
ভারত সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের প্রযোজনায় ১৯৬১ সালে কবির জন্মশতবর্ষে নির্মিত এই ছবি কেবল তথ্যমূলক একটি চিত্র নয়, একটি মূল্যায়ন। শিল্পী, সাধক, মানুষ রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন। রবীন্দ্রনাথ আটটি দশক এই পৃথিবীতে নশ্বর শরীরে বর্তমান ছিলেন। জীবনের প্রতি দশটি বছরে তাঁর সারস্বত সাধনা বিবর্তিত হয়েছে বলেই দেখা যায়। তাঁর জন্মের পরে পৃথিবীতে ষোলোটি দশক পার হয়ে আরও অর্ধদশক কাল অতিক্রম করেছে। তাঁর মৃত্যুর পরেও আটটি দশক চলে গেছে। আরও একটি দশকের অর্ধকাল অতিক্রান্ত। তাঁর জন্মশতবর্ষের পরেও ছয়টি পূর্ণদশক, একটি অর্ধদশক কেটে গেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কালের রথচক্রের ঘর্ঘর ধ্বনিতে, রাজপথে ছুটে চলা সেই মহাশকটের চক্রাঘাতে উত্থিত ধূলিজ্বালে আবৃত হয়ে যান নি। তাঁর বিচিত্রগামী মনীষা, তাঁর শিল্পীসত্তা, তাঁর দর্শনভাবনা আজ-ও প্রাসঙ্গিক। তাঁর মহাপ্রয়াণের পরে কেটে যাওয়া দীর্ঘকালের পরেও তিনি বহু যুগের ওপারের কেউ নন, বাক্ ও অর্থের, শব্দ ও ছন্দের আবরণে মননশীল মানুষের জনপ্রবাহে তিনি সার্থক হয়েছেন।
সার্থকতা যে মহামানব কিংবা ‘ঠাকুর’ হয়ে ওঠায় নয়, মরণোত্তর অবিনশ্বর স্থিতিতে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হতে পারেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর নোবেল জয়, সমকালীন ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ ও রাজনীতি, বিশ্বকবির উপনিষদ-ভাবনা থেকে রাজনৈতিক দর্শন, শিক্ষার ঘরে-বাইরের অচলায়তন থেকে যোগাযোগ কিংবা রহস্যমেদুর মন, হৃদয় ও মানসসুন্দরীর অনন্ত সন্ধান, তাঁর গান, তাঁর রূপকভাবনা, তাঁর ছোটগল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, নৃত্যনাট্য কিংবা চিঠি অথবা তাঁর রং-তুলির জগৎ, হোমিওপ্যাথি কিংবা খাতার পাতায় কাটাকুটিতে জেগে ওঠা যাপনচিত্র, তাঁর তপোবন, আশ্রম কিংবা রসবোধের নানা চর্চিত অচর্চিত দিক-দিগন্তের শেষে জেগে থাকেন মানুষ রবীন্দ্রনাথ।
তাই প্রথমেই দেখা যায় দিগন্তবিস্তৃত তৎকালীন “অক্টারলোনি মনুমেন্ট”… যার পাশে জেগে থাকা কলিকাতায় সামাজিক নবজাগরণ আসবে। সেই জাগরণের পথ ধরে ধরে জেগে উঠবেন জোড়াসাঁকোর প্রবাদপ্রতিম এক মানুষ, হয়ে উঠবেন বঙ্গজন, বঙ্গজীবনের অভিজ্ঞান, ওই মিনারের মতো। দেখা যাবে ঠাকুরবাড়ির অলিন্দ, তাতে ধীর পদবিক্ষেপে এগিয়ে চলবে এক কিশোর, তাঁর সৃষ্ট পঞ্চকের মতোই দূরে দূরে ঘুরে বেড়ায় যার মন। ‘জীবনস্মৃতি’র পাতা থেকে জেগে উঠবেন বালক রবি, তাঁর অনেকদিনের আকাশ চাওয়ার পাশেই ছুটে চলবে দখিন হাওয়া। ক্রমে ক্রমে তাঁর সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল ফোটে।

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৫ : কালাদেওর গুহায়

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৩২: অমিতাভ হত্যারহস্য / ১৩

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৮: জরাসন্ধবধ ও জনার্দনের কৃতিত্ব
তবু, এই চলচ্চিত্র এক মগ্ন ক্ষণজন্মা কবির আত্মোদ্ঘাটন “আত্মানং বিদ্ধি”র তত্ত্ব বা সত্যের, অনুশীলন বা সিদ্ধির ভাষ্য নয়। কবির নেপথ্যে থাকা ক্রান্তদর্শী ঋষির আত্মদর্শনের উপন্যাস-ও নয় এই তথ্যচিত্র।

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৯: নোনা জলের কুমির

ক্যাবলাদের ছোটবেলা, পর্ব-৩৭: লোকে যারে বড় বলে
চলচ্চিত্রে উল্লিখিত হয় তাঁর মরজীবনের শেষ পঁচিশে বৈশাখ, যেখানে ‘সভ্যতার সঙ্কট’কে তিনি দেখেছেন। ভাষ্যকার জানাবেন যে, এই জন্মদিনের তিনমাস পরে তিনি চিরকালের জন্য ছেড়ে যাবেন তাঁর শান্তিনিকেতন, আমাদের শান্তিনিকেতন। নেপথ্যে বেজে ওঠে রবীন্দ্রগান “তবু মনে রেখো।”

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৫: অকালরাবী জাতক—সময় গেলে সাধন হবে না

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা
রবীন্দ্রকণ্ঠে শুনতে থাকেন দর্শক, অনুভব করেন কবির হৃদ্গত আকুতি, তীব্র মর্ত্যমায়া। একদিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে, তবু মনে রেখো। একদিন যদি বাধা পড়ে কাজে, তবু মনে রেখো।… ছলছল জল নাহি দেখা দেয় নয়ন কোণে, তবু মনে রেখো।
কিন্তু চোখ কি অশ্রুসজল হয় না কবির? গানের সঙ্গে দেখা যায় পরিণত বয়সের রবীন্দ্রনাথের হাস্যময় সৌম্য মুখ, দুটি উজ্জ্বল, আলোকিত চোখ-সহ। কিন্তু তারপর চলচ্চিত্র পৌঁছোয় তার অভীষ্ট লক্ষ্যে। যাঁর কলমে মরা গাঙে বান আসার বাণী, যিনি জানিয়েছেন সঙ্কোচের বিহ্বলতায় আত্মাবমাননা, যিনি ভাঙনের জয়গান গেয়ে বলে ওঠেন, জীর্ণ পুরাতনকে মুছে দিয়ে চিরনূতনের অভিবন্দনার মাঝেই ব্যক্ত হয় অসীমের চিরবিস্ময় তিনিও কিন্তু সেদিন ব্যথিত হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে এবার পরপর দেখা যায়, নিবিড় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রবীন্দ্রনাথের উদ্বিগ্ন চোখ দুটি, নানা চিত্রে। ফুটে ওঠে পৃথিবী জুড়ে চলতে থাকা বীভত্সতার বহু চিত্র, দগ্ধ শব, আর্তনাদ, ব্যাকুল শরণাগত, বিপুল সৈন্যভার, রণহুঙ্কার, যুদ্ধোন্মাদ মানুষের আস্ফালনের দলিলগুলি। চলচ্চিত্র এখানেই পৌঁছতে চাইছিল। যে পাশ্চাত্ত্যজগতের আলোকে এককালের নবজাগরণ, তা এখন সভ্যতার সঙ্কট। রবীন্দ্রনাথের শেষ বার্তা হয়ে থেকে যায় তা আগামী পৃথিবীর জন্য। যে সভ্যতার রথচক্রের অব্যাহত আবর্তন পৃথিবীকে নবরূপায়িত করেছে, সেই সভ্যতাকে তার ভিত্তিমূলে জেগে ওঠা এই ভাঙন থেকে উত্তীর্ণ করতে পারে মহামানব। তাঁর আগমনবার্তা শুনিয়েই শেষ হয় ছবি। তথ্যচিত্র। প্রশ্ন জাগিয়ে যায়, উত্তর-ও। “ভারততীর্থ” কবিতায় মহামানবের সাগরতীরে জেগে ওঠা এক থেকে বহু, বনস্পতি থেকে অরণ্যানী, ব্যক্তি থেকে সমষ্টির পথ ধরেই উত্তরণ। এই উত্তরণ আসে আত্মশক্তিতে, যা উদ্গত হয় অন্তর থেকেই। উপনিষদ ইন্দ্রিয়বাহী শরীররথের সার্থকতার কথা জানান। সংযতেন্দ্রিয় মানুষের দেহরথের যাত্রা সফল হয়। পৃথিবীজোড়া সঙ্কট, বিশ্বযুদ্ধোত্তীর্ণ ও আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উপনিবেশ তার রাষ্ট্রসত্তা অর্জন করতে পারবে? খুঁজে পাবে মানুষ শান্তি, সত্য, শিব, সুন্দরকে? কবির ব্যথিত চোখদুটি তার সন্ধান করে হয়তো।

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম
এই রবীন্দ্রনাথ-ই পঁচিশে বৈশাখ ডাক দিয়ে যান। রিক্ততা অতিক্রম করে জাড্যে আক্রান্ত প্রাণে প্রাণে জীবনের জয়গান শুনিয়ে যান সঙ্কটকালে, আজও।


















