বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
চার্চ হাসপাতালে আজ সকাল থেকেই ভারি ব্যস্ততা। সকাল না বলে অবশ্য ভোররাত বলাই সঙ্গত। মাঝে-মাঝে ফাদারকে কলকাতা যেতে হয়, সদরে তো হামেশাই যান, পাশের রাজ্যে হাসপাতালের যে বড় ব্রাঞ্চ আছে, সেখানেও কমবেশি ছুটতে হয় তাঁকে। তবে এবার ফাদার লম্বা ছুটিতে যাচ্ছেন। অনেকদিন পর। অনেকদিন মানে সত্যি অনেকদিন, দিন না বলে বছর বলাই সঙ্গত।

বড় ফাদারের অসুস্থতার পর সব দায়িত্ব এখন ছোট ফাদারের উপর। বড় ফাদার নাম-কা-ওয়াস্তে আছেন। তাও তিনি কতটা অথর্ব হয়ে পড়েছেন, সে-কথা ছোট ফাদার এবং তাঁর খাস লোক কনক গোমেজ ছাড়া আর কেউ জানে না। কনক গোমেজকে অবশ্য বিশেষ বাইরে দেখা যায় না। বড় ফাদারের রুমের সংলগ্ন একটি কক্ষেই কনক সারাদিন থাকেন। তাঁর একমাত্র কাজ চব্বিশ ঘণ্টা বড় ফাদারের দেখভাল করা। তিনি বাইরে বেরুনোর ফুরসৎ পাবেন কোথায়? তাঁর খাবারদাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। যে পৌঁছয়, সে কেবল কনকের খাবার নির্দিষ্ট টেবিলে রেখে আসে কেবল। কনক থাকলেও কথা বলেন না বিশেষ। আর বড় ফাদারের ঘরে থাকলে তো দেখার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, সে ঘরের দরজা বন্ধই থাকে সে-সময়।

বড় ফাদারের চিকিৎসার দায়িত্ব আগে ছিল এই হাসপাতালের পুরাতন ডাক্তার তমাল অ্যানথনির ওপর। কিন্তু ছোট ফাদার বছর দুই-তিন হল সে-দায়িত্ব থেকে তাঁকে সরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, তমাল ঠিকভাবে চিকিৎসা করতে পারছেন না। নতুন দিনের চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই বড় ফাদারকে পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে না পারলেও অন্তত জীবিত রাখতে পারে। বড় ফাদারের জীবিত থাকা এই চার্চ এবং হাসপাতালের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতএব তিনি বেছে-বেছে একজন তরুণ ডাক্তারকে এনেছেন, যাঁর বিদেশের ডিগ্রি আছে, যিনি কেবল বড় ফাদারেরই চিকিৎসা করেন। পিটার শ্যাম আগে ছিলেন পাশের রাজ্যের বড় সেন্টারে, আপাতত বছর দুই-তিন তিনি এখানেই থাকেন এবং বস্তুত হয়ে উঠেছেন, বড় ফাদারের একমাত্র চিকিৎসক এবং ছোট ফাদারের ছায়াসঙ্গী।
পিটার যেহেতু কেবল বড় ফাদারের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত, সেকারণে তাঁর হাতে অনেক অবকাশ। তিনি দিনে তিনবার করে বড় ফাদারকে চেকআপের জন্য যান। সকালে ব্রেকফাস্টের আগে, বিকেলে এবং রাতে। বড় ফাদার এখন কিছুই খেতে পারেন না প্রায়। আগে তাঁর খাবার চার্চের কিচেন থেকেই আসত। এখন কনক গোমেজই সমস্তকিছুর দেখাশোনা করেন। বড় ফাদার এখন হালকা স্যুপ এবং আপেলসিদ্ধ জাতীয় লিক্যুইড কিংবা সেমি-লিক্যুইড খাবার খান। দিনে চিকেনের হালকা-স্যুপ আর এক স্লাইস ব্রেড তাও সেটাকে গরম জলে ডুবিয়ে নরম করে নেওয়া হয়, তাই চামচে করে খাওয়ান কনক। রাতে বার্লি কিংবা ভেজিটেবল্‌ স্যুপ কেবল। আগে লাঞ্চে ফাদার ভাত খেতেন। অনেকগুলি পদ পেলে শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠতেন। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। এখনও লাঞ্চে তাঁকে ভাত দেওয়া হয়, তবে গলা ভাত। সঙ্গে বেকড ফিস আর ডিমের সাদা অংশ। সেই সঙ্গে ডাল ও ভেজিটেবল দিয়ে বানানো কোন একটি পদ থাকে। ডায়েট চার্ট করে দিয়েছেন পিটার। ছোট ফাদারের কড়া নির্দেশ সেই চার্টের বাইরে যেন বড় ফাদারকে কেউ কিছু না দেয়। অবশ্য দেওয়ার উপায় কোথায়? বড় ফাদারের ঘরে ঢুকতে গেলে কনক গোমেজের পাহারা পার হতে হবে। আর হনুমানের সাগরলঙ্ঘনও এর চেয়ে সহজতম কাজ। এক সময় নুনিয়া কেবলমাত্র ফাদারের কাছে যেতে পারত। ফাদার তাকে খুব ভালবাসতেন, হয়তো আজও বাসেন। যদিও বেশ কিছুকাল নুনিয়াকেও আর তাঁর কাছে যেতে দেওয়া হত না। কারণ, নুনিয়া গেলেই নাকি বড় ফাদার উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। তাঁর পালস্‌ রেট বেড়ে যেত। তিনি অস্ফুট জড়ান স্বরে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন। না দিলে পাগলের মতো হাত-পা ছুঁড়তেন। এই উত্তেজনা যে তাঁর শরীরের পক্ষে ভালো নয়, তা বুঝেও বুঝতে চাইতেন না। ফলে পিটার শ্যাম বড় ফাদারের কাছে নুনিয়ার আসার উপর বিধিনিষেধ জারি করে ব্যাপারটি একেবারে বন্ধ করে দেন। অবশ্য তার আগে তিনি ছোট ফাদারের সঙ্গে পরামর্শও করে নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৯ : আড়ালে আছে আততায়ী

সাগর উঠে তরঙ্গিয়া

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০২ : ‘স্বজাতির্দূরতিক্রমা’—জন্মগত স্বভাব কি কখনও বদলায়? পঞ্চতন্ত্রের পাতায় এক অমোঘ রাজনৈতিক সত্যের

পিটার যা কিছু করেন, ছোট ফাদারকে না-জানিয়ে করেন না। তিনি থাকেনও ছোট ফাদারের কক্ষের প্রায়-লাগোয়া আউটহাউসের একটি কক্ষে। হাসপাতালের বাকি স্টাফেদের সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলেন না। শোনা যায়, তিনি ব্রাহ্মণ-পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর বাবা-মা তাঁকে ভরণপোষণ করতে না পেরে চার্চের কাছে আশ্রয় এবং সাহায্য প্রার্থনা করলে চার্চ তাঁদের ফেরাতে পারেননি। সেই থেকে তিনি চার্চে মানুষ হয়েছেন এবং তাঁর পরিবার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে চার্চেই থেকে গিয়েছেন। পিটারের বাবা-মা এখনও পাশের রাজ্যে চার্চের বড় হাসপাতালে কাজ করেন। পিটারের বয়স বছর পঁয়ত্রিশ। তবে দেখলে আর-একটু ভারিক্কি লাগে। তাছাড়া অন্যদের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করার জন্য তিনি সকলের সঙ্গে কথাবার্তা যতটা না-বললেই নয়, ততটাই বলেন। এমনকি মেডিসিন বিভাগের সঙ্গেও তিনি কথা বলেন না তেমন, ছোট ফাদারকে বলেন কী কী মেডিসিন লাগবে, সেই মতো ছোট ফাদার সব ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর কথাবার্তা মূলত হয় ছোট ফাদার, কনক গোমেজ এবং টুকটাক বড় ফাদারের সঙ্গে। অবশ্য কী কথা হয়, তা তিনিও বলেননি, বাকিরাও জিজ্ঞাসা করেনি। সকলে কেবলমাত্র জানতে চায়, বড় ফাদার জীবিত এবং মোটামুটি সুস্থ আছেন কি-না। সেই উত্তর অবশ্য পিটার দেন না। তাঁর বদলে দিতেন ছোট ফাদার। বছরখানেক হল, অন্যরা জিজ্ঞাসা করার আগেই তিনি প্রতিদিন বিকেলের দিকে একটা বুলেটিন মতো নোটিশবোর্ডে আটকে দেন, যেখানে ফাদারের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতা সম্পর্কে জানানো হয়। লোকে মনে-মনে তেমন খুশি না হলেও, মেনে নিয়েছে কিংবা বাধ্য হয়েছে মেনে নিতে। বড় ফাদারকে তারা সকলেই খুব ভালোবাসে। দয়ার সাগর ছিলেন যাকে বলে। তাঁর জীবিত থাকাটাই সকলের কাছে একমাত্র কামনা।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯১ : বিপাশা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৪: কুকুরমুখো ফল বাদুড়

গতপরশু রাতে ছোট ফাদার কনক এবং পিটারকে ডেকেছিলেন। জরুরি মিটিং। তাঁদের মধ্যে অনেকদিনই গভীর রাত পর্যন্ত জরুরি মিটিং চলে। তিনি সবাইকে বলেন, “বড় ফাদারের ফারদার ট্রিটমেন্ট নিয়ে ডিসকাসশন করি আমরা। লেটেস্ট ট্রিটমেন্ট-পলিসির ব্যাপারে না জানলে কীভাবে বড় ফাদারকে বাঁচিয়ে রাখব?” শুনে বাকিরা আর কিছু বলে না।

গতপরশু রাতে ফাদার প্রথমে কনককে বললেন, “কনক, ধর যদি এমন হয় যে আমি কিছুকালের জন্য এই চার্চে না থেকে বিদেশে আমার হোমপ্লেসে গেলাম, তুমি নিশ্চয়ই সব সামলে নিতে পারবে?”
প্রশ্ন শুনে কনক চকিত চোখ তুলে তাকালেন। তারপর বললেন, “আপনি আপনার হোমপ্লেসে যাচ্ছেন? কবে? কতদিনের জন্য?”
ফাদার বললেন, “এ-আমার প্রশ্নের উত্তর হল না কনক !”
“উত্তর নির্ভর করছে আপনার যাওয়া-আসার সময়কালের উপর। বলুন…। আপনি নিজে তো জানেন কতদিনে ফিরবেন কিংবা একটা আন্দাজ আছে তো আপনার! সেটা আগে জানলে আমিও আমার মতামত জানাতে পারি।”
ছোট ফাদার বললেন, “আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেতে চাই। দরকার হলে, আজ, কাল, পরশু…যে-কোন সময়…”
“কিন্তু প্লেনের টিকিট ? এত শর্ট টাইম পিরিয়ডে…!” কথা শেষ করল না কনক।
“সেটা চার্চের হেডকোয়াটারের ব্যাপার। আমি জানিয়ে দিয়েছি, তাঁরাও জানিয়ে দিয়েছেন, দিন তিনেকের মধ্যে আমার টিকিটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন তাঁরা। আর টিকিট এসে গেলেই আমি চলে যাব। অন্তত এই ধর মাস ছয়েক কিংবা সাত-আট। পারবে না সামলাতে?”
কনক কিছু বলার আগে পিটার বলে উঠলেন, “কনক ম্যাম যদি না বলেন, তাহলেও আপনার চিন্তার কিছু নেই, আমি তো আছি!”
“আঃ! কথার মাঝখানে কথা বলো না পিটার! আমি কনকের কাছে আনসার চেয়েছি। কনকই বলুক। ও যদি না বলে, তাহলে তখন কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটা ভেবে দেখব ! তোমার অন্য দায়িত্ব থাকবে, তুমি আপাতত ধৈর্য্য ধরে বসো!”
পিটার রক্তাভ মুখ নিয়ে বসে রইলেন। কনক বলল, “সাত-আট মাস চার্চ সামলানো মুখের কথা নাকি?”
“চার্চ সামলাতে বলনি। বলেছি ফাদারের দেখভালের কথা! এর মধ্যে দুনিয়ার সামনে ফাদারকে এক্সপোজ করলে চলবে না, সেটা মানো তো?”
“জানি!”
“তাহলে সেইভাবেই গোটা ব্যাপারটি সামলে নাও। চার্চের দায়িত্ব অন্য কাউকে দিয়ে যাব, ও-ব্যাপারে অনেক কমপিটেন্ট লোক আছে আমাদের। ও-নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।”
“বেশ। আমি চেষ্টা করব আমার সাধ্যমতো সব দিক সামলে নিতে!”
“বড় ফাদারের খবর আগেও যেমন বাইরে যায় নি, এখনও যাবে না। কেবল এ-দিকটা সামলে নাও। বাকি যেমন-তেমন করে চললেও ক্ষতি নেই!” বলে ফাদার পিটারের দিকে ফিরলেন। বললেন, “নাও পিটার, য়্যোর টার্ন!”
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৩৬: অমিতাভ হত্যারহস্য / ১৭

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

পিটার একটু আগে ফাদারের কথায় সামান্য আহত হয়েছিলেন। আর কেউ উপস্থিত না-থাকলে, তাঁর গায়ে লাগত না, কিন্তু সামনে কনক গোমেজ বসে আছেন। সেটাই তাঁর সম্মানহানির মতো মনে হচ্ছিল। কিন্তু ছোট ফাদারকে অস্বীকার কিংবা অগ্রাহ্য করার মতো সাহস বা পরিস্থিতি নেই তাঁর, অতএব এখন মুখে কাষ্ঠহাসি টেনে কোনরকমে পিটার বললেন, “বলুন ফাদার!”
“তোমাকে চার্চের হাসপাতালের ওভারএল ইনচার্জ করে নোটিশ দেব ভেবে রেখেছি। যতদিন না ফিরি তুমি চার্চের হাসপাতালের দায়িত্বভার সামলাবে।”
“কিন্তু ফাদার! ইনচার্জ তো একজন আছেন। তাঁকে সরিয়ে আমাকে দায়িত্ব দেওয়ার কী মানে তা তো বুঝলাম না! আপনার অ্যাবসেন্সের সঙ্গে হসপিটালের ইনচার্জ বদলের কী সম্পর্ক?”
ছোট ফাদার পিটারের দিকে ভালো করে তাকালেন। পিটার কি একটু বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে? নাকি এ-দেশে লোকজন যাকে বলে, ডানা গজানো, সে-রকম ডানা গজিয়েছে পিঁপড়ের? তা-না-হলে এত প্রশ্ন করছে কেন?

ফাদারের তাকান দেখে পিটার বুঝতে পারছিলেন, আবার একটা ব্লাণ্ডার করে ফেলেছেন তিনি। কোনওরকমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তড়িঘড়ি বললেন, “না মেন আমি বলতে চাইছিলাম, আমি তো হসপিটালের কিছুই চিনি না। আর কারুর সঙ্গে আমার সদ্ভাব তো দূরের কথা, আলাপ-পরিচয়ও তেমন নেই। আপনিই বারণ করে দিয়েছিলেন, ওদের সঙ্গে বেশি কথা না বলতে। আমিও সেটাই করেছি। এতদিন বড় ফাদারের চিকিৎসার যে ব্যাপার এখানে চলছে, সে দায়িত্ব আমি পালন করেছি, করে আসছিও সুষ্ঠুভাবেই। কিন্তু এখন একটা গোটা হসপিটাল চালানোর মতো অভিজ্ঞতা কোথায় আমার? বরং বললে, ড্রাইভ করে আপনার মালপত্র কিছু আনার বা পাঠানোর থাকলে ডেলিভারি-ম্যানের কাজ করে দিতে পারি। কিন্তু গোটা হসপিটাল চালানোর মতো দক্ষতা আমার আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না!”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬২: যুদ্ধের নৃশংসতা নয়, জনমানসে ঠাঁই পায় শুধু যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য

ফাদার বললেন, “তোমাকে বিশেষ কিছু করতে হবে না। কেবল মেডিসিনের রিক্যুয়ারমেন্টগুলি দেখে অর্ডার যথাস্থানে প্লেস করা। মেইলগুলি ঠিকঠাক্‌ করছে কিনা চেক করা— এইসমস্ত আরকি ! ওতে খুব অসুবিধা হবে না তোমার। তোমাকে তো আমি পেশেন্ট দেখতে বলছি না পিটার। কেন বলছি না, সে-কথা তুমি নিজেই ভালো করে জানো!”
“ফাদার! আপনি যা বলছেন, তাতে কিন্তু খুব রিস্ক! ঘূণাক্ষরেও যদি কেউ টের পায় যে আমি…”
“আঃ! বড্ড বাজে কথা বল তুমি! তোমাকে এত ভাবতে কে বলেছে অ্যাঁ? বলেছি তো তোমার হয়ে, সকলের হয়ে ভাবনাচিন্তা করার দায়িত্ব প্রভু যীশু আমাকে দিয়েছেন। তা আমার কাজটি আমায় করতে দাও!”
“আমি কিন্তু আপনাকে সে-কথা বলতে চাইনি ফাদার! হসপিটাল চালাতে হবে ইনচার্জ হিসেবে, শুনেই আমার হাত-পা পেটের ভিতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে!”
“তুমি এত ভীতু, তা তো জানতাম না!”
“স্যার, চারপাশের খবর রাখছেন না আপনি? বুঝতে পারছেন না, ক্রমশ অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে? সাইকেলের কী অবস্থা শুনেছেন তো? এরপর কোনদিন না চার্চে পুলিশ এসে পড়ে!”
ছোট ফাদার তার কথার জবাব না দিয়ে বললেন, “কনক, তুমি যাও, গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমাদের মধ্যে অনেক আলোচনা সারার আছে আজ। বেশ রাত হবে। যাও, তুমি চলে যাও!”
ফাদারের কথা শুনে কনক গোমেজ বুঝতে পেরেছিলেন, নিশ্চয়ই এমন কোনও গোপন কাজ বা পরামর্শ, যার জন্য ফাদার চাইছেন না, তিনি সেখানে থাকুন। অতএব তিনি উঠে পড়লেন, “গুড নাইট ফাদার, গুড নাইট ডক্টর শ্যাম” বলে বেরিয়ে গেলেন।
“ব্রিলিয়ান্ট মহিলা!” পিতার মন্তব্য করলেন কনকের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে।
“সেইসঙ্গে ভালো অভিনেত্রীও!” ছোট ফাদার বললেন, “এখন যা বলছি শোন। সাইকেল ধরা পড়েছে এটা বড় কথা নয়, নুনিয়াকে আমরা ধরতে পারিনি, সেটাই আসল কথা! নুনিয়া আমাদের চার্চের কাছে বড় থ্রেট। বড় ফাদারের ব্যক্তিগত দুর্বলতার জন্য নুনিয়াকে তিনি সেভ শেলটার দিয়ে এসে আজ এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছেন আমাদের। আমার ইচ্ছে করছে… নাহ্‌, নুনিয়াকে তুলে আনতে গিয়ে আমি এখনই জেলে যেতে চাই না। কোনওদিনই চাই না অবশ্য। অতএব আমার নিজেকেই এখন শেফ শেলটার খুঁজতে হবে। বুঝতে পারছ, নিজের হোমপ্লেসে কেন ফিরতে চাইছি? এখানকার পরিস্থিতি শান্ত না হলে, এ-মুখো আর হব না!”
“নুনিয়া এখন কোথায়?”
“কোথায় তা ঠিক জানি না, তবে আমার অনুমান, তারা এখন পুলিশ-প্রোটেকশনের মধ্যে আছে। কলকাতা থেকে আসা গোয়েন্দাটিকে আবার নুনিয়ার খুব মনে ধরেছে। সে যদি না বাঁচাতো, তাহলে সেদিনই জঙ্গলে যখন পথ হারিয়েছিল, ওকে আমরা নিকেশ করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু ব্যাড লাক আমাদের। নুনিয়া ওইসময়েই ওখানে উপস্থিত হয়ে আমাদের প্ল্যান চৌপাট করে দেয়। এখন সে পুলিশের হাতে গিয়ে পড়েছে, এটা আমাদের কাছে কতদূর থ্রেট বুঝতে পারছো?”
“পারছি ফাদার!”
“যাই হোক, তুমি সামলে নাও। আমি কনকের সামনে সত্যি কথা বলিনি। চাইনি ইচ্ছে করেই আর-কি। আর কোন কারণ নেই না বলার। যাই হোক, অবস্থা হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে, আমি মাস দেড়েক আগেই হেডঅফিসে মেইল করেছিলাম। তার উত্তরও পেয়ে গিয়েছিলাম। টিকিট এসে গেছে এক সপ্তাহ আগেই। পরশু এখান থকে কলকাতা রওনা হব। যদি সব ঠিক থাকে, তার পরের দিন দমদম থেকে দিল্লী। তারপর দিল্লী থেকে ফ্লাইট ধরে আপাতত, বাই-বাই পিশাচপাহাড়!”
“আমাকে রিস্কের মুখে ঠেলে দিয়ে আপনি কেটে পড়ছেন তাহলে?”
“তোমার নাম কোথাও আসবে না পিটার। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো!”
“বললেই কি আর নিশ্চিন্ত হওয়া যায়? আপনি যাচ্ছেন যান! আমি দেখব যতটা পারা যায়!”
“হ্যাঁ, যেতে আমাকে হবেই!” ফাদার বললেন।

সকাল থেকেই আজ সাজো-সাজো রব সেকারণেই। ফাদারের জিনিষপত্র বাঁধাছাঁদা কমপ্লিট আগেই। ফাদার যাবেন চার্চের অ্যাম্বুলেন্সে। মেডিক্যাল কিছু জিনিসপত্র কিনে কলকাতা থেকে সেই অ্যাম্বুলেন্স ফিরে আসবে। যাওয়ার আগে জনে-জনে ডেকে ফাদার কাল থেকেই পাখিপড়ার মতো বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আজকেও দিচ্ছেন আর ঘন-ঘন মোবাইল দেখছেন। যেন কারুর ফোনের অপেক্ষা করছেন। ফোন এল তখন দশটা বাজে। ফাদার ফোন হাতে অফিসঘরের দিকে চলে গেলেন। তাঁর মুখে আঁধার ঘনাচ্ছিল। —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content