রবিবার ১৪ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

জ্যেষ্ঠপাণ্ডব যুধিষ্ঠির রাজসূয়যজ্ঞ করতে মনস্থ করেছেন। পাণ্ডবদের শুভাকাঙ্ক্ষী কৃষ্ণের পরামর্শ অনুযায়ী, অত্যাচারী ক্ষমতালিপ্সু প্রভাবশালী মগধরাজ জরাসন্ধের প্রতিপত্তির কাছে হার স্বীকার করেছেন যাদবরা, জরাসন্ধের গিরিব্রজ নামের পার্বত্যদুর্গে বন্দি রয়েছেন পরাজিত রাজারা, তাঁদের মুক্ত করা যুধিষ্ঠিরের প্রথম কর্তব্য। এই সব বৃত্তান্ত শুনে, জরাসন্ধের অমিত শক্তি ও ক্ষমতা স্মরণ করে, যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানে অনীহা প্রকাশ করলেন। অত্যুৎসাহী দ্বিতীয়পাণ্ডব ভীমসেনের অভিমত হল,জরাসন্ধকে পরাজিত করতে যুদ্ধোদ্যম প্রয়োজন। তাঁর মতে, কৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীম এই তিনজনের শক্তিবলে তাঁরা জরাসন্ধজয়ে সক্ষম হবেন। কৃষ্ণের বক্তব্য— ধর্ম, অর্থ ও নয় অর্থাৎ নীতির অপপ্রয়োগকারী, অত্যাচারী রাজা, দুর্বিনীত, জরাসন্ধের পরবর্তী লক্ষ্য আরাধ্য মহাদেবের উদ্দেশ্যে ছিয়াশী জন বন্দি রাজাদের উৎসর্গ করা।

একশত রাজাকে উৎসর্গ করতে প্রয়াসী রাজা জরাসন্ধের লক্ষ্যপূরণের জন্যে প্রয়োজন চোদ্দো জন রাজা। এই নিষ্ঠুর কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। যুধিষ্ঠির জানালেন, স্নেহভাজন ভাই ভীম ও অর্জুন তাঁর দুটি নয়ন এবং কৃষ্ণ হলেন যুধিষ্ঠিরের মন। যুদ্ধে, অপ্রতিরোধ্য জরাসন্ধের বিরুদ্ধে এদের পরাজয় নিশ্চিত। যুধিষ্ঠির জানালেন, দুঃসাধ্য রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানে তাঁর আর প্রবৃত্তি নেই। পার্থ অর্জুন, দৈবাস্ত্র লাভ করেছেন, তিনি শৌর্যশালী, সুগঠিত দৈহিক শক্তির অধিকারী, যশস্বী ও বলবান, উৎসাহী, ক্ষত্রিয়সুলভ তেজোদীপ্ত, তিনি যুদ্ধাভিযানের বিপক্ষে নয়, যুদ্ধাভিযানের পক্ষে মত প্রকাশ করলেন।
জ্যেষ্ঠপাণ্ডব যুধিষ্ঠির রাজসূয়যজ্ঞ করতে মনস্থ করেছেন। পাণ্ডবদের শুভাকাঙ্ক্ষী কৃষ্ণের পরামর্শ অনুযায়ী, অত্যাচারী ক্ষমতালিপ্সু প্রভাবশালী মগধরাজ জরাসন্ধের প্রতিপত্তির কাছে হার স্বীকার করেছেন যাদবরা, জরাসন্ধের গিরিব্রজ নামের পার্বত্যদুর্গে বন্দি রয়েছেন পরাজিত রাজারা, তাঁদের মুক্ত করা যুধিষ্ঠিরের প্রথম কর্তব্য। এই সব বৃত্তান্ত শুনে, জরাসন্ধের অমিত শক্তি ও ক্ষমতা স্মরণ করে, যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানে অনীহা প্রকাশ করলেন। অত্যুৎসাহী দ্বিতীয়পাণ্ডব ভীমসেনের অভিমত হল,জরাসন্ধকে পরাজিত করতে যুদ্ধোদ্যম প্রয়োজন। তাঁর মতে, কৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীম এই তিনজনের শক্তিবলে তাঁরা জরাসন্ধজয়ে সক্ষম হবেন। কৃষ্ণের বক্তব্য— ধর্ম, অর্থ ও নয় অর্থাৎ নীতির অপপ্রয়োগকারী, অত্যাচারী রাজা, দুর্বিনীত, জরাসন্ধের পরবর্তী লক্ষ্য আরাধ্য মহাদেবের উদ্দেশ্যে ছিয়াশী জন বন্দি রাজাদের উৎসর্গ করা।

একশত রাজাকে উৎসর্গ করতে প্রয়াসী রাজা জরাসন্ধের লক্ষ্যপূরণের জন্যে প্রয়োজন চোদ্দো জন রাজা। এই নিষ্ঠুর কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। যুধিষ্ঠির জানালেন, স্নেহভাজন ভাই ভীম ও অর্জুন তাঁর দুটি নয়ন এবং কৃষ্ণ হলেন যুধিষ্ঠিরের মন। যুদ্ধে, অপ্রতিরোধ্য জরাসন্ধের বিরুদ্ধে এদের পরাজয় নিশ্চিত। যুধিষ্ঠির জানালেন, দুঃসাধ্য রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানে তাঁর আর প্রবৃত্তি নেই। পার্থ অর্জুন, দৈবাস্ত্র লাভ করেছেন, তিনি শৌর্যশালী, সুগঠিত দৈহিক শক্তির অধিকারী, যশস্বী ও বলবান, উৎসাহী, ক্ষত্রিয়সুলভ তেজোদীপ্ত, তিনি যুদ্ধাভিযানের বিপক্ষে নয়, যুদ্ধাভিযানের পক্ষে মত প্রকাশ করলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৮: সুজাতজাতক—তবু অনন্ত জাগে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৩: ক্যান ইউ হ্যান্ডেল ইট?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৮: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বানর

যুধিষ্ঠিরের অপরিসীম কৌতূহল, কে এই জরাসন্ধ? কেমন তাঁর শৌর্য? কেমন তাঁর প্রতিপত্তি?যিনি কি না অগ্নিসম কৃষ্ণকে স্পর্শ করেও পতঙ্গের মতো দগ্ধ হননি? কৃষ্ণ বিশদে বর্ণনা করবন, জরাসন্ধ কে? তাঁর বীর্যবত্তা,প্রতিপত্তি এবং অপ্রিয় আচরণ সত্ত্বেও তাঁকে কৃষ্ণ উপেক্ষা করেন কেন? কৃষ্ণ জরাসন্ধের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন। মগধদেশে তিন অক্ষৌহিণী সেনাদলের অধিনায়ক, যুদ্ধে গর্বিত, বৃহদ্রথ নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন রূপবান, বীর্যবান, বিত্তবান, অপরিমিত পরাক্রমশালী, যজ্ঞদীক্ষায় চিহ্নিতদেহ যেন এক ইন্দ্র। তিনি সূর্যসম তেজস্বী, সহিষ্ণুতায় পৃথিবীতুল্য, যমের মতো ক্রোধী এবং কুবের সদৃশ সম্পদের অধিকারী ছিলেন। সদ্বংসজাত গুণপরম্পরার অধিকারী বৃহদ্রথের যশ, সূর্যের মতো পৃথিবী ব্যাপ্ত করেছিল। মহাশৌর্যবান ও ধনবান তিনি কাশিরাজের যমজ দুই কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন।সেই পুরুষ শ্রেষ্ঠ রাজা বৃহদ্রথ সেই ভার্যাদের সম্মুখে এই মর্মে শপথ করলেন যে তিনি তাঁদের কারও প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবহার করবেন না। দুইটি হস্তিনী যেমন একটি হস্তীর শোভা হয় তেমনি তাঁর উপযুক্ত প্রিয় দুই পত্নী যেন তাঁর সৌন্দর্য হলেন। গঙ্গাযমুনার মধ্যবর্তী যেন মূর্তিমান সমুদ্র হয়ে পৃথিবীপতি সেই রাজা বিরাজমান হলেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা/ দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৬: আকাশ এখনও মেঘলা

বিষয়চিন্তায় নিমগ্ন রাজার যৌবন অতিক্রান্ত হল, কিন্তু বংশরক্ষক কোন পুত্রের জন্ম হল না। বহু যাগ যজ্ঞ, হোম এবং পুত্রকামনায় যজ্ঞ করেও রাজার বংশগতিরক্ষক কোন পুত্রলাভ হল না। এই অবস্থায় রাজা শুনলেন, গৌতমবংশীয় মহাত্মা কক্ষীবানমুনির পুত্র প্রশস্তহৃদয় চণ্ডকৌশিকমুনি তপস্যার ফলে শ্রান্ত হয়েছেন। সেই মুনি স্বেচ্ছায় এসেছেন এক তরুতলে। রাজা বৃহদ্রথ ও তাঁর দুই ভার্যার যত্নে তিনি সন্তুষ্ট হলেন। পরম সন্তোষ লাভ করে, সত্যবাদী ঋষিশ্রেষ্ঠ রাজাকে বললেন, হে রাজশ্রেষ্ঠ আমি পরিতুষ্ট হয়েছি। হে সুব্রত,বর প্রার্থনা করো। পরিতুষ্টোঽস্মি রাজেন্দ্র!বরং বরয় সুব্রত!। সস্ত্রীক রাজা বৃহদ্রথ প্রণত হয়ে, পুত্রহীনতার কারণে নৈরাশ্যজনিত বাষ্পগদগদবচনে জানালেন, তিনি রাজ্য পরিত্যাগ করে তপোবনে চলে যাচ্ছেন।হতভাগ্য ও নিঃসন্তান, রাজার বরলাভের কি প্রয়োজন? রাজ্যেরই বা কি প্রয়োজন?
কৃষ্ণ বর্ণনা করলেন, এই অবস্থায় চণ্ডকৌশিকমুনির প্রতিক্রিয়া কেমন হল। রাজার কথা শুনে,মুনি বিচলিতমনে সেই আমতরুচ্ছায়ায় ধ্যানমগ্ন হলেন। বাতাসের আঘাতেও নয় বা শুকপাখির উচ্ছিষ্টরূপেও নয়, মুনির কোলে এসে পড়ল একটি আম। মুনিশ্রেষ্ঠ চণ্ডকৌশিক সেটি গ্রহণ করে, মনে মনে মন্ত্র পাঠ করে, অনুপম ফলটি পুত্রলাভের জন্য রাজাকে দান করলেন। মহাপ্রাজ্ঞ, মহামুনি সেই রাজাকে বললেন, (নিজগৃহে) যান। উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, ফিরে আসুন। মুনির কথা শুনে, তাঁর পায়ে মাথা রেখে প্রণত হলেন রাজা। তিনি ফিরে গেলেন স্বগৃহে। নৃপশ্রেষ্ঠ বৃহদ্রথ যথাসময়ে (পত্নীদের সন্তানধারণের উপযুক্ত কালে), প্রতিজ্ঞানুসারে, ফলটি দুই পত্নীকে প্রদান করলেন। দুই পত্নী, মুনির কথা ভাবিফলদায়ী হবে ও তাঁর কথার সত্যনিষ্ঠতাহেতু আমটি দুই ভাগে ভাগ করে খেলেন। ফলটি খাওয়ার ফলে দুজনেই গর্ভবতী হলেন। তাই দেখে রাজা পরমানন্দ লাভ করলেন। যথাসময়ে উভয় স্ত্রী যথানিয়মে দুটি দেহাংশ প্রসব করলেন। দেহাংশ দুটির প্রত্যেক খণ্ডতে ছিল একটি বাহু,একটি চরণ, অর্ধেক উদর, মুখ ও কটির অর্দ্ধাংশ। এই দৃশ্য দেখে দুই রানি কেঁপে উঠলেন। উদ্বিগ্ন ও দুঃখিত দুই ভগিনী, পরস্পর পরামর্শ করে, দু’জনে মিলে সেই প্রাণিশরীরের খণ্ড দুটি পরিত্যাগ করলেন। তাঁদের গর্ভ হতে নির্গত খণ্ডদুটি সুন্দরভাবে আবৃত করে,দুই ধাত্রী, অন্তঃপুরদ্বার হতে বেড়িয়ে, সেই দুটি ফেলে দিয়ে ফিরে গেলেন। চারটি পথে ছড়িয়ে থাকা সেই খণ্ডদুটি গ্রহণ করলেন রক্তমাংসভোজিনী জরা নামে এক রাক্ষসী।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২০: গোরা-সুনীতি: সম্পর্কের অন্য সুর

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৩ : শহরের ইতিকথা

সেই রাক্ষসী, দৈববিধানানুসারে উদ্বুদ্ধ হয়ে, অংশ দুটিকে (মানুষের মতো) সুখজনক আকৃতি দান করতে ইচ্ছুক হল। রাক্ষসী, খণ্ডদুটিকে সংযুক্ত করল। সংযুক্ত হওয়ামাত্র খণ্ড দুটি, মূর্তিমান এক বীর কুমারের আকৃতিতে পরিণত হল। সেই রাক্ষস তখন বিস্ময়বিস্ফোরিত চোখে সেই বজ্রকঠিন ভারী শিশুটিকে বহন করতে পারল না। শিশুটি তামার তুল্য বর্ণময় মুঠি মুখে নিয়ে, জলপূর্ণ মেঘগর্জনে উঁচু স্বরে কেঁদে উঠল। সেই শব্দে ব্যস্ত অন্তঃপুরবাসী পুরুষবৃন্দ রাজার সঙ্গে বেড়িয়ে এলেন এবং পুত্রলাভবিষয়ে নিরাশ, ম্লান, দুধে পরিপূর্ণ হয়েছে যাঁদের স্তন, এমন অবলা সেই রাজপত্নী দুজনে, সহসা বাইরে এলেন। তাঁদের দুজনকে সেই অবস্থায় দেখে এবং রাজার পুত্রাকাঙ্খা অনুভব করে, সেই সবল শিশুর বিষয়ে চিন্তা করলেন —পুত্রলাভেচ্ছু, ধার্মিক, মহান রাজার রাজ্যে বাস করে এই শিশুপুত্রটিকে আমি হত্যা করতে পারব না। নার্হামি বিষয়ে রাজ্ঞো বসন্তী পুত্রগৃদ্ধিনঃ। বালং পুত্রমিমং হন্তুং ধার্ম্মিকস্য মহাত্মনঃ।।

মানুষরূপধারিণী মেঘমালাধারণকারী সূর্যের মতো সেই রাক্ষসী, বালকটিকে কোলে নিয়ে,রাজাকে বললেন, রাজা বৃহদ্রথ, এই আপনার পুত্র, আমি দিচ্ছি, আপনি গ্রহণ করুন। বৃহদ্রথ! সুতস্তেঽহং ময়া দত্তঃ প্রগৃহ্যতাম্। রাক্ষসী জানাল, ব্রাহ্মণ (চণ্ডকৌশিকের) বরে রাজার দুই পত্নীর গর্ভে পুত্রটি জন্ম নিয়েছে। ধাত্রীগণের পরিত্যক্ত শিশুটিকে, রাক্ষসী সুরক্ষিত রেখেছে। তখন সুলক্ষণা কাশিরাজকন্যাদ্বয়, সেই মুহূর্তে শিশুটিকে কোলে নিয়ে, স্তনদুধক্ষরণ দিয়ে স্নান করালেন।তখন আনন্দিত রাজা সবকিছু লক্ষ্য করে, কনকবর্ণা, মানবীরূপধারিণী রাক্ষসীকে বললেন, কা ত্বং কমলগর্ভাভে! মম পুত্রপ্রদায়িণী। কামং বা ব্রূহি কল্যাণি! দেবতা প্রতিভাসি মে।। হে পদ্মকোষবর্ণা, আমার পুত্রপ্রদায়িনী তুমি কে? নির্দ্বিধায় বল। আমার মনে হয়, তুমি কোন দেবী। রাক্ষসী বলল, আমি জরা নামে যথেচ্ছরূপধারিণী এক রাক্ষসী। আপনার গৃহে, সমাদৃতা হয়ে সুখে বাস করেছি।আপনার মঙ্গল হোক। জরা নামাস্মি ভদ্রং তে রাক্ষসী কামরূপিণী। তব বেশ্মনি রাজেন্দ্র! পূজিতা ন্যবসং সুখম্।।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯২: কৈলাসচন্দ্র সিংহ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

জরা জানাল এক অদ্ভুত তথ্য, মানুষের ঘরে ঘরে সর্বদাই বিরাজমানা আছে এক রাক্ষসী। প্রাচীনকালে, ব্রহ্মা, গৃহদেবী নামে তাকে সৃষ্টি করেছিলেন। দানবদের বিনাশ হল, দিব্যরূপধারিণীর স্থাপনের মূল লক্ষ্য। যিনি ভক্তিসহকারে পুত্রসমন্বিতা যৌবনবতী তাঁকে, গৃহের ভিত্তিতে চিত্রিত করেন, তাঁর উন্নতি হয়, এর অন্যথা হলে তাঁর ক্ষয় হয়। জরা বৃহদ্রথরাজাকে সম্মান প্রদর্শন করে বললেন, রাজার গৃহে অবস্থানরতা সে বহু পুত্রবেষ্টিতা হয়ে ভিত্তিতে চিত্রিতা হয়ে, নিত্য পূজিতা হত। গন্ধদ্রব্য, পুষ্প, ধূপ, খাদ্য, ভোজ্যসামগ্রীর মাধ্যমে তিনি সুন্দরভাবে সম্মানিতা হতেন। রাক্ষসী তাই রাজার প্রত্যুপকারের কথা সর্বদাই চিন্তা করে থাকে। রাক্ষসী জরা জানাল, আপনার পুত্রের খণ্ডিত দেহাংশ দুটি আমি দৈবাৎ দেখেছিলাম। সেই দুটি যুক্তকরামাত্র আপনার সৌভাগ্যক্রমে কুমারের জন্ম হল। আমি এখানে শুধু হেতু। সংশ্লেষিতে ময়া দৈবাৎ কুমারঃ সমপদ্যত। তব ভাগ্যান্মহারাজ। হেতুমাত্রমহং ত্বিহ।। রাক্ষসী অকপটে ঘোষণা করল, মেরুপর্বত পর্যন্ত সে খেয়ে ফেলতে পারে, এই বালকটি সেই তুলনায় নগণ্যমাত্র। রাজার গৃহে সমাদরের সঙ্গে পূজার কারণে সন্তুষ্টিহেতু, সে, পুত্রটিকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

কৃষ্ণ কাহিনীর শেষে বললেন, জরা তাঁর বক্তব্য শেষ করে অন্তর্হিতা হল। রাজা পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে স্বগৃহে প্রবেশ করলেন। রাজা, বালকটির জাতকর্ম প্রভৃতি করণীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন এবং মগধদেশে রাক্ষসী জরার উদ্দেশ্যে মহোৎসব-অনুষ্ঠানপালনের জন্যে আদেশ দিলেন। রাক্ষসী জরা, পুত্রটির দেহাংশ সংযুক্ত করেছিলেন বলে, পিতামহ ব্রহ্মার সমতুল্য প্রভাবশালী পিতা বৃহদ্রথ, পুত্রের নামকরণ করলেন জরাসন্ধ। মগধরাজের মহাতেজস্বী, শরীরের পরিমাণ-অনুযায়ী বলসম্পন্ন ও আহুতিপ্রাপ্ত অগ্নিসম পুত্রটি, শুক্লপক্ষের চাঁদের মতো মাতাপিতার আনন্দদায়ক পুত্র হয়ে বড় হতে লাগল।

রাজসূয়যজ্ঞ সম্পাদন করে রাজা যুধিষ্ঠির অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হবেন। তিনি হবেন অবিসংবাদী সম্রাট। যজ্ঞানুষ্ঠানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেন একমাত্র মগধরাজ জরাসন্ধ। পরামর্শদাতা কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছেন জরাসন্ধের প্রতিপত্তির কাছে হার স্বীকার করেছেন কৃষ্ণের যাদবকুল। গিরিব্রজের পার্বত্যদুর্গে জরাসন্ধ বন্দী রেখেছেন পরাজিত রাজাদের। যাঁদের তিনি উৎসর্গ করবেন। সব শুনে যুধিষ্ঠির হতোদ্যম হলেন। অমিত শক্তিশালী ভীমের অভিমত,জরাসন্ধের বিরোধিতায়। তাঁর মতে ভীম, অর্জুন ও কৃষ্ণের সম্মিলিত শক্তির কাছে জরাসন্ধ নিশ্চয়ই নতিস্বীকার করবেন। স্নেহান্ধ যুধিষ্ঠির অনুমান করলেন, জরাসন্ধের বিরুদ্ধে ভাইদের ও কৃষ্ণের শক্তি বিপন্ন হবে। তাই রাজসূয়যজ্ঞে আর তাঁর সম্মতি নেই। অর্জুন বীর ক্ষত্রিয় এবং দৈবাস্ত্রবলে বলী, তাই তিনি জরাসন্ধের বিপক্ষে যুদ্ধাভিযানের সমর্থক।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

একটি বড় সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন মত গড়ে ওঠে। সেগুলির যুক্তিগ্রাহ্য গ্রহণযোগ্যতা মনে চিন্তার খোরাক এনে দেয়। ভীমের মতানুসারে যে কোনও কাজে উদ্যম প্রয়োজন। তবে যদি সে কাজে প্রতিবন্ধকতা থাকে তবে সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তাবিষয়টি বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে। চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে উদ্যমের প্রকাশ সুচিন্তিত হওয়া আবশ্যক। জরাসন্ধ চরমপন্থী, যে কোনও প্রাণের বিনিময়ে লক্ষ্যপূরণে তিনি তৎপর। এমন প্রাণহানির মাধ্যমে ক্ষমতাধিকারে সচেষ্ট হন যাঁরা, তাঁদের ক্ষেত্রে সুচিন্তিত পরিকল্পনাপ্রসূত দমননীতির প্রয়োগ আবশ্যক। জরাসন্ধের দমনপ্রসঙ্গে আধুনিক পৃথিবীতে চরমপন্থীদের দমননীতির প্রয়োগে বৃহত্তর শক্তির সক্রিয় হস্তক্ষেপের কথা মনে আসে।

কৃষ্ণ জীবনের যে কোন মুহূর্তে মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী পরিণতির কথা স্মরণে এনেছেন। তাঁর মতে, কোনও যুদ্ধেই যুদ্ধবিমুখতা নয়, সুকৌশল প্রয়োগ করে যুদ্ধজয় সম্ভব। যুদ্ধনীতির যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন বলে কৃষ্ণ মনে করেছেন। শত্রুর দুর্বলতার দিকটিও বিবেচনার বিষয়। জরাসন্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান শুধু ক্ষত্রিয়দের পারস্পরিক বিরোধিতার যুদ্ধনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যে কোন জীবনযুদ্ধে সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও নির্দিষ্টলক্ষ্যে তার রূপায়ণ প্রয়োজন। মহাভারতের এক একটি কাহিনির মূল্যায়ন, সমাজজীবনের প্রেক্ষিতে এভাবেই হয়তো সাযুজ্যময় হয়ে ওঠে। কৃষ্ণ জরাসন্ধহত্যার যে চরমপন্থা অবলম্বনের পরিকল্পনা করেছেন,তা চরমপন্থীদের মতাদর্শের সমতুল। তবে বহু প্রাণ রক্ষার তাগিদে একজনের জীবনের মূল্য হয়তো তুচ্ছ মনে হয়। কৃষ্ণের মতে, আত্মক্ষয়ী যুদ্ধে হয়তো চরম সমাধান সম্ভব।

যে জরাসন্ধ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তাঁর পরিচয় প্রকাশ করেছেন কৃষ্ণ। প্রতিপত্তিশালী মগধরাজ বৃহদ্রথের পুত্র জরাসন্ধের জন্মবৃত্তান্তটি বিচিত্র। দুই খণ্ডিত দেহাংশ যুক্ত করে জরা নামে এক রাক্ষসী তাঁকে জীবনদান করেছিলেন। তাই তাঁর নাম জরাসন্ধ। জরা যুক্ত করে দ্বিখণ্ডিত ব্যক্তিত্বকে। জীবনের পরিণতিতে মানুষের ব্যক্তিত্ব যখন দ্বিধাবিভক্ত হয় তখন জরা তাঁর দ্বিধাবিভক্ত চেতনাকে যুক্ত করে তাঁকে পূর্ণতা দেয়। রাক্ষসী জরা আনত কৃতজ্ঞতায়, রাজার গৃহে সম্মানিতা হয়ে কৃতজ্ঞতার ঋণ পরিশোধ করেছিল। জরাগ্রস্ত মানুষ, জীবনের কাছে বিনয়াবনত হয়ে পূর্ণ হয়। জরা মানুষকে সংযোগসূত্রটি খুঁজে তাঁকে যুক্ত করে, পরিণত করে, সম্পূর্ণতা দেয়, যেমন রাক্ষসী জরা, দ্বিখণ্ডিত বৃহদ্রথপুত্রকে সংযুক্ত করে পূর্ণতা এনে দিয়েছিল।

মহাকাব্যের কাহিনির চরিত্রগুলির নামমাহাত্ম্যে লুকিয়ে থাকে বিচিত্র ভাবনার খোরাক। মহাভারতের মহত্ব ও ভারবত্বের এমনই হয়তো গভীরতা।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content