শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

শাস্ত্রে দু’রকম পালনীয় কাজের কথা বলা হয়েছে। নিত্য ও নৈমিত্তিক। শাস্ত্র উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন যে, সন্ধ্যাবন্দনা ইত্যাদি হল নিত্য কর্ম। আপনি নিত্যদিন যে সব কাজ করে বেঁচে থাকেন, তা যদি হয় নিত্যকর্ম, তবে কালেভদ্রে, তিথি মেনে, পঞ্জিকা-ক্যালেণ্ডার দেখে যা হবে তা নৈমিত্তিক। কোনও কারণ ঘটলে তবেই তার অনুষ্ঠান। এই যেমন দোলদুর্গোৎসব কিংবা মন খারাপ লাগলে একটু ঘুরে আসা, সিনেমা দেখা কিংবা মাসে একটি দিন হলেও নিজের জন্য কিছু সময় রাখা।

কিন্তু হঠাৎ করে নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মের কথা কেন? কেন না, আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। নিত্যদিন যার মধ্যে বাঁচি সেই তাকে কেন্দ্র করে নৈমিত্তিক পার্বণের দিনে তাকে ভালবেসে দুটি চারটি কথা না বললে নয়। তাতে উদ্বেগ আশঙ্কা থাকবে, আগামীর সংশয় থাকবে, বর্তমানের দুরবস্থা থাকবে, শেষে উজ্জ্বলতর কোনও উত্তরণের স্বপ্ন দেখে সেশন শেষ হবে। ক্ল্যাপ। তারপর তো সারাবছরের নিত্যকর্ম থাকলোই।
‘এল্ নিনো’ নামক দুষ্টু বালকটি কি আবোল তাবোল মত্তমাদল বাজিয়ে কোন এক পাগলের খেয়ালখোলা স্বপনদোলার চলাচলের সাকিন-ঠিকানা, হদিস-হালচাল রাখে?

এই বিপুল পাগলামির কথা এক মহাকবিও বলেছেন বারবার, গানেগানে। এককালে বাদল দিনের প্রথম কদমফুল দেখে ব্যাকুল হয়েছিল যাঁর হৃদয় শেষজীবনে সেই হৃদয়ে লেগেছিল বাদল দিনের অচিনপুরের পাগলা হাওয়ার মাতন। সততঃ দূরগামী হৃদয়ে ভর করে জেগে ওঠা সেসব খেয়ালী সুর আজ সারাবছর জুড়ে যে খেয়ালরস পরিবেশন করে যাচ্ছে তার খোঁজ কিছুটা সুকুমার রাখতেন। আসুন, একটু পড়ে দেখা যাক।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৩: বাদুড়

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০২ : ‘স্বজাতির্দূরতিক্রমা’—জন্মগত স্বভাব কি কখনও বদলায়? পঞ্চতন্ত্রের পাতায় এক অমোঘ রাজনৈতিক সত্যের

“জন্তুটা বলল, ‘কেন হাসছি শুনবে? মনে কর, পৃথিবীটা যদি চ্যাপটা হত, আর সব জল গড়িয়ে ডাঙায় এসে পড়ত, আর ডাঙার মাটি সব ঘুলিয়ে প্যাচ-প্যাচে কাদা হয়ে যেত, আর লোকগুলো সব তার মধ্যে ধপাধপ্ আছাড় খেয়ে পড়ত, তা হলে—হোঃ হোঃ হোঃ হো—’ এই বলে সে আবার হাসতে-হাসতে লুটিয়ে পড়ল।
আমি বললাম, ‘কি আশ্চর্য! এরজন্য তুমি এত ভয়ানক করে হাসছ?’
সে আবার হাসি থামিয়ে বলল, ‘না, না, শুধু এরজন্য নয়। মনে কর, একজন লোক আসছে, তার এক হাতে কুলপিবরফ আর-এক হাতে সাজিমাটি, আর লোকটা কুলপি খেতে গিয়ে ভুলে সাজিমাটি খেয়ে ফেলেছে—হোঃ হোঃ, হোঃ হো, হাঃ হাঃ হাঃ হা—’ আবার হাসির পালা।
আমি বললাম, ‘কেন তুমি এই-সব অসম্ভব কথা ভেবে খামকা হেসে-হেসে কষ্ট পাচ্ছ?’
সে বলল, ‘না, না, সব কি আর অসম্ভব? মনে কর, একজন লোক টিকটিকি পোষে, রোজ তাদের নাইয়ে খাইয়ে শুকোতে দেয়, একদিন একটা রামছাগল এসে সব টিকটিকি খেয়ে ফেলেছে—হোঃ হোঃ হোঃ হো—’
জন্তটার রকম-সকম দেখে আমার ভারি অদ্ভুত লাগল। আমি জিগগেস করলাম, ‘তুমি কে? তোমার নাম কি?’
সে খানিকক্ষণ ভেবে বলল, ‘আমার নাম হিজি বিজ্ বিজ্।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯১ : বিপাশা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬২: যুদ্ধের নৃশংসতা নয়, জনমানসে ঠাঁই পায় শুধু যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য

আজ প্রকৃতির এমন হিজিবিজি হিজবিজ দশা আর প্রকৃতিস্থ মনুষ্যকুলের অসহায় পর্যবেক্ষণের নেপথ্যে কী ছিল, কী আছে?

কুমির আর শেয়ালের মৈত্রী হয়েছিল একবার। তারা জয়েন্ট ভেঞ্চারে নামল। যা হবে, আধাআধি ভাগ হবে। তো শেয়াল বন্ধুকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, মাটির ওপরেই খাঁটি সারভাগটি পাওয়া যায় হে। বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে জানে শেয়াল, কুমির-ই সারভাগ পাবে। তারপর আলু চাষ হল। শেয়াল আলু নিয়ে চলে গেল। কুমির যখন সারতত্ত্বটি বুঝল তখন বিস্তর দেরি হয়ে গেছে। তবুও যুধিষ্ঠির যেমন দ্বিতীয়বার পাশাখেলায় নেমেছিলেন, তেমন-ই আবারও মিত্রতানীতিতে আবদ্ধ হয়ে চাষে নামল দুজনে। এবার কুমির সব শিখে গিয়েছে, জানে কোথায় থাকে সারপদার্থ। মাটির ওপরের “রাবিশ” আর সে নেবে না। এবার আখ চাষ হল। তারপর কী হল সে কথা থাক বরং, তবে প্রকৃতি আর নিজের সঙ্গে নিত্যদিন আমরা এই তঞ্চকতাটিই করে আসছি।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৩৬: অমিতাভ হত্যারহস্য / ১৭

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

অর্থশাস্ত্রকার কৌটিল্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজার রাজ্যশাসন করার বিবিধ নীতি জানিয়েছিলেন। পৃথিবীর লাভ ও পালনের জন্য এই অর্থশাস্ত্র, যেখানে “অর্থ”শব্দের অর্থ হল “মনুষ্যবতী ভূমি”… সেই বিপুলা পৃথিবীর মানব ও সম্পদভারকে অবলম্বন করেই সভ্যতার ভিত্তি জেগে ওঠে। একটা গোটা ‘আরণ্যকের’ শেষে বিড়িপাতার জঙ্গল মুছে দিয়ে মানুষ তার নবতর স্বপ্নরচনা করে। মায়াময় জ্যোত্স্নোলোকে মণ্ডিত অপার্থিব রাত ক্রমে ক্রমে বেনোজলে ভেসে যায়, সঙ্গেসাথে ভেসে যায় সেই বুড়ি চাঁদ। খেতখামার থেকে হাইরাইজ, কলকারখানা এসব হতে গেলে বন-জঙ্গলকে মুছে যেতে হয় কিছু কিছু। তাতে মানুষের সঙ্কট যত বেশিরকম, জঙ্গলের ততো নয়।

এঁদো ডোবা, মজা নদী, নালার মতো সমুদ্র, কাটা গাছ, ন্যাড়া মাঠে সমৃদ্ধ নষ্ট পৃথিবীর বুকে মরু বাড়ছে। মানবতার হরিদ্রাভাও আজ গতপ্রায়, তার পিঙ্গল অবশেষ চোখে জ্বালা ধরায়। মেরু আর মরুর ব্যবধানটুকু দ্রুত মুছে যাচ্ছে। সভ্যতার দাবানল “সন্ধ্যার কূলে দিনের চিতা” হয়ে জ্বলছে অরণ্য থেকে অরণ্যান্তরে। “লও এ নগর” বলাটা আজ পরিহাস, নগর পুড়লে দেবালয়-ও বাঁচে না, অরণ্যকে ফিরিয়ে দেওয়ার স্বপ্নটুকুও আজ মিথ্যা থেকে অলীক হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

অরণ্য ফিরবে, যদি সে চায়। তবে প্রতিরুদ্ধ, অবরুদ্ধ প্রকৃতি যে মরা গাঙে বান আনতে পারে, তার ভয়ঙ্কর দাগ থেকে গিয়েছে গত কয়েকটি দশকে। এসব হয়েছে কেন তা মানুষের অজানা নয়, তাই তার চর্চা নিষ্প্রয়োজন। তবে এটুকু বলাই যায়, একটি ধানের শিষের ওপর শোভমান একটি শিশিরবিন্দুকে চিনে ওঠার মতো বোধ থাকলে সভ্যতার সঙ্কটকাল আসে না।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৯ : আড়ালে আছে আততায়ী

প্রকৃতি হয়তো নিজের মতো করে নিজেকে গুছিয়ে নেবে আবার। তবে তা দেখার জন্য তার “অমৃতস্য পুত্রাঃ” থাকবে কীনা কে জানে! তবে বিস্ময়ের কথা এই যে, নিজেকে যারা চিনেছিল, অমৃত হয়েছিল, সেই তারা ভূমিকে অধিকার করার পাশাপাশি তাকে মাতৃত্বের গরিমা দিয়ে প্রণিপাত করেছিল। তারপর কবে যেন কোন্ উতল হাওয়া তার কানে কানে অন্য কী এক কথা বলে গেল। তখন সে তুলাযন্ত্রের নিক্তিতে মেপে নিল সেই মায়ের সকল সম্পদ। মাটি, কাঠ, বনস্পতি কিংবা অরণ্যানী তখন ঐশ্বরিক নিভৃত ছায়ালোকের মায়ামেদুর রহস্যগানটি বিস্মৃত হয়ে “পণ্য” হল, পতিত হল। মানুষ হল সভ্য, নবজ্ঞানের স্রোতে তার দীর্ঘলালিত সুষুপ্তি আর জাড্য অবসিত হল হয়তো কিছু, কিছু নবতর বোধ ও বেদনায় সে জারিত হল খানিক, কিন্তু তার পূর্বতন মর্ত্যলোক ততদিনে মেগাসিটির কৌলিন্যে মহার্ঘ্য এক পণ্য, তার “তালিবনঘনশ্যাম সমুদ্রমেখলা” জন্মভূমি এক বিপুল জুতা আবিষ্কারের সিঁড়ি ভাঙা অনন্ত অঙ্কে হারিয়ে গেছে।

মানুষ কী করবে, তা তাকেই ঠিক করে নিতে হবে। দেশ-দশ, রাষ্ট্র অথবা সমাজ সেই প্রবাল দ্বীপের নারকেলের বনের ঝোড়ো হাওয়ায়, নগনদীর চকিত তরঙ্গভঙ্গের মর্মমূলে সততঃ বয়ে চলা “না বলা বাণীর” আকুলতাটুকুর কূল কিংবা তল খুঁজে পাবে আর? সেখানেই যে আছে সাত রাজার ধন মানিকের সন্ধান!
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content