
ছবি : প্রতীকী।
কাকোলূকীযম্
১৩: মুষিকার বিবাহের কাহিনি
সে বহুকাল আগেকার কথা। পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে এক অপরূপ নৈসর্গিক তটভূমি। রুক্ষ পাহাড়ের গা বেয়ে সশব্দে আছড়ে পড়ছে উদ্দাম জলপ্রপাত। সেই জলরাশির গুরুগম্ভীর গর্জনে নিরন্তর মুখরিত চারপাশের বিস্তীর্ণ বনভূমি। জলের তীব্র আলোড়নে চকিত মৎস্যকুলের ভয়ার্ত বিচরণ, আর প্রতিটি আছড়ে পড়া তরঙ্গের বুকে জেগে ওঠা দুগ্ধফেনিল শুভ্র বুদবুদ—সব মিলিয়ে এক আদিম বন্যতা। যখন সেই ফেনিল তরঙ্গের ওপর ভোরের সূর্যের সোনালি আলো এসে ঠিকরে পড়ে, তখন চারদিকে বিচিত্র বর্ণের এক মায়াবী আলোর হিল্লোল বয়ে যায়।
প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ আর চঞ্চলতার ঠিক পাশেই, গঙ্গার পবিত্র তীরে গড়ে উঠেছিল এক শান্ত, স্নিগ্ধ তপোবন। বাইরের সেই কোলাহল যেন সেখানে এসে এক পরম নৈঃশব্দ্যে বিলীন হয়ে গেছে। তপোবনের বাতাস সর্বদাই পবিত্র হয়ে থাকত ঋষিমুনিদের গম্ভীর বেদধ্বনি, নিরবচ্ছিন্ন জপ, উপবাস আর গভীর যোগসাধনার স্পন্দনে। সেখানকার তপস্বীদের জীবন ছিল কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গঙ্গার নির্মল, হিমশীতল বারি পান করে, বন্য কন্দ-মূল-ফল আর নামমাত্র শৈবাল আহার করে তাঁরা নিজেদের নশ্বর দেহকে শুষ্ক করে তুলেছিলেন। জাগতিক বিলাসের লেশমাত্র সেখানে ছিল না; তাঁদের পরিধানে ছিল কেবল গাছের ছাল বা বল্কল নির্মিত সামান্য কৌপীন।
এই মহান তপোবনের প্রাণকেন্দ্র এবং প্রধান আচার্য ছিলেন এক পরম তেজস্বী মহর্ষি—যাজ্ঞবল্ক্য। তপোবনে আশ্রয় নেওয়া অগণিত ঋষিকুল ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ‘কুলপতি’। আধুনিক যুগের দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘কুলপতি’ পদটিকে আমরা আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। তবে প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এর তাৎপর্য ছিল আরও অনেক গভীর, অনেক বেশি আত্মিক। আজকের উপাচার্য যেখানে মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক প্রধান, প্রাচীন নীতিশাস্ত্রে ‘কুলপতি’ ছিলেন একাধারে পিতা, মাতা এবং পরম গুরু। যিনি সম্পূর্ণ নিখরচায় একক দায়িত্বে দশ হাজার শিষ্যকে অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে নিজের সন্তানের মতো স্নেহচ্ছায়ায় লালন-পালন করতেন এবং একই সঙ্গে পরম বিদ্যাদান করতেন—তাঁকেই কেবল এই মহিমান্বিত ‘কুলপতি’ উপাধিতে ভূষিত করা হতো। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য ছিলেন ঠিক তেমনই এক অনন্য শিক্ষক এবং আধ্যাত্মিক অভিভাবক।
প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ আর চঞ্চলতার ঠিক পাশেই, গঙ্গার পবিত্র তীরে গড়ে উঠেছিল এক শান্ত, স্নিগ্ধ তপোবন। বাইরের সেই কোলাহল যেন সেখানে এসে এক পরম নৈঃশব্দ্যে বিলীন হয়ে গেছে। তপোবনের বাতাস সর্বদাই পবিত্র হয়ে থাকত ঋষিমুনিদের গম্ভীর বেদধ্বনি, নিরবচ্ছিন্ন জপ, উপবাস আর গভীর যোগসাধনার স্পন্দনে। সেখানকার তপস্বীদের জীবন ছিল কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গঙ্গার নির্মল, হিমশীতল বারি পান করে, বন্য কন্দ-মূল-ফল আর নামমাত্র শৈবাল আহার করে তাঁরা নিজেদের নশ্বর দেহকে শুষ্ক করে তুলেছিলেন। জাগতিক বিলাসের লেশমাত্র সেখানে ছিল না; তাঁদের পরিধানে ছিল কেবল গাছের ছাল বা বল্কল নির্মিত সামান্য কৌপীন।
এই মহান তপোবনের প্রাণকেন্দ্র এবং প্রধান আচার্য ছিলেন এক পরম তেজস্বী মহর্ষি—যাজ্ঞবল্ক্য। তপোবনে আশ্রয় নেওয়া অগণিত ঋষিকুল ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ‘কুলপতি’। আধুনিক যুগের দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘কুলপতি’ পদটিকে আমরা আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। তবে প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এর তাৎপর্য ছিল আরও অনেক গভীর, অনেক বেশি আত্মিক। আজকের উপাচার্য যেখানে মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক প্রধান, প্রাচীন নীতিশাস্ত্রে ‘কুলপতি’ ছিলেন একাধারে পিতা, মাতা এবং পরম গুরু। যিনি সম্পূর্ণ নিখরচায় একক দায়িত্বে দশ হাজার শিষ্যকে অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে নিজের সন্তানের মতো স্নেহচ্ছায়ায় লালন-পালন করতেন এবং একই সঙ্গে পরম বিদ্যাদান করতেন—তাঁকেই কেবল এই মহিমান্বিত ‘কুলপতি’ উপাধিতে ভূষিত করা হতো। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য ছিলেন ঠিক তেমনই এক অনন্য শিক্ষক এবং আধ্যাত্মিক অভিভাবক।
একদিন গঙ্গার সেই পুণ্যসলিলে প্রাত্যহিক স্নান সেরে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য সূর্যদেবকে অর্ঘ্য নিবেদনের জন্য অঞ্জলি বদ্ধ করে আচমন করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশপথে উড়ে যাওয়া এক ক্ষুধার্ত বাজপাখির চঞ্চু থেকে ফসকে একটি ছোট্ট ইঁদুর-কন্যা সোজা এসে পড়ল মহর্ষির অঞ্জলিবদ্ধ পবিত্র জলের মধ্যে। আচমকা এই ঘটনায় মহর্ষি বিস্মিত হলেও তাঁর হৃদয় করুণায় সিক্ত হলো। তিনি দ্রুত নদী থেকে উঠে এসে সযত্নে প্রাণীটিকে একটি বটপাতার ওপর রাখলেন। তারপর পুনরায় স্নান সেরে প্রায়শ্চিত্ত ও আচমনাদি ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করলেন। এরপর তাঁর সুদীর্ঘ কালের অর্জিত তপস্যার অলৌকিক প্রভাবে সেই ইঁদুর-কন্যাকে তিনি এক অপরূপা মানবীকন্যায় রূপান্তরিত করে দিলেন।
সেই নবজাতিকা কন্যাকে বক্ষে ধারণ করে আশ্রমে ফিরে এলেন মহর্ষি। নিজের অপত্যহীন স্ত্রীর কোলে তাকে তুলে দিয়ে তিনি বললেন,”ভদ্রে! এই কন্যাকে গ্রহণ করো। আজ থেকে একে নিজের গর্ভজাত সন্তান জ্ঞানেই লালনপালন করো। একে আপন সাধ্যমতো রক্ষা করো।”
মাতৃত্বের স্বাদ পেয়ে ঋষিপত্নীও পরম মমতায় তাকে বড় করে তুলতে লাগলেন। দেখতে দেখতে কেটে গেল বারোটি বসন্ত। কন্যা এখন বিবাহযোগ্যা। তার যৌবনোন্মুখ রূপ দেখে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের পত্নী একদিন চিন্তিত মুখে স্বামীকে বললেন, “হে পতিদেব! আপনি কি লক্ষ্য করছেন না যে, আমাদের কন্যার বিবাহের উপযুক্ত সময় অতীত হয়ে যাচ্ছে?”
স্ত্রীর কথা শুনে স্মিত হাসলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য। শান্ত কণ্ঠে বললেন, “হে দেবী! আপনি যথার্থই বলেছেন। তবে শাস্ত্র বলে—স্ত্রীলোককে সর্বপ্রথম সোম, গন্ধর্ব এবং অগ্নি ভোগ করেন। তারপর সেই নারী মনুষ্যের উপযোগ্যা হন। তাই নারীজাতির মধ্যে কোনো দোষ উৎপন্ন হয় না, তাঁরা সর্বদাই নির্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক।”
প্রাচীন ভারতের এই শ্লোকটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রতীকবাদ (Symbolism)। এখানে ‘স্ত্রী-ভোগ’ শব্দটিকে আধুনিক স্থূল অর্থে বা নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। এর অন্তর্নিহিত অর্থটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিজ্ঞানসম্মত।শিশুকন্যা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সর্বপ্রথম সোম দেবতা তাকে ‘ভোগ’ করেন, অর্থাৎ সোম বা চন্দ্রের প্রভাবে কন্যার মধ্যে এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও সৌম্য ভাবের উদয় হয়। এটি সোমদেবতার আশির্বাদ। এরপর গন্ধর্বের পরশ —শিশুকন্যাকে ভোগ করেন গন্ধর্ব। গন্ধর্ববিদ্যার প্রভাব বলতে বোঝায় শিল্প, নৃত্য, গীত ও সঙ্গীতে পারদর্শিতা। অর্থাৎ, কন্যার কথায়-বার্তায়, চলনে-বলনে এক জন্মগত আভিজাত্য ও মাধুর্য ফুটে ওঠে।তদন্তর তাঁকে ‘ভোগ’ করেন অগ্নিদেব। অগ্নির প্রখর তেজ ও প্রাণশক্তি যখন কন্যার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কন্যা ঋতুমতী হন। তার শরীরে আসে নারীত্বের পূর্ণতা। এই তিনটি দৈব-স্তর পেরিয়ে আসার পরই এক নারী মনুষ্যের বা স্বামীর উপভোগের যোগ্যা হয়ে ওঠেন। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের পালিতা কন্যাটিও এখন সম্পূর্ণ দেবোপভোক্তা। সে সৌম্যকান্তি, আভিজাত্যে ভরপুর এবং ঋতুমতী। সুতরাং, সে এখন সর্বতোভাবে এক বিবাহযোগ্যা নারী।
সেই নবজাতিকা কন্যাকে বক্ষে ধারণ করে আশ্রমে ফিরে এলেন মহর্ষি। নিজের অপত্যহীন স্ত্রীর কোলে তাকে তুলে দিয়ে তিনি বললেন,”ভদ্রে! এই কন্যাকে গ্রহণ করো। আজ থেকে একে নিজের গর্ভজাত সন্তান জ্ঞানেই লালনপালন করো। একে আপন সাধ্যমতো রক্ষা করো।”
মাতৃত্বের স্বাদ পেয়ে ঋষিপত্নীও পরম মমতায় তাকে বড় করে তুলতে লাগলেন। দেখতে দেখতে কেটে গেল বারোটি বসন্ত। কন্যা এখন বিবাহযোগ্যা। তার যৌবনোন্মুখ রূপ দেখে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের পত্নী একদিন চিন্তিত মুখে স্বামীকে বললেন, “হে পতিদেব! আপনি কি লক্ষ্য করছেন না যে, আমাদের কন্যার বিবাহের উপযুক্ত সময় অতীত হয়ে যাচ্ছে?”
স্ত্রীর কথা শুনে স্মিত হাসলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য। শান্ত কণ্ঠে বললেন, “হে দেবী! আপনি যথার্থই বলেছেন। তবে শাস্ত্র বলে—স্ত্রীলোককে সর্বপ্রথম সোম, গন্ধর্ব এবং অগ্নি ভোগ করেন। তারপর সেই নারী মনুষ্যের উপযোগ্যা হন। তাই নারীজাতির মধ্যে কোনো দোষ উৎপন্ন হয় না, তাঁরা সর্বদাই নির্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক।”
প্রাচীন ভারতের এই শ্লোকটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রতীকবাদ (Symbolism)। এখানে ‘স্ত্রী-ভোগ’ শব্দটিকে আধুনিক স্থূল অর্থে বা নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। এর অন্তর্নিহিত অর্থটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিজ্ঞানসম্মত।শিশুকন্যা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সর্বপ্রথম সোম দেবতা তাকে ‘ভোগ’ করেন, অর্থাৎ সোম বা চন্দ্রের প্রভাবে কন্যার মধ্যে এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও সৌম্য ভাবের উদয় হয়। এটি সোমদেবতার আশির্বাদ। এরপর গন্ধর্বের পরশ —শিশুকন্যাকে ভোগ করেন গন্ধর্ব। গন্ধর্ববিদ্যার প্রভাব বলতে বোঝায় শিল্প, নৃত্য, গীত ও সঙ্গীতে পারদর্শিতা। অর্থাৎ, কন্যার কথায়-বার্তায়, চলনে-বলনে এক জন্মগত আভিজাত্য ও মাধুর্য ফুটে ওঠে।তদন্তর তাঁকে ‘ভোগ’ করেন অগ্নিদেব। অগ্নির প্রখর তেজ ও প্রাণশক্তি যখন কন্যার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কন্যা ঋতুমতী হন। তার শরীরে আসে নারীত্বের পূর্ণতা। এই তিনটি দৈব-স্তর পেরিয়ে আসার পরই এক নারী মনুষ্যের বা স্বামীর উপভোগের যোগ্যা হয়ে ওঠেন। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের পালিতা কন্যাটিও এখন সম্পূর্ণ দেবোপভোক্তা। সে সৌম্যকান্তি, আভিজাত্যে ভরপুর এবং ঋতুমতী। সুতরাং, সে এখন সর্বতোভাবে এক বিবাহযোগ্যা নারী।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০২ : ‘স্বজাতির্দূরতিক্রমা’—জন্মগত স্বভাব কি কখনও বদলায়? পঞ্চতন্ত্রের পাতায় এক অমোঘ রাজনৈতিক সত্যের

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৯ : আড়ালে আছে আততায়ী
মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বস্তুত এই নিগূঢ় তত্ত্বটিই তাঁর সহধর্মিণীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। প্রাচীন এই ধ্যানধারণার মধ্যে নারীর অবমাননা বা তাকে পণ্য হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ ছিল না; বরং এর মধ্যে নিহিত ছিল নারীকে দেবীজ্ঞানে পবিত্র মান্য করার এক শাশ্বত দর্শন। স্ত্রীর উদ্বেগ নিরসন করতে গিয়ে পরবর্তী শ্লোকের মর্মার্থ তুলে ধরে মহর্ষি স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন—
“দেবী, দেবতাদের এই অধিকার আসলে নারীর প্রতি তাঁদের আশীর্বাদ। সোমদেব নারীকে দান করেন পরম শুচিতা, গন্ধর্ব প্রদান করেন সুমধুর ও চতুর বাক্পটুতা, আর অগ্নিদেব তাঁকে আশীর্বাদ করেন ‘সর্বমেধত্ব’ বা সর্বাঙ্গীণ পবিত্রতায়। এই ত্রিবিধ দৈব-আশীর্বাদের ফলেই নারী সর্বদা নিষ্পাপ ও পবিত্র থাকেন—তাঁর শরীর সর্বদাই শুদ্ধ।”
একটু থামলেন মহর্ষি। আজীবন যিনি বেদ ও শাস্ত্রের নিবিড় চর্চায় মগ্ন থেকেছেন, যাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসে কেবল উপনিষদের বাণী ধ্বনিত হয়, তাঁর চিন্তা ও মননে শাস্ত্রবাক্যই তো সর্বপ্রথম উদিত হবে! জীবনচর্যা আর শাস্ত্র যেখানে মিলেমিশে একাকার, সেখানে তাঁর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাস্ত্রের শ্লোকই নির্গত হতে লাগল।
স্মৃতিশাস্ত্রের পাতা থেকে একের পর এক নিদান স্মরণ করে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলতে শুরু করলেন নারীদেহের বিকাশ ও তার শাস্ত্রীয় নামকরণের কথা, যতদিন না কন্যার শরীরে স্তনচিহ্নের উদ্গম ঘটছে, ততদিন পর্যন্ত শাস্ত্রের ভাষায় সে নেহাতই শিশু, তাকে বলা হয় ‘নগ্নিকা’।শরীরে রোমোদ্গমের পূর্ব পর্যন্ত তার শাস্ত্রে তাঁরপরিচতি ‘কন্যা’।রজোদর্শনের ঠিক পূর্বাবস্থায় থাকা বালিকাকে বলা হয় ‘গৌরী’আর কন্যা যখন ঋতুমতী হয়, তখন তার শাস্ত্রীয় নাম হয় ‘রোহিণী’।
মহর্ষি বুঝিয়ে বললেন, “শরীরে যখন রোমাদি চিহ্নের বিকাশ হয়, তখনই সোমদেবতা সেই কন্যাকে উপভোগ করেন। এরপর যখন সে পয়োধরা হয়, তখন তার মধ্যে গন্ধর্ববিদ্যার প্রতিষ্ঠা ঘটে। সবশেষে রজোদর্শনের মাধ্যমে তার মধ্যে অগ্নিদেবের তেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ঠিক এই কারণেই শাস্ত্র নির্দেশ দেয় যে, কন্যা ঋতুমতী হওয়র পূর্বেই তার বিবাহ সম্পন্ন করা উচিত। অষ্টমবর্ষীয়া কন্যার বিবাহ তাই শাস্ত্রের চোখে সর্বাধিক প্রশংসনীয়।”
“দেবী, দেবতাদের এই অধিকার আসলে নারীর প্রতি তাঁদের আশীর্বাদ। সোমদেব নারীকে দান করেন পরম শুচিতা, গন্ধর্ব প্রদান করেন সুমধুর ও চতুর বাক্পটুতা, আর অগ্নিদেব তাঁকে আশীর্বাদ করেন ‘সর্বমেধত্ব’ বা সর্বাঙ্গীণ পবিত্রতায়। এই ত্রিবিধ দৈব-আশীর্বাদের ফলেই নারী সর্বদা নিষ্পাপ ও পবিত্র থাকেন—তাঁর শরীর সর্বদাই শুদ্ধ।”
একটু থামলেন মহর্ষি। আজীবন যিনি বেদ ও শাস্ত্রের নিবিড় চর্চায় মগ্ন থেকেছেন, যাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসে কেবল উপনিষদের বাণী ধ্বনিত হয়, তাঁর চিন্তা ও মননে শাস্ত্রবাক্যই তো সর্বপ্রথম উদিত হবে! জীবনচর্যা আর শাস্ত্র যেখানে মিলেমিশে একাকার, সেখানে তাঁর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাস্ত্রের শ্লোকই নির্গত হতে লাগল।
স্মৃতিশাস্ত্রের পাতা থেকে একের পর এক নিদান স্মরণ করে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলতে শুরু করলেন নারীদেহের বিকাশ ও তার শাস্ত্রীয় নামকরণের কথা, যতদিন না কন্যার শরীরে স্তনচিহ্নের উদ্গম ঘটছে, ততদিন পর্যন্ত শাস্ত্রের ভাষায় সে নেহাতই শিশু, তাকে বলা হয় ‘নগ্নিকা’।শরীরে রোমোদ্গমের পূর্ব পর্যন্ত তার শাস্ত্রে তাঁরপরিচতি ‘কন্যা’।রজোদর্শনের ঠিক পূর্বাবস্থায় থাকা বালিকাকে বলা হয় ‘গৌরী’আর কন্যা যখন ঋতুমতী হয়, তখন তার শাস্ত্রীয় নাম হয় ‘রোহিণী’।
মহর্ষি বুঝিয়ে বললেন, “শরীরে যখন রোমাদি চিহ্নের বিকাশ হয়, তখনই সোমদেবতা সেই কন্যাকে উপভোগ করেন। এরপর যখন সে পয়োধরা হয়, তখন তার মধ্যে গন্ধর্ববিদ্যার প্রতিষ্ঠা ঘটে। সবশেষে রজোদর্শনের মাধ্যমে তার মধ্যে অগ্নিদেবের তেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ঠিক এই কারণেই শাস্ত্র নির্দেশ দেয় যে, কন্যা ঋতুমতী হওয়র পূর্বেই তার বিবাহ সম্পন্ন করা উচিত। অষ্টমবর্ষীয়া কন্যার বিবাহ তাই শাস্ত্রের চোখে সর্বাধিক প্রশংসনীয়।”
আরও পড়ুন:

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭২: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৪: কুকুরমুখো ফল বাদুড়
প্রাচীন ভারতের সমাজব্যবস্থায় কন্যার বিবাহ নিয়ে একজন পিতার ওপর যে কী বিপুল মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় চাপ ছিল, মহর্ষির পরবর্তী কথাগুলোতে তারই স্পষ্ট প্রতিফলন ফুটে উঠল। গম্ভীর কণ্ঠে তিনি বললেন—”শাস্ত্রে বলা হয়েছে, বিবাহের পূর্বে পিতৃগৃহে থাকা অবস্থায় কন্যার গুপ্তাঙ্গে রোমোদ্গম হওয়ার অর্থ হলো—সেই কন্যার পিতার পূর্বসঞ্চিত সমস্ত পুণ্যফল নাশ হওয়া। যদি তার স্তনচিহ্ন প্রকাশ পায়, তবে তা পিতার ভাবীকালের পুণ্যফলকেও ক্ষয় করে। আর যদি সেই কন্যা পিতৃগৃহেই পতিসমাগমের ইচ্ছা পোষণ করে, তবে তা পিতার পরকালকেও সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে।সর্বোপরি, যদি পিতার ঘরেই কন্যার রজোদর্শন হয়, তবে তা সেই পিতার ঘোর বিনাশকাল বলেই গণ্য করতে হবে। শাস্ত্র বলছে, পিতৃগৃহে যে কন্যা ঋতুমতী হয়, সে ‘বৃষলী’ বা ‘জঘন্যা’ দোষে দুষ্ট হয়। এমন কন্যাকে শাস্ত্র বিধিপূর্বক বিবাহের অযোগ্য বলে বিবেচনা করে।” মহর্ষি বললেন— যে এই চরম পরিস্থিতি থেকে কন্যা ও পিতাকে রক্ষা করার জন্যই স্বয়ং মনুমহারাজ বিধান দিয়েছেন যে, ‘নগ্না’ অবস্থাতেই (অর্থাৎ বয়ঃসন্ধির পূর্বেই) কন্যার বিবাহ দেওয়া সর্বোত্তম।
কিন্তু যদি কোনও কারণে কন্যার বিবাহে বিলম্ব হয়েই যায়? যদি পিতৃগৃহেই সে রজস্বলা হয়, তখন উপায় কী?
শাস্ত্রের সেই আপৎকালীন বিধান উল্লেখ করে মহর্ষি বললেন, “যদি কন্যা পিতৃগৃহেই ঋতুমতী হয়ে যায়, তবে তার বিবাহের জন্য আর গোত্রাদির সূক্ষ্ম বিচার করার প্রয়োজন থাকে না। রজোদর্শনের পর যেহেতু শাস্ত্রীয় বিবাহবিধির আর আবশ্যকতা থাকে না, তাই বিনা আড়ম্বরেই তাকে সম্প্রদান করে দেওয়া উচিত। তখন যথাসম্ভব তার সমকক্ষ এবং অনুরূপ গুণসম্পন্ন বরের হাতেই তাকে তুলে দেওয়া শ্রেয়। কিন্তু যদি তেমন পাত্র না-ও মেলে, তবে কন্যার তুলনায় হীন বা অসদৃশ বরের হাতে হলেও তাকে সম্প্রদান করা উচিত। কারণ, ঋতুমতী কন্যার বিবাহে পাত্রের যোগ্যাযোগ্য বিচারে আর কোনো দোষ বর্তায় না।”
প্রাচীন ভারতের সমাজ ও দর্শনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এক কন্যার পিতার মতো এমন করুণ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আর কারও ছিল না। একদিকে তাঁর কন্যাস্নেহ, অন্যদিকে শাস্ত্রের রক্তচক্ষু—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে একজন পিতাকে যে কী নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো, তা আজকের দিনে বসে কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের শেকড় কোথায়? কেন প্রাচীন ভারতের বিধানকর্তারা নারীদেহের স্বাভাবিক জৈবিক পরিণতিকে এক ভয়াবহ আতঙ্কের রূপ দিয়েছিলেন? ভারততত্ত্ব (Indology) এবং ইতিহাসের আলোকে এই নাটকীয় দ্বন্দ্বটিকে বিশ্লেষণ করলে এক অন্য ভারতের ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।একটু পিছিয়ে মহাকাব্যের যুগে দৃষ্টিপাত করা যাক। মহাভারত বা রামায়ণের যুগে কিন্তু এমন দমবন্ধ করা পরিবেশ ছিল না। সেখানে আমরা দেখি সাবিত্রীর মতো তেজস্বিনী নারীকে। পিতা অশ্বপতি যখন কন্যার জন্য যোগ্য পাত্র খুঁজে পেলেন না, তখন সাবিত্রী নির্দ্বিধায় রথে চড়ে দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন নিজের স্বামী নির্বাচনের জন্য। সেখানে কোনো ‘বৃষলী’ বা ‘জঘন্যা’ হওয়ার ভয় ছিল না। শকুন্তলা কিংবা দময়ন্তীরা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পরেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।
কিন্তু মহাকাব্যের সেই মুক্ত হাওয়া ধীরে ধীরে রুদ্ধ হতে শুরু করল ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রের যুগে এসে। বিশেষ করে মনুসংহিতার রচনাকালে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যে) সমাজব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল।
কিন্তু যদি কোনও কারণে কন্যার বিবাহে বিলম্ব হয়েই যায়? যদি পিতৃগৃহেই সে রজস্বলা হয়, তখন উপায় কী?
শাস্ত্রের সেই আপৎকালীন বিধান উল্লেখ করে মহর্ষি বললেন, “যদি কন্যা পিতৃগৃহেই ঋতুমতী হয়ে যায়, তবে তার বিবাহের জন্য আর গোত্রাদির সূক্ষ্ম বিচার করার প্রয়োজন থাকে না। রজোদর্শনের পর যেহেতু শাস্ত্রীয় বিবাহবিধির আর আবশ্যকতা থাকে না, তাই বিনা আড়ম্বরেই তাকে সম্প্রদান করে দেওয়া উচিত। তখন যথাসম্ভব তার সমকক্ষ এবং অনুরূপ গুণসম্পন্ন বরের হাতেই তাকে তুলে দেওয়া শ্রেয়। কিন্তু যদি তেমন পাত্র না-ও মেলে, তবে কন্যার তুলনায় হীন বা অসদৃশ বরের হাতে হলেও তাকে সম্প্রদান করা উচিত। কারণ, ঋতুমতী কন্যার বিবাহে পাত্রের যোগ্যাযোগ্য বিচারে আর কোনো দোষ বর্তায় না।”
প্রাচীন ভারতের সমাজ ও দর্শনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এক কন্যার পিতার মতো এমন করুণ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আর কারও ছিল না। একদিকে তাঁর কন্যাস্নেহ, অন্যদিকে শাস্ত্রের রক্তচক্ষু—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে একজন পিতাকে যে কী নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো, তা আজকের দিনে বসে কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের শেকড় কোথায়? কেন প্রাচীন ভারতের বিধানকর্তারা নারীদেহের স্বাভাবিক জৈবিক পরিণতিকে এক ভয়াবহ আতঙ্কের রূপ দিয়েছিলেন? ভারততত্ত্ব (Indology) এবং ইতিহাসের আলোকে এই নাটকীয় দ্বন্দ্বটিকে বিশ্লেষণ করলে এক অন্য ভারতের ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।একটু পিছিয়ে মহাকাব্যের যুগে দৃষ্টিপাত করা যাক। মহাভারত বা রামায়ণের যুগে কিন্তু এমন দমবন্ধ করা পরিবেশ ছিল না। সেখানে আমরা দেখি সাবিত্রীর মতো তেজস্বিনী নারীকে। পিতা অশ্বপতি যখন কন্যার জন্য যোগ্য পাত্র খুঁজে পেলেন না, তখন সাবিত্রী নির্দ্বিধায় রথে চড়ে দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন নিজের স্বামী নির্বাচনের জন্য। সেখানে কোনো ‘বৃষলী’ বা ‘জঘন্যা’ হওয়ার ভয় ছিল না। শকুন্তলা কিংবা দময়ন্তীরা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পরেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।
কিন্তু মহাকাব্যের সেই মুক্ত হাওয়া ধীরে ধীরে রুদ্ধ হতে শুরু করল ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রের যুগে এসে। বিশেষ করে মনুসংহিতার রচনাকালে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যে) সমাজব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল।
আরও পড়ুন:

সাগর উঠে তরঙ্গিয়া

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
বিখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ এবং সংস্কৃত পণ্ডিত প্যাট্রিক ওলিভেল (Patrick Olivelle) তাঁর ‘মনুসংহিতা’র (Manu’s Code of Law) সুবিখ্যাত ভূমিকায় তৎকালীন সমাজের এক চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরেছেন। ওলিভেল দেখাচ্ছেন, মনুর এই কঠোর বিধানগুলো কোনো শূন্যস্থান থেকে তৈরি হয়নি; এর পিছনে ছিল গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগ।
সেটি ছিল এমন এক সময়, যখন মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, সমাজে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রবল প্রভাব। এই শ্রমণ ধর্মগুলো নারীদের সামনে এক বিকল্প পথের সন্ধান দিয়েছিল—তাঁরা চাইলে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসিনী বা ভিক্কুনী হতে পারতেন। ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষকরা এই ব্যবস্থাকে সমাজের ভিত্তিমূলের ওপর চরম আঘাত বলে মনে করলেন। ওলিভেলের মতে, মনু এবং অন্যান্য শাস্ত্রকারদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বর্ণাশ্রম প্রথাকে সুদৃঢ় করা এবং ‘বর্ণসঙ্কর’ (মিশ্র জাতি) রোধ করা।
আর এই বর্ণ বিশুদ্ধতা রক্ষার একমাত্র উপায় কী? নারী-যৌনতার ওপর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
মনুসংহিতার পাতায় পাতায় তাই ছড়িয়ে আছে নারী-যৌনতা নিয়ে এক গভীর আতঙ্ক। শাস্ত্রকাররা মনে করলেন, নারীর স্বভাবই হলো চঞ্চলতা। তাই পিতা, পতি ও পুত্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাকে এক মুহূর্তও রাখা যাবে না। বয়ঃসন্ধির পর নারীর নিজস্ব ইচ্ছা বা যৌনচেতনা জাগ্রত হতে পারে, সে নিজের পছন্দে অন্য বর্ণের পুরুষকে নির্বাচন করতে পারে—এই ভয় থেকেই জন্ম নিল ‘বাল্যবিবাহ’ বা ‘প্রাক্-রজোদর্শন বিবাহ’-এর কঠোর বিধান।
কন্যাকে তার যৌনতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আগেই, ‘নগ্নিকা’ বা ‘গৌরী’ অবস্থাতেই তাকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার এই বিধান আসলে পিতৃতন্ত্রের এক নিপুণ রাজনৈতিক কৌশল। ওলিভেল খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন, ঋতুমতী হওয়ার অর্থ হলো প্রজনন ক্ষমতার শুরু। সেই প্রজনন ক্ষমতার ফসল যেন কোনওভাবেই পিতৃগৃহে না থাকে, তা নিশ্চিত করতেই শাস্ত্রকাররা পিতার ওপর চাপিয়ে দিলেন ভয়াবহ মানসিক চাপ।
শাস্ত্রকাররা খুব ভালো করেই জানতেন, শুধু আইনের ভয় দেখিয়ে একজন পিতাকে তার শিশুকন্যাকে ঘরছাড়া করতে বাধ্য করা যাবে না। প্রয়োজন এক চরম আধ্যাত্মিক আতঙ্কের বা স্পিরিচুয়াল ব্ল্যাকমেইলের। তাই তাঁরা পিতার সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করলেন—তাঁর পরকাল এবং পিতৃপুরুষের পুণ্য। বিধান দেওয়া হলো: কন্যা যদি ঘরে বসে ঋতুমতী হয়, তবে সেই ঋতুস্রাবের প্রতিটি বিন্দু তার পিতা এবং পূর্বপুরুষদের নরকে নিক্ষেপ করবে। সেই কন্যা ‘বৃষলী’—সে অস্পৃশ্য, অপবিত্র।
সেটি ছিল এমন এক সময়, যখন মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, সমাজে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রবল প্রভাব। এই শ্রমণ ধর্মগুলো নারীদের সামনে এক বিকল্প পথের সন্ধান দিয়েছিল—তাঁরা চাইলে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসিনী বা ভিক্কুনী হতে পারতেন। ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষকরা এই ব্যবস্থাকে সমাজের ভিত্তিমূলের ওপর চরম আঘাত বলে মনে করলেন। ওলিভেলের মতে, মনু এবং অন্যান্য শাস্ত্রকারদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বর্ণাশ্রম প্রথাকে সুদৃঢ় করা এবং ‘বর্ণসঙ্কর’ (মিশ্র জাতি) রোধ করা।
আর এই বর্ণ বিশুদ্ধতা রক্ষার একমাত্র উপায় কী? নারী-যৌনতার ওপর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
মনুসংহিতার পাতায় পাতায় তাই ছড়িয়ে আছে নারী-যৌনতা নিয়ে এক গভীর আতঙ্ক। শাস্ত্রকাররা মনে করলেন, নারীর স্বভাবই হলো চঞ্চলতা। তাই পিতা, পতি ও পুত্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাকে এক মুহূর্তও রাখা যাবে না। বয়ঃসন্ধির পর নারীর নিজস্ব ইচ্ছা বা যৌনচেতনা জাগ্রত হতে পারে, সে নিজের পছন্দে অন্য বর্ণের পুরুষকে নির্বাচন করতে পারে—এই ভয় থেকেই জন্ম নিল ‘বাল্যবিবাহ’ বা ‘প্রাক্-রজোদর্শন বিবাহ’-এর কঠোর বিধান।
কন্যাকে তার যৌনতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আগেই, ‘নগ্নিকা’ বা ‘গৌরী’ অবস্থাতেই তাকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার এই বিধান আসলে পিতৃতন্ত্রের এক নিপুণ রাজনৈতিক কৌশল। ওলিভেল খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন, ঋতুমতী হওয়ার অর্থ হলো প্রজনন ক্ষমতার শুরু। সেই প্রজনন ক্ষমতার ফসল যেন কোনওভাবেই পিতৃগৃহে না থাকে, তা নিশ্চিত করতেই শাস্ত্রকাররা পিতার ওপর চাপিয়ে দিলেন ভয়াবহ মানসিক চাপ।
শাস্ত্রকাররা খুব ভালো করেই জানতেন, শুধু আইনের ভয় দেখিয়ে একজন পিতাকে তার শিশুকন্যাকে ঘরছাড়া করতে বাধ্য করা যাবে না। প্রয়োজন এক চরম আধ্যাত্মিক আতঙ্কের বা স্পিরিচুয়াল ব্ল্যাকমেইলের। তাই তাঁরা পিতার সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করলেন—তাঁর পরকাল এবং পিতৃপুরুষের পুণ্য। বিধান দেওয়া হলো: কন্যা যদি ঘরে বসে ঋতুমতী হয়, তবে সেই ঋতুস্রাবের প্রতিটি বিন্দু তার পিতা এবং পূর্বপুরুষদের নরকে নিক্ষেপ করবে। সেই কন্যা ‘বৃষলী’—সে অস্পৃশ্য, অপবিত্র।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬২: যুদ্ধের নৃশংসতা নয়, জনমানসে ঠাঁই পায় শুধু যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য
কল্পনা করুন সেই প্রাচীন যুগের এক পিতার কথা। তিনি সমাজের সম্মানীয় ব্যক্তি, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ। অথচ তাঁর ঘরে একটি আট বা দশ বছরের বালিকা ধীরে ধীরে নারীত্বের দিকে এগোচ্ছে। কন্যার শরীরে ফুটে ওঠা প্রতিটি রোমকূপ, প্রতিটি স্বাভাবিক পরিবর্তন সেই পিতার কাছে মনে হচ্ছে এক-একটি অভিশাপ। প্রতিদিন সকাল হয় এই আতঙ্কে—আজই কি সেই দিন, যেদিন আমার সমস্ত সঞ্চিত পুণ্য ভস্মীভূত হয়ে যাবে? ঠিক এই ভয়ঙ্কর মনস্তাত্ত্বিক খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য। তাঁর পালিতা কন্যা ঋতুমতী হওয়ার মুখে। শাস্ত্রের খাঁড়া নেমে আসার সময় আসন্ন।
স্ত্রী তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শাস্ত্রের সেই আপৎকালীন নির্লজ্জ বিধানটির কথা—যদি সময় পেরিয়ে যায়, তবে পাত্রের গুণাগুণ বিচার করার আর সময় নেই। তখন কন্যাকে যার-তার হাতে, সে হীন বা বিকলাঙ্গ হলেও, তার হাতে সঁপে দিয়ে পিতাকে নিজের পরকাল রক্ষা করতে হবে।শাস্ত্রের চোখে, একজন অযোগ্য পাত্রের হাতে কন্যাকে তুলে দেওয়াও সমর্থনযোগ্য, কিন্তু পিতৃগৃহে তার ঋতুমতী হওয়া ঘোরতর পাপ!
দীর্ঘ শাস্ত্রকথা শেষ হল। তপোবনের শান্ত বাতাসে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। নিজের পালিতা কন্যার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য। শাস্ত্রের কঠোর অনুশাসন এবং এক স্নেহশীল পিতার হৃদয়ের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত জয়ী হল পিতৃত্বই। দৃপ্ত কণ্ঠে, স্থির প্রতিজ্ঞায় মহর্ষি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “শাস্ত্র যাই বলুক, আপৎকালীন বিধিতে হীন পাত্রের বিধান থাকলেও—আমি আমার এই প্রাণাধিক কন্যার বিবাহ সর্বাংশে যোগ্য এবং তার অনুরূপ গুণের অধিকারী বরের সঙ্গেই দেবো। অন্য কারও সঙ্গে নয়।”
এইখানেই শুরু হল নাটকের চরম মুহূর্ত। এক নীরব মহাকাব্যিক যুদ্ধ। একদিকে হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত কঠোর ব্রাহ্মণ্য বিধান, সমাজের রক্তচক্ষু, নরকবাসের ভয়। অন্যদিকে এক জন্মদাতা না হলেও, এক পরম স্নেহশীল পিতার অবিনশ্বর ভালোবাসা।—চলবে।
স্ত্রী তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শাস্ত্রের সেই আপৎকালীন নির্লজ্জ বিধানটির কথা—যদি সময় পেরিয়ে যায়, তবে পাত্রের গুণাগুণ বিচার করার আর সময় নেই। তখন কন্যাকে যার-তার হাতে, সে হীন বা বিকলাঙ্গ হলেও, তার হাতে সঁপে দিয়ে পিতাকে নিজের পরকাল রক্ষা করতে হবে।শাস্ত্রের চোখে, একজন অযোগ্য পাত্রের হাতে কন্যাকে তুলে দেওয়াও সমর্থনযোগ্য, কিন্তু পিতৃগৃহে তার ঋতুমতী হওয়া ঘোরতর পাপ!
দীর্ঘ শাস্ত্রকথা শেষ হল। তপোবনের শান্ত বাতাসে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। নিজের পালিতা কন্যার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য। শাস্ত্রের কঠোর অনুশাসন এবং এক স্নেহশীল পিতার হৃদয়ের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত জয়ী হল পিতৃত্বই। দৃপ্ত কণ্ঠে, স্থির প্রতিজ্ঞায় মহর্ষি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “শাস্ত্র যাই বলুক, আপৎকালীন বিধিতে হীন পাত্রের বিধান থাকলেও—আমি আমার এই প্রাণাধিক কন্যার বিবাহ সর্বাংশে যোগ্য এবং তার অনুরূপ গুণের অধিকারী বরের সঙ্গেই দেবো। অন্য কারও সঙ্গে নয়।”
এইখানেই শুরু হল নাটকের চরম মুহূর্ত। এক নীরব মহাকাব্যিক যুদ্ধ। একদিকে হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত কঠোর ব্রাহ্মণ্য বিধান, সমাজের রক্তচক্ষু, নরকবাসের ভয়। অন্যদিকে এক জন্মদাতা না হলেও, এক পরম স্নেহশীল পিতার অবিনশ্বর ভালোবাসা।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra : politics & diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।


















