শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন মগধরাজ্যে ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রবেশ করলেন। উদ্দেশ্য স্বেচ্ছাচারী মগধরাজ জরাসন্ধের অমানবিক আচরণের বিলাপ করে, নরবলির জন্যে উৎসর্গীকৃত কারারুদ্ধ রাজাদের মুক্তিসাধন। মগধরাজের প্রখরদৃষ্টিতে তাঁরা ধরা পড়ে গেলেন। শুরু হল ধুরন্ধর দুই রাজনীতিবিদের বাদানুবাদ। অবশেষে কৃষ্ণের কথার ফাঁদে ধরা দিলেন রাজা। জরাসন্ধ প্রস্তাব দিলেন, তিনি একাকী কৃষ্ণ এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের একজনের সঙ্গে বা তাঁদের মধ্যে দুই জনের সঙ্গে বা তিন জনের সঙ্গে পৃথকভাবে যুদ্ধ করবেন। যুদ্ধ নিশ্চিত জেনে, বাগ্মী কৃষ্ণ, জরাসন্ধকে বললেন, রাজা তিনজনের মধ্যে কার সঙ্গে যুদ্ধে ইচ্ছুক? কে রণসাজে সজ্জিত হয়ে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হবে? মহাপ্রতাপান্বিত মগধরাজ জরাসন্ধ ভীমের সঙ্গে যুদ্ধের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
রাজপুরোহিত গোরোচনা, মালা, দই, দূর্বা প্রভৃতি মাঙ্গলিক দ্রব্য, বলকারক ও ক্লান্তিনাশক ওষুধ এবং লুপ্তসংজ্ঞা ফিরিয়ে আনে এমন ওষুধ প্রভৃতি নিয়ে যুদ্ধে উন্মুখ জরাসন্ধের কাছে উপস্থিত হলেন। কোনও এক যশস্বী ব্রাহ্মণ, রাজার কল্যাণে স্বস্ত্যয়ন (মঙ্গলবিধায়ক দেবপূজা প্রভৃতি) করলেন। ক্ষত্রধর্ম অনুসরণ করে, জরাসন্ধ সমরসজ্জার আয়োজন করলেন। তিনি মাথার মুকুট ত্যাগ করলেন, শক্তভাবে বাঁধলেন মাথার চুল। বেলাভূমি অতিক্রমকারী সমুদ্রের মতো উঠে দাঁড়ালেন রাজা জরাসন্ধ। বুদ্ধিমান ও মহাপরাক্রমশালী রাজা, ভীমকে বললেন, তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করব। শ্রেষ্ঠর কাছে পরাজয়ও শ্রেয়। ভীম! যোৎস্যে ত্বয়া সার্দ্ধং শ্রেয়সা নির্জ্জিতং পরম্। এই বলে, মহাতেজস্বী জরাসন্ধ, বল নামক অসুরের মতো ইন্দ্রপ্রতিম শত্রুনিহন্তা ভীমের দিকে ধেয়ে গেলেন। কৃষ্ণ স্বস্ত্যয়ন সম্পন্ন করলেন। বলশালী ভীম কৃষ্ণের সঙ্গে মন্ত্রণাশেষে,যুদ্ধে উৎসুক হয়ে জরাসন্ধকে প্রতি-আক্রমণ করলেন। দুই শ্রেষ্ঠ পুরুষ ও মহাবীর, বাহুমাত্র অস্ত্র সম্বল করে, পরমানন্দে, জয়ের আকাঙ্খায় পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হলেন।
দু’জনে পরস্পরের হাত ধরে,চরণদুটি দিয়ে একে অপরকে বেষ্টন করে, করাঘাত করলেন ঘরটির প্রকোষ্ঠে। ভয়ঙ্কর শব্দে কেঁপে উঠল ঘরটি। বাহু দিয়ে পরস্পরের কাঁধে আঘাত করে, চলমান অবস্থায় পরস্পরের অঙ্গ জড়িয়ে ধরে আস্ফালন করতে লাগলেন। বিচিত্র সব হাতের মুঠির সাহায্যে চিত্রহস্ত (আঙ্গুলগুলি কুঞ্চিত কখনও বা প্রসারিত করে) সৃষ্টি করে বাহুমূল আবদ্ধ করলেন। গলা ও কপোলেরর অভিঘাতে (পাথরের মতো কঠিন অঙ্গের ঘর্ষণে) স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হল, বজ্রপাতের মতো শব্দ হল। তাঁরা দু’ জনে পরস্পরের বাহুবন্ধন করে, পা দিয়ে মাথায় আঘাত করলেন। ভীম ও জরাসন্ধ হাতদুটী পূর্ণ কলসের মতো, চক্রসদৃশ করে বুকে আঘাত করতে লাগলেন। হাতি যেমন শুঁড় দিয়ে পরস্পরকে উৎপীড়ন করে তেমন হাতিদুটির মতো দুইজন অস্ত্রতুল্য বাহু দিয়ে, একে অপরকে আঘাত করলেন। মেঘের মতো গর্জে উঠলেন তাঁরা। একে অপরকে হত্যা করতে ইচ্ছুক, ক্রুদ্ধ, ভীম ও জরাসন্ধ, সিংহসম স্তব্ধদৃষ্টিতে পরস্পরকে নিরীক্ষণ করলেন। তাঁরা, করতল দিয়ে, পরস্পরকে আকর্ষণ করে যুদ্ধ করতে লাগলেন। দুই জনে, উভয়র অঙ্গ পিষ্ট করে, পরস্পরের মুখোমুখি হলেন। তাঁদের বাহুগুলি আঘাত করল পরস্পরের উদরে। মল্লযুদ্ধে সুশিক্ষিত, ভীম ও জরাসন্ধ বিহ্বল হয়ে কোমর ও কাঁধের পাশে ও আরও নীচের অঙ্গে, হাত মুঠো করে প্রহার করলেন এবং নিজেদের বাহুর সাহায্যে গলায় আঘাত প্রতিরোধ করলেন।

আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৪: শূর্পনখার কাহিনিতে, ষড়রিপুর প্রভাব, এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত নয় কী?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬৩: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৮৮ : নেকলেস

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৩: শৃগাল-জাতক—তঞ্চক

মল্লযুদ্ধে নিরত দুই বীর সূচী মতো দুই বাহু মিলিত করে, পূর্ণচক্র, তৃণপীড়, কাল, মুষ্টি ও পূর্ণযোগ নামে বন্ধ সৃষ্টি করলেন। সমবেত নগরবাসীরা দুই জনের দর্শনীয় যুদ্ধের কসরত দেখতে সমবেত হলেন। হাজার হাজার ব্রাহ্মণ, বণিক(বৈশ্য), ক্ষত্রিয় ও শূদ্র, নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলে হাজির হলেন। নিরন্তর জনস্রোতে,জায়গাটি নিশ্ছিদ্র হয়ে পরিপূর্ণ হল। ভীম ও জরাসন্ধের বাহুর আঘাতে, পরস্পরকে নীচে ছুঁড়ে ফেলবার চেষ্টায় বা উঠিয়ে পতিত করবার জন্য চাপানউতরের ফলে,যেন বজ্র ও পর্বতের ভীষণ সংঘাত শুরু হল। দুই শ্রেষ্ঠ বীর, যুদ্ধজয়ের আশায়, গভীর মনোযোগ সহকারে, বলপ্রয়োগ করে, পরস্পরের মধ্যের ফাঁক খুঁজতে লাগলেন। দর্শকদের সরিয়ে দেওয়া হল। যুদ্ধভূমিতে বৃত্র ও ইন্দ্রের মতো দুই বলীর ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলতে থাকল। প্রকর্ষণ অর্থাৎ সামনে বা দূরে প্রেরণ, সম্মুখে আকর্ষণ, অনুকর্ষ অর্থাৎ বামদিকে প্রেরণ, বিকর্ষণ বা দক্ষিণে প্রেরণ প্রভৃতি রণকৌশল অবলম্বন করে একে অপরকে আকর্ষণ করতে লাগলেন। সেই সঙ্গে তাঁরা পরস্পরকে জানু দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন। পরস্পরকে ভর্ৎসনা করে পাথরছোঁড়ার মতো ভয়ানক শব্দে উভয়ে উভয়কে প্রহারের মাধ্যমে আহত করতে সচেষ্ট হলেন। বিশালবক্ষা, দীর্ঘবাহু, বাহুযুদ্ধে নিপুণ, দুই বীর, বাহুগুলি দিয়ে যেন একটি লোহার পরিঘ তৈরি করে মিলিত হলেন। কার্ত্তিক মাসের প্রথম দিনে, যে যুদ্ধের শুরু, দিবারাত্রব্যাপী সেই যুদ্ধ অনাহারে বিরামহীনভাবে চলতেই থাকল। দুই মহাত্মা, জরাসন্ধ ও ভীমের, যুদ্ধের তেরদিন পরে চোদ্দদিনে রাত্রিতে মগধরাজ জরাসন্ধ ক্লান্ত হয়ে যুদ্ধ হতে নিবৃত্ত হলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাকে ক্লান্ত দেখে, কৃষ্ণ, ভয়ঙ্করকাজে অভ্যস্ত ভীমকে, কর্তব্যবিষয়ে উপদেশ দিলেন। হে কুন্তীপুত্র, যুদ্ধে, ক্লান্ত শত্রুকে উৎপীড়ন নয়। সার্বিক উৎপীড়নের ফলে সে প্রাণত্যাগ করতে পারে। সেই জন্যই, কষ্ট দেবেন কিন্তু এই বিষয়ে যত্নবান হন। বাহু দুটি কোমলভাবে ব্যবহার করে, যুদ্ধ করুন। ক্লান্তঃ শত্রুর্ন কৌন্তেয়! লভ্যঃ পীড়য়িতুং রণে। পীড্যমানো হি কার্ৎস্ন্যেন জহ্যাজ্জীবিতমাত্মনঃ।। তস্মাদ্ যত্নেন কৌন্তেয়! পীড়নীয়ো জনাধিপঃ। সমমেতেন যুধ্যস্ব বাহুভ্যাং ভরতর্ষভ!।। কৃষ্ণের উপদেশ শেষ হলে শত্রুহন্তা ভীম, জরাসন্ধের ত্রুটি (ক্লান্তিবশত দুর্বলতা) জেনে নিয়ে, জরাসন্ধবধের বিষয়ে মনোনিবেশ করলেন। বলিদের শ্রেষ্ঠ বৃকোদর ভীম, নতুন উদ্যমে, অপরাজিত জরাসন্ধকে জয় করতে আগ্রহী হলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৯ : শুধু মনুভ্যালি নয়, কৈলাসহরের চা বাগান কালীশাসনও বিপ্লবী তৎপরতার সাক্ষী

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৭ : দুই সহোদরার সখি সংবাদ (২)

নিজের প্রখর বুদ্ধির ওপরে আস্থাশীল ভীমসেন, জরাসন্ধকে হত্যা করতে ইচ্ছুক হয়ে, যদুনন্দন কৃষ্ণকে বললেন, হে যাদবশ্রেষ্ঠ, (তার প্রাণরক্ষার্থে) আমায় বাধা দেওয়া, যুক্তিসঙ্গত নয়। সে তোমার বহু বন্ধুদের বিনাশ করেছে। তাই আমায় কোন পাপ স্পর্শ করবে না। নায়ং পাপো ময়া কৃষ্ণ! যুক্তঃ স্যাদনুরোধিতুম্। প্রায়েণ যদুশার্দ্দূল! বান্ধবক্ষয়কৃত্তব।। কৃষ্ণ ভীমের বক্তব্যে, সমর্থন জানালেন। তিনি পুরুষোত্তম ভীমকে জরাসন্ধবধে দ্রুত তাড়া দিলেন। বললেন, হে ভীমসেন, আপনার যে দৈবশক্তি (শৈশবে নাগলোকে অর্জিত বল) আছে সেই পরম বল, নিজের পৈত্রিকসূত্রে মাতরিশ্বা পবনদেবের কাছ থেকে যে শক্তি লাভ করেছেন, সেই বল অবিলম্বে প্রদর্শন করুন। যত্তে দৈবং পরং সত্ত্বং যৎ সত্ত্বং মাতরিশ্বনঃ। বলং ভীম ! জরাসন্ধে দর্শয়াশু তদদ্য বৈ।। শত্রুঘাতী, বলশালী ভীম, জরাসন্ধকে উপরে তুলে ধরে ঘোরাতে লাগলেন। এইভাবে দুই বাহু দিয়ে শতবার ঘুরিয়ে, নিষ্পেষিত করে,তার দেহটি সংকোচনের মাধ্যমে (হাঁটু ও গলা একযোগে ধারণ করে, শত্রুর দেহটি সংকুচিত করে) পিঠ ভেঙ্গে দিলেন। গর্জন করে উঠলেন ভীম। জরাসন্ধকে নিষ্পেষণের সময়ে, মধ্যম পাণ্ডবের গর্জনধ্বনি, প্রাণীদের উদ্বেগ সৃষ্টি করে, ভয়ঙ্কর বিকট শব্দের সৃষ্টি হল। ভীম ও জরাসন্ধের গর্জন শুনে, মগধবাসীরা ভীত, সন্তস্ত্র হলেন। স্ত্রীলোকদের গর্ভপাত হল। ভীমসেনের গর্জনহেতু মগধবাসীদের ধারণা হল হিমালয় কি বিদীর্ণ হল? বসুন্ধরা চৌচির হল না তো? শত্রুনিহন্তারা, ঘুমন্ত মানুষের মতো জরাসন্ধের নিষ্প্রাণ দেহটি রাজবাড়ির দুয়ারে রেখে প্রস্থান করলেন। কৃষ্ণ, জরাসন্ধের রথটিতে পতাকা যুক্ত করে, ভীম ও অর্জুন এই দুই ভাইকে রথে তুলে নিয়ে অবরুদ্ধ বন্ধু রাজাদের (কারাগার হতে) মুক্ত করলেন। ভয়ানক ভয় হতে মুক্ত রাজারা, রত্নের যোগ্য কৃষ্ণকে সামনে পেয়ে, রত্নসম্ভার হাতে তুলে দিলেন। অক্ষতদেহে, অস্ত্রধারী, শত্রুবিজয়ী, কৃষ্ণ, রাজাদের সঙ্গে নিয়ে, সেই দিব্য রথে আরোহণ করে গিরিব্রজ নগর পরিত্যাগ করলেন। দুই সহোদর, দুই হাতে যিনি যুদ্ধ করেন সেই সব্যসাচী অর্জুন, কৃষ্ণ সারথি যার, শত্রুনিধনে অভ্যস্ত, সুদর্শন, দুর্জয়, অর্জুনও ভীমের সঙ্গে একই পথ ধরলেন। অতীতে ইন্দ্র ও নারায়ণ নক্ষত্রের মতো হীরকখচিত যে রথে আরোহণ করে যুদ্ধে বিচরণ করতেন সেইরকম রথে আরোহণ করে যাত্রা করলেন কৃষ্ণ। রথটি ছিল উজ্জ্বলতায় তপ্ত সোনার বরণ, তাতে ঝুলছিল কিঙ্কিণীর (ছোট ঘণ্টা) মালা, যার শব্দ ছিল মেঘমন্দ্রিতধ্বনির সমান, এমন শত্রুবিনাশী, বিজয়ী ছিল রথটি। ইন্দ্র এই রথে আরোহণ করে নব্বই জন দানবকে হত্যা করেছিলেন। সেই রথটি লাভ করে পুরুষশ্রেষ্ঠরা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। ভাইদের সঙ্গে রথস্থ মহাবীর কৃষ্ণকে দেখে, মগধবাসীরা বিস্মিত হলেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬১ : গোবিন্দ সোরেন দ্য গ্রেট

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!

মগধরাজ জরাসন্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে শামিল হয়েছিলেন বীরত্রয়ী, কৃষ্ণ ও দুই পাণ্ডুপুত্র, ভীম ও অর্জুন। তিনজনের লক্ষ্য ছিল, অত্যাচারী মগধরাজ জরাসন্ধের অমানবিক আচরণের প্রতিকার অর্থাৎ তাঁকে হত্যা করে বলিদানের উদ্দেশ্যে কারারুদ্ধ রাজাদের তাঁর কবল হতে মুক্তিদান। কৃষ্ণের সঙ্গে অনেক বাদানুবাদের পরে জরাসন্ধ স্থির করলেন, তিনি একাকী যুদ্ধ করবেন। প্রতিপক্ষ হতে পারেন একজন, দুজন বা সদলে কৃষ্ণরা তিনজন। দ্বাভ্যাং ত্রিভির্বা যোৎস্যে২হং যুগপৎ পৃথগেব বা। কৃষ্ণ জানতেন, যুদ্ধে জরাসন্ধ দেবাসুরের অবধ্য।শুধু দৈহিকবল প্রয়োগ করে তাঁকে জয় করা সম্ভব। ন চ শক্যো রণে জেতুং সর্ব্বৈরপি সুরাসুরৈঃ।প্রাণযুদ্ধেন জেতব্যঃ স ইত্যুপলভামহে।। টীকাকারমতে ‘প্রাণযুদ্ধেন’ শব্দার্থ ‘দৈহিকবলপ্রযুক্তযুদ্ধেন’।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— বালিকাঠা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

কৃষ্ণ এই অভিযানে নীতিনির্ধারক, যুদ্ধজয়ের পরিকল্পনা তাঁর নিজস্ব মস্তিষ্কজাত। ভীমের রয়েছে বাহুবল। অর্জুন আছেন রক্ষকের ভূমিকায়। কৃষ্ণ স্থির করেছেন, ময়ি নীতির্বলং ভীমে রক্ষিতা চাবয়োর্জয়ঃ। একটি বৃহৎ পরিকল্পনা রূপায়ণের জন্যে চাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, শক্তি এবং কাজটিতে যাতে বিঘ্ন না ঘটে তার জন্য দায়িত্ববান কেউ, যিনি সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। দক্ষ, চিন্তাশীল, রাজনীতিবিদ যাদবশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণ জানতেন, তাঁদের তিনজনের মধ্যে তিনি ও অর্জুন বাহুযুদ্ধে অপেক্ষাকৃত দুর্বল, তাঁরা মল্লযুদ্ধে জরাসন্ধের সমপর্যায়ের নন। বলগর্বিত জরাসন্ধ বাহুবলে বলী। তাঁর পক্ষে অপেক্ষাকৃত দুর্বলের সঙ্গে যুদ্ধ, অবমাননাকর। নিশ্চয়ই তিনি সম্মুখযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে ভীমসেনকে বেছে নেবেন। ভীমসেনং স যুদ্ধায় ধ্রুবমপ্যুপযাস্যতি। তাই কৃষ্ণের প্রস্তাবের উত্তরে জরাসন্ধ ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সম্মত হলেন। কৃষ্ণের অনুমান, অভ্রান্ত প্রমাণিত হল। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন দুই বীর। তাঁদের রণসাজের সঙ্গে আধুনিক মল্লযোদ্ধাদের প্রতিযোগিতামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ ক্রীড়াবিদদের কোনও পার্থক্য নেই। মল্লযুদ্ধের এই আয়োজন অনেকটা পাশ্চাত্যের আমৃত্যু (dual) দু’জনের সম্মুখযুদ্ধের মতো। এখানে কেবলমাত্র বাহুবল সম্বল করে যুদ্ধ। সঙ্গে কোনও অস্ত্র নেই যোদ্ধাদের একমাত্র শক্তি, শারীরিক বল। এই যুদ্ধের সঙ্গে আধুনিক মল্লক্রীড়ার কোনই অমিল নেই, শুধু রাজারা এখন খেলোয়াড় নন, এই খেলা এখন মরণখেলা নয়, নয় প্রাণঘাতী কোন সংঘাত, এখন এই মল্লযুদ্ধ বিনোদনের মাধ্যমমাত্র। যুদ্ধের রোমাঞ্চকর বিবরণ,দুই যোদ্ধার আস্ফালন, এমন উত্তেজিত বিবরণ হয়তো সংবাদপত্রে আজও পাঠকবর্গের প্রিয় পাঠ্যবিষয়। নৈতিকতার নিরিখে,মল্লযুদ্ধের নিয়মাবলী হয়তো এখনও অনুসরণ করা হয়। তবে এখন, মল্লযুদ্ধ তথাকথিত যুদ্ধ নয়, নিছক প্রতিযোগিতামূলক খেলা। অতীতে দুই যোদ্ধার জীবনপণ সংগ্রামমাধ্যমে, পার্থক্য রয়েছে।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

অতীতে মল্লযুদ্ধের অনৈতিক বিষয় হল, ক্লান্ত প্রতিপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা। যে কোনও যুদ্ধে নৈতিকতার বিধিবদ্ধ মানদণ্ড অতিক্রম করে যান যুদ্ধরত দুই পক্ষই। ভুলে যান মানবিকতা, মমত্ববোধ প্রভৃতি কোমলবৃত্তি। প্রকট হয়ে ওঠে হত্যা, মৃত্যু, জিঘাংসা এবং প্রতিশোধস্পৃহা। জয় হয়, আত্মঘাতী নৈতিক অবক্ষয়ের।এই চিত্রের পরিবর্তন হয়নি। প্রখ্যাত কুরুকুলশ্রেষ্ঠ অন্যতম মল্লযোদ্ধা ভীমের আচরণ হয়তো মহাভারতীয় প্রেক্ষিতে ক্ষত্রিয়বীরের যোগ্য আচরণ কিন্তু বর্তমান যুদ্ধের আবহে ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’তে ‘নিত্য নিষ্ঠুর দ্বন্দ্ব’ময় যুযুধান যুদ্ধবাজদের সিদ্ধান্তে তার ছায়া লক্ষ্য করা যায় কী?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content