শূর্পণখা মাটিতে পড়ে রয়েছে, রুধিরসিক্ত দেহ তার। তার আকাঙ্ক্ষা, সে পান করবে রাম-লক্ষ্মণ আর সীতার উষ্ণ রক্ত। শূর্পনখার দুর্দশা, শরীরের বিরূপতা দেখে খরের মনে জাগল তীব্র ক্ষোভ। ক্রোধে দুচোখ লাল হয়ে উঠল।
শূর্পণখা মাটিতে পড়ে রয়েছে, রুধিরসিক্ত দেহ তার। তার আকাঙ্ক্ষা, সে পান করবে রাম-লক্ষ্মণ আর সীতার উষ্ণ রক্ত। শূর্পনখার দুর্দশা, শরীরের বিরূপতা দেখে খরের মনে জাগল তীব্র ক্ষোভ। ক্রোধে দুচোখ লাল হয়ে উঠল।
রামের বাক্য মনে ধরল রাক্ষসীর। বাক্যের মধ্যে নিহিত পরিহাসের তীক্ষ্ণ ঝলক সে উপলব্ধিও করতে পারল না। সঙ্গে সঙ্গে রামকে পাওয়ার আশা ছেড়ে সে লক্ষ্মণের প্রতি মনোযোগ দিল।
রাম, লক্ষ্মণ, সীতা শেষে এসে পৌঁছলেন অগস্ত্য মুনির আশ্রমে। দণ্ডকারণ্যের বনরাজি যেন তার সমস্ত বৃক্ষসম্পদ একত্রিত করে বিরাজ করছে এই স্থানে। বিচিত্র সুন্দর বনজ গন্ধে ভরে আছে চারিদিক।
বাতাপি আর ইল্বল নামে দুই দুর্ধর্ষ পরাক্রমী অসুর বাস করত এই অরণ্যে। তারা যেমন শক্তিশালী, তেমনই নিষ্ঠুর ছিল। কত অসহায় ব্রাহ্মণের যে প্রাণ গিয়েছে তাদের হাতে, তার ইয়ত্তা নেই।
রাঘব, ক্ষত্রিয়ের জন্য ধনুর্বাণ হল আগুনের ইন্ধনের মতো। ক্ষত্রিয়ের কাছে অস্ত্র থাকলে তার স্বভাব এমনিতেই হিংস্র হয়ে ওঠে। সে ইচ্ছা না করলেও তার তেজ বেড়ে যায়। একটা প্রাচীন আখ্যান মনে পড়ছে। এক তপস্বী ছিলেন।
রাক্ষসী শূর্পনখা, রাক্ষসরাজ রাবণের কাছে রামের শৌর্য এবং রামের সুন্দরী স্ত্রী সীতার দৈহিক সৌন্দর্য বর্ণনা করল। রাক্ষসী, রাবণকে রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রায় প্ররোচিত করল। শূর্পনখার মতে, রামের বিরুদ্ধে রাবণের যুদ্ধযাত্রার দুটি উদ্দেশ্য —রামলক্ষ্মণের সম্মিলিত শক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং নিজের শক্তিতে আস্থা রেখে অনবদ্য দৈহিকসৌন্দর্যের অধিকারিণী সীতাকে ভার্যারূপে গ্রহণ। বিজ্ঞায়ৈষামশক্তিঞ্চ ক্রিয়তাঞ্চ মহাবল। সীতা তবানবদ্যাঙ্গী ভার্য্যাত্বে রাক্ষসেশ্বর।। রাবণ শূর্পনখার এই রোমাঞ্চকর প্রস্তাব শুনে, মন্ত্রীদের সম্মতি...
কৃষ্ণ পূজনীয় কেন? স্থির হল, মাননীয় কুরুপ্রধান কুরুপাণ্ডবদের পিতামহের নির্দেশে, রাজসূয়যজ্ঞে কৃষ্ণকে সম্মান প্রদর্শন করে অর্চনা করা হবে। ভীষ্ম, কৃষ্ণের সর্বত্রচারী অবিসংবাদিত স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। কনিষ্ঠ পাণ্ডবভাই সহদেবের অভিমত— কেশিদানবের হত্যাকারী কৃষ্ণের অর্চনা যিনি সহ্য করতে অক্ষম তাঁকে চূড়ান্ত অবমাননার সম্মুখীন হতে হবে। মনের গভীরে দানববৃত্তির সংহারক যিনি তাঁর স্থান নিঃসন্দেহে বিশিষ্ট এবং অদ্বিতীয়। প্রকারান্তরে তিনিই একজন প্রকৃত আচার্য যিনি শুভবোধ জাগরিত করে, অশুভকে নির্মূল করেন। কৃষ্ণ পিতার মতোই সন্তানসম সকলের শুভকামনায় নিয়োজিতপ্রাণ একজন পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। গুরুতুল্য তাঁর ভাবমূর্তি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিসরে একজন নারীকে কেন্দ্র করে দুই শক্তির বিরোধ হয়তো সহজ নয়। শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নারীকেন্দ্রিক নৈতিক চরিত্রের স্খলন, বিচ্যুতি বিরল নয়। সেটি হয়তো দেশের ঘরোয়া পরিসরে বা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে সংবাদপত্রের রসাল আলোচনার বিষয়। তবে কি পরস্ত্রী অপহরণ, ধর্ষণ এই অপরাধ নেই? একেবারেই তা নয়। এই দুষ্প্রবৃত্তির প্রবণতায় এই অপরাধ নিত্য ঘটে চলেছে এই ভোগবাদী দুনিয়ায়।
কৃষ্ণ পাণ্ডবদের পথপ্রদর্শক, পিতৃতুল্য শুভাকাঙ্খী, গুরুতুল্য ক্ষমাশীল, তাই তিনি সম্মানীয়। যজ্ঞের ব্যবস্থাপক, গুরুতুল্য সদুপদেশদাতা, আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ, স্নাতক গার্হস্থ্যজীবনের সঙ্গী, তিনি রাজার রাজা অর্থাৎ মনোজগতের অধীশ্বর, প্রিয় সখা, তিনি এই সব কিছু, তাই তিনি পূজ্য। যেন ভারতের অন্তরাত্মার কৃষ্ণপ্রীতির মর্মবাণী ঘোষণা করলেন ভীষ্ম। কৃষ্ণের মানবিক রূপ অতিক্রম করে অতিলৌকিক সত্তা বর্ণনা করে ভীষ্ম বললেন, তিনি বৃদ্ধতম, লোকবৃদ্ধতমে কৃষ্ণে যোঽর্হণাং নাভিমন্যতে।
দুর্বলচিত্ত মানুষের প্রশ্রয়ে রাবণ যখন মাথা চাড়া দেয় তখন শুরু হয় সীতাহরণের প্রস্তুতি, সেই সঙ্গে হয় লঙ্কাকাণ্ডের সূচনা। এর ফল সকলেরই জানা। শুভশক্তির উত্থান প্রতিহত করে অমানবিক অশুভ রাবণকে, যুগে যুগে, কালে কালে…। লিখেছেন পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায়।
দীর্ঘ শাস্ত্রকথা শেষ হল। তপোবনের শান্ত বাতাসে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। নিজের পালিতা কন্যার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য। শাস্ত্রের কঠোর অনুশাসন এবং এক স্নেহশীল পিতার হৃদয়ের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত জয়ী হল পিতৃত্বই। দৃপ্ত কণ্ঠে, স্থির প্রতিজ্ঞায় মহর্ষি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “শাস্ত্র যাই বলুক, আপৎকালীন বিধিতে হীন পাত্রের বিধান থাকলেও—আমি আমার এই প্রাণাধিক কন্যার বিবাহ সর্বাংশে যোগ্য এবং তার অনুরূপ গুণের অধিকারী বরের সঙ্গেই দেবো। অন্য কারও সঙ্গে নয়।”
নিজের ব্যভিচারিণী স্ত্রী কামদমনী আর তার প্রেমিক দেবদত্তকে কাঁধে নিয়ে রথকার বীরবরের সেই পাগলামি আর থামে না! স্ত্রী কামদমনী আর তার প্রেমিক দেবদত্তকে দুই কাঁধে তুলে নিয়ে, আনন্দে নাচতে নাচতে বীরবর সোজা বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে সে একে একে পৌঁছাতে লাগল তার সমস্ত আত্মীয়স্বজন আর পাড়াপড়শির দরজায়। সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে, জনে জনে সে অত্যন্ত গদগদ হয়ে সেই দুজনের ‘অপূর্ব আত্মত্যাগ’ আর ‘গুণকীর্তন’ শোনাতে লাগল!
কিছুক্ষণ পরেই রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার চিরে দেবদত্ত এসে ঢুকল কামদমনীর ঘরে। কোনওদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে সোজা গিয়ে বসল কামদমনীর নরম শয্যায়। চোখের সামনে নিজের স্ত্রীর এই কীর্তি দেখে রথকার বীরবরের তো রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে ওঠার জোগাড়! সে খাটের তলায় শুয়ে শুয়েই দাঁতে দাঁত চেপে ভাবতে লাগল, “কী করি এখন? এখনই খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এসে এই বিশ্বাসঘাতকদের কচুকাটা করব? নাকি এরা দুজনে যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে, তখন অবলীলায় দুটোকেই একসঙ্গে পরপারে পাঠিয়ে দেব?
মহারাজের এই চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত শুনে বিচক্ষণ ও দূরদর্শী মন্ত্রী রক্তাক্ষের তো চক্ষু চড়কগাছ! রাগে, ক্ষোভে আর হতাশায় তাঁর বুক ফেটে যাওয়ার জোগাড়। অন্যান্য মন্ত্রীদের এই নির্বুদ্ধিতা দেখে তিনি মনে মনে এক তিক্ত হাসি হাসলেন। তারপর গম্ভীর ও শ্লেষমাখা কণ্ঠে সভাসদদের উদ্দেশে বলে উঠলেন, “বড়ই পরিতাপের বিষয়! আপনাদের এই চরম মূর্খতা দেখে আমার সত্যিই কষ্ট হচ্ছে। আপনারা এক ভয়ংকর ভুল নীতি প্রয়োগ করে আমাদের প্রভুর এবং এই সমগ্র পেঁচাকুলের বিনাশের পথটাই নিজ হাতে প্রশস্ত করছেন!”
স্বামীর জীবন বাঁচিয়েই রাজকন্যা কিন্তু থামলেন না। এবার তিনি মন দিলেন উইয়ের ঢিবির সেই অহংকারী সাপটির দিকে। উনুনে ফুটন্ত গরম তেল চাপিয়ে, সেই টগবগ করে ফোটা তেল তিনি সাবধানে ঢেলে দিলেন উইয়ের ঢিবির গর্তের ভিতর। তেলের সেই ভয়ংকর তাপে ঢিবির ভিতরের সাপটিও নিমেষে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আর ঢিবি খুঁড়তেই বেরিয়ে এল ঝকমকে সোনাভর্তি দুটো বিশাল কলসি!
লোমশমুনি আখ্যান শেষ করে যুধিষ্ঠিরের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বলেন, ‘রাজন! এই সেই সমঙ্গা নদী। এখানেই স্নান করে অষ্টাবক্র স্বাভাবিক হয়েছিলেন। পবিত্র এই নদীতে তোমরা সকলে অবগাহন করো।’
রাজা বালকের বিদ্যাবত্তা পরীক্ষার ইচ্ছাতে তাকে কিছু প্রশ্ন করেন, যে প্রশ্নের উত্তর যথার্থ পণ্ডিতব্যক্তি ছাড়া কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। বালক অষ্টাবক্র অবলীলায় সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। রাজা মুগ্ধ হন।
অষ্টাবক্র জন্ম হওয়া অবধি পিতার পরিচয় জানতে পারলেন না। তিনি মাতামহ উদ্দালক পিতা বলে জানলেন আর শ্বেতকেতুকে নিজের ভাই বলে চিনলেন। এ ভাবে আরও কিছু বছর পেরিয়ে গেল।
রাজা আশ্রিত কপোতের মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে বাজপাখির দিকে ঘুরে তাকাতেই বাজপাখিটি মানুষের গলায় বলে ওঠে, ‘হে রাজন! এই বাজপাখিটি আমার ভক্ষ্য। অতএব আপনি ওটিকে আমার হাতে ছেড়ে দিন।’
যুধিষ্ঠির লোমশমুনির কাছে সোমকরাজার সে আশ্চর্য কাহিনী শোনেন। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে চলেন সোমকরাজার আশ্রমের দিকে। যাঁর সদ্গুণের প্রভাব হয়তো এখনও মিশে রয়েছে এখানকার বাতাসে।
ত্রিপুরার মহারাজ রবীন্দ্রনাথকে কিশোর-বয়সে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ত্রিপুরার প্রতি রবীন্দ্রনাথের দুর্বলতা ছিল। দুর্গম পথ পেরিয়ে অন্তত সাতবার গিয়েছিলেন ত্রিপুরায়। মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্যকে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, আশ্রম-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা। কেমন হবে সে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকরা কীভাবে পড়াবেন, প্রতি ক্লাসে কতজন ছাত্র থাকবে, সেই সঙ্গে ব্যায়ামচর্চার ব্যবস্থা রাখতেও যে আগ্রহী, সবই ত্রিপুরার রাজাকে বিশদে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
পিতা ও পিতামহের সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবেই সত্যেন্দ্রনাথ চাননি কাদম্বরী দেবী ঠাকুরবাড়িতে বধূ হয়ে আসুন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হোক। পত্নী জ্ঞানদানন্দিনীকে আহমদনগর থেকে লিখেছিলেন, ‘কোন্ হিসাবে যে এ কন্যা নতুনের উপযুক্ত হইয়াছে জানি না।’ আরেক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘শ্যামবাবুর মেয়ে মনে করিয়া আমার কখনই মনে হয় না যে ভাল মেয়ে হইবে-কোন অংশেই জ্যোতির উপযুক্ত তাহাকে মনে হয় না।’
ঠাকুরবাড়িতে অসুস্থ যোগমায়াকে বেলিসাহেব দেখতে আসার পর এক কাণ্ড ঘটেছিল। যোগমায়া দেবী দ্বারকানাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র গিরীন্দ্রনাথের পত্নী। রবীন্দ্রনাথের ‘মেজকাকিমা’ তিনি। অবনীন্দ্রনাথ তাঁর এই ‘দিদিমা’র কথা ‘ঘরোয়া’তে শুনিয়েছেন। দিদিমাকে তিনি চোখে দেখেননি। ছবি দেখারও সুযোগ হয়নি। কেউ তাঁর ছবি তুলে রাখেননি। অবনীন্দ্রনাথ শুধুই তাঁর গল্প শুনেছিলেন।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, তাঁদের জন্য ‘উত্তম ঘর ও উত্তম আহারাদির ব্যবস্থা’ করতেন নিয়মিত। যাঁরা এইভাবে উপকৃত হয়েছিলেন, জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর মহর্ষির সঙ্গে শুধু নয়, পরিবারের কারও সঙ্গে দেখা হলেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘প্রায় দুই একজন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রকে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়া তাহার শিক্ষার ব্যয়ভার তিনি বহন করিতেন। তন্মধ্যে একজন পরীক্ষোত্তীর্ণ ছাত্র—এখন ডাক্তার— আমাদের সহিত কখনও সাক্ষাৎ হইলেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া থাকেন।’
রানি চন্দকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন অবনীন্দ্রনাথ। মুখে মুখে কত গল্প শোনাতেন তাঁকে। শোনা গল্প নিখুঁত- নির্ভুলভাবে ঠিক অবনীন্দ্রনাথের ভাষাতে লিখে ফেলতেন তিনি। এভাবেই লেখা হয়েছিল দুটি বই, ‘ঘরোয়া’ ও ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’। রবীন্দ্রনাথও রানি চন্দকে খুব স্নেহ করতেন। রবীন্দ্রনাথের বলে যাওয়া লেখারও অনুলিখন করেছিলেন রানি। রোগশয্যায় কবি মৃদুুস্বরে বলেছেন কবিতা, সে কবিতা দ্রুত কাগজে লিখে নিয়েছেন রানি চন্দ। অবনীন্দ্রনাথের তো বটেই, রবীন্দ্রনাথের অনুলিখনও যথাযথভাবে করতে পেরেছিলেন তিনি। কবির সঙ্গে তিনি ভ্রমণেও গিয়েছিলেন।...
"তিন টান একত্র হলে তবে তিনি দেখা দেন। বিষয়ের বিষয়ের উপর, মায়ের সন্তানের উপর, আর সতীর পতির উপর টান। এই তিন টান যদি কারও একসঙ্গে হয়, সেই টানের জোরে ঈশ্বরকে লাভ করতে পারে।" [কথামৃত পৃঃ ২১] ঈশ্বরীয় প্রেম সর্বদাই কথা ও শব্দের আড়ালে মানুষ লৌকিক ভালোবাসার সামঞ্জস্য খুঁজে। কিন্তু লোকত্ত্বর সে ভালোবাসার সামঞ্জস্য ও গভীরতা বোধগম্যের পারে। মানবের সহজ প্রবৃত্তি হল তুলনামূলক বিচারের দ্বারা ধারণা উৎপাদন করা। বাস্তবিক, মানব মন বুদ্ধির পারে চিরকালীন অব্যক্ত প্রেম রয়েছে তাকে গ্রহণ করতে পারে না। 'আমি' কে না হারিয়ে যা পাওয়া...
আমাদের লক্ষ্য আনন্দ লাভ, স্বরূপ উপলব্ধি। অর্থ নয়, সম্পত্তি নয়, সুখও নয়, দুঃখও নয়। অর্থ বা সম্পদের প্রাপ্তির ইচ্ছার মূল লক্ষ্য, আনন্দ। কিন্তু আমাদের চক্ষু-আদি ইন্দ্রিয় সকল বহির্মুখী বিষয়ের ভোগের কারণে ক্ষণিকের সুখে মত্ত হয়ে পড়ে। অন্তরে বিষয় ব্যতীত আনন্দের ভান্ডার রয়েছে। শরীরের বহির্ভাগে ভগবান যেন ইন্দ্রিয়গুলি খোদাই করে বসিয়ে দিয়েছেন।
‘অয়ং নিজ পরবেতি গণনা লঘু চেতসাম্, উদার চরিতানান্তু বসুধৈব কুটুম্বকম্।’ (নীতি) যাহারা সংকীর্ণ চিত্ত স্বার্থপর ব্যক্তি, তাহারা সর্বদা আমি ও আমার চিন্তায় ব্যস্ত। কিন্তু উদার প্রকৃতির লোকেরা সারা জগতবাসীকে আত্মীয় গান করেন, তাদের নিকট আপন পর বোধ থাকে না। তাদের দূর্বল চিত্ত আপনার গণ্ডি এত ছোট করে যে সে জায়গাতেই থেকে যায়, আর সম্প্রসারণ হয় না।
কর্ম করলে চিত্তের বিক্ষেপ হওয়া স্বাভাবিক। উপাসকের তাহলে কর্ম করা অনুচিত। কিন্তু কর্ম না করে, চিত্তের বিক্ষেপ প্রতিরোধ করা কী সম্ভব? পতঞ্জল বলছেন, “যোগঃ চিত্ত-বৃত্তি নিরোধঃ”। বৃত্তিহীন মন সাধন ছাড়া উপার্জনক্ষম। কর্মফল বিনাশী বা সঞ্চয়কারী হলেও কর্ম সর্বদা পরিত্যক্ত নয়। শাস্ত্রবিহিত কর্ম চিত্রের স্বাভাবিক এবং দুশ প্রবৃত্তি দূর করে ও নিষ্কাম কর্মের দ্বারা চিত্রশুদ্ধিকরণ হলে জ্ঞাননিষ্ঠার উপযোগী হয় সাধক।
মানুষ, সীমিত সত্ত্বা এবং ক্ষুদ্র অহংকার যুক্ত। যে কারণেই সে পৃথক ঈশ্বর থেকে। সংস্কারমুক্ত অখণ্ড জ্ঞানই ঈশ্বর, আর খণ্ডিত জ্ঞান কর্ম ও সংস্কারযুক্ত মানুষ। এই সীমা বা বন্ধনের বাইরে যাওয়াই উপাসনার লক্ষ্য। এ জগৎ, যা পরিব্যপ্ত হয়ে আছে তা জড়। যদি বলি তবে প্রশ্ন জড় থেকে জড় উৎপন্ন হতে পারে কী করে? না, তবে এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনও সজীব সত্ত্বা রয়েছে।
ভারতের দুই মহামানব—শ্রীরামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথ। একজন নররূপী নারায়ণ, অবতাররূপে পূজিত, অন্যজন বিশ্বকবি হিসেবে বন্দিত। দু’ জনেরই অলোকসামান্য জীবন, কর্ম ও বাণী আমাদের চিন্তা ও কল্পনাকে বারবার মুগ্ধ এবং বিস্মিত করে।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের মধ্য থেকেই উদাহরণ দিয়েছেন নিরাকার ও সাকারবাদী উপাসকের। শ্রীরামকৃষ্ণ “আশ্চর্য দর্শন সব হয়েছে। অখণ্ড সচ্চিদানন্দ দর্শন। তার ভিতর দেখছি, মাঝে বেড়া দেওয়া দুই থাক।
রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ চল্লিশ বছর তাঁর শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়টিকে লালন-পালন করার সময় পেয়েছিলেন, আর শ্রীরামকৃষ্ণ মাত্র বছর আটেক।
কথামৃতে আমরা দেখি কথামৃতকার শ্রীম, যাঁকে শ্রীরামকৃষ্ণ ‘মাস্টার’ বলেও সস্নেহ সম্বোধন করতেন, প্রথম প্রবেশ করছেন শ্রীরামকৃষ্ণের আনন্দ-পাঠশালায়।
আপনার অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসন্ধান পরিমার্জিত করার চেষ্টা করুন অথবা ওয়েবসাইট মেনু থেকে পোস্টটি সনাক্ত করুন।
মেঝেতে আসনে শ্রীমা পা মেলে বসে আছেন। সন্ধ্যার পর ভক্ত সারদেশানন্দ তাঁকে চিঠি পড়ে শোনাচ্ছেন। সামনে একটি লণ্ঠন জ্বলছে। ভক্তটির হঠাৎ চোখে পড়ল, কিছুদূরে একটা মস্ত বড় তেঁতুল বিছে শ্রীমার দিকে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, শ্রীমাকে কামড়াবে না তো। তখনি পা দিয়ে বিছেটাকে সরিয়ে দিলে। তখন লাঠি বা কিছু নেওয়ার কথা মনে আসেনি তার। শুধু ভেবেছেন, মাকে কামড়ালে সর্বনাশ! তাই যেই দেখেছেন অমনি জোরে পা দিয়ে মেরেছেন।
শ্রীমা নিকুঞ্জদেবীকে একদিন বলেন, ‘ঠাকুর বলেছিলেন, তুমি আর লক্ষ্মী কে, আমি জানতে পেরেচি, তোমাদের বলব না। তোমার ধার শোধ করার জন্যে আমি বাউল হব আর তোমাকে সঙ্গে নেব’। তিনি আরও বলেন যে, লক্ষ্মী বলেছিল, আমাকে তামাক-কাটা কল্লেও আর আসচি না। ঠাকুর হেসে বললেন, ‘আমি যদি আসি তো থাকবি কোথা? প্রাণ টিকবে না। কলমীর দল, এক জায়গায় বসে টানলেই সব আসবে’।
মা সারদা জয়রামবাটি থাকার সময় যোগীন মহারাজের দেওয়া কাঠের টেবিলের মাঝের কব্জা দিয়ে দুখণ্ডে জোড়া ভারি কাঠটা তাঁর পায়ের উপর পড়ে গেল। আঘাত লেগে চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বেরিয়ে এল। ভীষণ ব্যথা হচ্ছে, শ্রীমা পা চেপে ধরে বসে আছেন, তাঁর চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগল। সকলে ছুটে এসে, ডাক্তারখানা থেকে ওষুধ এনে পায়ে বেঁধে দেওয়া হল।
১৩৩৯ সালের দোলপূর্ণিমায় আবির খেলার সময় কোনও ছেলের অসাবধানতার জন্য সুরমাদেবীর কানের ঠিক পিছনে রঙের ঘটির আঘাত লাগে। তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাঁর কান দিয়ে দু’একদিন জল পড়ার পর পুঁজরক্ত পড়তে আরম্ভ করল। আর এর ঘা মস্তিষ্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ায় রাতের মধ্যেই একটা কিছু হয়ে যাবে, ডাক্তার এরূপ নিশ্চিত অভিমত দিয়ে চলে গেলেন। সেই রাতে সুরমাদেবী ক্রমাগত ভুল বকতে লাগলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন যে, তাঁর ঘাড়ের উপর কে বসল? ‘আমি কি এত ভার সইতে পারি? আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্চে, শিগ্গির আলো জ্বাল, দেখি’। তারপরই প্রকৃতিস্থ হয়ে...
মা সারদা তাঁর সময় হয়ে আসছে বুঝতে পেরে নিজের পরিবারের প্রতি বিশেষ করে রাধুর উপর থেকে মন তুলে নিলেন। রাধুকে কেবল একটা কথাই তিনি বলেছিলেন, ‘তুই আমার কী করবি, আমি কি মানুষ?’ পরে রাধু ব্রহ্মচারি অক্ষয়চৈতন্যকে বলেছিল, ‘আমি তো তাঁকে নিজের পিসিমা বলেই জানতুম। আমি কি জানতুম যে তিনি মানুষ নন, দেবতা?’
আপনার অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসন্ধান পরিমার্জিত করার চেষ্টা করুন অথবা ওয়েবসাইট মেনু থেকে পোস্টটি সনাক্ত করুন।
রুমির স্কুলের শিক্ষিকারা তাকে পড়াশোনায় নানাভাবে সাহায্য করতেন। শিক্ষিকাদের সাহায্য, মায়ের ইচ্ছা আর নিজের মেধায় রুমি মাধ্যমিকে স্টার মার্কস নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করে। সে আমলে প্রথম বিভাগ পাওয়াটাই যথেষ্ট কঠিন ছিল, তার ওপর রুমি পেয়েছিল স্টার মার্কস। তাই সকলেরই প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
সালাম ঘোড়ার পিছু পিছু হাঁটছিল। রাশ টানতেই থমকে দাঁড়ায়। উঠে পড়ে পিঠে। ঘোড়ার পিঠে উঠেই গতি বাড়ায়। ট্রামগুমটি পেরিয়ে শিয়ালদার ফ্লাইওভার। স্টেশনের ইলেকট্রনিক ঘড়িতে একটা পাঁচ। সালাম ঘোড়া ঘুরিয়ে ফেলে জগৎ সিনেমার দিকে। সব সময় সামনের দিকেই যেতে অভ্যস্ত ঘোড়া। চোখে ঢাকনা লাগানো থাকে। ফলে দু’পাশের কিছু দেখতে পায় না। যা দেখে, তা সোজা, বলা যায়, নাক-বরাবর।
কাঠঠোকরা বলে হ্যাঁ হ্যাঁ, তা তো পারি। কিন্তু ভালো গাছ তো এ বাগানে দেখছি না। কোথায় পাবো শাল-সেগুন ভালো কাঠের গাছ? আমি তো ভালো কাঠওয়ালা গাছই খুঁজে বেড়াচ্ছি। শাল-সেগুন গাছ কোথায় আছে? ঠিক তখনই একদল চড়াই এসে বসল ওই গাছেরই আর একটা ডালে। একটা চড়াই বলল, একটা সেগুন গাছের হদিশ দিতে পারি আমি।
বরকর্তা হিসেবে একটা নিটোল বিয়ের সুচারু ব্যবস্থাপনার পর সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে বিয়ের আসর ছেড়ে ভুরিভোজের ঠিকানায় পা বাড়িয়েছি, তখন কন্যাপক্ষের এক যুবক এসে বললেন—কাকু ট্রলিব্যাগটা দিয়ে দিন। গাড়িটা যাচ্ছে ব্যাগটা বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
শব্দবাজির কম্পাঙ্ক কমানোর জন্য আইনকানুন আলোচনা সবই হচ্ছে কিন্তু আখেরে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। কানফাটানো শব্দের কোন বিরাম নেই। আর পাড়ার ভেতরে এতো কড়া আইনকানুন বলে কিছু নেই। মানা করতে গেলে বেশিরভাগ লোকই নাক কান চুলকে বলবেন——কালী পুজোর সময় বাজি পুড়বে না? এ কি হয় নাকি মশাই? কানে তুলে দিয়ে রাখুন, জোরসে মিউজিক চালিয়ে দিন।
শাক্য নিচুগলায় শর্মাকে কিছু বলল। শর্মা শুনে ঘাড় নাড়লেন। তারপর ফাদারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ফাদার, আপনি ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। আসুন। আপনি যাতে পরে কোন অভিযোগ না করতে পারেন, সেজন্য আপনারও থাকা উচিৎ এখানে। দেখুন, আন=মরা কিন্তু জাস্ট রুটিন এনকোয়ারি করছি। ফাদার এগিয়ে এলেন। তাঁকে কিছুটা নার্ভাস দেখাচ্ছিল। সেইসঙ্গে চাপা বিরক্তির চিহ্ন মুখে-চোখে।
ফাদার চোখ রগড়ে ভালো করে দেখলেন, তাই তো। অন্তত খান পাঁচ-সাত গাড়ি দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে বড় গাড়িও আছে দুটি। একটি আবার লোডেড। চেকপোস্টে যে সব পুলিশ এবং কাস্টমসের লোক থাকেন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, তাদের অনেককেই ফাদার চেনেন ভালো করে। চার্চের গাড়ি, বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স দেখলে তারা রুটিনমাফিক কেবল একবার উঁকি দিয়ে দেখে। পেশেন্ট থাকলে তো কথাই নেই। সঙ্গে-সঙ্গে ছেড়ে দেয়। সব সময় তো ফাদার নিজে থাকেন না। কিন্তু চার্চের গাড়ি আলাদা ট্রিটিমেন্ট পায় পুলিশ-প্রশাসনের কাছ থেকে।
ড্রাইভারের বেশ অল্পবয়স। আগে কখনও দেখেনি শাক্য। থানায় অবশ্য বেশ কয়েকটি গাড়ি। সব ড্রাইভারকে চেনাতার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তাকে যতটা সম্ভব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুনে সে বেশ উত্তেজিতও হয়ে উঠেছিল। আজকালকার ওয়েব-সিরিজ দেখে সম্ভবত খুব। পাকা হাত অবশ্য। বেশ জোরেই গাড়ি চালাচ্ছিল। সুদীপ্ত খরচোখে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
শেফালিকা আছেন বলে নুনিয়ার খাওয়া-দাওয়ার কোনও অসুবিধা নেই। বাইরের খাবার দেওয়ার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নুনিয়াকে রাজসাক্ষী করা হবে এটাই ঠিক আছে। এই অবস্থায় তার প্রাণের উপর আবার অ্যাটেম্পট হলে ওইটুকু বাচ্চার প্রাণ তো যাবেই, কেসের ভবিষ্যতও বিশ বাঁও জলে চলে যাবে।
সুদীপ্ত ভেবেছিল রেস্ট নেবে ক’দিন, বেশ ধকল গিয়েছে পিশাচপাহাড় হেলথ সেন্টার চেজের ঘটনায়, কিন্তু আজ সকালের ঘটনা শুনে সে ছুটে এসেছে। সঙ্গে আফজল নামের ছেলেটিও আছে। আফজল-ও বেশ করিতকর্মা। এক ওই মালাকার ছাড়া এই থানার বাকি সকলের দক্ষতা এবং উদ্যম নিয়ে শাক্যর কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু মালাকার যেন গা-ছেড়ে দিয়েছেন আগে থেকেই। এত কিছুর পরেও তাঁর বিশ্বাস, কালাদেওই এত কিছুর হোতা। কিছুক্ষণ আগেও তার কানের কাছে সেই ব্যাপারে বকবক করছিলেন।
ডিজিটাল লক লাগানো হল, যা যা বলা হয়েছিল সবই করা হল। কিন্তু যেদিন পুলকের ফোন বন্ধ থাকায় বিরূপাক্ষকে ঈপ্সিতা ফোন করেছিল সেদিন প্রথম পুলক বাড়ি ফিরে উদ্ধত ব্যবহার করল। যেদিন সম্পূর্ণ এক অন্য চেহারার পুলককে দেখল ঈপ্সিতা। রুক্ষ সাংঘাতিক উত্তেজিত কিছুটা উন্মত্ত পুলক আজকাল মদ্যপ হয়ে ফেরে। এত সাফল্যের পরেও কী চায় পুলক? মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার? সেদিন সে আরও অস্বাভাবিক ছিল।
কনফিডেন্সিয়ালিটির জন্য এটা স্যার বা আপনাকেই করতে হবে! না হলে আমি এসে সব করে দিতাম কিন্তু সেটা ঠিক হবে না। আর ওই কার্ডের কোড নম্বরটা নিয়ে আমি রেজিস্ট্রেশন সব করে দেব আপনার ফোন নম্বর আমার কাছে আছে। এটা ওদেরও দেখার কথা নয়, সেজন্যই আমি আপনাকে এত কিছু বললাম।
হঠাৎ কী হল? বিরূপাক্ষ তড়িঘড়ি ফোনটা ছেড়ে দিল কেন? পুলকের সঙ্গে কথা হয়েছে শুনে বিরূপাক্ষ ঘাবড়ে গেল কেন? বিরূপাক্ষ অন্যদিন যতটা আত্মবিশ্বাসী থাকে আজ তেমন লাগলো না কেন? মনে হল আজকের ফোনটার জন্য বিরূপাক্ষ যেন তৈরি ছিল না! কেন? পুলককে ফোনে না পেলে ঈপ্সিতা তো বিরূপাক্ষকেই ফোন করে? আজ পুলক কোথায় আছে সেটা কি বিরূপাক্ষ জানে না?
সরকারি চাকরি দিতে অনেক হ্যাপা। পরে এ নিয়ে খোঁচাখুঁচি হলে ঝঞ্ঝাট অনেক। কিন্তু এতও হিসেবী এতো বুদ্ধিমান হয়েও ইপ্সিতার কাছে পুলকের পরকীয়া ধরা পড়ে গেল। মা কেন, ইপ্সিতা ছাড়া সারা পৃথিবীর আর কেউ জানে না। পুলক হাঁটুর বয়সী টেলিনায়িকা উত্তরা মুখার্জির সঙ্গে ডুবে ডুবে বিষপান করছে।
বিনীতা বেশ অবাক। মাত্র গতকাল ভোরেই বুতাইয়ের জীবনের এতও বড়ো একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে। তারপর গোটা একটা দিনের ছোটাছুটি! হাসপাতাল শ্মশান! কিন্তু আজ বুতাইকে দেখে মনে হচ্ছে এক তার মনে কোনও কষ্ট নেই আর নাহলে ইচ্ছে করে পাগলের মতো বকবক করছে। জোর করে শোকের থেকে শকের থেকে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনতে চাইছে মেয়েটা।
অতনুবাবু, ঝুঁকি কোনওদিন নিতে পারিনি। আজকে আমি আর আমার স্ত্রী। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বোনেরা সংসার করছে। অনেকটা ঝাড়া হাত-পা। তাই এবার একটু ঝুঁকি নিতে চাই। আর একটা কথা। আপনার মতো যুবক আমি ছোটবেলা থেকে বড় হওয়ার মধ্যে দেখিনি কাউকে। তাই ঝুঁকিটা আপনার সঙ্গে নিতে চাই।
দরজা ঠেলতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে আসে। চিকেন চাপ আর বিয়ারের রাতভোর জমে থাকা ককটেল। বাড়িতে ফ্রিজেরাখা কপির তরকারিতেও একই কাণ্ড ঘটে। আলো-আঁধারি। রেস্তঁরার মালিক বোধহয় সকালের বিদ্যুৎ বাঁচান। নো লাইট, নো ফ্যান! একটা মোটা থপথপে লোক। মাথায় রোঁয়াওঠা খাড়াখাড়া চুল। লালরঙের সানমাইকার কাউন্টারে বসে আছে। পাশে ঝুল কালি-নিন্দিত একটা টেবলফ্যান। ঘরঘর করে ঘুরছে। তবে লোকটার মোটা খসখসে চামড়া টপকে সে হাওয়া তাঁর শরীরে পৌঁছচ্ছে কিনা সন্দেহ।
অতনু জানেই না যে তার অজান্তে সিকিউরিটি এজেন্সির বিতান ঘোষ তার সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়েছেন। প্রয়োজনটা তার নয়। প্রয়োজন অতনু সেনের রেকমেন্ডেশনে রবীন চ্যাটার্জির কোম্পানি অ্যাথেনা ইনফোটেকের কর্মরতা দিয়া সাহার। তবে দিয়ার কেন অতনুকে জানার প্রয়োজন সেটা সে বোধহয় নিজেও জানে না।
রাতে দিয়া ঘুমোতে পারে না! অতনু সেনের জন্যে খুব খারাপ লাগছিল। এতদিন দিয়া ভাবতো তার মতো কষ্ট কেউ পায়নি। তাকে পড়াশোনা করাতে এতকষ্ট করেছেন তার মা-বাবা। কিন্তু তার সাফল্য দেখার আগেই মারণ রোগে বাবা চলে গেলেন। মা এখনও গ্যাস এজেন্সিতে কাজ করেন। পরিশ্রম হয়। অসুস্থ হন। তবু কাজে যেতে হয়। গ্যাস এজেন্সিতে ছুটি নেই।
ছুটি হতেই দিয়া দ্রুত পায়ে রাস্তায়। কলেজ মোড়ে বাসযাত্রীদের চাকচাক ভিড়। বাসস্ট্যান্ড থেকে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়া আরও ঘরফিরতি মানুষজন। সেক্টর ফাইভের বহুতল থেকে দেখলে ঠিক যেন কৌটোতে মৌরী ঢালতে গিয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়তি মৌরীর মতো দেখাবে। রান্নাঘরে মৌরি নিতে গিয়ে দিয়া রোজ ফেলে আর মা রোজ চটে যান। দিয়া আরও খানিকটা তফাতে দাঁড়াল।
সেখানে একটা তে-পায়া টেবিল। সে টেবিলের তিন দিকে তিনটে চেয়ার। আমার পরিচিতাকে যে দেবরাজ বাবু চেনেন না সেটা আমি স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম। তবু দেবরাজবাবু আমি আর ঈপ্সিতা বসলাম তিনটে চেয়ারে।
শবনমের বিয়ে আসানসোলেই হয়েছে। তবে তার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে এ সব নিয়ে কথা বলাটা শোভনীয় হবে না ভেবে বুনি শবনমকে ওদের বাড়িতে ডেকে পাঠালো।
আফিফার ভয়ানক পরিণতির কথা তো আমি এতদিন বাদে শুনলাম। কিন্তু আমি ক্রমাগত সেই চামড়া পোড়া মাংস পোড়া গন্ধটা পেতাম কেন? আফিফা আত্মহত্যা করেছে নাকি সেটা খুন?
কী আশ্চর্য আমার ফ্ল্যাটের কবে গেট বন্ধ কবে পাম্প চালানোর কথা আমার এসব খেয়াল থাকে না কিন্তু মায়ের সব খেয়াল থাকে যদিও সেটা আমার হয়ে সুমন্ত এতদিন করে এসেছে।
আমি এখনও জানি না আদৌ এমন কিছু ঘটছে নাকি পুরোটাই আমার মনের ভুল বা হ্যালুসিনেশন। যেটা আমার ডাক্তারনী মনে করেন। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস করেছি।
অরুণাভ-বাবলিকে একসঙ্গে দেখে প্রণয়ের হিংসা তাকে অপহরণ করার ছক তারপর সেই ঘটনা হাতের বাইরে চলে যাওয়ার মুহূর্তে নিজের ভুল বুঝতে পেরে বাড়ির কথায় নিজের স্বভাবসিদ্ধ ঔদ্ধত্য ভুলে আত্মসমর্পণ। এই সব কিছু প্রণয়কে একেবারে বদলে দিল। সেই বদলটা বাইরের নয় ভেতর থেকে বদলে গেল প্রণয়কান্তি দত্ত। কিন্তু এতদিনের যে ভুল যে অন্যায় প্রণয় করেছে তার মাশুল তো তাকে দিতেই হবে। এক ভয়ংকর মাশুল দিতে হল তাকে।
বাবা এরকম কিছু একটা আন্দাজ করেছিলেন। বাবা একবার মায়ের দিকে তাকালেন। হয়তো নিঃশব্দে বলতে চাইলেন, প্রণয়ের জন্য আর কত পাপ করতে হবে। মা-ও তাঁর দৃষ্টিতে হয়ত বুঝিয়ে দিলেন, প্রণয় নয় বাবলির জন্য করতে হবে। বাবা চুপ করে চোখ বুজিয়ে ভাবলেন। আসলে এটা যেন সেই বিশেষ মুহূর্ত, যখন সাহিত্যিক অমলকান্তি দত্ত তাঁর নিজস্ব ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন।
স্টুডিয়ো থেকে কলকাতার একটু বাইরে কোলাঘাটের কাছে একটা কালীপুজোর উদ্বোধনে যাওয়ার কথা ছিল অরুণাভর। আগরওয়াল বুদ্ধি করে এই টোপটা অরুণাভর কাছে তারই লোক দিয়ে পাঠিয়েছিল। মোটা টাকা অ্যাপিয়ারেন্স মানি। স্টুডিয়ো থেকে গাড়ি করে নিয়ে যাবে রাতে কলকাতা পৌঁছে দেবে।
বাবা ফোনটা ধরে কোন ভণিতা না করে সরাসরি বললেন —প্রণয়! সেজ্জেঠু বলছি। তোর খুব বড়ো বিপদ ! বাঁচতে চাস তো যেখানে যে অবস্থায় আছিস, সেখান থেকে এক্ষুনি বাড়িতে আয় ! আমি লাইব্রেরি ঘরে অপেক্ষা করছি। হাতে সময় কম। নিজে লেখেন বলে বাবা জানতেন প্রণয়কে ধাক্কা দিয়ে ঘটনার গভীরতা না বোঝাতে পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
আসলে ছোটবেলা থেকে দিল্লিতে পড়াশোনা বেড়ে ওঠা, ওর এখনও এডজাস্টমেন্ট-এর অসুবিধে হয়। বিশ্বাস করে মনের কথা মানে কাজের পছন্দ অপছন্দ, খারাপ লাগা এসব মন খুলে কাউকে বলতে পারে না, বুঝতে পারি সবাই আমার মতো নয়। কারও কারও মনের জমে থাকা ধোঁয়া বের করে দেবার চিমনী লাগে।
খুকু ষোল পূর্ণ করে সবে সতেরোয় পা দিয়েছে। ডায়মন্ডহারবার আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাস নাইনের ছাত্রী। লালপাড় সাদা শাড়ি আর দুটো মোটা বিনুনি ঝুলিয়ে খুকু যখন ইস্কুলে যায় অচেনা পথচারীরাও না তাকিয়ে পারে না। কোনো সাজ নেই। একটা টিপ পর্যন্ত না। শুভ্র ত্বকের নীচ থেকে তবু জ্যোতি বেরোয়। ছেলেবেলা থেকে এমন কথাই শুনেছে ও মায়ের কাছে। বাবা নাকি তাই ওর ভালো নাম রেখেছিলেন প্রভাময়ী। ডাকেন প্রভা বলে।
তখন প্রায় মধ্যরাত। মেঘাবৃত আকাশ গর্জন করছিল থেমে থেমে। ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কমেছে অনেকক্ষণ। জোলো বাতাস বইছে নিজের মতো করে। দক্ষিণ পুবের জানলা টেনে বন্ধ। পায়ের কাছে মেঝে সমান পশ্চিমের জানলার পাল্লাখানা শুধু খোলা। বিছানা থেকে দেখা যাচ্ছিল, গাঢ় অন্ধকার চিরে চিরে রুপোলি অলোর ইচ্ছেখুশি ছুটোছুটি। ঝড়টা উঠেছিল শেষ বিকেলে। গোধূলির মুখ নিকষ কালো হয়ে থমথম করল কিছুক্ষণ। তারপরেই আছড়ে পড়া কাকে বলে। প্রবল সাইক্লোন। সঙ্গে তুফান বর্ষণ। একঘন্টার মধ্যে সামনের রাস্তায় গোড়ালি ডুবল। সুনীতি ভাগ্যিস মেয়েকে নিয়ে তখনও এ বাড়িতেই।...
নবীন আসছে ছুটতে ছুটতে। সমুদ্রের নোনা জল গায়ে মাখা তাগড়া নবীন চন্দ্র। সেজদা বলতে অজ্ঞান। আদিনাথ দাশগুপ্তর খাস চাকর ছিল নবীনের বাবা অনন্ত মাহাতো। তখন ওরা পাকাপাকি পূর্ববঙ্গে। ক্ষুদে শঙ্কর অনন্ত কাকার কোলে পিঠেই বড় হয়েছে। কোটালিপাড়ায় আদিনাথের বিপুল সম্পদ এবং প্রতিপত্তির মধ্যে। তারপর শুধুই ভাঙচুর। গুঁড়িয়ে যাওয়া দাপটের ধুলোকণায় প্রভুভৃত্যের বনেদি রেয়াৎ এখন নেই। কেবল তার একটা অস্পষ্ট আভা রয়ে গিয়েছে।
সুধা সবে অভিমানে মুখ ফুলিয়ে কিনতে যাচ্ছিল মুড়কি তখনই হাত নেড়ে আহ্বান। ওদিকে পুজোর ঘরে হই হই করে গুরুদেবের বহুব্যঞ্জন ভোগের ব্যবস্থা হয়েছে। সুনীতি ও আছেন সেই দলে। গুরুদেব ডেকে নিলেন সুধাকে। শিষ্যদের বললেন, গিন্নি মুখে কিছু না দিলে আমি খাই কি কইরা? আমার পাশেই অর বসার পিঁড়িখান পাত। গুছায়ে খাইতে দাও।
গুরুদেব বলছিলেন, যা সত্য তাই কি কেবল স্থায়ী! মৃত্যু তো সত্য। তবে মৃত্যু কি স্থায়ী? হ্যাঁ, তাই। নশ্বর এই জীবন। ক্ষণস্থায়ী। চঞ্চল। ফেনাময় বুদবুদ। গুরুদেবের গলায় ঢেউয়ের মতো শব্দ। চাঁদনি রাতে ডায়মন্ডহারবারের সমুদ্র যেমন গম্ভীর গলায় ডাকে, আকাশের সঙ্গে একলা কথা বলে, ঠিক তেমনি গম্ভীর আর সুন্দর। লালপোলের কিনারে দাঁড়ালে সে কথা শোনা যায়। লিখছেন ড. জয়িতা দত্ত।