
কাঠবিড়ালির পেটপুজো। সংগৃহীত।
“কাঠবেড়ালি, কাঠবেড়ালি, পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ?
বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?”
কাজী নজরুল ইসলামের লেখা “খুকী ও কাঠবিড়ালি” ছড়া পড়েনি এমন বাঙালি পাওয়া মুশকিল। কাঠবিড়ালি চর্মচক্ষে দেখা হোক বা না হোক এই ছড়া দিয়েই বাঙালি শিশুর প্রথম পরিচয় কাঠবিড়ালির সঙ্গে। তারপর কাঠবিড়ালির সঙ্গে বাঙালির দ্বিতীয় পরিচয় রামায়ণের কাহিনিতে। রামচন্দ্রের সীতা-উদ্ধার কাহিনিতে প্রধান ভূমিকায় যারা ছিল তারা ভারতীয়দের মননে উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত হলেও পার্শ্বচরিত্রে কাঠবিড়ালিও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ছোট্ট, অতি সাধারণ এই প্রাণীটি কিন্তু সমুদ্রের ওপর দিয়ে সেতুবন্ধে বানরসেনাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ?
বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?”
কাজী নজরুল ইসলামের লেখা “খুকী ও কাঠবিড়ালি” ছড়া পড়েনি এমন বাঙালি পাওয়া মুশকিল। কাঠবিড়ালি চর্মচক্ষে দেখা হোক বা না হোক এই ছড়া দিয়েই বাঙালি শিশুর প্রথম পরিচয় কাঠবিড়ালির সঙ্গে। তারপর কাঠবিড়ালির সঙ্গে বাঙালির দ্বিতীয় পরিচয় রামায়ণের কাহিনিতে। রামচন্দ্রের সীতা-উদ্ধার কাহিনিতে প্রধান ভূমিকায় যারা ছিল তারা ভারতীয়দের মননে উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত হলেও পার্শ্বচরিত্রে কাঠবিড়ালিও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ছোট্ট, অতি সাধারণ এই প্রাণীটি কিন্তু সমুদ্রের ওপর দিয়ে সেতুবন্ধে বানরসেনাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কাহিনি অনুসারে, বানরসেনারা যখন বড় বড় পাথরের টুকরো বয়ে এনে রামসেতু নির্মাণ করছিল তখন সেখানে হাজির হয়েছিল এই কাঠবিড়ালি। সীতা-উদ্ধারে সেও সাহায্য করতে চায়। কিন্তু তার চেহারা তো খুব ছোট। পাথর বয়ে আনার ক্ষমতা তার নেই। তখন সে সমুদ্রতীরে বালির ওপর গড়াগড়ি দিয়ে সারা গায়ে ঘন লোমের মধ্যে বালি ঢুকিয়ে নিল আর তারপর নির্মীয়মান সেতুর ওপরে উঠে গা-ঝাড়া দিয়ে সমস্ত বালি ঝরিয়ে দিল পাথরের টুকরোগুলোর ফাঁকে ফাঁকে। ফলে পাথরের টুকরোগুলো পরস্পর শক্তভাবে জুড়ে গেল, নড়বড়ে রইল না। এইভাবে পুরো সেতু নির্মাণে কাঠবিড়ালি সাহায্য করল। হনুমান কাঠবিড়ালিকে বিদ্রুপ করলেও সেতুনির্মাণে সাহায্যের বিষয়টি রামচন্দ্রের নজর এড়ায়নি। অত্যন্ত প্রীত রামচন্দ্র কাঠবেড়ালির পিঠে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। আর তার পর থেকেই এই কাঠবেড়ালির পিঠে সমদূরত্বে তিনটে সাদা ডোরা দাগ তৈরি হয়েছে। ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, কাঠবিড়ালির পিঠে ওই তিনটি সাদা রেখা হল রামচন্দ্রের আঙুলের দাগ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৫: চামচিকা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০২ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৯: বিড়ালীকৌশিক-জাতক —অতি ইচ্ছার সঙ্কট
রামায়ণের কাহিনি ছেড়ে ফিরে আসি বাস্তবে। আমাদের খুব চেনা এই কাঠবিড়ালিদের বাসস্থান হল ভারত এবং শ্রীলঙ্কা। যেহেতু ভারত এবং শ্রীলঙ্কা এই দুই ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যেই রামায়ণ সীমাবদ্ধ সুতরাং এই দুই দেশের মধ্যেই এই প্রজাতির কাঠবেড়ালি সীমাবদ্ধতা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। ভারতের মধ্যে উপকূলীয় এলাকা অর্থাৎ কেরলম, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা এবং অবশ্যই সুন্দরবন অঞ্চল হল এই কাঠবিড়ালিদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। তবে ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে সুদূর অতীতে এই কাঠবিড়ালি পৌঁছে গিয়েছে মাদাগাস্কার, রিইউনিয়ান, মরিশাস, সিসিলি, মেওতি এবং কোমরো দ্বীপপুঞ্জে। ইংরেজিতে এই কাঠবিড়ালিদের বলা হয় ‘Three-striped Palm Squirrel’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Funumbulus pygerythrus’। সুন্দরবন অঞ্চলে জঙ্গল এবং বসতি এলাকা — দুই জায়গাতেই এদের উপস্থিতি রয়েছে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৩৯: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২০

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৩: রাজসূয় মহাযজ্ঞের প্রস্তুতিপর্বে পাণ্ডবদের দিগ্বিজয় যেন রাজনীতির আনুগত্য-আদায়ের পাঠ
তবে সুন্দরবনের সমস্ত এলাকায় এরা সমানভাবে লভ্য নয়। আমি অবশ্য খুব ছোট থেকেই এদের দেখে আসছি। আমাদের গ্রামের বাড়ির খামারে খড়ের চালে, বাঁশের কাঠামোতে যেমন ঘুরে বেড়াত তেমনই একটানা কিচ-কিচ-কিচ শব্দ করে বাগানের গাছগুলোতে ঘুরে বেড়াত। দূর থেকে শুনলে মনে হয় যেন কোনও পাখি ডাকছে। লেজ উঁচিয়ে পুটুস পুটুস চেয়ে নারকেল গাছে ওঠানামা করতে খুব দেখতাম। এখনও প্রত্যেকদিন স্কুল চলাকালীন আমার স্কুলের বারান্দায় ওরা ঘোরাফেরা করে। স্কুলের বেশ কয়েকটি ভেন্টিলেটরের মধ্যে ওদের দীর্ঘদিনের বাসা রয়েছে। স্কুলের সামনে ও পিছনে সমস্ত গাছে সারাদিন ওরা কিচ-কিচ-কিচ শব্দ করে ঘোরে। মাঝে মাঝে মোবাইলে ওদের বিভিন্ন মুহূর্ত বন্দি করি। আমাদের স্টাফ রুমের মধ্যেও একটি ভেন্টিলেটরে বাসা রয়েছে। কখনও কখনও স্টাফ রুমের মধ্যে দিয়েও ওরা ছোটাছুটি করে। মানুষের সঙ্গে কাঠবিড়ালির এই চমৎকার সহাবস্থান মানুষ মেনে নিয়েছে, তার কারণ সম্ভবত ওই রামায়ণ। কাঠবিড়ালিকে ভারতীয়রা ভালোবাসে, ভক্তি করে। অনেকেই নিয়মিত কাঠবিড়ালিকে খেতে দেয়। ভারতীয় ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা কাঠবিড়ালিকে কখনও আঘাত করে না বা ওদের ক্ষতি করে না। অনেকে মনে করে বাড়ির সামনে বা বাস্তুতে কাঠবিড়ালি থাকা গৃহস্থের পক্ষে মঙ্গলজনক।

খেলায় মত্ত দুই কাঠবিড়ালি। সংগৃহীত।
কাঠবিড়ালি ছোট্টখাট্টো ছটফটে প্রাণী। লেজসহ লম্বা হয় ২৩-৩৫ সেন্টিমিটার, আর পূর্ণবয়স্ক একটা কাঠবিড়ালির ওজন হয় ১০০ – ১২০ গ্রাম। পিঠের উপর দিয়ে তিনটে লম্বা সাদা জোড়া দাগ ঘাড় থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনটে ডোরা দাগের অন্তর্বর্তী অংশের লোম গাঢ় বাদামি বা কালচে বাদামি। গায়ে এই ধরণের রং ও ডোরা দাগ গাছগাছালির মধ্যে নিজেকে খাদকের নজর থেকে লুকোতে সাহায্য করে। এদের পেটের দিকের লোমের রং হালকা ধূসর। মুখের নিচের দিক, গলা এবং দু’পায়ের ভেতরের দিকের রঙও ফ্যাকাশে সাদা বা হালকা ধূসর। এদের সামনের তুটি পা পিছনের পায়ের তুলনায় বেশ ছোট। প্রতি পায়ের আঙুলে বাঁকা নখর গাছের গায়ে দ্রুত খাড়া বেয়ে উঠতে সাহায্য করে। তাছাড়া পাগুলো খুব নমনীয় হওয়ায় অনেকটা উঁচু থেকে চমৎকার লাফ দিতে পারে। তবে এদের চেহারার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল লেজ। রীতিমতো রোমশ ও লম্বা লেজটি প্রায় দেহের সমান কিংবা সামান্য ছোট। লেজটি এদের দেহের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে, বিশেষ করে সরু শাখার উপর দিয়ে হাঁটা বা দৌড়ানোর সময়। এদের লেজটাতে সাদা ও কালো বা গাঢ় বাদামি লোম এত সুন্দরভাবে বিন্যস্ত যে চোখ ফেরানো মুশকিল। তবে লেজের নিচে মাঝ বরাবর একটা মরচে লাল রঙের লম্বা রেখা থাকে। এদের চোখ দুটো এত সুন্দর যে দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। কালো রঙের ছোট গোল গোল স্পষ্ট দুটো চোখ। চোখের ওপরে ও নিচে রয়েছে ফ্যাকাশে সাদা রঙের রেখা যা ওদের চোখের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক গুণ। মাথার দুপাশে তিন কোণা ছোট্ট দুটো কান অনেকটা ইঁদুরের মতো। আর ঊর্ধ্ব-চোয়ালে দুটো কৃন্তক দাঁত হুবহু ইঁদুরদের মতো।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৩: স্মৃতিশাস্ত্রের রক্তচক্ষু বনাম এক স্নেহশীল পিতা: মূষিক-কন্যার বিবাহ-উপাখ্যান

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
খাওয়ার ব্যাপারে এই কাঠবিড়ালিরা কিন্তু সর্বভুক। তবে বেশি পছন্দ করে ফল আর ফলের দানা। সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকায় যেসব কাঠবিড়ালি থাকে তারা মূলত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ফল ও বীজ খায়। তবে সুন্দরবনের যেসব এলাকা জোয়ারে জলমগ্ন হয়ে যায় কিংবা ভেজা স্যাঁতসেঁতে সেখানে এদের দেখা মেলে না। এরা একটু শুকনো এলাকা পছন্দ করে। আর সুন্দরবনের বসতি এলাকায় এদের প্রায়শই ধান, চাল, ডাল খেতে দেখা যায়। আমি নিজে দেখেছি আমাদের খামারে যখন ধান, চাল বা খেসারি ও বিউলি ডাল রোদে দেওয়া হত তখন এরা লেজ উঁচিয়ে সেসব খেত। তবে কাঠবিড়ালি ফল, বীজ ছাড়াও গাছের বাকল, ফুলের মকরন্দ, কচি পাতা, কাণ্ডের নরম আগা, ফুলের কুঁড়ি, ছোট পোকামাকড়, কীটপতঙ্গের লার্ভা, ছোটখাটো সরীসৃপ, পাখির ছোট ডিম ইত্যাদি উদরস্থ করতে পারে। পিছনের দু’পা আর লেজের ওপর ভর দিয়ে খাড়া হয়ে বসে সামনের দু’পা দিয়ে খাবার ধরে খাওয়ার দৃশ্য কিন্তু যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমিকের কাছে মনোমুগ্ধকর। এরা দিনের বেলাতেই খাওয়ার সংগ্রহে বেরোয়। সন্ধ্যে হলেই আস্তানায়। যেহেতু এদের প্রিয় খাবার হল বিভিন্ন উদ্ভিদের ফল ও বীজ তাই মলের সাথে অসংখ্য ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বীজ এরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। এইভাবে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বিস্তারে সুন্দরবনের কাঠবিড়ালিরা চমৎকার ভূমিকা পালন করে আসছে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭২ : শুধু হাসি-খেলা?
কাঠবিড়ালিদের প্রজনন সারা বছর ধরে হলেও মূলত ডিসেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে অর্থাৎ যে সময় আবহাওয়া শুকনো থাকে সেই সময় বেশি হয়। প্রজননের সময় একাধিক পুরুষ কাঠবিড়ালিকে একটি স্ত্রী কাঠবিড়ালির মন হরণ করার জন্য ছোটাছুটি করে সচেষ্ট হতে দেখা যায়। চিক চিক শব্দ করতে করতে ওরা স্ত্রী কাঠবিড়ালির পিছনে তাড়া করে। একটি পুরুষ কাঠবিড়ালি যেমন একাধিক স্ত্রী কাঠবিড়ালির সাথে মিলিত হতে পারে তেমনই উল্টোটাও হতে পারে। স্ত্রী কাঠবিড়ালির গর্ভাবস্থা ৩৪-৪৫ দিন স্থায়ী হয়। গড়ে একসঙ্গে দু’তিনটি বাচ্চার জন্ম হয়। সদ্য জন্মানো বাচ্চার গায়ে কোনও লোম থাকে না আর চোখ ফোটে না। বাচ্চাদের লালনপালনের জন্য মা কাঠবিড়ালি বাচ্চা প্রসবের আগে গাছের কোটরে কিংবা বাড়ির ভেন্টিলেটরে বা কোনও ফাটলে শুকনো শাখা, শুকনো পাতা, সুতো, তুলো, পাট, নারকেলের ছোবড়া ইত্যাদি দিয়ে গোলাকার একটা বাসা বানায়। এই বাসার মধ্যেই সে বাচ্চাদের প্রসব করে ও লালনপালন করে। বাচ্চারা প্রায় দু’মাস মায়ের স্নেহচ্ছায়ায় প্রতিপালিত হয়। এই সময় পুরুষ কাঠবিড়ালিকে আশেপাশে বাচ্চা পাহারার কাজ করতে দেখা যায়। কোনও বিপদ বুঝলে মুখে সতর্কতাসূচক শব্দ করে। দু’মাসের মধ্যেই বাচ্চারা বাসা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং নিজেই খাবার সংগ্রহ করে খেতে শেখে। এইরকম ছোট বাচ্চাকে প্রায়শই আমাদের স্কুলের স্টাফ রুমের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে দেখি। ৬-১১ মাস বয়সের মধ্যে বাচ্চারা প্রজননে সক্ষম হয়ে ওঠে।

খাবারের খোঁজে কাঠবিড়ালি। সংগৃহীত।
আগেই বলেছি যে সুন্দরবন অঞ্চলে, বিশেষ করে জনবসতি এলাকায় কাঠবিড়ালির সংখ্যা গত দুই দশকে অনেকটাই কমেছে। অন্তত চর্মচক্ষে তা টের পাচ্ছি। কোনও কোনও জায়গা থেকে তো সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। কীটনাশকসমৃদ্ধ ফল, বীজ ও শস্য খেয়ে মনে হয় ওদের প্রজনন ক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে। বট, অশ্বত্থ ইত্যাদি বড় বড় গাছের অভাব এবং পাকা বাড়িতে দু’দিক বন্ধ ভেন্টিলেটরের কারণে ওরা বাসা তৈরি করার জায়গা হারিয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে “কাগমারা” নামে এক যাযাবর সম্প্রদায়ের মানুষ প্রায় প্রতি বছর শীতের আগে হাজির হয় ও বর্ষার আগে পর্যন্ত থাকে। কম হলেও এখনও ওরা আসে। ওদের পুরুষরা সকাল হলে মাথায় ফলা লাগানো লম্বা একটা বাঁশ নিয়ে গাছগাছালির মধ্যে ঘুরে ঘুরে নানা পখির সাথে কাঠবিড়ালিও শিকার করে। ওদের মুখে অবিকল কাঠবিড়ালিদের মতো ডাক শুনে বিভ্রান্ত হয়ে কাঠবিড়ালি আড়াল থেকে সামনে ছুটে আসে। আর তখন ওরা সহজেই শিকার করে। কাঠবিড়ালির মাংস নাকি ওদের খুব প্রিয়। ছোটোবেলায় দেখেছি ওরা যখন পাখি ও কাঠবিড়ালি শিকার করতে আমাদের বাগানে ঘোরাঘুরি করত তখন বাবার নজরে পড়লে বকুনি দিয়ে ভাগিয়ে দিত। কাঠবিড়ালি কমে যাওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে। ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনে (১৯৭২) কাঠবিড়ালি শিডিউল-চার-এ রয়েছে, অর্থাৎ এরা বিপন্ন নয়। কিন্তু সুন্দরবনের বসতি এলাকায় এরা ভালো নেই–এ আমার অভিজ্ঞতালব্ধ দৃঢ় বিশ্বাস। প্রকৃতির এই সুন্দর আদুরে প্রাণীটিকে রক্ষা করতেই হবে, নইলে একদিন আসবে যেদিন কেবল সাহিত্যের পাতাতেই থেকে যাবে কাঠবিড়ালির অস্তিত্ব।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















