
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠান সম্পন্ন করে একচ্ছত্র সাম্রাজ্যের আধিপত্যলাভ প্রয়োজন। যুধিষ্ঠিরের সহযোদ্ধা তাঁর অন্য চার ভাই — ভীমসেন, অর্জুন, নকুল ও সহদেব। চারদিকে চারজন দিগ্বিজয়ের লক্ষ্যে বেড়িয়ে পড়লেন। কনিষ্ঠ নকুলের দায়িত্ব পশ্চিমদিকের রাজাদের আনুগত্য-আদায়। বুদ্ধিমান নকুল তাঁর বিশাল সৈন্যদল নিয়ে পশ্চিমদিকে যাত্রা করলেন। সিংহনাদে গর্জন করতে লাগল তাঁর যোদ্ধারা। রথচক্রের শব্দে কাঁপতে লাগল পৃথিবী। নকুল রোহীতকপর্বতে উপস্থিত হলেন। বড়ই রমণীয় সেই পর্বত, রয়েছে বহু গাভী, ঘোড়া, ধন ও ধান। কার্ত্তিকেয়র প্রিয় এই পর্বতে মত্তময়ূর নামের যোদ্ধাদের সঙ্গে নকুলের মহাযুদ্ধ হল। অত্যন্ত প্রোজ্জ্বল নকুল, মরুভূমি, প্রচুর ধানে সমৃদ্ধ, শৈরীষকদেশ ও মহোত্থদেশ এবং সেখানের রাজা আক্রোধের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হল। এর পরে দশার্ণদেশ জয় করে প্রস্থান করলেন পাণ্ডুপুত্র নকুল। নকুল শিবি, ত্রিগর্ত্ত, অম্বষ্ঠ, মালবান্, পঞ্চ কর্ব্বট, মাধ্যমিক এবং বাটধানদেশের ক্ষত্রিয়দের জয় করে, আবার ফিরে এসে পুষ্করারণ্যবাসী বীর উৎসবসঙ্কেতদের জয় করলেন।
সমুদ্রতীরবাসী গ্রামের অধিপতিদের মহাবীর বংশধরদের, সরস্বতীনদীকে আশ্রয়কারী শূদ্র ও গোপদের, মৎস্যজীবীদের এবং পর্বতের অধিবাসীদেরও জয় করলেন। মহাশৌর্যবান নকুল যথাক্রমে সমগ্র পঞ্চনদদেশ, অমরকণ্টকদেশ, উত্তরজ্যোতিষদেশ, দিব্যকটপুর ও দ্বারপালদেশ বলপ্রয়োগ করে বশে আনলেন। পাণ্ডুপুত্র নকুল রামঠ, হার, হূণ এবং পশ্চিমদিকের রাজাদের (দূতের মাধ্যমে) আদেশ দিয়ে বশীভূত করলেন। সেখানে অবস্থান করে নকুল বাসুদেব কৃষ্ণের কাছে দূত পাঠালেন। কৃষ্ণও যাদবদের সঙ্গে নকুলের শাসন (করদানের আদেশ) মেনে নিলেন। তারপরে সে মদ্রদেশের শাকলনগরে উপস্থিত হয়ে প্রিয়কথায় মাতুল শল্যকে বশীভূত করলেন। সম্মানযোগ্য নকুল, রাজা শল্যের সৌজন্যমূলক সাম্মানিক রত্নসমূহ (কররূপে) গ্রহণ করে প্রস্থান করলেন। পশ্চিমসাগরের তীরবর্তী অতি ভয়ঙ্কর ম্লেচ্ছ,পহ্লব এবং বর্ব্বর,তাদের সবাইকে বশীভূত করলেন।
সমুদ্রতীরবাসী গ্রামের অধিপতিদের মহাবীর বংশধরদের, সরস্বতীনদীকে আশ্রয়কারী শূদ্র ও গোপদের, মৎস্যজীবীদের এবং পর্বতের অধিবাসীদেরও জয় করলেন। মহাশৌর্যবান নকুল যথাক্রমে সমগ্র পঞ্চনদদেশ, অমরকণ্টকদেশ, উত্তরজ্যোতিষদেশ, দিব্যকটপুর ও দ্বারপালদেশ বলপ্রয়োগ করে বশে আনলেন। পাণ্ডুপুত্র নকুল রামঠ, হার, হূণ এবং পশ্চিমদিকের রাজাদের (দূতের মাধ্যমে) আদেশ দিয়ে বশীভূত করলেন। সেখানে অবস্থান করে নকুল বাসুদেব কৃষ্ণের কাছে দূত পাঠালেন। কৃষ্ণও যাদবদের সঙ্গে নকুলের শাসন (করদানের আদেশ) মেনে নিলেন। তারপরে সে মদ্রদেশের শাকলনগরে উপস্থিত হয়ে প্রিয়কথায় মাতুল শল্যকে বশীভূত করলেন। সম্মানযোগ্য নকুল, রাজা শল্যের সৌজন্যমূলক সাম্মানিক রত্নসমূহ (কররূপে) গ্রহণ করে প্রস্থান করলেন। পশ্চিমসাগরের তীরবর্তী অতি ভয়ঙ্কর ম্লেচ্ছ,পহ্লব এবং বর্ব্বর,তাদের সবাইকে বশীভূত করলেন।
যুদ্ধের আশ্চর্য কৌশল বিষয়ে অভিজ্ঞ, মানবশ্রেষ্ঠ, নকুল, রাজাদের আনুগত্য লাভ করে, রত্নসমূহ আদায় করে ফিরে গেলেন। দশ হাজার উট নকুলের সংগৃহীত বিপুল অর্থের ভাণ্ডার অতি কষ্টে বহন করে নিয়ে চলল। ইন্দ্রপ্রস্থে উপস্থিত হয়ে কান্তিমান মাদ্রীপুত্র নকুল সমস্ত ধন যুধিষ্ঠিরকে নিবেদন করলেন। এইভাবে নকুল বরুণদেবের পালিত,কৃষ্ণের বিজিত, পশ্চিমদিক জয় করলেন।
প্রজাবৎসল রাজা যুধিষ্ঠির, নিজের রাজ্যের ও অর্থের পরিমাণ বিবেচনা করে যজ্ঞানুষ্ঠান বিষয়ে মনস্থ করলেন। তাঁর যত শুভাকাঙ্খী ছিলেন তাঁরা সকলে মিলে এবং এককভাবে বললেন, রাজা, এটাই যজ্ঞের সময়। এখন যা করা যুক্তিসঙ্গত সেটাই করুন। তাঁরা যখন এই সব কথা বলছেন, সেই সময়ে কৃষ্ণ এসে উপস্থিত হলেন। কৃষ্ণ পৃথিবীর স্থিতিশীল প্রাণীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি উৎপত্তি স্থিতি ও বিলয়স্থান, তিনি অতীত,ভবিষ্যত ও বর্তমানের নির্মাতা, কেশী নামে দানবকে হত্যা করেছিলেন তিনি। সেই কারণে এবং কৃষ্ণের প্রচুর কেশ অর্থাৎ চুল, তাই তাঁর নাম কেশব। যাদবদের প্রাচীর হয়ে বিপদে শত্রুহন্তারূপে অভয়দাতা হয়েছেন।
পুরুষোত্তম, কৃষ্ণ, নিজের পিতাকে সেনাপতিত্বে যুক্ত করে, সৈন্যদলপরিবেষ্টিত হয়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জন্যে নানাবিধ ধনসমূহ নিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি অপর্যাপ্ত ধনরাশি ও অক্ষয় রত্নসম্ভার নিয়ে রথশব্দে চারিদিক সচকিত করলেন। লোকজনে পরিপূর্ণ পাণ্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থনগরকে আরও পূর্ণ করে নগরে প্রবেশ করলেন কৃষ্ণ। তাঁর এই প্রবেশ, শত্রুদের মহাশোকের কারণ হল। সূর্যহীন জায়গায় সূর্যের উপস্থিতির মতো, বায়ুহীন জায়গায় বায়ুর মতো, কৃষ্ণ, ইন্দ্রপ্রস্থে প্রবেশ করা মাত্র নগরটি আনন্দমুখর হল। পুরুষশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির, রাজপুরোহিত ধৌম্য, দ্বৈপায়ন প্রভৃতি প্রধান ঋত্বিক, ভীম, অর্জুন, দুই যমজ নকুল ও সহদেবসহ সানন্দে কৃষ্ণের কাছে উপস্থিত হয়ে, তাঁকে যথাবিধি স্বাগতসম্ভাষণ জানিয়ে, কুশলসংবাদ প্রশ্ন করে জেনে নিলেন। তারপরে আরামকেদারায় সমাসীন কৃষ্ণকে বললেন, ত্বৎকৃতে পৃথিবী সর্ব্বা মদ্বশে কৃষ্ণ! বর্ত্ততে। ধনঞ্চ বহু বার্ষ্ণেয়! ত্বৎপ্রসাদাদুপার্জিতম্।। সোঽহমিচ্ছামি তৎ সর্ব্বং বিধিবদ্দেবকীসুত!। উপযোক্তুং দ্বিজাগ্রেষু। হব্যবাহে চ মাধব!।।
প্রজাবৎসল রাজা যুধিষ্ঠির, নিজের রাজ্যের ও অর্থের পরিমাণ বিবেচনা করে যজ্ঞানুষ্ঠান বিষয়ে মনস্থ করলেন। তাঁর যত শুভাকাঙ্খী ছিলেন তাঁরা সকলে মিলে এবং এককভাবে বললেন, রাজা, এটাই যজ্ঞের সময়। এখন যা করা যুক্তিসঙ্গত সেটাই করুন। তাঁরা যখন এই সব কথা বলছেন, সেই সময়ে কৃষ্ণ এসে উপস্থিত হলেন। কৃষ্ণ পৃথিবীর স্থিতিশীল প্রাণীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি উৎপত্তি স্থিতি ও বিলয়স্থান, তিনি অতীত,ভবিষ্যত ও বর্তমানের নির্মাতা, কেশী নামে দানবকে হত্যা করেছিলেন তিনি। সেই কারণে এবং কৃষ্ণের প্রচুর কেশ অর্থাৎ চুল, তাই তাঁর নাম কেশব। যাদবদের প্রাচীর হয়ে বিপদে শত্রুহন্তারূপে অভয়দাতা হয়েছেন।
পুরুষোত্তম, কৃষ্ণ, নিজের পিতাকে সেনাপতিত্বে যুক্ত করে, সৈন্যদলপরিবেষ্টিত হয়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জন্যে নানাবিধ ধনসমূহ নিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি অপর্যাপ্ত ধনরাশি ও অক্ষয় রত্নসম্ভার নিয়ে রথশব্দে চারিদিক সচকিত করলেন। লোকজনে পরিপূর্ণ পাণ্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থনগরকে আরও পূর্ণ করে নগরে প্রবেশ করলেন কৃষ্ণ। তাঁর এই প্রবেশ, শত্রুদের মহাশোকের কারণ হল। সূর্যহীন জায়গায় সূর্যের উপস্থিতির মতো, বায়ুহীন জায়গায় বায়ুর মতো, কৃষ্ণ, ইন্দ্রপ্রস্থে প্রবেশ করা মাত্র নগরটি আনন্দমুখর হল। পুরুষশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির, রাজপুরোহিত ধৌম্য, দ্বৈপায়ন প্রভৃতি প্রধান ঋত্বিক, ভীম, অর্জুন, দুই যমজ নকুল ও সহদেবসহ সানন্দে কৃষ্ণের কাছে উপস্থিত হয়ে, তাঁকে যথাবিধি স্বাগতসম্ভাষণ জানিয়ে, কুশলসংবাদ প্রশ্ন করে জেনে নিলেন। তারপরে আরামকেদারায় সমাসীন কৃষ্ণকে বললেন, ত্বৎকৃতে পৃথিবী সর্ব্বা মদ্বশে কৃষ্ণ! বর্ত্ততে। ধনঞ্চ বহু বার্ষ্ণেয়! ত্বৎপ্রসাদাদুপার্জিতম্।। সোঽহমিচ্ছামি তৎ সর্ব্বং বিধিবদ্দেবকীসুত!। উপযোক্তুং দ্বিজাগ্রেষু। হব্যবাহে চ মাধব!।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৪: ভাবি প্রশাসক রামের প্রশিক্ষণের সূচনা—রাক্ষস খরের সঙ্গে সংঘাত

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৪০: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২১
হে কৃষ্ণ, তোমার জন্যই (তোমার উপদেশানুসারে জরাসন্ধ প্রভৃতি শত্রু বধ করে) সমগ্র পৃথিবী আমার বশে এসেছে। তোমার অনুগ্রহে আমি যথেষ্ট ধনসম্পদ লাভ করেছি। হে দেবকীনন্দন কৃষ্ণ, সেই সব ধন আমি যথাবিধি ব্রাহ্মণে ও যজ্ঞাগ্নিতে উৎসর্গ করতে ইচ্ছা করি। সেই কারণে যুধিষ্ঠির, ভাইদের সঙ্গে নিয়ে, কৃষ্ণের সাহচর্যে, যজ্ঞানুষ্ঠানের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তিনি মিনতি করলেন, হে গোবিন্দ, তুমি নিজেকে দীক্ষিত করো।কারণ,হে দাশার্হ তুমি যজ্ঞে সফল হলে,আমার সব পাপমুক্ত হতে পারব। তদ্দীক্ষাপয় গোবিন্দ! ত্বমাত্মানং মহাভুজ!। ত্বয়ীষ্টবতি দাশার্হ! বিপাপ্মা ভবিতাস্ম্যহম্।। যুধিষ্ঠির বিকল্প প্রস্তাব রাখলেন — নতুবা কৃষ্ণ, ভাইদের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে যুধিষ্ঠিরকেও যজ্ঞানুষ্ঠানের অনুমতিদান করুন। অনুজ্ঞাতস্ত্বয়া কৃষ্ণ! প্রাপ্নুয়াং ক্রতুমুত্তমম্।। কৃষ্ণের অনুমতি লাভ করলে তবেই তিনি যজ্ঞানুষ্ঠানে সক্ষম হবেন।
কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের বিস্তারিতগুণ বর্ণনা করে বললেন, রাজেন্দ্র যুধিষ্ঠির সম্রাটপদপ্রাপ্তির যোগ্য এবং মহাযজ্ঞের (রাজসূয়যজ্ঞ) উপযুক্ত কর্তা। আপনার উপস্থিত এই কর্তব্য সম্পন্ন করলে আমরা কৃতকার্য হব। কৃষ্ণ আশ্বস্ত করলেন, যুধিষ্ঠির কাঙ্খিত যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করুন,কৃষ্ণ নিজে যজ্ঞের মঙ্গলসাধনবিষয়ে লক্ষ্য রাখবেন। কৃষ্ণের অনুরোধ, এই কর্তব্যে আমায় শুধু নিযুক্ত করুন, আমি আপনার আজ্ঞানুসারে সব কাজ করব। নিযুঙ্ক্ষ্বত্বঞ্চ মাং কৃত্যে সর্ব্বং কর্ত্তাস্মি তে বচঃ। পরম সন্তুষ্ট যুধিষ্ঠিরের সঙ্কল্প সফল হতে চলেছে। পরিতৃপ্ত যুধিষ্ঠির বললেন, হে হৃষীকেশ, তুমি যে আমার ইচ্ছাতে উপস্থিত হয়েছ। *যস্য মে ত্বং হৃষীকেশ! যথেপ্সিতমুপস্থিতঃ। কৃষ্ণের অনুমতি লাভ করে, যুধিষ্ঠির, ভাইদের সঙ্গে রাজসূয় যজ্ঞের উপকরণ সামগ্রী সংগ্রহে উদ্যোগী হলেন।
কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের বিস্তারিতগুণ বর্ণনা করে বললেন, রাজেন্দ্র যুধিষ্ঠির সম্রাটপদপ্রাপ্তির যোগ্য এবং মহাযজ্ঞের (রাজসূয়যজ্ঞ) উপযুক্ত কর্তা। আপনার উপস্থিত এই কর্তব্য সম্পন্ন করলে আমরা কৃতকার্য হব। কৃষ্ণ আশ্বস্ত করলেন, যুধিষ্ঠির কাঙ্খিত যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করুন,কৃষ্ণ নিজে যজ্ঞের মঙ্গলসাধনবিষয়ে লক্ষ্য রাখবেন। কৃষ্ণের অনুরোধ, এই কর্তব্যে আমায় শুধু নিযুক্ত করুন, আমি আপনার আজ্ঞানুসারে সব কাজ করব। নিযুঙ্ক্ষ্বত্বঞ্চ মাং কৃত্যে সর্ব্বং কর্ত্তাস্মি তে বচঃ। পরম সন্তুষ্ট যুধিষ্ঠিরের সঙ্কল্প সফল হতে চলেছে। পরিতৃপ্ত যুধিষ্ঠির বললেন, হে হৃষীকেশ, তুমি যে আমার ইচ্ছাতে উপস্থিত হয়েছ। *যস্য মে ত্বং হৃষীকেশ! যথেপ্সিতমুপস্থিতঃ। কৃষ্ণের অনুমতি লাভ করে, যুধিষ্ঠির, ভাইদের সঙ্গে রাজসূয় যজ্ঞের উপকরণ সামগ্রী সংগ্রহে উদ্যোগী হলেন।

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৪ : শেষ অঙ্ক
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬০ : কাকজাতক — ভেবে দেখ মন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৬: কাঠবিড়ালি
প্রথমেই শত্রুদমনকারী যুধিষ্ঠির শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা সহদেবকে এবং মন্ত্রীদের আদেশ করলেন, ব্রাহ্মণরা এই যজ্ঞের অঙ্গ (যজ্ঞসম্পাদনের জন্যে যজ্ঞের কাঠ, কুশঘাস প্রভৃতি) সব মাঙ্গলিক উপকরণাদি সংগ্রহ করতে বলেছেন সেই গুলি (পূর্ণঘটাদি), পুরোহিত ধৌম্য যে সব যজ্ঞসম্ভারের (যব, তণ্ডুল প্রভৃতি দ্রব্য) কথা বলেছেন সেই যথাযোগ্য উপকরণগুলি ক্রমানুসারে দ্রুত সংগ্রহ করা হোক। যুধিষ্ঠির ইন্দ্রসেন, বিশোক, পূরু ও অর্জুনসারথি নামে ব্যক্তিদের তাঁর প্রিয়কাজ সম্পাদনের জন্যে অন্ন প্রভৃতি সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করলেন। আদেশ করলেন, ব্রাহ্মণদের আনন্দদায়ক ও মনোহর সরস ও সুগন্ধযুক্ত অভীষ্টপদার্থ সব কিছু যোগার করা হোক। যথাসময়ে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা সহদেব, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে জানালেন,আপনার আদেশানুসারে যথাসময়ে সব কাজ সম্পন্ন হয়েছে তদ্বাক্যসমকালন্তু কৃতং সর্ব্বম্। দ্বৈপায়ন বেদব্যাস যিনি সাক্ষাৎ মূর্তিমান বেদের প্রত্যক্ষ রূপ,তিনি মহান পুরোহিতদের নিয়ে এলেন। সত্যবতীপুত্র বেদব্যাস, এই যজ্ঞের ব্রহ্মার কাজ করলেন।ধনঞ্জয়গোত্রের শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ সুসামা হলেন (সামবেদের) উদ্গাতা। ব্রহ্মশ্রেষ্ঠ যাজ্ঞবল্ক্য হলেন অধ্বর্যু (যজুর্বেদের মন্ত্র। পুরোহিত ধৌম্যের সঙ্গে বসু নামে মুনির পুত্র হলেন হোতা (ঋগ্বেদের কর্মকর্ত)।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০২ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
তাঁদের বেদবেদাঙ্গে পারদর্শী শিষ্যবর্গ ও পুত্ররা যজ্ঞস্থানে উপস্থিত সদস্য হলেন। তাঁরা পবিত্রদিনের বচন এবং তর্কবিতর্কসহ যজ্ঞসম্বন্ধীয় বেদবাক্যের অর্থ নিরূপন করে শাস্ত্রোক্ত বিশাল যজ্ঞস্থানটির পূজা করলেন। অনুমতি অনুযায়ী শিল্পীরা দেবগৃহের মতো বিশাল সুগন্ধযুক্ত গৃহ নির্মাণ করলেন। তারপরে তৎক্ষণাৎ রাজেন্দ্র,পুরুষশ্রেষ্ঠ,যুধিষ্ঠির মন্ত্রী সহদেবকে আদেশ করলেন, নিমন্ত্রণের জন্য দ্রুতগামী দূতদের এখনই প্রেরণ করা হোক। সহদেব রাজার আদেশ পালন করলেন। যুধিষ্ঠিরের আদেশ ছিল — রাজ্যের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, সকলকে আমন্ত্রণ কর এবং তাঁদের উপস্থিত করো। আমন্ত্রয়ধ্বং রাষ্ট্রেষু ব্রাহ্মণান্ ভূমিপানপি। বিশশ্চ মান্যান্ শূদ্রাংশ্চ সর্ব্বানানয়তেতি চ।। যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে সহদেবের নির্দেশে দূতরা আমন্ত্রণ জানিয়ে অন্যদের দ্রুত নিয়ে এলেন। যথাসময়ে ব্রাহ্মণরা কুন্তীপুত্র যুধিষ্ঠিরকে রাজসূয় যজ্ঞে দীক্ষিত করলেন। দীক্ষিত ধর্মাত্মা রাজশ্রেষ্ঠ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির হাজার হাজার ব্রাহ্মণ, ভাই, জ্ঞাতি, সুহৃদ্বর্গ, ক্ষত্রিয়গণ, নানা দেশ হতে সমাগত শ্রেষ্ঠ মানুষেরা এবং অমাত্যগণ পরিবৃত যেন সাক্ষাৎ ধর্মের প্রতিমূর্তির মতো যজ্ঞের স্থানে যাত্রা করলেন। সববিদ্যায় কুশল,বেদ ও বেদাঙ্গে পার পারঙ্গম ব্রাহ্মণরা সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে হাজার হাজার শিল্পী বহু অন্ন ও বস্ত্র আছে এমন, ব্রাহ্মণদের গণানুসারে পৃথক পৃথক, সব ঋতুতে যথাযোগ্য (বাসযোগ্য) গুণসম্পন্ন, আবাস নির্মাণ করলেন। সেই ব্রাহ্মণগণ রাজার সমাদরে বহু গল্পকথায় ও নটনর্তকদের নৃত্য প্রভৃতি দেখতে দেখতে আবাসগুলিতে বাস করতে লাগলেন। আনন্দিত মহান ব্রাহ্মণদের আহারের সময়ে এবং আলাপচারিতায় সেখানে সর্বদা মহা কোলাহল শোনা যেত। এখানে সর্বদাই এনাদের দেওয়া হোক, ভোজন করাও এমন কথা শোনা যেত —দীয়তাং দীয়তামেষাং ভুজ্যতাং ভুজ্যতামিতি।ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পৃথকভাবে একশ হাজার গরু, শয্যা, সোনা ও পরিচারিকা দান করলেন। সুরলোকে ইন্দ্রের যজ্ঞের মতো পৃথিবীর অদ্বিতীয় বীর মহান পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞানুষ্ঠান বজায় রইল। তার পরে যুধিষ্ঠির ভীষ্ম, দ্রোণ, ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর, কৃপ ও জ্ঞাতিভাইদের (দুর্যোধনদের একশ ভাইদের) জন্যে এবং যাঁরা যুধিষ্ঠিরের প্রতি অনুরক্ত তাঁদের জন্য নকুলকে হস্তিনাপুরে পাঠিয়ে দিলেন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭২ : শুধু হাসি-খেলা?
রাজসূয়যজ্ঞ — রাজার একচ্ছত্র অধিকারপ্রতিষ্ঠার প্রথম অবিসংবাদিত হাতিয়ার। হাতিয়ার শব্দটির মধ্যে একটি যান্ত্রিকতার ছোঁয়া আছে। একটি যন্ত্র যেমন একটি বস্তুর অবয়বগঠনের সহায়ক এবং যন্ত্রটি ধারণ করে রাখে পাঁচটি আঙ্গুলের একটি মুঠি। তেমনই যুধিষ্ঠিরের যুধিষ্ঠিরের সম্রাটপদপ্রাপ্তির জন্যে কৃষ্ণের পরিকল্পিত রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান নামক হাতিয়ারটির পূর্ণ রূপদানে সহায়ক হয়েছেন স্বয়ং কৃষ্ণ এবং যুধিষ্ঠিরের চার ভাই। কৃষ্ণ জরাসন্ধবধের নিয়ামক হয়ে যুধিষ্ঠিরের আত্মবিশ্বাসের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। যুধিষ্ঠিরের বিশ্বস্ত দুই অনুজ এবং নির্ভরতার আশ্রয় কৃষ্ণ, মহাদেবের আশীর্বাদধন্য জরাসন্ধের বিনাশ করে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, যুধিষ্ঠিরের আত্মশক্তি ক্রমশ বিকশিত হয়েছে। তাঁর মুঠি আরও শক্ত হয়েছে যখন ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব, চার ভাই একযোগে চতুর্দিক জয় করে অপরাপর বশীভূত রাজাদের আনুগত্য নিশ্চিত করেছেন। রাজসূয়যজ্ঞের পরিকল্পনা রূপায়িত হতে চলেছে এবারে।
রাজসূয়যজ্ঞের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করে, একদা মহর্ষি নারদ যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছিলেন, বলশালী রাজা হরিশ্চন্দ্র সম্রাট হয়েছিলেন, স রাজা বলবানাসীৎ সম্রাট্ সর্ব্বমহীক্ষিতাম্। তস্য সর্ব্বে মহীপালাঃ শাসনাবনতাঃ স্থিতাঃ।। তাঁর এই সম্রাটপদপ্রাপ্তিহেতু অন্য সব রাজারা তাঁর শাসনাধীন হয়ে আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন। রাজা হরিশ্চন্দ্র সম্রাটত্বের আরও একটি শর্ত পূরণ করেছিলেন কারণ তিনি রাজসূয় নামে মহাযজ্ঞানুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। মহর্ষি নারদ, যুধিষ্ঠিরের স্বর্গত পিতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, সমর্থোঽসি মহীং জেতুং ভ্রাতরস্তে বশে স্থিতাঃ।রাজসূয়ং ক্রতুশ্রেষ্ঠমাহরস্বেতি ভারত।। তুমি পৃথিবী জয় করতে সক্ষম, কারণ ভাইরা তোমার বশীভূত। তুমি রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান কর। পাণ্ডু আরও জানিয়েছিলেন রাজা হরিশ্চন্দ্রের মতো যুধিষ্ঠিরের সম্রাটত্বের গৌরবে গৌরবান্বিত হবেন। এই গৌরব হল, ইন্দ্রের সভায় তাঁর স্থানলাভের সম্মান। স্বর্গত পাণ্ডুর গৌরববোধের অনুপ্রেরণা রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান যদি বা হয়, রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের প্রমাণিত সত্য হল অসম্ভবকে সম্ভব প্রতিপন্ন করবার লক্ষ্যে, যুধিষ্ঠিরের অনুপ্রেরণা, তাঁর চার ভাই। অনেক বড় কাজে সাফল্য আসে, যদি স্বজনবর্গের প্রীতিময় আনুগত্য সেই কাজের শক্ত ভিতটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। অনেক বড় যুদ্ধ, অনেক দ্বন্দ্বের অবসান সম্ভব যদি নিকটজনদের শক্তপোক্ত সাহায্যের হাতগুলি আন্তরিক বন্ধনে জড়িয়ে রাখে সম্পর্কের সুতোগুলি।
রাজসূয়যজ্ঞের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করে, একদা মহর্ষি নারদ যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছিলেন, বলশালী রাজা হরিশ্চন্দ্র সম্রাট হয়েছিলেন, স রাজা বলবানাসীৎ সম্রাট্ সর্ব্বমহীক্ষিতাম্। তস্য সর্ব্বে মহীপালাঃ শাসনাবনতাঃ স্থিতাঃ।। তাঁর এই সম্রাটপদপ্রাপ্তিহেতু অন্য সব রাজারা তাঁর শাসনাধীন হয়ে আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন। রাজা হরিশ্চন্দ্র সম্রাটত্বের আরও একটি শর্ত পূরণ করেছিলেন কারণ তিনি রাজসূয় নামে মহাযজ্ঞানুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। মহর্ষি নারদ, যুধিষ্ঠিরের স্বর্গত পিতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, সমর্থোঽসি মহীং জেতুং ভ্রাতরস্তে বশে স্থিতাঃ।রাজসূয়ং ক্রতুশ্রেষ্ঠমাহরস্বেতি ভারত।। তুমি পৃথিবী জয় করতে সক্ষম, কারণ ভাইরা তোমার বশীভূত। তুমি রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান কর। পাণ্ডু আরও জানিয়েছিলেন রাজা হরিশ্চন্দ্রের মতো যুধিষ্ঠিরের সম্রাটত্বের গৌরবে গৌরবান্বিত হবেন। এই গৌরব হল, ইন্দ্রের সভায় তাঁর স্থানলাভের সম্মান। স্বর্গত পাণ্ডুর গৌরববোধের অনুপ্রেরণা রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান যদি বা হয়, রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের প্রমাণিত সত্য হল অসম্ভবকে সম্ভব প্রতিপন্ন করবার লক্ষ্যে, যুধিষ্ঠিরের অনুপ্রেরণা, তাঁর চার ভাই। অনেক বড় কাজে সাফল্য আসে, যদি স্বজনবর্গের প্রীতিময় আনুগত্য সেই কাজের শক্ত ভিতটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। অনেক বড় যুদ্ধ, অনেক দ্বন্দ্বের অবসান সম্ভব যদি নিকটজনদের শক্তপোক্ত সাহায্যের হাতগুলি আন্তরিক বন্ধনে জড়িয়ে রাখে সম্পর্কের সুতোগুলি।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
সর্বোপরি আছে পাণ্ডবদের চালিকাশক্তি অর্থাৎ চলচ্ছক্তি কৃষ্ণ। যুধিষ্ঠিরের আন্তরশক্তির উদ্বোধন করেছেন কৃষ্ণ। যেমন জীবনযুদ্ধে মানসিকশক্তির আধার হন গুরু, শিক্ষক, কোনও প্রিয় ব্যক্তিত্ব, যাঁদের উৎসাহশক্তি অনেক মহৎ কাজের অনুপ্রেরণা হয়ে সাফল্যের পথে এগিয়ে দেন আমাদের। পাণ্ডবদের এই জীবনীশক্তির উৎস কৃষ্ণ। তাঁর কণ্ঠে যখন উৎসাহী বাণী ঘোষিত হয় যজস্বাভীপ্সিতং যজ্ঞং ময়ি শ্রেয়স্যবস্থিতে। আমার শুভাকাঙ্খায় জারিত উপস্থিতিতে আপনি যজ্ঞ সম্পন্ন করুন তখন তাঁর এই দৃঢ় আশ্বাসে শ্রোতার আত্মবিশ্বাস দ্বিগুণ হয়, এটি বোধ হয় অনেকেরই অভিজ্ঞতালব্ধ অনুভব।।অনেকক্ষেত্রেই জীবনযজ্ঞে আত্মাহুতির বহ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে বোধ হয় এমন কোনও উজ্জীবনী বহ্নিশিখার প্রয়োজন হয়, কখনও প্রকাশ্যে, কখনও বা প্রচ্ছন্ন থাকে সেই উৎসটি। পাণ্ডবদের কাছের কৃষ্ণের মতো চালিকাশক্তির আধার কেউ হয়তো অনেকেরই জীবনে আছেন, মনে মনে বা প্রকাশ্যে হয়তো অনেকেই এই কথা স্বীকার করবেন।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















