আজ রথযাত্রা। সূর্যের আপাতঃ বার্ষিক গতি, জগতের সচল মহাযাত্রার প্রতীক রথ, জগন্নাথ কিংবা নারায়ণ, বিষ্ণু কিংবা কৃষ্ণের সংশ্লেষ-সংযুক্তির তত্ত্বভারে “পথের ধারের রথের মেলা”র খুব একটা এসে যায় না।
আজ রথযাত্রা। সূর্যের আপাতঃ বার্ষিক গতি, জগতের সচল মহাযাত্রার প্রতীক রথ, জগন্নাথ কিংবা নারায়ণ, বিষ্ণু কিংবা কৃষ্ণের সংশ্লেষ-সংযুক্তির তত্ত্বভারে “পথের ধারের রথের মেলা”র খুব একটা এসে যায় না।
বারাণসীর রাজপুরোহিতকুলে জন্ম নিয়েছেন বোধিসত্ত্ব। ক্রমে ক্রমে বড় হলেন। তক্ষশিলা থেকে বিদ্যালাভ করে ফিরে এলেন। পিতার মৃত্যুর পর পৌরোহিত্যে নিয়োজিত হলেন। হলেন রাজার ঐহিক ও পারত্রিক উভয়বিধ বিষয়ের হিতসাধক ধর্মার্থানুশাসক। তাঁর এই রাজকর্মের পথ নিষ্কণ্টক ছিল না। তিনি রাজার মঙ্গলসাধক হলেও তাঁর অকল্যাণের জন্য ‘কর্ণেজপ’ কান-ভাঙানো লোকের সংখ্যা কম ছিল না। এদের কাজই হল মনোমালিন্য ঘটানো, ভেদসাধন। রাজা ব্রহ্মদত্ত এদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বিমোহিত হলেন। এই সময় মানুষ কানে দেখে, চোখে শোনে। রাজার দশাও তা-ই হল। সেই সকল দুষ্টু...
এই জগতে সকল কিছুই ঘটা সম্ভব? অভিজ্ঞতা বলবে, যার সম্ভাবনা কোটিতে গুটি, কিংবা তার চেয়েও ঢের কম, তা একপ্রকার অসম্ভব বটে। যেসব কারণের জন্য কেউ হয় ডুমুরের ফুল, কিছু কল্পনা হয় আকাশকুসুম, সেই সম্ভাবনাগুলি তখনই সত্য হয়, যদি সূর্য পশ্চিমে উদিত হন। অসম্ভব কোনও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, নাকি অসম্ভবের সম্ভাব্য হয়ে ওঠার দুরাকাঙ্ক্ষাটিই একান্ত মনোজাগতিক সেই তর্ক এ কাহিনির তত্ত্ব নয়। তবে, অনেক গল্পে দেখা যায়, যা একান্তই অসম্ভব বলে মনে করা হয়, তা ঘটে যায়।
একবার কোনও এক পাখি সেই পলাশগাছের কাণ্ডে বসে মলত্যাগ করেছিল। তার আগে সে পরশপাথরের পাকা বটফল খেয়েছিল। পলাশগাছের কাণ্ড ও শাখার সংযোগস্থলে সেই মলের মধ্যে থাকা বটের বীজে ক্রমে ক্রমে অঙ্কুরোদ্গম ঘটল। দেখতে দেখতে আঙুল-চারেক লম্বা হয়ে গেল সেই চারাগাছ। রক্তাভ অঙ্কুর থেকে উদ্গত সবুজ কোমল পাতা অনন্ত ভবিষ্যতের ইশারা পেয়েছিল বুঝি! কিন্তু যা পরিত্যজ্য, তাকে ত্যাগ করাই ভাল। যা আশঙ্কার কারণ, তাকে থেকে আশঙ্কিত হওয়াই শ্রেয়।
এই গল্পের একদিকে যেমন মানুষ, তেমন-ই অন্যদিকে তারা, যারা মানুষ নয়। কিন্তু তারাই এই গল্পের মুখ্যভূমিকায়, তারাই হয়ে ওঠে মানুষের প্রতিভূ। তাই এই গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের, মনুষ্যপ্রকৃতির। তার দুর্দমনীয় স্বভাব ও আত্মজয়ের এই কাহিনির একদিকে মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মবন্ধনের প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে থাকে স্বার্থসংশ্লিষ্ট জীবন ও প্রবঞ্চনাকুটিল সার্থসিদ্ধির জগতে যথার্থ হিতাকাঙ্ক্ষীর অভ্যুদয় ও আত্মরক্ষার পাঠ।
একদিন বারাণসী নগরের তোরণদ্বারে দুটি কাক বসে আছে। একটি অবিমৃষ্যকারী, স্বভাবচপল। অপরটি স্থিতধী। রাজপুরোহিত তোরণদ্বার অতিক্রম করে নদীতে গেলেন। সেখানে স্নান সমাপন করে গায়ে দিলেন গন্ধবিলোপন, ধারণ করলেন মাল্য ও মহার্ঘ্য বস্ত্র। শুদ্ধদেহে তিনি ফিরতে লাগলেন রাজপুরীর দিকে। চপল কাকটি অপরটিকে বলল, “আমি ওর গায়ে বিষ্ঠা ত্যাগ করব ভাবছি।”
শাস্ত্রে দু’রকম পালনীয় কাজের কথা বলা হয়েছে। নিত্য ও নৈমিত্তিক। শাস্ত্র উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন যে, সন্ধ্যাবন্দনা ইত্যাদি হল নিত্য কর্ম। আপনি নিত্যদিন যে সব কাজ করে বেঁচে থাকেন, তা যদি হয় নিত্যকর্ম, তবে কালেভদ্রে, তিথি মেনে, পঞ্জিকা-ক্যালেণ্ডার দেখে যা হবে তা নৈমিত্তিক। কোনও কারণ ঘটলে তবেই তার অনুষ্ঠান। এই যেমন দোলদুর্গোৎসব কিংবা মন খারাপ লাগলে একটু ঘুরে আসা, সিনেমা দেখা কিংবা মাসে একটি দিন হলেও নিজের জন্য কিছু সময় রাখা। কিন্তু হঠাৎ করে নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মের কথা কেন? কেন না, আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। নিত্যদিন...
জাতকমালার এই কাহিনিটির আজ প্রথম পর্ব। সামাজিক পরিসর পরিবর্তিত হয়, দিন বদলায়, কিন্তু “দান” তার অত্যুজ্জ্বল মহিমা নিয়ে অক্ষুণ্ণ থাকে। কঠোপনিষদে নচিকেতার গল্প হোক কিংবা মহাভারতে কর্ণের কাহিনি, অথবা ইতিহাস-পুরাণের নানা আখ্যান উপাখ্যান, দানের প্রসঙ্গ সর্বদাই অন্য এক মাত্রা, মর্যাদা নিয়ে অনন্য।
বোধিসত্ত্বের সঙ্গে এক সাপুড়ের পরিচয় হয়েছিল। সেই সাপুড়ে একটি বাঁদরকে বিশেষ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করেছিল, তাকে বিষপ্রতিষেধক ওষুধ খাইয়ে সাপের সঙ্গে খেলা করাতো সে। এই ছিল তার জীবিকা। একদিন বারাণসীতে এক উত্সব ঘোষিত হল। সাপুড়ে কি বাঁদরটিকে নিয়ে সাপের খেলা দেখাতে উত্সবে গেল এবার?
একবিংশ শতকের ভোগ ও পুঁজির জগতেও হয়তো এই উপলব্ধি অসার নয়, কারণ ঐহিক, আধ্যাত্মিক সিদ্ধির পথে একান্ত উপলব্ধি আবশ্যক। আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মোপলব্ধি তো নিজের প্রতি নিরাসক্ত, নির্মোহ দৃষ্টি ব্যতীত জাগে না। এই আত্মবিশ্লেষণহীন আত্মবিচ্ছিন্ন মানুষ আজকের রাষ্ট্রের, পৃথিবীর বিশ্বনাগরিক। আত্মসর্বস্ব, আত্মকেন্দ্রিক মানুষের পক্ষে এমন বীতেচ্ছ হয়ে যথার্থ সিদ্ধিলাভ কি আদৌ সম্ভব হয়? জানাবে এই কাহিনি।
চলচ্চিত্রে উল্লিখিত হয় তাঁর মরজীবনের শেষ পঁচিশে বৈশাখ, যেখানে ‘সভ্যতার সঙ্কট’কে তিনি দেখেছেন। ভাষ্যকার জানাবেন যে, এই জন্মদিনের তিনমাস পরে তিনি চিরকালের জন্য ছেড়ে যাবেন তাঁর শান্তিনিকেতন, আমাদের শান্তিনিকেতন। নেপথ্যে বেজে ওঠে রবীন্দ্রগান “তবু মনে রেখো।”
সেবার বোধিসত্ত্ব এক লঙ্ঘন-নর্তককুলে জন্ম নিয়েছেন। অর্থাৎ, বাজিকর। দড়ি ওপর শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে নানা উপায়কৌশল দেখানোর সেই বিদ্যা ক্রমে ক্রমে আয়ত্ত করে তিনি পরিণত ও প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠলেন। হলেন প্রাপ্তবয়স্ক। জনৈক আচার্যের কাছে তিনি শক্তিলঙ্ঘনবিদ্যা শিখেছিলেন এবং গুরুর সঙ্গেই অর্জিত বিদ্যা প্রদর্শন করে অর্থোপার্জন করতেন। শক্তি একপ্রকার অস্ত্রবিশেষ। ওই আচার্য নৃত্য প্রদর্শনের সময় চারটি শক্তি অতিক্রম করতে পারতেন, কিন্তু পাঁচটি শক্তিলঙ্ঘনের উপায় তাঁর অজ্ঞাত ছিল। এর প্রচেষ্টা প্রাণঘাতী। একবার বিপদ নেমে এল...
নতুন সব সময়েই একলা, তার জুড়ি মেলা ভার। যা নতুন সে ছাড়া তো বাকি সকল কিছুই পুরনো। নববর্ষের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। আসলে, বছরটা নতুন মনে হলেও তার প্রথম দিনটুকুই যা কিছু নতুন, দ্বিতীয় দিনে পা রাখলেই বছর পুরনো। তাই, পয়লার দিন একলা, বড্ড একলাই।
কৃষি ভিত্তিক ভারত প্রায় সমস্ত উৎসব মূলত কৃষি অর্থাৎ ফসল উৎপাদনকে ঘিরে আবর্তিত হয়। উত্তর পূর্বাঞ্চলের উৎসব অনুষ্ঠানও এই ধারার ব্যতিক্রম নয়। ত্রিপুরার অন্যতম উৎসব গরিয়া, গাজন, বিজু — যাই হোক না কেন শষ্য উৎপাদনকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছিল একদিন। সুখ ও সমৃদ্ধির কামনা, নতুন ফসলের জন্য প্রার্থনা যেন সমস্ত উৎসবেরই মূল সুর। ত্রিপুরায় সুদীর্ঘকাল যাবৎ বছর সন্ধির এই কৃষিকেন্দ্রিক পার্বণ এবং বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়ে আসছে।
ডিসেম্বর আর চৈত্রের দূরত্বটুকু এখন বেশ বুঝি। চৈত্রের গায়ে একটা শিহরণ আর অনেকখানি বিষাদ লেগে থাকে। বিষণ্ণ রিক্ত হেমন্ত, মেদুর বর্ষার থেকে সাবধানী ব্যবধানে উদাসী হাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে থাকা তার। গায়ে বসন্তের রঙ নিয়েও তার বুকে ফাল্গুনের আনন্দ নেই, মার্গশীর্ষ অঘ্রাণের পূর্ণতা নেই, ডিসেম্বরের আকাঙ্ক্ষিত শৈত্যের মাঝে অভীপ্সিত ‘ওম’ টুকু নেই।