অযোধ্যা ত্যাগ করে আসার সময় রাম ছিলেন পঁচিশ বছরের পূর্ণ যুবা, আর সীতা নিজে ছিলেন অষ্টাদশী। জনকনন্দিনী বৈদেহী যুক্তিক্রম হারিয়ে ভুলে যান, অপরিচিতা নারীর দেহসৌন্দর্যের সকাম স্তুতি পরিব্রাজকের স্বভাব নয়।
অযোধ্যা ত্যাগ করে আসার সময় রাম ছিলেন পঁচিশ বছরের পূর্ণ যুবা, আর সীতা নিজে ছিলেন অষ্টাদশী। জনকনন্দিনী বৈদেহী যুক্তিক্রম হারিয়ে ভুলে যান, অপরিচিতা নারীর দেহসৌন্দর্যের সকাম স্তুতি পরিব্রাজকের স্বভাব নয়।
সোনার হরিণের মোহময় রূপ ভুলিয়েছিল সীতার মন। তার ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে রাম একাই চললেন গভীর বনে। সঙ্গী তাঁর স্বর্ণভূষিত বিপুলকায় শরাসন, ধনু, তীক্ষ্ণ বাণ।
হিতাকাঙ্ক্ষী মারীচের এত কথা কিন্তু রাবণের কর্ণগোচর হল না। তার বহু চেষ্টা বিফলে গেল। সীতাহরণের বিষয়ে রাবণ নিজের সংকল্পে অবিচল থাকলেন। মারীচ নিজের আসন্ন মৃত্যুর চিন্তায় ডুব দিল এবারে।
রাতের অন্ধকারে যজ্ঞবেদীর চারপাশে মারীচ আর অন্যান্য রাক্ষসেরা যখন নিক্ষেপ করছে মাংসের টুকরো, রক্তে ভরে যাচ্ছে যজ্ঞবেদী, রামের হাতে জ্বলে উঠেছে তখন মানবাস্ত্র।
রামের সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত, নিহত হল খর, দূষণ, ত্রিশিরা সহ জনস্থানবাসী চোদ্দ হাজার রাক্ষস। শূর্পণখা আশায় বুক বেঁধেছিল যে, খর-দূষণের পরাক্রমের কাছে পরাভূত হবে রাম। রামের উষ্ণ রক্ত সে পান করবে।
দুর্বলচিত্ত মানুষের প্রশ্রয়ে রাবণ যখন মাথা চাড়া দেয় তখন শুরু হয় সীতাহরণের প্রস্তুতি, সেই সঙ্গে হয় লঙ্কাকাণ্ডের সূচনা। এর ফল সকলেরই জানা। শুভশক্তির উত্থান প্রতিহত করে অমানবিক অশুভ রাবণকে, যুগে যুগে, কালে কালে…। লিখেছেন পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায়।
যুধিষ্ঠিরের সমালোচনায় আত্মীয় অনাত্মীয় নির্বিশেষে অসম্মানিত তালিকাভুক্তরা অদূরভবিষ্যতে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্রে শান দিচ্ছে না—এ কথা কি নিশ্চিতভাবে বলা যায়? বোধ হয় না। একটি ঘটনার বিরোধিতার সূত্র ধরে যে জটিলতা ও কুৎসার পাঁক উঠে আসে, কথার মারপ্যাঁচে জড়িয়ে যায় অনেক সদুদ্দেশ্যের মহান আদর্শ, বেরিয়ে আসে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ, যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞে চেদিরাজ শিশুপালের বিরোধিতা তার প্রমাণ।
রাক্ষসশ্রেষ্ঠর কথা শুনে মারীচ বলল, মিত্ররূপে কোনও শত্রু রাবণকে সীতার কথা বলেছে? এমন কে আছে যাকে রাক্ষসশ্রেষ্ঠ আনন্দ দিয়েছেন, অথচ সে আদৌ সন্তুষ্ট নয়। সন্দিগ্ধ মারীচ স্পষ্টভাষায় তার উদ্বেগের কারণ জানিয়ে বলল, ‘সীতাকে এখানে নিয়ে এস’ — এ কথা কে বলেছে? আমাকে বলুন। কে রাক্ষসজগতের শৃঙ্গ উচ্ছেদ করতে ইচ্ছুক?
রাজসূয় মহাযজ্ঞ যুধিষ্ঠিরের আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রদর্শনী, কিন্তু তার মধ্যে নেই অযথা ক্ষমতার ঔদ্ধত্যপ্রকাশ, নেই নির্লজ্জ দম্ভের অবকাশ, আছে শুধু বিনয়াবত হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত ঔদার্যের মহত্ব। সুশাসনের বীজ প্রোথিত হয় মহান হৃদয়ের বিস্তৃত ভূমিতে, উদারতার পলিমাটিতে তার বৃদ্ধি, পরিপূর্ণতা আসে গুণীজনের মন্ত্রণা ও পরামর্শের জলসিঞ্চনে এবং জীবনাভিজ্ঞতার আলোকে। যুধিষ্ঠিরের আয়োজিত রাজসূয় মহাযজ্ঞের আলোকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এমন পরিপূর্ণতা আশা করা যেতে পারে কী?
স্বামীর কৃতিত্বে স্ত্রী সীতা আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন। এই প্রতিক্রিয়া অরণ্যবাসী মুনি, ঋষি সকলের আনন্দ। নিশ্চিন্ত উপদ্রবমুক্ত শান্ত জীবনের কামনা — গৃহী, সর্বত্যাগী তপস্বী, সকলের। শত অশুভশক্তির প্রভাবে দ্রুত আচ্ছন্ন এই দুনিয়ায় শুভবোধে প্রাণিত ভারতাত্মা চিরকাল ধরে সমাহিত শান্ত নিভৃত পরিবেশ প্রার্থনা করে এসেছে, মনে মনে কামনা করেছেন রামের মতো কোন আদর্শ পুরুষের উপস্থিতির, এখন পর্যন্ত, আজও।
নিজের চোখের সামনে নিজের মাতৃভূমির এই তিলে তিলে এগিয়ে আসা মৃত্যু দেখে প্রধান অমাত্য ও বংশানুক্রমিক দূরদর্শী মন্ত্রী রক্তাক্ষের হৃদয় বেদনায় ও ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তিনি বুঝলেন, এই অন্ধ রাজার দরবারে বসে অরণ্যে রোদন করার আর কোনো অর্থ হয় না। যে রাষ্ট্রযন্ত্র শত্রুর মিষ্টি কথায় ভুলে প্রজ্ঞাবান মন্ত্রীর উপদেশ পদদলিত করে, তার পতন তখন কেবলসময়ের অপেক্ষা মাত্র।
রাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে ভয়ংকর ভ্রান্তি হল শত্রুর আত্মসমর্পণকে নিজের শক্তির বিজয় বলে ভুল করা। কূটনীতির ময়দানে যখন কোনও প্রাজ্ঞ ও দীর্ঘদিনের পুরনো শত্রু হঠাৎ বশ্যতা স্বীকার করে, তখন বুঝতে হয় তার পিছনে কোনও গভীর মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ পাতা রয়েছে। উলূকরাজ অরিমর্দন ঠিক সেই ফাঁদেই পা দিলেন। বিচক্ষণ মন্ত্রী রক্তাক্ষের সমস্ত অকাট্য যুক্তি, দূরদর্শিতা আর রক্তজল করা সতর্কবাণী সেদিন রাজসভার চাটুকারদের স্তুতিবাক্যের স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। পেঁচাদের দল যেন এক অদ্ভুত আত্মঘাতী উল্লাসে নিজেদের চিরন্তন বিনাশ ডেকে আনার জন্যই কাকদের বৃদ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত মন্ত্রী স্থিরজীবীকে সসম্মানে নিজেদের দুর্গের ভিতরে নিয়ে এলো।
ইঁদুর থেকে ঋষির কৃপায় মানুষ হওয়া সেই পরম রূপবতী কন্যার বিয়ের বয়স হয়েছে। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য মেয়ের জন্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ পাত্রের সন্ধান করতে চাইলেন। মহর্ষি প্রথমে আকাশের অধিপতি, পরম তেজস্বী বিবস্বান সূর্যকে আহ্বান করলেন। বৈদিক মন্ত্রের মহিমাময় প্রভাবে আকাশ আলো করে স্বয়ং সূর্যদেব মর্ত্যে আবির্ভূত হলেন। ঋষিকে প্রণাম জানিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, “ভগবন্! কিমহাম্ আহূতঃ? — হে দেব! আমাকে কী কারণে আহ্বান করেছেন?”
মহর্ষি চোখ বন্ধ করলেন। তিনি বেদান্তের প্রবক্তা, তিনি জানেন আত্মার কোনো লিঙ্গ হয় না, ব্রহ্মস্বরূপের কোনও অশৌচ হয় না। এই সমাজিক ভয় তো কেবল মানুষেরই তৈরি করা নিগড়! যখন চোখ খুললেন, তখন তাঁর দৃষ্টিতে আর কোনও শাস্ত্রভয় নেই। সেখানে জ্বলজ্বল করছে এক শাশ্বত পিতৃসত্তার প্রশান্ত তেজ।
দীর্ঘ শাস্ত্রকথা শেষ হল। তপোবনের শান্ত বাতাসে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। নিজের পালিতা কন্যার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য। শাস্ত্রের কঠোর অনুশাসন এবং এক স্নেহশীল পিতার হৃদয়ের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত জয়ী হল পিতৃত্বই। দৃপ্ত কণ্ঠে, স্থির প্রতিজ্ঞায় মহর্ষি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “শাস্ত্র যাই বলুক, আপৎকালীন বিধিতে হীন পাত্রের বিধান থাকলেও—আমি আমার এই প্রাণাধিক কন্যার বিবাহ সর্বাংশে যোগ্য এবং তার অনুরূপ গুণের অধিকারী বরের সঙ্গেই দেবো। অন্য কারও সঙ্গে নয়।”
হনুমানকে দেখে ভীমসেন অত্যন্ত তৃপ্ত হন। আরও খুশি হন একথা শুনে যে, রামপত্নী সীতার কাছে এমনি বর পেয়েছিলেন হনুমান যে, যতদিন রামকথা পৃথিবীতে প্রচলিত থাকবে লোকমুখে ততদিনই হনুমানও রয়ে যাবেন এই পৃথিবীতে।
পাণ্ডবভাইয়েরা একের পর এক তীর্থ দর্শন করতে করতে এগিয়ে চলেছেন। সকলেই অধীর হয়ে উঠেছেন, অর্জুনের সঙ্গে দেখা করবার জন্য। কিন্তু অর্জুন যে দেবস্থানে গিয়েছেন। সে স্থান সাধারণের গম্য নয়। অতি কঠোর সে যাত্রাপথ।
ভরদ্বাজ পুত্রের এমন করুণ মৃত্যুসংবাদ শুনে অত্যন্ত শোকগ্রস্ত হলেন। নানাভাবে বিলাপ করতে করতে তিনি বলে উঠলেন, ‘হে পুত্র! না পড়েও ব্রাহ্মণদের হৃদয়ে বেদের ঠাঁই হোক, এমনটাই প্রয়াস ছিল তোমার।’
প্রাচীনকালে বালধি নামধারী এক মুনি ছিলেন। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁর কোনও পুত্র ছিল না। তাই তিনি একসময় অত্যন্ত অস্থিরচিত্ত হয়ে পড়েন। একটি অমর পুত্রের কামনায় তিনি তীব্র তপস্যা আরম্ভ করেন।
মুনি বলে চলেন, ‘হে পাণ্ডুপুত্র! স্থূলশিরা মুনির আশ্রমের পশেই এই রৈভ্যমুনির আশ্রম। এখানে ভরদ্বাজমুনির পুত্র যবক্রীত বিনষ্ট হয়েছিলেন। আজ তোমাদের আমি কবি যবক্রীতের কাহিনি শোনাবো।’
ইন্দিরা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে। অত্যন্ত রুচিবান আধুনিকমনস্ক মানুষ ছিলেন তিনি। বিবাহ হঠাৎ ঘটেনি। প্রমথ চৌধুরীর অগ্রজ আশুতোষ ছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাতা ও কবির বন্ধু। রবীন্দ্র-অগ্রজ হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভাসুন্দরীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। সেই সূত্রে আশুতোষ-ভ্রাতারা অগ্রজের শ্বশুরালয়ে আসতেন। তাঁদের সঙ্গে ‘অন্তরঙ্গ মেলামেশা’র কথা ইন্দিরা নিজেই জানিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের সবে তখন বিয়ে হয়েছে। থাকতেন জোড়াসাঁকোয়, দোতলার এক ঘরে। প্রথম-জীবনে অনেক জায়গা নিয়ে সাজিয়েগুছিয়ে ঘর-সংসার করার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। সীমিত পরিসরে, নানা প্রতিকূলতায়, প্রতিবন্ধকতায় কোনওরকমে দিনযাপন। আর পাঁচজনের থেকে তো তাঁর একটু বেশিই জায়গা প্রয়োজন! সবার সঙ্গে মেলানো যাবে না, তাঁর বাড়তি জিনিসও তো কম নয়। কোথায় বইপত্র রাখবেন, বসবেন, লিখবেন, সেসব নিয়ে রীতিমতো ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
ছেলেবেলায়, যৌবনে রবীন্দ্রনাথ যে খুব বেশি পোশাক সচেতন ছিলেন, তা নয়। এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে মধ্য-বয়সে। মাঝেমধ্যে তিনি টুপিও পরতেন। বাহারি টুপি। সুতির বা ভেলভেটের। কখনও ঘন রঙের মোটা সিল্কের টুপি। রানি চন্দ সান্নিধ্য পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের, অত্যন্ত স্নেহ করতেন তাঁকে। ‘গুরুদেব’ নামে একটি বইয়ে সেই সান্নিধ্য-অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখেওছেন।
শান্তিনিকেতন আশ্রমে দুটো হরিণ ছিল। দুটো ময়ূর ছিল। ময়ূর দুটোকে ছাত্রাবাসের দক্ষিণ দিকে রাখা হয়েছিল। ময়ূর দুটোর থাকার জায়গা ঘিরেও দেওয়া হয়েছিল জাল দিয়ে। হরিণ দুটো আশ্রমে ইতস্তত ঘুরে বেড়াত। একদিন একটা হরিণকে অনেকগুলো কুকুর তাড়া করে। তাড়া খেয়ে হরিণটা আশ্রমের বাইরে বেরিয়ে পড়ে। দৌড়াতে থাকে। কোথায় যে গেল, কে জানে! আশ্রমের সকলেই ভাবনায় পড়লেন, কেউ কেউ এদিক-সেদিক খুঁজে হতাশ হয়ে শেষে ফিরে আসেন।
আনন্দ-সুখের মাঝে কখনো দুঃখের ছোঁয়া। দুই বান্ধবীর এভাবেই কাটছিল দিনগুলি। হঠাৎই ছন্দপতন। শরৎকুমার ব্যারিস্টার হতে বিলেতে গিয়েছেন। মাধুরীলতা বাপের বাড়িতে গিয়ে বসবাস শুরু করেছেন। অনুরূপা দেবী কখনও কলকাতায় এলে ঠিক পৌঁছে যেতেন জোড়াসাঁকোয়। তাঁকে জোড়াসাঁকোয় দেখে রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমিই বেলার সবচেয়ে বড় বন্ধু? তোমার কথা ওর কাছে ঢের শুনেছি।’
দেবী সপ্তশতীর মধ্যে সবথেকে বেশি করে মন আকর্ষণকারী অংশ হল দেবী-দূত সংবাদ এবং চণ্ড ও মুণ্ড বধ, যা দেবী মাহাত্ম্যকে শতগুণে বাড়িয়ে তোলে। অহংকার নাশক দৈবী শক্তির জয় লাভ ও আসুরিক শক্তির পরাজয় জ্ঞাপক। মেধা ঋষি বলছেন, কাশ্যপের ঔরসে ও ভার্যা দনুর গর্ভে শম্ভু ও নিশুম্ভের জন্ম। শম্ভু ও নিশুম্ভ সমস্ত দেবতা, সূর্য, চন্দ্রাদি সকলকে পরাজিত করে, ইন্দ্রের ত্রিলোকাধিপত্য ও যজ্ঞভাগও অধিকার করেন। দেবগণ সমস্ত অধিকার শূন্য ও পরাজিত হলে, স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে অপরাজিতা দেবীকে স্মরণ করেন। দেবী পূর্বে কথা দিয়েছিলেন, বিপদে তাঁকে...
শ্রীশ্রীচণ্ডীর মূল গ্রন্থ অর্থাৎ দুর্গা সপ্তশতী পাঠের পূর্বে সকলেই দেবীকবচ পাঠ করেন। শ্রীশ্রীচণ্ডীকা দেবীর প্রীতির জন্য পাঠ করা হয়। যেখানে ঋষি মার্কণ্ডেয় সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে জগতের পরম গোপনীয় অথচ মঙ্গলকারক আদি শক্তি, সর্বজীবের রক্ষাকর্তী মহামায়ার কীর্তি, জয়গাথা শোনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। কবচ শব্দের অর্থ বর্ম; যা পরিধানে শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষা করা যায়।
আমরা শারীরিকভাবে এক একটি অঙ্গকে ত্রুটিমুক্ত করব, এমনটা কখনোই সম্ভব নয়। বরং নিজের আত্মশক্তির ধারণার দ্বারা সার্বিকভাবে ত্রুটিমুক্ত হওয়া যায়। সর্বদা সব বিষয়ে সজাগ থাকলে মনের উপর নিয়ন্ত্রণ আনা যায়। ফলে মন ক্রমশ সচেতন হয়। সচেতনতার সঙ্গে করা মন বা ইন্দ্রিয় একবার যা অনুভব করে, তা চিত্রের মতো থেকে যায়। আমরা নিজেদের ব্যস্ততার জন্য বা অন্য কোনও কারণে সেই ছবিকে দেখতে পাই না বা অনেক ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাই।
অনেকে ধর্ম বন্ধনের কারণ বলে মনে করেন। কোনও ধর্মাবলম্বী হতে চান না, বা মতাদর্শে চলতে পছন্দ করেন। ধর্ম ত্যাগ করাটাই বা কোনও ধর্মের অবলম্বী না হয়ে থাকাটাই নতুন সমাজ ভাবনা মনে করে। কিন্তু ধর্মের কি অন্য কোনও দিক আছে, যা মানুষকে ঈশ্বর ভাবা-পন্ন করে করা ছাড়াও আর বিশেষ কিছু করতে পারে? আমার উত্তর হবে ধর্মের আরেকটা ভালো রূপ হচ্ছে সংস্কৃত বান, চরিত্রবান করে তোলা।
অর্থ উপার্জন অন্যায় নয় কারণ ওই অর্থ বিতরণের জন্য। গৃহস্থই জীবন ও সমাজের কেন্দ্র অর্থ উপার্জন অসৎ কাজে অর্থ ব্যয় করা তার পক্ষে উপাসনা, কারণ যে গৃহস্থ সদুপায়ে ও সৎ উদ্দেশ্যে ধনী হবার চেষ্টা করছেন—সন্ন্যাসী নিজ কুঠিরে বসে উপাসনা করলে উহা যেমন তার মুক্তি লাভের সহায় হয়, সেই গৃহস্থেরও ঠিক তাই হয়ে থাকে।
শ্রীরামকৃষ্ণ জানতেন, এখন তাঁকে কেউ বুঝবে না। তাই বলেছেন “কালে বুঝবে। বাউলের দল এলো গেল, কত নাচলে গাইলে, কেউ চিনল না।”
রামকৃষ্ণ নামে এক ফেরিওয়ালা রাস্তায় ফেরি করতে বেরিয়েছে। অদ্ভুত লোক বটে! ঝুড়িতে তাঁর খাঁটি সোনার সব গহনা—জ্ঞান, ভক্তি, বিবেক, বৈরাগ্য, আনন্দ, সমাধি। সেই অমূল্য সব গহনা সে বিনা পয়সায় দিতে চায়। কিন্তু নেবার লোক নেই।
রবীন্দ্রনাথ সংসারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মন, সব কাজের মধ্যেও সবসময়, উত্তর-মুখ কম্পাসের কাঁটার মতো, ঈশ্বরের দিকে ঘুরে আছে। একথা প্রমাণ হয় তাঁর প্রতিদিনের জীবনচর্যা অনুসরণ ও সংগীত সহ চিঠিপত্র, প্রবন্ধ ও বিবিধ রচনাবলী পড়লেই।
শ্রীরামকৃষ্ণ (কথামৃত : ১-১-৫) সব কাজ করবে কিন্তু মন ঈশ্বরেতে রাখবে। স্ত্রী, পুত্র, বাপ, মা, সকলকে নিয়ে থাকবে ও সেবা করবে। যেন কত আপনার লোক। কিন্তু মনে জানবে যে তারা তোমার কেউ নয়।
রবীন্দ্রসংগীত রবীন্দ্রনাথ সংসারে থেকেও ঈশ্বরের আনন্দ পেয়েছিলেন বলেই, যৌবনে মানুষ যখন সাংসারিক আনন্দে একেবারে মেতে থাকে, তখন তাঁর কলম থেকে বের হয়েছে এইসব কালজয়ী গান।
আপনার অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসন্ধান পরিমার্জিত করার চেষ্টা করুন অথবা ওয়েবসাইট মেনু থেকে পোস্টটি সনাক্ত করুন।
বাগবাজারে শ্রীমার আঙিনার মাথার আকাশ আজ থমথমে, বর্ষার মেঘের মতো। শরৎ মহারাজ মা সারদাকে সুস্থ করে তোলার জন্য চিকিৎসার যে সুবন্দোবস্ত করেছিলেন, এমনকি দৈব প্রতিকার, স্বস্ত্যয়নাদিরও অনুষ্ঠান করেছিলেন। সেই সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে গেল। চিকিৎসারত ডাক্তার ও কবিরাজদের দর্শন দিয়ে ধন্য করে মা সারদা ১৩২৭ সনে বা ১৮৪২ শকাব্দে, ১৯২০ সালের একুশে জুলাই, বাংলার চৌঠা শ্রাবণে মঙ্গলবার রাত দেড়টার সময় তাঁর বাড়ি উদ্বোধনে মানবীলীলা সম্বরণ করলেন।
শ্রীমার দেহ রাখার পর একদিন একজন উদ্বোধনে তাঁকে দেখেন যে, তাঁর দেহ একেবারে ভেঙে গিয়েছে। তখন তিনি বিছানার উপর রাখা মা সারদার পটচিত্রের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বলেন, ‘কি করব বল বাবা, মাই যে সব ভেঙে দিয়ে গেছেন’। কেদারের মা কোয়ালপাড়ায় থাকতেন। তিনি ঠাকুরকে দর্শন করে কৃতার্থ হয়েছিলেন। তাঁর স্বামী জয়রামবাটিতে পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন। তিনিও ঠাকুরের স্নেহধন্য ছিলেন।
মানুষ নয়, পশু, পাখি, বেড়াল, কুকুর, এরাও জানত মা সারদার ভালবাসার মহিমা। একবার ছোট্ট রাধু শ্রীমার বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে একটা বাচ্চা বেড়াল নিচে ফেলে দিলে, তাই দেখে শ্রীমার অস্থির অবস্থা। এক সেবক তাঁর অবস্থা দেখে ছুটে গিয়ে বেড়ালছানাটিকে কোলে করে তুলে আনল। শ্রীমা তখন তাকে কোলে শুইয়ে গরম দুধ খাওয়ালেন আর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। সবাই জয়রামবাটির বেড়ালটাকে ‘মায়ের বেড়াল’ বলত। আর সেই সুযোগে সে দুষ্টুমি করে বেড়াত। একদিন সবাই শ্রীমার কাছে এসে বেড়ালটার বিরুদ্ধে নালিশ জানাল। শ্রীমা আর কি করবেন, হাতে...
শ্রীমার অসুখের সংবাদ শুনে দূরদেশ থেকে শ্রীমার সন্তান সারদেশানন্দ এসেছেন। তিনি সকলের পরিচিত বলে শ্রীমার ঘরে গিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন। কখনও যদি শ্রীমা ডাকেন তো দুটো কথা হয়। ভয়ে ভয়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন, যাতে শ্রীমার কষ্ট না হয়।
রামলাল কাজের জন্য দক্ষিণেশ্বরে থাকলেও মাঝে মাঝে কামারপুকুরে যাতায়াত করতেন। শ্রীমার ভিক্ষাপুত্র শিবরাম সর্বদা গৃহদেবতা রঘুবীরের পুজো ও ঘরবাড়ির দেখাশোনা করতেন। শ্রীমার মন তখন অতীন্দ্রিয় জগতে ঘুরে বেড়াত। তিনি সংসার থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ঠাকুর তাঁকে যে ঘরখানা দিয়েছিলেন, সেখানেই থাকতেন। পাকশালার একাংশে নিজেই রান্না করে ঠাকুরকে নিবেদন করে সেই প্রসাদী শাকান্নে কালাতিপাত করতেন।
আপনার অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসন্ধান পরিমার্জিত করার চেষ্টা করুন অথবা ওয়েবসাইট মেনু থেকে পোস্টটি সনাক্ত করুন।
শীতকাল, পিসিমা তাই একপ্রকার জোর করেই পিছন থেকে গায়ের চাদরটা ওর গলায় জড়িয়ে দেন। সাঁকোটা পার হতেই একটা উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগে। দেবী বোঝে বিপদ খুব কাছে। সে আরো সজাগ হয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় কিন্তু একটু থামতেই গন্ধটা যেন তার ডান পাশে অনুভূত হল, দুর্গন্ধে দেবীর গা গুলিয়ে উঠল, তখনই পশুটার জ্বলন্ত চোখ দেবীর নজরে আসে।
মা-হারা মেয়েকে এর আগে এত খুশি হারাধন কখনও দেখেনি। কাজের দেরি হবে জেনেও মেয়ের আনন্দের জন্য বাবা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো নদীর ধারে। তারপর দু’জনে মিলে মুড়ি-বাতাসা খেয়ে ফিরে এলো আবার জঙ্গলের মাঝে। তখন উঁচু উঁচু গাছগুলোর মাথা ভেদ করে সূর্যের আলো ঝিলিক দিচ্ছিল জঙ্গলের ভিতরে। এবার শুরু হল বাবার কাঠ কাটার আর কুসুমের শুকনো পাতা কুড়ানোর পালা। হঠাৎ একটা বাচ্চা হরিণ তাদের দিকে ছুটে আসতে আসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। হরিণ ছানার এক পায়ে তীরবেঁধা।
মা দুইগ্গা আইতাছেন চাঁদ। দশ হাতে তাঁর মন্ডা মেঠাই, নূতন শাড়ি, জামা, কাপড় রাশি রাশি। আমরা ক্ষ্যাতের মিট্টি চাপড়ে লিয়ে ঘর দুয়োর নিকোবো…গিরিমাটি দে পেত্তেক বারের মতো দাওয়ায় এত্ত ছবি আঁকবা তুমি… সোন্দর সোন্দর চিত্তির...। ঠাকমার নিদ্রা বিজড়িত অলস অবশ হাত। অভ্যাসবশে সন্তুর পিঠে ঢেঁকির মত আলতো করে উঠছে আর পড়ছে। সঙ্গে কানের পাশে একটানা কল্পিত পাঁচালি, বাহারি স্বপ্নের উড়োখই… পূজার দিন বামন কায়েতদের বাড়িত মনিব কুটুমজন ভিড় জমায়, অ্যাকব্যালা বানশি বাজনেই কত্তগুলা বকশিশ পাবে আমার সোনার চাঁদ… এহন খানিক ঘুম যাও...
সামনে উল্টো দিকের এলিট বিরিয়ানিতে হঠাৎ করে ভিড়ে ভিড়, এপাশে বৌদির স্মার্ট বিরিয়ানির সবকটা টেবিল ফাঁকা। মোমোর দোকানে কিছু ভিড়, ও দিকের চাচার রোল, বাচ্চুর রোল হাউসে দু-চারজন বসে দাঁড়িয়ে। পলাশের হটস্পটের সামনে যেন ম্যাটিনি শোয়ের ভিড়। মাগো, মুখ তুলে চাও। একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে বাড়িয়ে ধরলে ওই স্নিগ্ধ হ্রদে ঢেউ উঠবে?
আকাশ সোজা তাকালো স্পন্দিতার দিকে। স্পন্দিতা নির্বাক। ‘আপনি চাইলে আপনার আর আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দায়িত্ব আমি নিতে রাজি। যাই হোক না কেন, আমার আর ওর শরীরে তো একই রক্ত বইছে। এবার আপনি ভাবুন।’ খুব দ্রুত কথাগুলো বলে বেরিয়ে গেল আকাশ। স্পন্দিতা বসে পড়ল সোফায়। নিজের কানকেই বিশ্বাস হল না ওর। যা শুনলো, তা কি সত্যি! এও কি সম্ভব!
সুদীপ্ত ভেবেছিল রেস্ট নেবে ক’দিন, বেশ ধকল গিয়েছে পিশাচপাহাড় হেলথ সেন্টার চেজের ঘটনায়, কিন্তু আজ সকালের ঘটনা শুনে সে ছুটে এসেছে। সঙ্গে আফজল নামের ছেলেটিও আছে। আফজল-ও বেশ করিতকর্মা। এক ওই মালাকার ছাড়া এই থানার বাকি সকলের দক্ষতা এবং উদ্যম নিয়ে শাক্যর কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু মালাকার যেন গা-ছেড়ে দিয়েছেন আগে থেকেই। এত কিছুর পরেও তাঁর বিশ্বাস, কালাদেওই এত কিছুর হোতা। কিছুক্ষণ আগেও তার কানের কাছে সেই ব্যাপারে বকবক করছিলেন।
হেড কুক অনন্ত পাণিগ্রাহী সমস্ত জিনিস ফ্রিজে তুলে রাখছে। গেস্টদের জন্য লাঞ্চের পাট আজ সম্ভবত উঠল। তাদের নিজেদের লাঞ্চের মেনু হিসাবে আজ ভাত, আলুসেদ্ধ, পটলভাজা আর ডিমের কারি ঠিক হয়েছিল গতকাল রাতেই। কিন্তু আজ সে-সব রান্না হবে কি-না কেউ জানে না। সকলেই চাকরি হারানোর আশঙ্কায় তটস্থ হয়ে আছে। সত্যিই তো এ-রিসর্টকে কেন্দ্র করে যা-সব চলছে বেশ কিছুদিন ধরে, তাতে মাথা ঠিক রাখা আর কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
কোর্টে একটা বড় অ্যাডভান্টেজ পেয়েছে পুলিশ। যে-বিপুল পরিমাণে অস্ত্রভান্ডার উদ্ধার হয়েছে কালাদেওর গুহা থেকে, তা কেবল জেলা বা রাজ্য নয়, সারা দেশেই আলোড়ন তুলেছে। পুলিশের স্থানীয় দেওতার থানে প্রবেশ নিয়ে যে ক্ষোভ তলে তলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল, তা আর দানা বাঁধতে পারেনি। প্রায় সকলেই একযোগে এখন দুষছে মঙ্গল ওঝাকে। লোকটি মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছে, নাহলে স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতেই হয়ত তার শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করত।
কালাদেও জেগে ওঠার আগে, বছর দু’য়েক আগেও অনেকেই ভোরবেলা ওই পথে যাতায়াত করত। আসানমুড়ায় একখানা সিমেন্টের কারখানা হয়েছে বছর পাঁচ-সাত, সেখানে এদিককার অনেকেই কাজ করে। তারা দল বেঁধে, কখন একা সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু তাদের একজন ফেরার পথে কালাদেওর বলি হয়, সেই থেকে সকলে এত ভয় পেয়ে গিয়েছে যে, যাদের ইভনিং শিফট থাকে, তারা আর ফেরে না। নাইট শিফটে এক্সট্রা ডিউটি নিয়ে পরের দিন সকালে ফেরে। আজকাল পিশাচপাহাড়ে অনেকগুলি রিসর্ট-হোটেল তৈরি হয়েছে।
কালাদেও যদি অপ্রাকৃত কোনও প্রেত হয়, তাহলে তার সঙ্গে পুলিশবিভাগের লড়াই করা হবে হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করার সামিল। কিন্তু একটা কথা সে বুঝতে পারছে না। আগে তার মাথায় আসেনি। এখন এল। কালাদেও প্রেত হলে তার কাছে দরজা বন্ধই থাক কিংবা খোলা কী যায় আসে? প্রেত তো সর্বত্রগামী হয়, তাই না? তাহলে সে যতই দরজা এঁটে ঘরের মধ্যে বসে থাক-না-কেন, সেখানে কালাদেওর ঢুকে পরতে তো কোন অসুবিধা নেই। তাহলে কেন সে দরজা নক্ করছে বারবার?
পুলক সেদিন অনেক রাতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ফেরে। আবার মদের বোতল নিয়ে বসেছিল। বারান্দার কাচের বড় জানলা খুলে দিয়েছিল। বুতাই রাগারাগি করে শুয়ে পড়েছিল। হয়তো সেখান দিয়েই অসাবধানে পড়ে যায়। সব কমপ্লেসেই গভীর রাতে সিকিউরিটি গার্ড ঘুমোয়। এমন নামী কমপ্লেক্সেও তার অন্যথা হয় না। এদিন বেশ রাতে আবার ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়েছিল। ভোররাতে সিকিউরিটি ইনচার্জ এসে বেল দিয়ে দিয়ে ঈপ্সিতার ঘুম ভাঙিয়েছিল।
ঘটনাটা ঘটেছে ভোরবেলায়। রাজ্য রাজনীতির ব্যস্ত মন্ত্রী কিন্তু ভোরবেলায় উঠে হাঁটতে যেত পুলক। বহুদিন আগে যখন প্রথম মন্ত্রী হয়েছিল তখন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে যেত। সানি অ্যাপার্টমেন্টের পিছনটা টেনিস কোর্ট। তারও ওপাশে গেলে সিসিএফসি গ্রাউন্ড। ওসব জায়গায় অবাধ যাতায়াত ছিল। সঙ্গে থাকতো সরকারি পিএসও। পার্সোনাল সিকিউরিটি অফিসার।
ইপ্সিতা বা তার বান্ধবীরা জবাব খুঁজে পায়নি। অনুষ্ঠানের অয়োজকেরা ক্লাস এইটের কিশোরের মুখে এই দৃপ্ত যুক্তি শুনে অবাক। অবাক হয়েছিল ইপ্সিতা নিজেও। এই ধাক্কা থেকেই বোধহয় তাঁর মনের কোণে মিনমিনে ঘামের মতো জন্ম নেওয়া প্রেমের নির্যাস সারা শরীরে ও মনে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরের ধাক্কায় আরও চমকিত সকলে পুলক বন্ধুদের নিয়ে লাইন থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলেছিল— তোমরা আগে ব্যাজ নিয়ে নাও! পরে নিলেও ব্যাজ শেষ হয়ে যাবে না!
এক স্কুলে না হলেও পুলক আর ইপ্সিতার ভাবসাব বহু বছর। অবশ্য উত্তম-সুচিত্রার অনেক ছবির মতো ঝগড়া দিয়ে আলাপ ও ক্রমে ঘনিষ্ঠতা। তবে শতদলবাবুর মত ছিল না একেবারেই। পুলক সাধারণ ছেলেপুলের মতো সরল, সোজা সে নয়। তার স্বপ্ন উচ্চাশা রাজনীতিতে সাফল্য। আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার না হলে চাকুরী বৃত্তি শিক্ষকতা এই গণ্ডীতেই ঘোরাফেরা করতো। ব্যবসায় ভয় চিরকালের। আর রাজনীতি যে পেশা হয়ে উঠবে সেটা দু’দশক আগেও কেউ কল্পনা করেননি।
খুনের রহস্য সমাধানে আবার ধৃতিমানের প্রশংসা হল। ধৃতিমান ও শ্রেয়াকে নীলাঞ্জনা একদিন লাঞ্চে ডাকল। শ্রেয়া জানিয়েছিল, অন্য ডিউটি যাবে না। তাই সেটা মাস্যার দ্বিতীয় রবিবার ধার্য হল। ওইদিন সাধারণত শুটিং বন্ধ থাকে। নীলাঞ্জনা দু’জনকেই বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল। তবে সকলের আড়ালে শ্রেয়া বলেছিল — পুরুষমানুষ এতও ঝগড়াটে হয় জানতাম না!
ওয়েলেসলি জুটমিলের টাইম অফিসের কর্মী ছিল দুলাল সেন। মজদুর ইউনিয়নের সেই জুটমিলের মালিক কানাইলাল মহেশ্বরী। আরও আনুষাঙ্গিক ক'জন। সেই ভয়ংকর রাতে স্নিগ্ধার শ্লীলতাহানির মিথ্যে অভিযোগে দুলালকে দোষী সাজানোর কারিগর। হঠাৎ উপস্থিত হওয়া সেই দু’জন, বিয়েবাড়ির ভিডিওগ্রাফার আর তার শাকরেদ। ওয়েলেসলি জুট মিলের গাড়ির ড্রাইভার যে মিথ্যে সাক্ষী দিয়েছিল। থানার ওসি বীরেশ দও। সৎ স্বচ্ছ সাব-ইন্সপেক্টর হাসান আলি অনেক চেষ্টা করেও ওসির বিরোধিতার জন্য দুলাল বা তাঁর স্ত্রী তৃপ্তিকে কোনওভাবেই সাহায্য করতে পারেননি। আরও ছিলেন দুলালের মামলার...
…আরও একটা কারণে ছোট পিসেমশাইকে চুঁচুড়া আসতে হত। অতনুদের বাড়ি। মানে যেটা অতনুর দাদু স্কুল শিক্ষক অমৃতলাল সেন অনেক কষ্ট করে একটু একটু করে গড়ে তুলেছিলেন। সেই বন্ধ বাড়ির তদারক করতেন ছোট পিসেমশাই। দুলালের সঙ্গে দেখা করে তার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে বড় বা মেজ শালিকার সঙ্গে কথা বলে বাড়ি বিক্রি করা টাকা সকলকে সমানভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন ছোট পিসেমশাই।
অতনু সপ্তাহে একবার আসে। বাবা খবরের কাগজ পড়েন না। ফলে রাজ্য রাজনীতি কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আলোচনার মধ্যে আনা যায় না। তাই মাঝে মাঝে অতনুর অফিসের কথা এসে পড়ে। অতনু কথা বলে। বাড়ির কথা। চুঁচুড়ার কথা। সবেতে পাঁচিল দিয়ে রাখতে হয়। অতনু নিজেও চায় না পুরনো কথা মনে করতে। স্মৃতি এক অদ্ভুত অনুভূতি। জোর করে ভোলা যায় না! চুঁচুড়ার বাড়িটা বিক্রি হয়ে গিয়েছে। মায়ের মৃত্যুর পর ও বাড়ি বন্ধ ছিল। অতনু তো ফিরে যায়নি সেখানে।
দুলালেরও ভীষণ কৌতূহল হয়েছিল। বিখ্যাত অ্যাডভোকেট। নিখরচায় কেস তিনি করতেই পারেন। কিন্তু যে কেসে পুলিশ চোখের সামনে খুনটা হতে দেখেছে এবং খুনি নিজে ভরা আদালতে বিচারকের সামনে যে খুনের কথা স্বীকার করেছেন। সেখানে সাজা তো হবেই! তবু তিনি দুলাল সেনের কেসটা হাতে নিয়ে তিনি তাঁর মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন কেন?
ফাঁসি নিশ্চিত ছিল। দুলাল মানসিকভাবে তৈরি ছিল। কিন্তু প্রখ্যাত অ্যাডভোকেট অবনী চৌধুরী বিনা পয়সায় প্রো-বোনো কেস লড়ে সাজা ফাঁসি থেকে যাবজ্জীবন করেছিলেন। ফাদার স্যামুয়েল বিশ্বাসের কাছে দুলাল ও তৃপ্তির একমাত্র সন্তান এই অতনু সেন। পিতৃমাতৃহীন অতনুকে পুত্রস্নেহে চার্চে রেখে মানুষ করেছেন ফাদার। অতনুর কাছে অতীতের সবকিছু বলেছেন।
আফিফা চেয়েছিল আমি স্বচক্ষে এটা যেন দেখতে পাই। এবার মুক্তি পাবে ওরা। হয়ত আমিও। আমাকে ফিরে বুনিকে সব বলতে হবে। এ বার নিশ্চিন্তে কলকাতা ফিরবো।
ঠিক যেমন প্লাস্টিকের প্যাকেটে ঢাকা জিনিস দেখা যায়। তেমনি বাবার শরীর ভেদ করে দেখা যাচ্ছে আরও দূরে আমার লেখার টেবিলটা।
আমার অন্য লেখার ডট পেনের লাল রং নয়। আমার কাছে কোন লালকালির পেন নেই! আর এই লেখার অক্ষরগুলোতে লাল রংটা ক্রমশ শুকিয়ে খয়েরী হয়ে যাচ্ছে। তবে কি রক্ত!
ভয়ংকর শ্বাসকষ্ট, ঠিক মতো কথা বলতে পারছেন না। ছটফট করছেন। শরীরটা বেঁকে যাচ্ছে। তারপর একটা সময় আর পারলেন না।
…হঠাৎ ধপ করে সেই চাদরমোড়া এলিয়ে-পড়া শরীর দুটোতে আগুন ধরে গেল। পোড়া শরীরের চড়চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
আপনাদের সকলের কাছে আমার একটা সবিনয় প্রশ্ন আছে। আমার এই ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা কি আমি আর বলব? আপনারা না বললে আমি কোনও দুঃখ পাবো না। তাহলে আমার পরবর্তী বক্তারা বলবার সুযোগ পাবেন, আপনাদের মতো আমিও তাদের কথাও শুনতে পারব।
ঈশ্বর পৃথিবীর সবকিছুতে সময়ের নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন। বাড়ির দলিলের এই আইন মোতাবেক পরিবর্তনটা জরুরি ছিল। তাই বিনয়কান্তি দত্ত শারীরিকভাবে সজ্ঞানে ছিলেন। বসুন্ধরা ভিলায় এখন আর ছন্দ নেই সুর নেই। সর্বত্র যেন সুরতাল ছন্দহীন সময়ের ক্রমাগত ক্ষয়। বাড়িতে দু-দুজন অত্যন্ত সংকটজনক রোগী। ব্যবসায়ের আগের সময়কার রমরমা কমে আসছে। বসুন্ধরার স্বপ্নে দেখা সেই সকলকে নিয়ে ভরা সংসারের শিকড়ের মাটি আলগা হয়ে গিয়েছে।
এরমধ্যে সুরঙ্গমার কাছে বাবলির একটা চিঠি এল। সেই চিঠির সঙ্গে বসুন্ধরা গ্রুপ অফ কোম্পানির কাছে পাঠানো আলাদা আলাদা করে প্রণয়কান্তি ও বাবলি’র ই-মেল মারফৎ আবেদনের ছাপা কপি রয়েছে। প্রণয়কান্তি জানিয়েছে, তার যদি কিছু কিছু অর্থকরী পাওনা হয়ে থাকে সেই টাকা স্টাফ ওয়েলফেয়ার ফান্ডে সে দান করে দিতে চায়।
সুজাতা চিৎকার করে উঠলেন। তাড়াহুড়ো করে প্রণয়কে বাধা দিতে গিয়ে হুইলচেয়ারের চাকায় পা জড়িয়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পুরো শরীরের ভার নিয়ে মেঝের ওপর পড়ে গেলেন। নাক-মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হতে লাগলো। সুরঙ্গমা আর বাবলি ছুটে গিয়ে সুজাতাকে সোজা করে শোয়াতে গিয়ে দেখলেন সুজাতার জ্ঞান নেই।
দিল্লিতে সামরিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েও ন’ কাকিমা তন্ত্রমন্ত্র বশীকরণ বাণ মারা, এসব কালা জাদু বা ব্ল্যাক ম্যাজিকে বিশ্বাস করতেন। দিল্লি কালীবাড়িতে নাকি একজন তান্ত্রিক আসতেন। তাঁর কাছেই অবিবাহিতার সুজাতা এবং তাঁর মা ঘন ঘন যেতেন। সেই তান্ত্রিক বাবাকে নিয়ে কি একটা সমস্যা হবার পর কালীবাড়ি কমিটি কালীবাড়ির মধ্যে তার বসার ওপর নিষেধ জারি করেন…
সুনীতিও একটু নিশ্চিন্ত হন। সত্যি কথা বলতে ইদানিং সুনীতির বুকের ভার যেন খানিকটা লাঘব হয়েছে। তার রাজকন্যা মেয়ে। সেই মেয়ের মুখের রামধনু রংয়ের আসা-যাওয়া সুনীতি ছাড়া আর কেইবা এমন গভীর করে টের পাবে। টুলুর মায়ের সঙ্গে সুনীতির চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে। সামনের সপ্তাহে উনি যাবেন বিবাহ নিয়ে প্রাথমিক কথা বলতে।
তিলজলা খালের ধার ঘেঁষে উদ্বাস্তু ঝুপড়ি। শুধু বাংলাদেশের উদ্বাস্তু নয়। এ বঙ্গের বিভিন্ন গ্রাম থেকে কলকাতায় খুদ কুঁড়ো খুঁজতে হা-ঘরেদের ভিড়। শংকর এদের পরিত্রাতা হবে। এই তার স্বপ্ন। নয়া ভুবনের ঝিলিক আঁধার পাড়ার জোনাক আলোর সঙ্গে মিশে ওকে পথ দেখায়। এই টিন চালার নিচের প্রতিটা মানুষের হৃদস্পন্দন ওর চেনা। ডায়মন্ড হারবারে থাকতেই এই প্রাণের যোগ তৈরি হয়েছিল।শংকর 'এরা' 'এরা' করছে কেন? এরা মানে কি সকলের মিলিত একটা নামহীন বিশেষত্বহীন স্তূপাকার আকৃতি? একটা গুচ্ছবন্দি কলতান, নাকি এরাও এক এক করে একজন! সাধারণ থেকে বিশেষ...
সাহেবের মাঠের শেষ প্রান্ত দিয়ে যে রেললাইনটা গিয়েছে সেখান দিয়ে মাঝে মাঝে ট্রেন চলে। কু কু ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক। অবাক চোখে দুই বোন দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা রেলগাড়ি দেখে। ট্রেন চলে গেলে দু’জনে মনের সুখে ঠান্ডা লাইন ধরে হাঁটতে থাকে। ইস্পাত রেখার একদিকে সুধা অন্যদিকে তার ফুলদি। কাচির মতো বেঁকেবেঁকে পা ফেলে ফেলে চলে সরু লাইনে। তখনও শক্ত করে দু’জনের হাত দু’জনে ধরা। আচমকা কখনও বেসামাল হলেই ধপাশ। চিৎপাত পড়ে যায় লাইনের কাঠের পাতে। পাতের মাঝখানে বিছিয়ে রাখা কাঁকড় ফুটে যায় পিঠে। তখন হাসি আর হাসি।
গৌরীর অনেক সময়ই ভালো লাগত না সেই একঘেয়ে গপ্প। সে দৌড়ে চলে যেত মামাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলতে। কিন্তু সুধা বসে থাকতো ঠায়। শুয়ে পড়ত কোলে। সাদা নুড়ি চুলগুলো ইচ্ছে খুশি আঁচড়ে পাকাত একটা লকলকে বিনুনি। আর দিদিমার গল্প বয়ে চলত অবিরাম। একই গল্পের পুরনো খোসা টুপ করে ছাড়িয়ে যেত অজান্তে। জন্ম নিত এক একটা আস্ত নতুন খোলা। তার ভিতরে পুরনো কথামালারা ছাড়ানো টাটকা বাদামের মতন মচমচ করে উঠতো।
সকালে সুনীতি ভাত নামিয়ে চাপিয়ে দিয়েছে মাছের ঝোল। পুঁই শাকের ডাঁটা চচ্চড়ি বসবে। আনাজ পাতি ধুয়ে আঁশ কড়াইয়ে খানিকটা ছাই দিয়ে একটু ছোবড়ার খোঁজ করতে বেরোচ্ছিল খুকু। প্রায় ধাক্কাই লাগছিল একটু হলে। ধাক্কা না লাগলেও ছোঁয়া তো লেগেইছে। সঙ্গে নিবিড় একটা ঘ্রাণ। আর সেই মন ভোলানো দৃষ্টি। নরম চাপা গলায় মৃদু উষ্মা প্রকাশ করেছে খুকু —এত্তদিন পরে স্মরণে আইল, তাও এই সাইত সকালে!
আজকে শংকর একটু চিন্তিত উত্তেজিত। ভালোই কাজের চাপ। প্রথমে যাবে তিলজলা ক্যাম্প। নবীনকে সবার আগে সঙ্গী করা দরকার। আফজাল রসিক পানু নবীন আর সে নিজে এই পাঁচ মাথায় মিলে কিছু প্ল্যান করে নেবে। তারপর বেরোতে হবে কমরেডের নির্দেশ বুঝে। দিন দুয়েকের মধ্যে। ফলে, আজ রাতেও ডায়মন্ড হারবারে ফেরা হবে না।
বেতিয়া ক্যাম্প যেন নগ্নতা ক্ষুধা মৃত্যুর শ্মশানভূমি। অনেক উদ্বাস্তু এখানকার জীবন সহ্য করতে না পেরে পালিয়েছে। বাকিরা মৃত্যুর দিন গুনছে। ক্যাম্প অফিসাররা হৃদয়হীন। আর ক্যাম্পবাসীদের দেখতে কীট-পতঙ্গের মতো। দঙ্গল দঙ্গল মানুষ খেতে পাচ্ছে না। তার ওপর রোজের থেকে রোজ পঙ্গপাল মানুষের ভিড় বাড়ছে। ভিড়ের সঙ্গে ভিড় ঢেউয়ের মতো মিশে বেতিয়া চম্পারণ কে বানিয়েছে উদ্বাস্তু বাঙালের বিচ্ছিন্ন দ্বীপভূমি।
রাস্তার মেটে ধুলো উড়িয়ে ওরা দু’জন হাঁটছে। ব্রজেন স্যারের কষ্ট হচ্ছে। হবেই তো। এতদিনের উপবাস, অনিদ্রা, অসম্মান, কেমন জীর্ণ হয়ে গিয়েছেন স্যার! ভিতরে ভিতরে যেন বেঁচে নেই মানুষটা! এমন একটা মরা মানুষের পক্ষে উদ্বাস্তুর যন্ত্রণায় মলম লাগানো কি সম্ভব? ক্ষতের মুখ চিঁড়ে বার করে আনতে পারবেন পুঁজ রক্ত স্রাব! অপারেশন উদ্বাস্তুর অগ্নিগর্ভ লড়াইতে ধুঁকতে ধুঁকতে যেন সামিল হচ্ছে একটি অর্ধদগ্ধ শব!
দরজা ভেজিয়ে স্বামীর পায়ের কাছে বসলেন সুনীতি। অন্য দিন হলে আদিনাথ সরে শুতেন। বালিশ গুছিয়ে যত্নে স্ত্রীর শোবার বন্দোবস্ত করে দিতেন। আজ নির্বাক। বন্ধ চোখের ওপর আড়াআড়ি হাত দিয়ে শুয়ে আছেন। দীর্ঘ দেহ। স্পন্দনহীন। ঝড়ের পূর্বাভাস। একের পর এক বিচিত্র সব ঘটনার অভিঘাত যেন জমাট যন্ত্রণা হয়ে আছড়ে পড়বে সুনীতির ওপর।
পুষ্প সুরভিময় আদিনাথের শয়ন কক্ষ। চৌকিতে টানটান বিছানা পাতা। ধবধবে চাদর। জানলার ধারে টেবিল চেয়ার। নিখুঁত গোছানো খাতা বই লেখালেখির সরঞ্জাম। ওপাশে একটা কাঠের দেরাজ। খাটের পাশে ছোট্ট তেপায়ায় ফুলতোলা কাচের বাটি। জলে ভেজা দশ বারোটা টাটকা গন্ধরাজ। খুকুর হাতের পরিচর্যার ছাপ চারপাশে ছড়ানো।
সকলে মিলে মুড়ি নারকেল পাটালি খেয়ে নিয়েছে। খেয়েই নবীন লেগে পড়েছে কাজে। নারকেল গাছের পাতা কুড়িয়ে পিছনের বাগান পরিষ্কার করছে। ছোট একটা কোদাল জোগাড় করেছে কোথা থেকে। তাই দিয়ে মাটি কুপিয়ে গাঁদাল পালং পুঁইয়ের চারা পুঁতছে। তুলসীর ভাঙা মঞ্চ সারাই করে মাটি দিয়ে তকতকে করেছে। গোরা তার কর্মকান্ড দেখে অবাক। যে উদ্দেশ্যে তার ডায়মন্ডহারবারে আসা নবীনের আগমনের ঘনঘটায় সব যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
মায়ের নীল নীল শিরাওলা হাত দুটোর কথা মনে পড়েছিল। হেড দিদিমণির কাছে খুকুর ভর্তির জন্য সেই পাঁচ সিকে সহ বাড়িয়ে দেওয়া হাত। উদ্বাস্তু কন্যা সন্তানের শিক্ষা এরপর ফ্রি স্টুডেন্টশিপে চলবে ভেবেছিল তার মা। যেমন করেই হোক, মায়ের ফাঁকা বুকখানা খুকু ভরিয়ে দেবে পড়াশুনা করে।
খুকু হেসেছে। সুনীতির তথৈবচ অবস্থা তো ও বোঝে সবচেয়ে বেশি! সংসারে দশটার ব্যস্ততা সাংঘাতিক। তখন খুকু সামলায় রান্নাঘর আর মা দাদাদের অফিস কাছারি, ভাইদের স্কুল কলেজ, খাওয়া-দাওয়া, ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন দরকারে। এরই মধ্যে আছে বাবার স্নানের জোগাড়। মধ্যে মধ্যে সেলাইয়ের মেশিন টেনেও বসেন সুনীতি।
সুধা চোখের জল গোপন করে দৌড়ে চলে গেল নিজেদের ঘরে। সব মিলিয়ে মন খারাপ আর মন খারাপ। এত মন খারাপ নিয়ে কী করবে সুধা! বুঝতে পারছে এ বাড়ির পাট এবার উঠে যাবে। রাঙা কাকা মূল ফটক দিয়ে ঢুকে গেলেন। সুধাকে দেখতে পাননি। সুধা রোয়াক ছেড়ে নেমে গলির অন্ধকারে লুকিয়ে পড়েছিল।
জ্যেষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে কথায় কথায় পার হয়ে গেল কত সময়। উদ্বেল আবেগে ভাসছিলেন আদিনাথ। কথা ফুরিয়ে এসেছিল দু’জনের। আদিনাথের বুক থেকে নিঃসরিত হচ্ছিল পূর্ণতার সুখশ্বাস। দেবব্রতর কাজ অনেক। এখনই হয়তো উঠে যাবে। আদিনাথ কথা খুঁজছেন। আর কিছুক্ষণ যদি নিজের পাশে আটকে রাখা যেত ছেলেকে।
পিসতুতো ভাই অমূল্য বাড়ি দেখে রেখেছে। বড় বাড়ি। অসুবিধা হবার কথা নয়। তবু বুকের ভিতর বালির বাঁধ ভাঙছিল। সেই একই যন্ত্রণা। একাকিত্বের। আলাদা হয়ে যাবার। জ্যেষ্ঠ পুত্রের কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে পুনর্বার। আবার তাঁর জন্য নির্ধারিত হল অন্যবাস। দেবব্রত তাঁর বড় ছেলে। কেন যেন আদিনাথের জীবনের একমাত্র সম্বল। ঢেউয়ের ধাক্কায় ঝুপঝুপ করে ভাঙছিল তীরভূমি। অশনি সংকেতময় সেই ভাঙনের শব্দ এখনও কানে বাজে। ভিতরের বদ্ধ দীর্ঘশ্বাস বুক ফুঁড়ে বাইরে বেরোনোর আগে তাই আর একটিবার বলে দেখতে চাইছিলেন তাঁর খোকাকে। দেবব্রতকে।
হা-আ-আ-ডু-ডু-ডু-ডু। জেলেপাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ক্রীড়া প্রমত্ত গৌরী। ফুলদিকে নিয়ে চিন্তিত সুধা এখন আর তাকে একা ছাড়ে না। নিতান্ত অনিচ্ছায় সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে চটি ধরে বসে থাকে। ফুলদি সে-দিন একখানা চটি হারিয়েছে। এটা নতুন। সুন্দরদা কলকাতা থেকে কিনে এনেছে। খেলার মাঠে তার ফুলদিই সবচেয়ে যোগ্য এবং শক্তিশালী খেলোয়াড়। সুধা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দেখে। দু’ দলে ভাগ হয়ে গিয়েছে ওরা। একদিকে মেয়েদের দল।
গৌরী এবার উঠবে। নয়ত মায়ের হাতে খুন্তি পিটুনি। এতক্ষণে চমকে ওঠে। সর্বনাশ! চিনতে পারছে না। ছুটে ছুটে চলে তো এসেছে বহুদূর। পথের নিশানা করেনি! এধার ওধার ছুটোছুটি করলো খানিকক্ষণ। আচ্ছা সামনের ওই নালাটা কি পার হয়েছিল? সামনে কাকচক্ষু জল। অনেকক্ষণ ধরে জলতেষ্টা পেয়েছে। মুখ নিচু করে দু’ আঁজলা জল ভরে খেয়ে তবে শান্তি। না কোথাও কিছু চেনা নজরে আসছে না তো, সুন্দর বিলটা কোথায় গেল কোথায়? জেলে বস্তির অস্তিত্বই তো নেই চারপাশে, বালিয়াড়ির মধ্যেখানে একলা গৌরী যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে বুঝলো, ও হারিয়ে গিয়েছে।
শিয়ালদহ স্টেশনে ভিড়টা স্বাভাবিক ঠেকছে না। প্রবল মারপিট হাতাহাতি চলছে দুটো দলে। শঙ্কর জানে এ হররোজের ঘটনা। তার চেয়ে টিকিট লাইনে দাঁড়িয়ে পড়া ভালো। কী ভেবে চম্পারণের দুটো টিকিট কাটল। মন্মথ আসতে পারে বলেছিল। এমনিতে একা গেলেই ভালো হয়। পুরো ব্যাপারটা একদম নিজের মতো করে বুঝে আসা যায়। কিন্তু চারপাশে যা গরম হাওয়া, যুদ্ধ যুদ্ধ হুংকার, তাতে সম্পূর্ণ একলা গেলে সমস্যা হতে পারে।
শিয়ালদা স্টেশনে খুব ভিড়। বদ্দি বিশ্বাস এসে তিলজলা ক্লাবে শংকরদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার আগে একদিনের জন্য চট করে চম্পারণ ক্যাম্পে ঘুরে আসবে শঙ্কর। টুকিটাকি জিনিস-সহ ছোট একটা ব্যাগ আগেই গুছিয়ে নিয়ে এসেছে। মায়ের কাছ থেকে দশটা টাকা ও যোগাড় করেছে। এ টাকা মাকে ফেরত দিয়ে দেবে শঙ্কর। অ্যাড এঁকেই তুলে দিতে পারবে টাকা। এখন হাতে বেশ কয়েকটা ব্যানার আঁকার কাজ আছে। সবটা করতে পারলে শ’খানেক তো হয়েই যাবে।
শ্রবণ দর্শনের ক্ষমতাকেন্দ্র জড়ো করে এখন কেবল সুনীতি শুনছে আর দেখছে। গোরার দু’চোখে বিভ্রান্তি, অসহায়তা। তোতলাচ্ছে সামান্য। আকুল নিবেদনে জানাচ্ছে নিজের কৃতকর্ম। সুনীতির ধূসর অক্ষিগোলকের সামনে যেন কলাপাতায় মুড়ে বহু যত্নে নিবেদন করছে বধূর দুধেআলতা পদচিহ্ন। মাগো ওদের সম্পন্ন পরিবার শিক্ষিত বৈদ্যবংশ, সেনগুপ্ত, ভারী কোমল স্বভাবের ভদ্র মেয়ে।
গোরা মানে গোরাচাঁদ নয়। গৌরাঙ্গ নয়। এ পরিবার শিবমন্ত্রে দীক্ষিত। গোরা হল গৌরিতোষ। সুনীতির সব ছেলেই মহাদেবের দোরধরা। শঙ্কর গৌরিতোষ আশুতোষ আর পিনাকী। আগের পক্ষের দেবতোষ শিবতোষও তাই। তার ওপর আর এক চমৎকার। বছর চারেক বয়সে সুনীতি সপরিবার বারাণসী গিয়েছিলেন। বাবা কিনে দিয়েছিলেন ছোট একখানি শ্বেতপাথরের শিব। লিঙ্গ নয়। পদ্মাসনে বসে থাকা সুস্মিত দেবাদিদেব।
সুনীতির শরীর ভেঙে আসছে। পা দুটো অসম্ভব ভারি। মনে পাষাণভার। কিচ্ছু ভালো না লাগার ক্লান্তি। নকুল যত্নে তাঁকে বসিয়ে দিয়েছে মহিলা সংরক্ষিত কামড়ায়। আশেপাশে ভিড় করে আরো অনেকে। নোংরা মেঝে। পানের পিক ফেলা দেওয়াল। ধুলোমাখা আরশোলা এখানে ওখানে হাঁটছে। প্রশস্ত জানলা ছাড়িয়ে চোখ যাচ্ছে বহুদূর অজানা দিগন্ত। অজানা জগৎ। অজানা ঠিকানা। বৃদ্ধ স্বামী। এতগুলো ছেলেমেয়ে। কি যে করবেন সুনীতি!
সুনীতি রাতের শিশির আর ভেসে আসা শৈবালের তরঙ্গ দুহাতে সরিয়ে শীতল জলের গভীরে নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন অনেকক্ষণ। সারাদিনের কাজের গন্ধ ধুয়ে ফেলেন শরীর থেকে। ওই প্রত্যেকটা ডুবের ভিতরে মিশে থাকে তাঁর আত্মশুদ্ধির রাত-আহ্নিক। শুচিতার গৌরব মনের মধ্যে জ্যোতির্ময়ী প্রদীপ হয়ে জ্বলে। মৃদুমন্দ বহতায় আরাম ছড়ায় হিমেল বাতাস। সে বাতাসের শরীর জুড়ে প্রকৃতির নিজস্ব শান্তি।
ইন্দুমতি আদিনাথ রাজযোটক। সকলেই তাই বলতো। তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা ইন্দু। ওই মোমের মত রং ওই স্পর্শ ওই সহবাস সুখ! এখনও নিঃশব্দ রাতগুলোয় ওই নারীকে কাছে ডাকেন আদিনাথ। সেও আসে। লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁরা মিলিত হন। ইন্দুর অশরীরী অস্তিত্বের মায়ামৃগ এখনো তাঁকে দুঃসহ ছুটিয়ে বেড়ায়।