বুধবার ১৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

নিজের ব্যভিচারিণী স্ত্রী কামদমনী আর তার প্রেমিক দেবদত্তকে কাঁধে নিয়ে রথকার বীরবরের সেই পাগলামি আর থামে না! স্ত্রী কামদমনী আর তার প্রেমিক দেবদত্তকে দুই কাঁধে তুলে নিয়ে, আনন্দে নাচতে নাচতে বীরবর সোজা বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে সে একে একে পৌঁছাতে লাগল তার সমস্ত আত্মীয়স্বজন আর পাড়াপড়শির দরজায়। সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে, জনে জনে সে অত্যন্ত গদগদ হয়ে সেই দুজনের ‘অপূর্ব আত্মত্যাগ’ আর ‘গুণকীর্তন’ শোনাতে লাগল!
h3>
১২শ কাহিনি সমাপ্ত।
আপনার নির্দেশমতো, গল্পের এই চূড়ান্ত নাটকীয়, হাস্যকর এবং চরম কৌতুকপূর্ণ মুহূর্তটিকে একেবারে চোখের সামনে ভেসে ওঠা একটি নাটকের দৃশ্যের মতো সাজিয়ে নিচে পুনর্লিখন করা হলো। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির বানানবিধি এবং আপনার প্রদত্ত সংস্কৃত শ্লোকগুলো অক্ষুণ্ণ রেখে দৃশ্যটিকে আরও প্রাণবন্ত করা হয়েছে। শেষে সংস্কৃত সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্র থেকে প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণও যুক্ত করা হয়েছে:

নিজের ব্যভিচারিণী স্ত্রী আর তার প্রেমিককে কাঁধে নিয়ে রথকার বীরবরের সেই পাগলামি আর থামে না! স্ত্রী কামদমনী আর তার প্রেমিক দেবদত্তকে দুই কাঁধে তুলে নিয়ে, আনন্দে নাচতে নাচতে বীরবর সোজা বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে সে একে একে পৌঁছাতে লাগল তার সমস্ত আত্মীয়স্বজন আর পাড়াপড়শির দরজায়। সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে, জনে জনে সে অত্যন্ত গদগদ হয়ে সেই দুজনের ‘অপূর্ব আত্মত্যাগ’ আর ‘গুণকীর্তন’ শোনাতে লাগল!
বীরবরের এই চরম বোকামি আর প্রহসনের দৃশ্য বর্ণনা করে পেঁচাদের মন্ত্রী রক্তাক্ষ থামলেন। রাজসভায় তখন পিনপতন নীরবতা।

সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে রক্তাক্ষ আবার তাঁর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “মহারাজ, ঠিক এই কারণেই আমি বলেছিলাম—নিজের চোখে প্রত্যক্ষ পাপ দেখেও, শত্রুর মিষ্টি কথায় যে ভুলে যায়, তার অবস্থা এই মহামূর্খ রথকারের মতোই হয়! বায়সরাজ মেঘবর্ণের এই বিতাড়িত ও শরণাগত বৃদ্ধ মন্ত্রী স্থিরজীবীর মধুর কথায় ওই মূর্খ রথকার বীরবরের মতো আপনারাও সকলে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছেন। আর কেবল আপনাদের এই মূর্খতার কারণেই আজ আমরা সকলে সমূলে বিনষ্ট হতে চলেছি।”

একটু থেমে, অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে রক্তাক্ষ বললেন, “লোকে ঠিকই বলে—যে মানুষ হিতকথা না বলে অহিত উপদেশ দেয়, যে লোক মানুষের মঙ্গলের দিকে নজর না দিয়ে তার বিপরীত আচরণ করে, সেই প্রাজ্ঞ পুরুষ আসলে মিত্ররূপধারী এক ভয়ংকর শত্রুর সমকক্ষ! তা ছাড়া, রাজনীতির আকাশে দুর্বুদ্ধি ও অপটু মন্ত্রীদের উপস্থিতি থাকলে, দেশ ও কালের বিরুদ্ধ আচরণকারী রাজার কাছে সঞ্চিত সমস্ত অর্থ ও সম্পদ ঠিক সেভাবেই নষ্ট হয়ে যায়, যেমনভাবে সূর্যোদয় হলে রাতের অন্ধকার নিমেষে দূর হয়ে যায়।”

কিন্তু হায়! রক্তাক্ষের এত সব অকাট্য যুক্তি ও সতর্কবাণীতে কেউ কান দিল না। পরম সমারোহে বায়সরাজের বৃদ্ধ মন্ত্রী স্থিরজীবীকে সঙ্গে নিয়ে পেঁচার দল নিজেদের গোপন দুর্গের দিকে রওনা হল।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫২: বেজি

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬১: আধুনিক ক্ষমতাদখলের লড়াই ও রাজসূয়যজ্ঞের প্রেক্ষিতে যুদ্ধজয় ও অধিকারপ্রতিষ্ঠার মধ্যে সাযুজ্য কোথায়?

উলূকদের দুর্গে যাওয়ার পথে, আহত ও অসহায় স্থিরজীবী হঠাৎ পেঁচাদের বিচক্ষণ মন্ত্রী রক্তাক্ষকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত করুণ স্বরে বললেন, “হে দেব! আমি তো আজ আহত হয়ে এখানে পড়ে আছি। আজ আর আমার কিছুই করার ক্ষমতা নেই। তাহলে আমাকে আপনাদের মাঝে রেখে আর কী লাভ?— ‘অদ্য অকিঞ্চিৎকরেণ এতদবস্থেন কিং ময়া উপসংগৃহীতেন?’ তাই আপনারা যদি অনুমতি দেন, তবে আমি এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করে আত্মাহুতি দিতে চাই। আমার বিনীত অনুরোধ, আমাকে অগ্নিপ্রদান করে ভস্মীভূত করুন এবং এই ত্রিতাপ জ্বালা থেকে রক্ষা করুন।”

স্থিরজীবীর এই কান্নাকাটি আর মায়াকান্নার পেছনের আসল মতলবটা রক্তাক্ষের মতো বিচক্ষণ মন্ত্রীর বুঝতে একটুও বাকি রইল না। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার ভান করে জিজ্ঞাসা করলেন, “কিমর্থমগ্নিপতনমিচ্ছসি?— আপনি কেন অগ্নিতে প্রবেশ করতে চাইছেন?”
স্থিরজীবী তখন একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, “আপনাদের কারণেই তো বায়সরাজ মেঘবর্ণ আজ আমার এই নিদারুণ দশা করেছেন। তাই আজ তাঁর সেই চরম শত্রুতার মোক্ষম জবাব দেওয়ার জন্যই আমি পরের জন্মে ‘উলূক’ বা পেঁচা হয়ে জন্মাতে চাই!”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯০ : দুই ভাই

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৮ : পথের শেষ কোথায়?

পাঠকদের বলব, স্থিরজীবীর এই কথাটি একটু খেয়াল করুন! এ যেন ঠিক আজকের দিনের সুবিধাবাদী রাজনীতির ভাষা। প্রকৃতিগত বা জন্মগতভাবে সে একটি কাক; কিন্তু নিজের স্বার্থসিদ্ধি এবং প্রতিশোধের প্রয়োজনে তার পেঁচার দলে নাম লিখিয়ে ‘পেঁচা’ হতেও বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। এ যেন প্রয়োজন অনুসারে কেবল রাজনীতিতে রং ও পোষাক বদলানোর খেলা!

স্থিরজীবীর এই ‘অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেওয়া’ এবং ‘পরের জন্মে পেঁচা হওয়ার’ আখ্যানটি প্রাচীন ভারতের রাজনীতিতে গুপ্তচরবৃত্তির এক চূড়ান্ত ও নির্মম অধ্যায়কে তুলে ধরে। আসলে স্থিরজীবীর এই আচরণ আজকের যুগের ‘দলবদলু’ রাজনীতিকদের কথা মনে করিয়ে দেয়। চাণক্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’ -এ গুপ্তচরদের নানা রূপের কথা বলেছেন। স্থিরজীবী এখানে মূলত চাণক্য বর্ণিত ‘তীক্ষ্ণ’ এবং‘বিষদ’গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করছে, যে শত্রুর শিবিরের একেবারে গভীরে প্রবেশ করে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে। স্থিরজীবী জানে যে পেঁচারা তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি, তাই সে আত্মহত্যার ‘ফেক নেরেটিভ’ বা মিথ্যা আখ্যান তৈরি করছে, যাতে পেঁচারা তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও চরম কাক-বিদ্বেষী বলে মনে করে।

এই ঘটনাটাই আবার আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় সোমদেব ভট্টের ‘কথাসরিৎসাগর’এবং বিশাখদত্তের ‘মুদ্রারাক্ষস’ -এর সেই ঐতিহাসিক চাণক্য-নীতির কথা। চাণক্য যেমন নন্দবংশের মন্ত্রী রাক্ষসের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে তাকে নিজের দলে টেনে চন্দ্রগুপ্তের শাসন সুনিশ্চিত করেছিলেন, স্থিরজীবীও ঠিক একই কায়দায় অরিমর্দনের মনে বিশ্বাস উৎপাদন করে পেঁচাদের সর্বনাশ ডেকে আনছে। আসলে রাজনীতিতে আবেগের কোনো স্থান নেই; রাজনীতিতেআবেগ কেবলই একটি অস্ত্র। স্থিরজীবীর দীর্ঘশ্বাস এবং কান্না হলো পেঁচাদের আবেগকে কাজে লাগানোর একটি নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৮: শ্যালক-জাতক—অচিনপাখি

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

বৃদ্ধ কাকমন্ত্রী স্থিরজীবীর মুখে এমন চরম আত্মত্যাগের কথা আর মায়াকান্না শুনে রাজনীতিকুশল রক্তাক্ষের ঠোঁটের কোণে এক তীক্ষ্ণ ও শ্লেষমাখা হাসি ফুটে উঠল। তিনি স্থিরজীবীর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত অথচ ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বললেন, “হে ভদ্র! আপনার মতো এমন চতুর ও ধুরন্ধর অভিনেতা আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি! আপনি কুটিল বুদ্ধি আর মিথ্যে কথাকে এমন নিপুণভাবে সাজিয়ে বলতে পারেন, যা সত্যিই অসাধারণ।”

একটু থেমে রক্তাক্ষ আবার বলতে শুরু করলেন, “আপনার ওই ‘পরের জন্মে পেঁচা হওয়ার’ রূপকথা অন্য কাউকে শোনাবেন। আমি খুব ভালো করেই জানি, আপনি যদি সত্যিই উলূক-যোনিতে পেঁচা হয়েও জন্মান, তবুও আপনার ভেতরের আসল স্বভাবটি কোনোদিন বদলাবে না। আপনি পেঁচা হয়েও আসলে নিজের সেই জন্মগত বায়স বা কাক জাতির প্রতিই টান অনুভব করবেন এবং তাদেরই সমাদর করবেন। কারণ, নিজের স্বজাতির প্রতি নাড়ির টান আর জন্মগত স্বভাব ত্যাগ করা যে কারও পক্ষেই নিতান্ত কঠিন!”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

হয়তো আগামী ছবির নাম রাখতেন ‘হাওয়া-মোরগ’

চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে রক্তাক্ষ এবার একটু হালকা চালে বললেন, “এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত চমৎকার ও মজাদার উপাখ্যান আছে। এক মূষিকা অর্থাৎ ইঁদুর-কন্যা কীভাবে মহাপ্রতাপশালী সূর্য, মেঘ, বায়ু এবং পর্বতকে পতিরূপে প্রত্যাখ্যান করে শেষ পর্যন্ত নিজের জাতির এক ইঁদুরকেই বিবাহ করেছিল, সে এক অদ্ভুত ঘটনা। কারণ শাস্ত্রে ঠিকই বলা হয়েছে—
সূর্য ভর্তারমুৎসৃজ্য পর্জন্য মারুতং গিরিম্।
স্বজাতি মূষিকা প্রাপ্তা স্বজাতির্দূরতিক্রমা।। [কাকোলূকীয়ম্- ১৯৯]


অর্থাৎ, পরাক্রমশালী সূর্য, মেঘ, বায়ু এবং পর্বতকে স্বামী হিসেবে একে একে প্রত্যাখ্যান করে ইঁদুর-কন্যা শেষ পর্যন্ত নিজের স্বজাতির ইঁদুরকেই বিবাহ করেছিল; কারণ, নিজের জন্মগত স্বভাব বা স্বজাতিকে অতিক্রম করা সত্যিই অসাধ্য!”
এই অদ্ভুত শ্লোক আর ইঁদুর-কন্যার এমন খামখেয়ালি বিয়ের কথা শুনে স্থিরজীবী কৌতূহল চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি চরম নির্দোষ সাজার ভান করে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাসা করে উঠলেন, “কথমেতৎ? সে আবার কী কথা! ঘটনাটা ঠিক কী রকম? এক ইঁদুর-কন্যা কেন সূর্য বা পর্বতকে ছেড়ে সামান্য এক ইঁদুরকে বিয়ে করতে যাবে?”
তখন রক্তাক্ষ সেই কৌতূহল মেটাতে এক নতুন আখ্যান শোনাতে শুরু করলেন…।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra : politics & diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content