কলকাতায় বৃষ্টি
ফেলুদা ডিটেকটিভ। রহস্যের জট খুলে সমাধান করা তার পেশা, কিন্তু রহস্যেই আটকে পড়ে না সে। রহস্যভেদীর ওপরেও তার বৌদ্ধিক চিন্তাশীল সত্তাটি চলচ্চিত্রের সর্বত্র জেগে থাকে। ফেলুদা সমকালীন চিন্তাশীল বাঙালি যুবকের প্রতিনিধি; যে মূলত বুদ্ধিজীবী, মাথার মধ্যে থাকা ধূসরবস্তু মগজাস্ত্রের জোরেই তার সকল জারিজুরি; পেশীর ভারের থেকে মস্তিষ্কের ধারেই তার আস্থা বেশি, তাই ঘনিয়ে ওঠা রহস্যের আগাম আঁচ পায় সে, জানায় “ভালো লাগছে না রে তোপসে, ভালো লাগছে না!” একটা নকশা তার চোখের সামনে জেগে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়। রহস্যের ব্লু প্রিন্ট, সমাধানের নীল নক্সা তার মাথায় আনাগোনা করে। ভাবনা, চিন্তা, বুদ্ধি, যুক্তি, মনের পথে সে স্তরে স্তরে পৌঁছে যায় সাফল্যে। এই হল তার ডিটেকশনের পন্থা, যার আরম্ভ হয় তার ড্রয়িংরুমে।
style="display:block" data-ad-client="ca-pub-2284096077348736" data-ad-slot="3069590626" data-ad-format="auto" data-full-width-responsive="true">
ফেলুদা আদতে একজন চিন্তাশীল মানুষ। বাঙালির চিন্তাশীলতার অভিজ্ঞানটি নিয়েই তার পথ চলা। তার চোখের মধ্যে সেই বুদ্ধিদীপ্ত মননের স্বাক্ষর থেকে যায়। পরিচ্ছদে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেল, চলনে বলনে “স্মার্ট” বাঙালি এলিট সে। তার মন, বুদ্ধি, মননের আত্মপরিচয় বিধৃত আছে মস্তিষ্কে, তার চিন্তা, চেতনা, চৈতন্য আসন পেতে বসে মাথার সেই ড্রয়িংরুমে। তার স্পর্শ এসে লাগে ডিটেকটিভ পি সি মিটার, প্রদোষচন্দ্র মিত্রের বসার ঘরটিতে। সোনার কেল্লা ছায়াছবিতে ফেলুদার সেই ঘর দর্শক দেখেছেন। আজকের পর্বে আমাদের গন্তব্য ২১ নং রজনী সেন রোডের সেই বাড়ি।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১২৯: অমিতাভ হত্যারহস্য / ১০

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৬ : চিড়িয়াখানা: সত্যান্বেষীর অন্দর, ডিটেকটিভের ড্রয়িংরুম

একুশে আইনের ব্যাপার স্যাপারের মোকাবিলা করবে যে, তাকে গোধূলির প্রদোষকাল পার হয়ে রজনীর গভীর অন্ধকারে অমলিন চন্দ্রালোক হয়ে সৌহার্দ্যের হাতটি বাড়িয়ে দিতে হবে শরণার্থীর দিকে। ফেলুদার জন্য তাই সোফায় কুণ্ঠিত হয়ে বসে থাকতে দেখা গিয়েছে এক ছাপোষা ভদ্রলোককে, জাতিস্মর মুকুল ধরের বাবা। ইনিই গোয়েন্দার ক্লায়েণ্ট, মক্কেল।

ফেলুদার গল্প কি কিশোর কাহিনি? হ্যাঁ, হয়তো। এখানে প্রেম, যৌনতার কোনও অস্তিত্ব নেই। নেই মানবমনের গভীরলোকের জটিল তত্ত্ব, যে মনস্তত্ত্বে রিপুকেন্দ্রিক ক্রূর দ্বেষ, জুগুপ্সা, জিঘাংসা এবং অন্যায় কামনার ছায়াপাত রহস্যকাহিনির অন্যতম অবলম্বন হলে এখানে তা অবশ্যম্ভাবী হয়নি। যে ন্যায় অন্যায়ের পথ ধরে কাহিনি চলে, তাতে লোভ, সংযম, কর্তব্য, সামাজিক শিক্ষা, বোধের দায় মুখ্য হয়ে থাকে সত্যোন্মোচনের লক্ষ্যে। সত্য এখানে শান্তি, আদর্শ ও ব্যাপকতর জীবনবোধ হয়ে ওঠে, অপরাধ ও অপরাধীর তত্ত্ব এখানে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত যেখানে “শাস্তি” নিছক প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরেও মরজীবনের একটা অনিবার্য পরিণতি, যেখানে প্রাকৃত-অপ্রাকৃত মিশে যেতে পারে অনায়াসে। যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক সত্যের সঙ্গেই এখানে এসে মেশে কিশোরমনের উপযোগী মনস্তত্ত্বের গভীরলোক, আর তার প্রতীক হয়ে ওঠে ফেলুদার বসার ঘরের অ্যাকোরিয়ামটি, আলো আঁধারির মাঝে ভাস্বর মত্স্যাধারটিতে খেলে বেড়ায় ছোট ছোট মাছ, ইন্দ্রিয়গুলি যেমন ছুটে চলতে চায় ইচ্ছেমতো। অনিয়ন্ত্রিত আবেগের পথে অঙ্কুশ নিয়েই যেন ডিটেকটিভ পথরোধ করে দাঁড়ান। অ্যাকোরিয়ামের কাচের দেয়াল কি সেই নিয়ন্ত্রণের কথাই বলে?
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০০ : স্থানীয়রা দিনে কৃষি কাজ করতেন, আর রাতে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন বিপ্লবীরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৫: নৈতিকতার নিরিখে, মল্লযুদ্ধে জরাসন্ধবধ, আজও প্রাসঙ্গিক কেন?

কাচের স্বচ্ছতা দুর্জ্ঞেয় মনের গভীরলোকের প্রতীক হয়েও ধরা দেয় বুঝি। যে মন অস্পষ্ট, অব্যক্ত, তা তীক্ষ্ণধী সত্যভেদীর, রহস্যভেদীর কাছে অনায়াসগম্য হয়ে ওঠে। ওই অ্যাকোরিয়াম ও মাছের চলাচল একাধিকবার দৃশ্যমান হয়। রহস্য, সাসপেন্স, মনস্তত্ত্ব, সন্ধান, উদ্ঘাটন… সকল কিছুর প্রতিনিধি, প্রতীক হয়েই যেন ফেলুদার ড্রয়িংরুমে ঘটে চলা, তার মস্তিষ্কে ছুটে চলা যাবতীয় প্রবাহের অভিজ্ঞান হয়ে উঠতে থাকে এই অ্যাকোরিয়াম। ফেলুর বসার আসনের পিছনেই দৃশ্যমান হয়ে থাকে বুদ্ধদেবের আসনমূর্তি, সকল দ্বন্দ্ব বিরোধের মাঝে জাগ্রত ভালোর আশা ও আশ্বাস হয়ে।

ফেলুদার ছাপোষা ক্লায়েন্ট বিত্তশালী কৈলাশ চৌধুরী নন। কলেজ স্ট্রিটের ছোট একটি বইদোকানের মালিক। তাঁর দোকানে টেলিফোন আছে। ফেলুদা নাম্বার চাইলে তোপসে দ্রুত উঠে নোট করে নিতে থাকে… তিন চার পাঁচ ছয় তিন চার। এক এবং দুইকে দর্শক জেনে গিয়েছেন। তিন চার পাঁচ ছয় কি এখানে শিল্পের ভাষায় তাত্পর্যমণ্ডিত হতে পারে? তাহলে, সেই ষড়ভূজের দুটি বাহু যদি ফেলু ও তপেশ হয়, তাহলে বাকি চারটি নিঃসন্দেহে জটায়ু লালমোহন, প্যারাসাইকোলজিস্ট ড. হেমাঙ্গ হাজরা, নকল হাজরা ওরফে ভবানন্দ, আর ভবানন্দের চেলা ভূপর্যটকের ছদ্মবেশে মন্দার বোস।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬১ : গোবিন্দ সোরেন দ্য গ্রেট

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!

ফেলুদার ড্রয়িংরুমের কোণে দণ্ডায়মান ল্যাম্পশেড, ফোনসেট, গ্লাসটপ সেণ্টার টেবল, তার ওপরে ঝিনুক-সদৃশ রূপোলি (অথবা রূপোর) ভস্মাধার ছাইদানি, পিছনের দেয়ালে যামিনী রায়ের আঁকা প্রশস্ত চিত্রকর্মের প্রতিরূপটি, এছাড়াও দৃশ্যমান বই, বাঁকুড়ার ঘোড়া, অন্যান্য শো পিস, বিপন্ন মক্কেলের বসার আসনটির পিছনের দেয়ালে মাথার ওপরে খানিক দৃশ্যমান হিংস্র জন্তুর মাথা, সোফাসেটের পাশে সুদৃশ্য মোড়া যেটিতে শ্রীমান তপেশরঞ্জন মিত্র, কিশোর তোপসে বসে ফেলুদার সহকারী হয়… সবগুলিই সাত কিংবা আটের দশকের এলিট বাঙালির প্রজ্ঞাদীপ্ত, রুচিশীল, পরিশীলিত মন ও আত্মপরিচয়ের প্রতিনিধি, যেখানে অনাড়ম্বর কিন্তু পরিমিত সৌন্দর্যবোধ একটি বিশেষ বার্তা বহন করে। পাশাপাশি ফেলুদার পেশা ও আত্মপরিচয় তথা অন্তর্লোকের অনুষঙ্গে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক ও ব্যঞ্জনাবহ হয়।

যেমন, ওই বিদ্যুতের ল্যাম্পশেড ফেলুদার পেশার সূত্রে অর্থবহ, যেখানে আলোর সন্ধান, আলোর পথে সত্যের অন্বেষণ, চারপাশে ঘিরে ধরা অন্ধকারটুকু পার হয়ে যাওয়ার একটা বার্তা থাকে। তার ছাইদানিটি শুক্তিতে মুক্তোসন্ধানের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে দর্শককে। এবং, উপবিষ্ট ফেলুদার পিছনের দেয়ালে যামিনী রায়ের পটচিত্রটি শিল্পভাষায় অর্থবহ হয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— বালিকাঠা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

যামিনী রায়ের আঁকা কালিঘাটের পটচিত্রের শৈলীতে চিত্রিত এই ছবিতে কৃষ্ণ ও বলরামের যুগলমূর্তি দেখা যায়। যামিনী রায়ের চিত্রকলায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে। মোটা রেখা, উজ্জ্বল রঙে বিশেষ ভঙ্গিমায় দণ্ডায়মান যুগলমূর্তির পাশে ময়ূরযুগল দেখা যায়। রসজ্ঞ দর্শক পুরাণপ্রসিদ্ধ ভ্রাতৃদ্বয়ের অনুষঙ্গে ফেলু ও তার খুড়তুতো ভাই তপেশকে চিনে নিতে পারবেন; শার্লক হোমস ও ওয়াটসনের ছায়াবৃত্তে থেকেও যেন তারা স্বতন্ত্র, নিজের মতো করে অন্যরকম ও সম্পূর্ণ, পরস্পরের পরিপূরক, শৌর্য-জ্ঞান-কূটনীতির পথে তারাও যাত্রী। কৃষ্ণ বলরামের পাশে ময়ূর যে এই ছবিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে তা দর্শক হয়তো অনুমান করবেন, কিংবা সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলবেন, জন্ম ও জন্মান্তরের সূত্রে রাজস্থান-যোধপুর-জয়পুর-জয়সলমীরের পথে মরু, বালি, ময়ূরের পথে বেরিয়ে পড়বেন। দর্শক উপলব্ধি করবেন যে, বাঙালির মনন চিন্তনে রাধাকৃষ্ণের যুগলরূপের যে প্রবেশ ও প্রতিষ্ঠা, সেই পরিসরের বাইরে বেরিয়ে এসে ফেলু আর তোপসের এই ভ্রাতৃরূপ। এখানে কৃষ্ণ প্রেমিক নায়ক নন, বরং কূটনীতিজ্ঞ যুগপুরুষ। এই নবতর ব্যঞ্জনা ও মেলবন্ধন এই ছায়াছবির, চলচ্চিত্রের অঙ্গে অঙ্গে, ডিটেকশনের অন্দরমহল, অন্তর্লোক থেকে অপরিচয়ের পথে, “সংশয় থেকে সত্যসদনে” আলো জ্বেলে চলবে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com

Skip to content