রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) কলাপাতার নিচে কুকুরমুখো ফল বাদুড়ের গোষ্ঠী। (ডানদিকে) ডুমুর ভক্ষণরত কুকুরমুখো ফল বাদু। ছবি : সংগৃহীত।

এবছর জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে একদিন দ্বিপ্রহরের ঠিক আগে হঠাৎ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের খেয়ালে আমি ও আমার ভাইপো সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। কাকদ্বীপ স্টেশন ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকতেই হঠাৎ নজরে এল এক ঝাঁক বাদুড় চড়া রোদে উড়ছে। একেবারেই অস্বাভাবিক ঘটনা কারণ বাদুড় নিশাচর প্রাণী। ভরদুপুরে কখনোই ওরা আকাশে ওড়াউড়ি করে না। তাহলে? সাইকেল থেকে নামলাম। কারণ বোঝার চেষ্টা করলাম। নজরে এল একটা বাগান যেখানে রয়েছে চার-পাঁচটি তালগাছ। গাছগুলির কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখি প্রত্যেকটি গাছের বেশিরভাগ পাতা ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। বুঝতে অসুবিধে হল না যে ছেঁটে দেওয়া পাতাগুলোর মধ্যেই ছিল বাদুড়গুলোর বাসা। বাসাচ্যুত হওয়ায় বাদুড়গুলি উদভ্রান্তের মতো উড়ছিল। মনে পড়ে গিয়েছিল কবি জীবনানন্দ দাশের “রূপসী বাংলা” কাব্যগ্রন্থ থেকে কয়েকটা লাইন –
“গভীর আঁধার আরো— দেখিয়াছি বাদুড়ের মৃদু অবিরত
আসা-যাওয়া আমরা দু’জনে ব’সে— বলিয়াছি ছেঁড়াফাঁড়া কত
মাঠ ও চাঁদের কথা! ম্লান চোখে একদিন সব শুনেছ তো”।


সঙ্গে এও বুঝে গেলাম যে এই বাদুড়গুলি হল ‘Greater short-nosed fruit bat’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Cynopterus sphinx’। এদের প্রজাতির নাম স্ফিংস। স্ফিংস হল গ্রিক কাল্পনিক পৌরাণিক চরিত্র। এর মাথাটা মানুষের মতো, ঈগলের মত দুটো বিশাল ডানা রয়েছে, আর মাথার পর থেকে দেহের শেষাংশ সিংহের মতো। কুকুরমুখো বাদুড়ের মুখের সাথে স্ফিংসের মুখের মিল না থাকলেও ডানা দুটো বেশ বড়। হয়তো সেই কারণেই প্রজাতির নামকরণে স্ফিংস শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ইংরেজি নামের মধ্যে short-nosed কথাটা থাকলেও এদের নাক মোটেই খ্যাঁদা বা বোঁচা নয়! এমন নামের কারণও আমার অজানা। সম্ভবতঃ এই গোষ্ঠীর বাদুড়দের মধ্যে এদের মুখের অগ্রভাগ অন্য সদস্যদের মতো বেশি সূচালো নয় বলে এমন নামকরণ। বরং এদের মুখের আকার অনেকটা কুকুরের মতো বলে এদের ‘Indian Dog-faced fruit bat’-ও বলা হয়। সাধারণভাবে সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষ এদের বাদুড় নামে ডাকলেও এদের কোনও সঠিক বাংলা নাম না পাওয়ায় আমি নাম দিলাম কুকুরমুখো ফল বাদুড়।
কুকুরমুখো ফল বাদুড়কে এই যে প্রথম দেখলাম তা নয়। খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে ২০-২২ বছর আগে। কিছুদিনের জন্য একটি বাড়িতে ভাড়া ছিলাম আর সেই বাড়ির মালিকের ছিল ভাঙাচোরা জিনিসপত্র রাখার জন্য একটি গোডাউন। গোডাউনের সবগুলো জানালার পাল্লা ছিল ভাঙা, আর বছরে একবারও দরজা খোলা হত কিনা সন্দেহ। সেই গোডাউনের সিলিং থেকে ঝুলে যাওয়া ইলেকট্রিকের তারে এবং দেয়াল থেকে বেরিয়ে থাকা কয়েকটি রডে এই বাদুড়দের একদিন ঝুলে থাকতে দেখেছিলাম। দূরত্ব যথেষ্ট কম থাকায় বেশ ভালোভাবেই এদের দেখতে পেয়েছিলাম এবং আমার সস্তার ক্যামেরা দিয়ে ছবিও তুলতে পেরেছিলাম। দেখেছিলাম কুকুর কিংবা শেয়ালের মতো মুখটা সরু ও লম্বা, অনেকটা ভারতীয় ফলভূক বাদুড় বা ইন্ডিয়ান ফ্লাইং ফক্সদের মতো। কিন্তু চোখদুটো যেন অন্যরকম, একটু বড় আর উজ্জ্বল। আর একটা বৈশিষ্ট্য খুব ভালোভাবে নজরে এসেছিল তা হল ওদের কানের প্রান্তভাগ সাদা। চোখ আর কানের এই দুটো বৈশিষ্ট্য নিশ্চিতভাবে ইন্ডিয়ান ফ্লাইং ফক্স বা ভারতীয় ফলভূক বাদুড়দের মতো নয়। তাহলে এরা কোন ধরনের বাদুড়? বইপত্র খোঁজাখুঁজি করতেই হল। এস এইচ প্র্যাটারের লেখা “The Book of Indian Animals” থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেল। বুঝলাম এরা ভিন্ন প্রজাতির বাদুড় ‘Cynopterus sphinx’। শুধু সুন্দরবন নয়, প্রায় সারা ভারতবর্ষ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি জুড়ে এই কুকুরমুখো ফল বাদুড় দেখা যায়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭০ : চার্চ হাসপাতালের সেই সকাল

সাগর উঠে তরঙ্গিয়া

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০২ : ‘স্বজাতির্দূরতিক্রমা’—জন্মগত স্বভাব কি কখনও বদলায়? পঞ্চতন্ত্রের পাতায় এক অমোঘ রাজনৈতিক সত্যের

এই কুকুরমুখো ফল বাদুড়ের আকার ভারতীয় ফল বাদুড়ের থেকে অনেকটাই ছোট। এরা লম্বায় হয় ৭০ থেকে ১২৭ মিলিমিটার আর ওজন হয় মাত্র ৭৫ থেকে ১০০ গ্রাম। এদের একটা ছোট লেজও আছে যার দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ১৫ মিলিমিটার। এদের দুটো ডানা কিন্তু বেশ চওড়া, চামচিকাদের মতো। যখন দুটো ডানা ছড়ায় তখন তার বিস্তার হয় ৪৫ থেকে ৪৮ সেন্টিমিটার। আর ডানার চামড়া খুব পাতলা ও অর্ধস্বচ্ছ হওয়ায় ওড়ার সময় ডানার হাড়ের সাদাটে রং খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। এদের গায়ের লোম খুব নরম, ছোট এবং রেশমের মতো মসৃণ। দেহের ঊর্ধ্বাংশের রং ধূসর-বাদামি বা বাদামি। অবশ্য পেটের দিকের রং কিছুটা ফ্যাকাশে। পরিণত পুরুষ কুকুরমুখো ফল বাদুড়দের ক্ষেত্রে ঘাড়ের কাছে কমলা বা হলুদ রঙের লোম দেখা যায়।

কুকুরমুখো ফল বাদুড়দের থাকার প্রিয় জায়গা যে তালগাছ তা ছোটবেলা থেকেই জানতাম। অবশ্য তখন শুধু বাদুড় বলেই জানতাম। ছোটবেলার সেই জানা বাদুড়গুলো যে কুকুরমুখো ফল বাদুড় তা জেনেছি ওই “The Book of Indian Animals” থেকেই। ফলে এই লেখার শুরুতে তালগাছের পাতা কেটে নেওয়ার কারণে ভরদুপুরে যে বাদুড়দের উড়তে দেখেছিলাম বলে লিখেছি তাদের সহজেই এই প্রজাতির বাদুড় হিসেবে বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়নি। আমাদের গ্রামের বাড়িতে একটা বহু পুরনো বিশালাকার স্ত্রী তালগাছ ছিল বাঁশবাগানে। এছাড়া আরও তিনটে তাল গাছ ছিল অন্য একটি পুকুরপাড়ে যেগুলোর মধ্যে একটা স্ত্রী তালগাছ। মাঝে মাঝে তালশাঁস খাওয়ার জন্য কচি তাল পাড়ানোর উদ্দেশ্যে লোককে তালগাছে ওঠানো হত। সেই সময় লক্ষ্য করতাম তালগাছের বেশ কিছু পাতা এমন ভাবে মোচড়ানো যেন দেখে মনে হবে তালপাতার টোপর।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯১ : বিপাশা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৩: বাদুড়

শুকনো তালপাতা যখন গাছ থেকে খসে পড়ত তখনও কোনও কোনও তালপাতা এইরকম টোপরের মতো মোচড়ানো হত। কারণটা বুঝতাম না। ভাবতাম হয়তো ঝড়ে এইভাবে পাতা মুচড়ে গিয়েছে। পরে বই পড়ে জানলাম যে এ হল কুকুরমুখো পুরুষ ফল বাদুড়ের কীর্তি। প্রজননকালে সে তালপাতার শিরাগুলোকে চিবিয়ে চিবিয়ে নরম করে ফেলে। ফলে তালপাতা খাড়া না থেকে নিচের দিকে ঝুলে পড়ে এবং অনেকটা তাঁবুর মতো আকৃতি নেয়। তালপাতার এই তাঁবুর ভেতর একটা পুরুষ ডেকে নেয় তার পছন্দের ১০-১৫ টি স্ত্রী কুকুরমুখো ফল বাদুড়কে। অর্থাৎ তালপাতার এই তাঁবু হল একটি পুরুষের জেনানা মহল। পুরুষ তার জেনানা মহলকে অন্যের দখলদারি থেকে কঠোরভাবে রক্ষা করে। শুধু প্রজনন নয়, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে, তীব্র সূর্যালোক, গরম ও শত্রুর খপ্পর থেকে রক্ষা পেতে এই তাঁবুর গুরুত্ব অপরিসীম। তালপাতার তাঁবু বানাতে এমন ওস্তাদ বাদুড় আর দুটি নেই। প্রজননকালে এইরকম তাঁবু আর তার মধ্যে জেনানা মহল তালবাগানে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। ওরা তালের কাঁদির মধ্যেও আস্তানা তৈরি করে। অনেক তাল আছে এমন একটা কাঁদির কেন্দ্রে তাল কেটে কেটে ওই তাঁবু বানিয়ে নেয়। আমি ছোটবেলায় গাছ থেকে মাঝে মাঝে আধা খাওয়া তাল পড়তে দেখতাম। কখনও ছোট ছোট তাল খসে পড়তেও দেখতাম। তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন জানি এসব ছিল পুরুষ কুকুরমুখো ফল বাদুড়ের কীর্তি। তবে যেখানে তালগাছের অভাব রয়েছে সেখানে এরা পাতাবহুল লতানে গাছের শাখা ও পাতা মুড়ে ও পাকিয়ে এই ধরনের তাঁবু তৈরি করে নেয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) কলাপাতার নিচে কুকুরমুখো ফল বাদুড়ের গোষ্ঠী। ছবি : সংগৃহীত। (ডানদিকে) কুকুরমুখো ফল বাদুড়। ছবি : লেখক।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মধ্যে তালগাছের অভাব থাকায় এই ধরনের তাঁবুর ওপর ওরা ভরসা করে। কিন্তু সুন্দরবনের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় তালগাছ থাকায় তাঁবু বানানোর জন্য ওদের প্রথম পছন্দ এই তালগাছ। আর দ্বিতীয় পছন্দের গাছ হল দেবদারু। অবশ্য শহরাঞ্চলে তালগাছ বা দেবদারু গাছের অভাবে পরিত্যক্ত বাড়ির মধ্যে যেখানে সূর্যের আলো সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না এবং অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা সেখানে এদের দিনের বেলায় অস্থায়ীভাবে থাকতে দেখা যায়। যেমনটা আমি গোডাউনে দেখেছিলাম এবং তার ছবিও তুলেছিলাম। অনেক সময় শহুরে মানুষ বিভিন্ন লতানে গাছগাছালি ছাদে বা কার্নিশে চাষ করেন। আবার কখনও কখনও জংলি লতা কার্নিশ বেয়ে উঠে আসে। ওইসব লতানে গাছের কাছে যদি মানুষের যাতায়াত খুব কম থাকে তবে সেইসব লতানে গাছের মধ্যেও ওদের কখনও কখনও আস্তানা তৈরি করতে দেখা যায়। শহর বা গ্রামে হোক কিংবা জঙ্গলে দিনের বেলায় ওরা আস্তানায় ঝুলন্ত অবস্থায় ঘুমায় আর আঁধার নামলেই বেরিয়ে পড়ে খাবারের সন্ধানে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৩৬: অমিতাভ হত্যারহস্য / ১৭

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

এই বাদুড়দের নামের সঙ্গে ফল কথাটা যুক্ত থাকায় সহজেই এদের খাদ্যাভ্যাস সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। বট, অশ্বত্থ, ডুমুর ইত্যাদির ফল, খেজুর, কলা, পেয়ারা, আম, লিচু— এ সবই হল এদের প্রিয় খাদ্য। পাকা না পেলে আধাপাকা বা কাঁচা ফলও এরা খেয়ে নিতে ছাড়ে না। এরা কিন্তু গন্ধ শুঁকেই কোথায় কী ফল ফলেছে তা বুঝতে পারে। অসাধারণ ঘ্রাণশক্তি এদের। গাছের শাখায় ঝুলে ঝুলে খাওয়ার সময় ফল মুখের ভেতরে নিয়ে তার রস চেপে চেপে খেয়ে তারপর তার ছিবড়ে এবং ফলের বীজ ফেলে দেয় বলে অনেকেই মনে করে যে মুখ দিয়ে মলত্যাগ করছে। আর স্কুলপাঠ্য ছোটদের বইতে বাদুড় মুখ দিয়ে মলত্যাগ করে বলে ভুলভাল কথা দিনের পর দিন লেখা থাকছে এবং শিশুদের এইসব ভুলভাল কথা শেখানো হচ্ছে। খেজুরগাছে রস দিলে এরা জিভ দিয়ে চেটে চেটে খেজুর গাছের ছিলে নেওয়া অংশের থেকে রস খায়। জ্যোৎস্নালোকিত রাতে আমাদের গ্রামের খেজুর গাছে এ দৃশ্য কয়েকবার দেখেছি। আবার যেসব গাছে রাত্রে ফুল ফোটে সেই সব গাছের পরাগরেণু আর মকরন্দ রয়েছে এদের খাদ্য তালিকায়। শিমুল এবং গোলাপজাম গাছের ফুলের মধু ও পরাগরেণু এদের খুব পছন্দ। কখনও কখনও এদের গাছের পাতা খেতেও দেখা যায়, যদিও গাছের পাতা এদের খাদ্য নয়। শরীরে খনিজ উপাদানের অভাব হলে তখন ওদের পাতা খেতে দেখা যায়। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের চাহিদা মেটাতে ওরা পাতা খায়। তাছাড়া অনেক সময় ওদের কাদা বা মাটি খেতেও দেখা যায়। ওদের দেহে বিভিন্ন স্বল্পমাত্রিক মৌল বা ট্রেস এলিমেন্টের অভাব পূরণ করার জন্য এবং শরীরে উৎপন্ন বিভিন্ন বিষাক্ত উপাদানকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য ওদের মাটি খেতে হয়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬২: যুদ্ধের নৃশংসতা নয়, জনমানসে ঠাঁই পায় শুধু যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য

কুকুরমুখো ফল বাদুড়ের জেনানা মহলের কথা আগেই বলেছি। একই তালগাছে কিংবা পাশাপাশি অনেকগুলো তালগাছে কিংবা জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা এলাকা জুড়ে এইরকম কুকুরমুখো স্ত্রী ফল বাদুড়দের গোষ্ঠীবদ্ধভাবে প্রজনন করতে দেখা যায়। বছরে দু’বার এদের প্রজনন হয় — একবার ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে এবং আরেকবার জুলাই-আগস্ট মাসে। একটি মা কুকুরমুখো ফল বাদুড় প্রতিবারে একটি করে বাচ্চার জন্ম দেয়। গর্ভাবস্থা স্থায়ী হয় ৩.৫ – ৫ মাস। শীতকালে গর্ভাবস্থার স্থায়িত্ব বেশি হয় কারণ পরিবেশের উষ্ণতা কম থাকায় ভ্রুণের পরিস্ফুটন দীর্ঘায়িত হয়। এরা হল বহুগামী বাদুড়। ৬-১০ টি প্রজননক্ষম পুরুষ কুকুরমুখো ফল বাদুড় ১০-১৫ টি স্ত্রী বাদুড়ের সঙ্গে প্রজনন করে এবং এরা সাধারণত একটা তালগাছে তাঁবু তৈরি করে। যে পুরুষরা প্রজননে অংশ নিতে পারে না তারা অন্যত্র দলবদ্ধভাবে থাকে। তবে একটি অত্যাশ্চর্য ঘটনা দেখা যায় এদের স্ত্রী ও পুরুষের যৌন মিলনকালে। স্ত্রী বাদুড়কে পুরুষ বাদুড়ের শিশ্ন অর্থাৎ লিঙ্গ চাটতে দেখা যায়। যৌন মিলনরত অবস্থাতে স্ত্রী বাদুড়কে পুরুষের শিশ্নের গোড়ার দিক চাটতেও দেখা যায়। যৌন মিলনকাল শেষ হলে স্ত্রীরা তাদের আস্তানায় থেকে যায় আর পুরুষরা কিছুদিন পর ওখান থেকে চলে গিয়ে তাদের দলবদ্ধ আস্তানায় থাকতে শুরু করে। অর্থাৎ স্ত্রী ও পুরুষ কুকুরমুখো ফল বাদুড়দের দলবদ্ধ আস্তানা হয় পৃথক পৃথক। কেবল প্রজননকালেই এরা কাছাকাছি আসে। যাইহোক এদের এই বিচিত্র যৌন মিলনের কারণে মিলনকাল দীর্ঘস্থায়ী হয়। আরও একটি বিচিত্র বৈশিষ্ট্য এদের দেখা যায়। স্ত্রী কুকুরমুখো ফল বাদুড়ের জরায়ুতে দুটি খন্ড থাকে। সাধারণভাবে প্রথম সন্তানের জন্ম হয় ডান খন্ডে। পরবর্তী সন্তানের জন্ম হয় বাম খণ্ডে। সদ্য জন্মানো বাচ্চার ওজন হয় প্রায় ১৩.৫ গ্রাম। কিন্তু চার সপ্তাহ পরে যখন তাদের গায়ে লোম ভর্তি হয়ে যায় তখন এর ওজন হয়ে দাঁড়ায় ২৫ গ্রাম। স্ত্রী বাচ্চা বাদুড়ের প্রজননক্ষম হয়ে উঠতে ৫-৬ মাস সময় লাগলেও পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় এক বছর লেগে যায়।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) ফুলের পরাগরেণু ও মকরন্দ ভক্ষণরত কুকুরমুখো ফল বাদুড়। (ডানদিকে) রাতের আঁধারে উড়ন্ত কুকুরমুখো ফল বাদুড়। ছবি : সংগৃহীত।

রাত্রিকালীন পরাগমিলন ঘটে এমন উদ্ভিদের ফুলে পরাগমিলনের জন্য এই কুকুরমুখো ফল বাদুড়ের গুরুত্ব অপরিসীম। যারা কলার চাষি তাদের কাছে পরম বন্ধু হল এই বাদুড়। এইজন্য কলাবাগানের ভেতরে বা আশেপাশে রাত্রিবেলায় কখনও কোনও আলো জ্বালাতে নেই। সুন্দরবনের অনেক ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের পরাগমিলন এই বাদুড়রাই করে থাকে। তাছাড়া এরা যেসব ফল খায় তার অনেক বীজ মলের সাথে নির্গত হয়। এইভাবে এরা এক জায়গার বীজ অন্যত্র ছড়িয়ে দিয়ে অরণ্যের বিস্তারে এবং বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। আর ঠিক এই কারণেই এদের একটা উপাধি জুটেছে — “রাতের মালী”। আই ইউ সি এন এবং ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগ জানাচ্ছে যে রাতের মালীরা আমাদের দেশে বিপন্ন নয়। কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সুন্দরবন অঞ্চলে তালগাছের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। কমছে সুন্দরবনের জঙ্গলও। বসতি এলাকায় বাগানের ফল রক্ষা করতে বাগানের মালিকরা ফলের গাছগুলো জাল দিয়ে ঘিরে দিচ্ছে। তাহলে এরা বাঁচবে কী করে? রাতের মালীরা না বাঁচলে প্রকৃতির বাগান বা চাষির ফলবাগান বাঁচবে তো?—চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content