বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) পেঁপে খেতে ব্যস্ত ভারতীয় ফলভূক বাদুড়। (ডানদিকে) কলা ফুলের মধু খাচ্ছে ভারতীয় ফল বাদুড়। ছবি : সংগৃহীত।

“আদুর বাদুড় চালতা বাদুড় কলা বাদুড়ের বে,
টোপর মাথায় দে,
দেখতে যাবে কে,
চামচিকাতে বাজনা বাজায় খ্যাংরাকাঠি দে।”
প্রচলিত এই শিশুতোষ লোকছড়া জানে না এমন বাঙালি পাওয়া মুশকিল। বাদুড় দেখুক বা না দেখুক ছড়ায় বাদুড়ের সঙ্গে সব বাঙালির পরিচয় ঘটে যায় শৈশবে। তবে গ্রামাঞ্চলের বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের কাছে বাদুড় খুব পরিচিত প্রাণী। সুন্দরবন অঞ্চলের জনবসতি এলাকায় একসময় অনেক বড় বড় বট ও অশ্বত্থ গাছ দেখা যেত। সেই সব গাছের পাতার আড়ালে দিনের বেলায় ঝুলে থাকত অসংখ্য বাদুড়। তাল গাছেও ঝুলে থাকত। তারপর সন্ধ্যে হলেই দল বেঁধে উড়ে যেত খাবারের সন্ধানে। চলত রাতভর খানাপিনা। আমাদের গ্রামের বাড়িতে অনেকগুলো পেয়ারা ও আমের গাছ ছিল। বাড়ির সামনে থাকা পেয়ারা গাছটায় রাতে ঝটাপট আওয়াজ পেতাম। আর সকালবেলায় দেখতাম গাছের নিচে পড়ে রয়েছে অনেক আধা খাওয়া পেয়ারা। বুঝতে অসুবিধে হত না এগুলো ওই বাদুড়দের কীর্তি। আমাদের একটা পুকুরের পাড়ে প্রচুর কাঁঠালি কলার গাছ ছিল। কলার কাঁদি লক্ষ্য রাখতে হতো। কলা পাকতে শুরু করলেই মাঝে মাঝে দেখতাম বেশ কিছু পাকা কলার খোসা কিংবা আধা খাওয়া কলা কাঁদিতে লেগে রয়েছে। এগুলো যে বাদুড়ের কাণ্ড বুঝতেই পারতাম। পাড়ার কেউ কেউ পরামর্শ দিত জাল দিয়ে পেয়ারা গাছ বা কলার কাঁদি ঘিরে দিতে।

বাবা বলতেন, তাহলে বাদুড়রা খাবে কী? এগুলোই তো ওদের খাবার। ওদের খাবার থেকে বঞ্চিত করলে ওরা বাঁচবে কী করে? ওদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে যা বেঁচে থাকবে সেগুলোই আমরা খাব। বাবার এই কথাগুলো আমি আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। আমার বর্তমান বাড়ির সামনে ও পিছনে কয়েকটা আম, একটা পেয়ারা ও একটা জামরুল গাছ আছে। যথেষ্ট ফলন হয়। বাদুড়ের আনাগোনাও নিয়মিত বুঝতে পারি। রাতের আলো-আঁধারিতে দেখি ওরা গাছের ডাল থেকে ঝুলে আছে। বেশ কয়েকবার আমার সস্তার ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করেছি। ছবি অস্পষ্ট হলেও ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে ওদের চোখগুলো আগুনের ভাটার মতো জ্বলজ্বল করছিল। সুন্দরবনের অতি পরিচিত এই বাদুড়রা হল ভারতবর্ষের প্রধান বাদুড় প্রজাতি। এদের ইংরেজিতে বলা হয় ‘Indian flying fox’ বা ‘Greater Indian fruit bat’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Pteropus medius’ । অবশ্য আরও দুটি জাতের বাদুড় সুন্দরবনের অরণ্য অংশে স্বল্প সংখ্যায় দেখা যায়। এরা হল ছোটো নাসাবিশিষ্ট ফলভূক বাদুড় (Greater short nosed fruit bat, Cynopterus sphinx) এবং হলুদ বাদুড় (Lesser Asiatic yellow bat, Scotophilus kuhlii)।
বাদুড়দের আস্তানা যেহেতু পাতাবহুল বড় বড় বৃক্ষ তাই সুন্দরবনের জঙ্গল ওদের থাকার জন্য আদর্শ। কিন্তু শুধু থাকার জায়গা থাকলে তো হয় না, খাবার চাই। আর উপযুক্ত খাবার মেলে জঙ্গল লাগোয়া জনবসতি এলাকায়, কারণ সেখানেই ওদের প্রিয় খাবার আম, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, ডুমুর, পাকা খেজুর ইত্যাদি ফল এবং বিভিন্ন ফুলের মধু, খেজুরের রস ইত্যাদি পাওয়া যায়। এই কারণে সুন্দরবনের জনবসতি এলাকাতেও ভারতীয় ফলভূক বাদুড় প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। আবার শুধু থাকার জায়গা ও খাবার থাকলেই তো হয় না, জল চাই। আর তাই কাছাকাছি মিষ্টি জলের উৎস যেমন নদী, খাঁড়ি, পুকুর, হ্রদ বা খাল থাকা দরকার। এই কারণে সুন্দরবন এলাকা বাদুড়দের উপযুক্ত বাসস্থান। আর বাদুড়রা একই বাসস্থানে বংশপরম্পরায় বসবাস করতে পছন্দ করে। যেহেতু বট, অশ্বত্থ, তেঁতুল, তাল ইত্যাদি গাছ দীর্ঘজীবী তাই বসতি এলাকায় এইসব গাছ ওদের বাসস্থান হিসেবে পছন্দের গাছ। আর জঙ্গলের মধ্যে বড় বড় ম্যানগ্রোভ গাছ তো রয়েছেই ওদের থাকার জন্য।

বাদুড় উড়তে পারলেও সে কিন্তু পাখি নয়, স্তন্যপায়ী প্রাণী। অর্থাৎ এদের বাচ্চারা মায়ের স্তনদুগ্ধ পান করে বড় হয় আর স্ত্রী বাদুড় বাচ্চা প্রসব করে। অধিকাংশ সময় স্ত্রী বাদুড় একটাই বাচ্চা প্রসব করে। জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ মা বাদুড় বাচ্চাকে তার সঙ্গে সঙ্গেই বয়ে নিয়ে যায়। বাচ্চা তার মাকে আঁকড়ে থাকে। বাচ্চা বাদুড় তার নখর ও দাঁত দিয়ে মায়ের লোম ধরে থাকে। জন্মের সময় থেকেই বাচ্চাদের পিছনের পা খুব শক্তিশালী হয় এবং নখরও খুব তীক্ষ্ণ হয়। ফলে জন্মের পরেই বাচ্চা তার পিছনের দুটো পা দিয়ে মায়ের কোমর পেঁচিয়ে আঁকড়ে থাকতে পারে। আবার মা যখন আকাশে ওড়ে তখন অতিরিক্ত অবলম্বন হিসেবে বাচ্চা বাদুড় তার মায়ের স্তনবৃন্ত কামড়ে ধরে থাকে। আর মা যখন ঝুলে থাকে তখন তার দুটো ডানা দিয়ে বাচ্চাকে ঘিরে ধরে সুরক্ষা ও উষ্ণতা দেয়। প্রায় পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত বাচ্চা মায়ের স্তনদুগ্ধ পান করে। দেড় বছর থেকে দু’বছর বয়স হলে বাদুড় প্রজননে সক্ষম হয়। এদের গর্ভাবস্থা ১৪০ থেকে ১৫০ দিন স্থায়ী হয়। জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষ বাদুড়ের মধ্যে প্রজনন ঘটে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বাচ্চার জন্ম হয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫২: বেজি

হয়তো আগামী ছবির নাম রাখতেন ‘হাওয়া-মোরগ’

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬১: আধুনিক ক্ষমতাদখলের লড়াই ও রাজসূয়যজ্ঞের প্রেক্ষিতে যুদ্ধজয় ও অধিকারপ্রতিষ্ঠার মধ্যে সাযুজ্য কোথায়?

ভারতীয় বাদুড়ের মধ্যে সুন্দরবনের এই ফলভূক বাদুড় অর্থাৎ ইন্ডিয়ান ফ্লাইং ফক্স সবচেয়ে বড় বাদুড়। পৃথিবীর মধ্যেও অন্যতম বড় আকারের বাদুড়। যখন এরা ডানা ছড়ায় তখন ৩ ফুট ১১ ইঞ্চি থেকে ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি বিস্তার হয়। লম্বায় হয় গড়ে ৬.১ ইঞ্চি থেকে ৮.৭ ইঞ্চি। স্ত্রী বাদুড়ের থেকে পুরুষ বাদুড় আকারে বড় হয়। গড় ওজন হয় ৬০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৬০০ গ্রাম। ওদের ডানার বুড়ো আঙুলে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী নখর। পরের আঙুলেও একটা নখর রয়েছে। তবে পায়ের পাঁচটি আঙুলেই নখর রয়েছে। পায়ের বুড়ো আঙুলের নখরও খুব শক্তিশালী। এদের লেজ থাকে না। এদের পিঠের দিকের রঙ কালো তবে হালকা ধূসরের রেখা থাকতে পারে। মাথা ও ঘাড়ের রং বাদামি বা ইট-রঙা আর নিচের দিকের রঙ কালচে বাদামি। বাদুড়ের চোখগুলি কিন্তু বেশ ডাগর ডাগর। কানদুটো সাধারণ আর ১.৪ থেকে ১.৬ ইঞ্চি লম্বা। তবে কানের সামনে আমাদের যে ছোট একটা উপবৃদ্ধি (tragus) থাকে বা এর বিপরীতে অন্য একটা ছোট উপবৃদ্ধি (antitragus) থাকে তেমন উপবৃদ্ধি এদের নেই। এদের মুখের সঙ্গে কুকুর বা শেয়ালের মুখের গঠনগত সাদৃশ্য থাকায় ইংরেজিতে ‘Flying Fox’ বলা হয়।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯০ : দুই ভাই

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৯ : আড়ালে আছে আততায়ী

সুন্দরবনের এই ফলভূক বাদুড়রা সম্পূর্ণই সমাজবদ্ধ স্তন্যপায়ী প্রাণী। একই গোষ্ঠীর বাদুড় দীর্ঘদিন ধরে একই গাছে বংশপরম্পরায় বাস করে। যখন খুব গরম পড়ে তখন এরা দুটো ডানাকে পাখার মতো ব্যবহার করে দেহকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। আবার শীতের সময় ডানা দুটোকে শরীরের উপর জড়িয়ে দিয়ে দেহের তাপমাত্রা বাড়ানোর চেষ্টা করে। এরা পিছনের দু’পায়ের তীক্ষ্ণ নক্ষর দিয়ে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে মাথা নিচের দিকে রেখে সারাদিন ঝুলে থাকে। এটাই হল ওদের বিশ্রাম ভঙ্গি। যখন ওড়ার দরকার হয় তখন নখর আলগা করে দিলেই শরীরটা ঝুপ করে নিচের দিকে নেমে আসে। আর তখনই শরীরটাকে বাতাসে ভাসিয়ে দেয়। যখন জল পান করার প্রয়োজন হয় তখন এরা কাছাকাছি থাকা কোনও জলাশয়ে উড়ন্ত অবস্থাতেই নিজের পেট অংশ ভিজিয়ে নেয়। তারপর উড়ে গিয়ে গাছের শাখা থেকে ঝুলে পড়ে। তখন পেটের ভেজা লোমে থাকা জল চেটে চেটে খেয়ে নেয়। এতে আর একটা উপকার হয়, তীব্র গরমের সময় শরীর ঠান্ডা হয়। অনেক সময় বাচ্চার শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য মা বাদুড় বাচ্চার গায়ে প্রস্রাব করেও দেয়। সুন্দরবনের ফলভূক বাদুড়ের আরেকটা দুর্দান্ত বৈশিষ্ট্য হল এরা ইকোলোকেশন পদ্ধতিতে রাতে খাবারদাবারের খোঁজ করে না বা শত্রুকে চিহ্নিত করে না। রাতের অন্ধকারেও এরা অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি এবং ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করে খাবার দাবার, জল এবং সামনে থাকা শত্রু বা বাধা শনাক্ত করে।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) পেয়ারা গাছে ঝুলে ভারতীয় ফলভূক বাদুড়। (ডানদিকে) রাতে পেয়ারা গাছের উপরে উড়ন্ত ভারতীয় ফলভূক বাদুড়। ছবি : লেখক।

সুন্দরবনের ফলভূক বাদুড় কিন্তু সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি অপরিহার্য প্রাণী। বীজের বিস্তার ও ফুলের পরাগমিলন ঘটিয়ে দারুন উপকার করে এই প্রজাতির বাদুড়। যেহেতু এরা ফলাহারী প্রাণী তাই এরা এদের মলের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ এক এলাকা থেকে আর এক এলাকায় ছড়িয়ে দেয়। দেখা গেছে সুন্দরবনের অরণ্য ও জনবসতি এলাকা মিলিয়ে এদের মলের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদ ছড়িয়ে পড়ে। আর একটা বাদুড়ের মাত্র এক রাতের মধ্যে ৬০,০০০, হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন ষাট হাজার বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। তাই সুন্দরবনে শুধু নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন অরণ্যে গাছের বংশবিস্তারে ভারতীয় ফলভূক বাদুড় অসামান্য ভূমিকা পালন করে থাকে। আবার যেসব উদ্ভিদের ফুল রাতে ফোটে তাদের পরাগমিলনে এই বাদুড় সাহায্য করে। প্রায় ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদের পরাগমিলন ঘটাতে পারে এই প্রজাতির বাদুড়। এইসব উদ্ভিদের মধ্যে সুন্দরবনের জনবসতি এলাকার অন্যতম অর্থকরী উদ্ভিদ হল কলা। এছাড়াও মহুয়া, আম, পেয়ারা, ইউক্যালিপটাস, বট, কদম ইত্যাদি গাছের ফুলের পরাগমিলন বাদুড়ের সাহায্যে হয়। মনে রাখবেন, বাদুড় না থাকলে আগামীদিনে কিন্তু আমাদের কলা খাওয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। সুন্দরবনের অরণ্য অংশে ভারতীয় ফলভুক বাদুড় বাইন, কাঁকড়া, গরান, খলসি ইত্যাদি গাছে ফুলের মধু খেতে গিয়েও পরাগমিলন ঘটিয়ে আসে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৮: শ্যালক-জাতক—অচিনপাখি

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

বাদুড় যে শুধু মানুষের জন্য নয়, প্রকৃতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সদস্য সে বিষয়ে নিশ্চয়ই আর কারও মনে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু তাও বাদুড়ের নামে রয়েছে একাধিক অপবাদ। যেমন প্রচলিত ভ্রান্তধারণা হল বাদুড় নাকি মুখ দিয়ে মলত্যাগ করে! বিভিন্ন শিশুপাঠ্য সাধারণ জ্ঞানের বইতে, এমনকি বাজার চলতি কুইজের বিভিন্ন বইতে এই কথা লেখা রয়েছে। আর তার ফলে লক্ষ লক্ষ শিশু প্রতিবছর এই ভ্রান্তধারণা মাথায় গেঁথে নিচ্ছে। তারপর তারা যখন বড় হচ্ছে তখন সেই ভ্রান্তধারণা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। খারাপ লাগে যখন দেখি বিজ্ঞানের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যেও অনেকে এই ভ্রান্তধারণা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়ান। বাদুড় হল স্তন্যপায়ী প্রাণী আর তাই তাদের সম্পূর্ণ পৌষ্টিকনালী রয়েছে। সম্পূর্ণ পৌষ্টিকনালী শুরু হয় মুখছিদ্র দিয়ে আর শেষ হয় পায়ুছিদ্র দিয়ে। অন্যান্য সমস্ত মেরুদন্ডী প্রাণীদের মতো বাদুড়ও তার পায়ু দিয়ে খাদ্যের অপাচ্য অংশ মল হিসেবে ত্যাগ করে। মুখ দিয়ে মলত্যাগ করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে এই ভ্রান্তধারণার উৎস কী? আসলে বাদুড় প্রধানত ফল খায়। ফলে থাকা ছিবড়ে অর্থাৎ সেলুলোজ হজম করার ক্ষমতা এদের নেই। এই ক্ষমতা মানুষেরও নেই। তাই ওরা ফল চিবিয়ে তার রস মুখের মধ্যে নিংড়ে নেয়, আর পড়ে থাকা ছিবড়ে মুখ দিয়ে ফেলে দেয়, ঠিক যেমন ভাবে আমরা আখের টুকরো চিবিয়ে রস চুষে খেয়ে ছিবড়েটা ফেলে দিই। ঝুলন্ত অবস্থায় বাদুড়কে এভাবে ফলের ছিবড়ে ফেলে দিতে দেখে হয়তো কেউ কখনও ভ্রান্তধারণা করেছিল যে বাদুড় মুখ দিয়ে মলত্যাগ করে। আর একটি অপবাদ হল, বাদুড় নাকি খুব নোংরা প্রাণী। কিন্তু বাস্তব হল বাদুড় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে পরিচ্ছন্ন প্রাণী হিসেবে ব্যতিক্রমী। এরা মাটিতে নামেই না পাছে শরীরে নোংরা লেগে যায়!
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!

আর সবচেয়ে বড় কলঙ্ক যা ভারতীয় ফলভূক বাদুড়ের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে তা হল এরা নিপা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী। কিছুদিন আগে যখন নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছিল তখন অনেক জায়গায় ব্যাপক পরিমাণে বাদুড় নিধন করা হয়েছে এবং ওদের বাসস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। যেহেতু ওরা নিশাচর প্রাণী, দিনের বেলা ভালো দেখতে পায় না, তাই দিনের বেলায় ওদের নিধন করা সহজ ব্যাপার। আমি নিজের চোখে দেখেছি কাকদ্বীপে বাদুড়ের বাসস্থান বট ও তালগাছ ওই সময় কেটে ফেলা হয়েছে, আর ঘরহারা বাদুড়রা অসহায়ভাবে উড়ে বেড়াচ্ছে! মোবাইলে সেই বেদনাদায়ক দৃশ্য ধরেও রেখেছি। যাইহোক, প্রকৃত ঘটনা হল শুধু নিপা ভাইরাস নয়, আরও অসংখ্য ভাইরাসের আশ্রয়দাতা হল এই ফলভূক বাদুড়, যেমন করোনা ভাইরাস, হেন্ড্রা ভাইরাস, লাইসা ভাইরাস, ফাইলো ভাইরাস (মারণ ইবোলা রোগ ছড়ায়) ইত্যাদি। এইসব ভাইরাস নিশ্চিন্তে বাদুড়ের দেহে বসবাস করে। এরা বাদুড়ের কোনও রোগ সৃষ্টি করে না। এর কারণ হল, বিবর্তনের পথ বেয়ে এই বাদুড়রা ভাইরাস প্রতিরোধের এক অনন্য ক্ষমতা অর্জন করেছে।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) সন্তানকে নিয়ে মা বাডুড়ের উড্ডয়ন। ছবি : সংগৃহীত। (ডানদিকে) ভর দুপুরে আস্তানা হারিয়ে উড়ছে বিপন্ন বাদুড়। ছবি : লেখক।

আমাদের দেহে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে আমাদের অনাক্রম্যতন্ত্র বা ইমিউন সিস্টেম প্রবলভাবে সক্রিয় হয় আর তার ফলে যে প্রতিক্রিয়া হয় তার ফলশ্রুতিতে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি, এমনকি কখনও কখনও তা প্রাণঘাতীও হয়। কিন্তু বাদুড়দের ক্ষেত্রে ওদের অনাক্রম্যতন্ত্র কখনওই প্রবলভাবে সাড়া দেয় না বরং অনেক নিয়ন্ত্রিতভাবে সক্রিয় হয়। আর এর ফলে বাদুড়ের দেহে রোগের কোনও লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এইভাবে বাদুড় এবং ভাইরাসগুলি পারস্পরিক বন্ধুত্ব তৈরি করে নেয়। কিন্তু বাদুড়রা যদি কোনও তীব্র সংকটের মধ্যে পড়ে তাহলে ওইসব ভাইরাস বাদুড়ের দেহে থাকা আর নিরাপদ বলে মনে করে না। খাদ্যাভাব, জলাভাব, অপুষ্টি, পরিবেশের পরিবর্তন ইত্যাদি চাপ বা স্ট্রেস তৈরি হলে বাদুড়ের দেহে নিশ্চিন্তে বসবাসরত ভাইরাসরা বেরিয়ে আসতে চায়। কারণ তারাও তো বাঁচতে চায়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ঘটনাকে বলে স্পিল ওভার (Spill over)। পোষক বা আশ্রয়দাতা যদি সংকটে পড়ে তাহলে আশ্রিত কি আর সেখানে থাকতে পারে? ভাইরাস তখন বাদুড়ের লালা, মল বা মূত্রের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে। এইরকম স্ট্রেস অবস্থায় থাকা কোনও বাদুড় যদি খেজুরের রস খেতে গিয়ে সেখানে লালা বা মল বা মূত্র মিশিয়ে দেয় আর সেই রস যদি মানুষ খায়, তাহলে মানুষও সেই ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত হতে পারে। এমনকি বাদুড়ের আধা খাওয়া ফল, যেখানে তার লালা লেগে রয়েছে তা খেলেও মানুষের সংক্রমণ হতে পারে। সত্যিই যদি বাদুড়ের কারণে বিপজ্জনক নিপা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে তবে তার জন্য বাদুড় নয়, দায়ী মানুষ। কারণ আমরাই বনজঙ্গল ধ্বংস করে, জলাভূমি ধ্বংস করে, ফলের গাছ জাল দিয়ে ঘিরে দিয়ে, বট, অশ্বত্থ, তেঁতুল ইত্যাদি বড় বড় বৃক্ষ কেটে দিয়ে ওদের আশ্রয়, খাদ্য ও জলের সংকট তৈরি করে দিয়েছি। শুধু তাই নয় বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণেও বাদুড়রা সংকটের মধ্যে রয়েছে। সুতরাং ভারতীয় ফলভূক বাদুড় মানুষ তথা প্রকৃতির পরম বন্ধু। এরা উপকার ছাড়া কোনও ক্ষতি করে না। ওদের রক্ষা করা আমাদের পরম কর্তব্য।

এই কারণে শুরুতে এই প্রজাতির বাদুড়কে ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের পঞ্চম শিডিউলে রাখা হলেও বর্তমানে এদের শিডিউল-II তে রাখা হয়েছে। সুন্দরবনের ভারতীয় ফলভূক বাদুড় বা ইন্ডিয়ান ফ্লাইং ফক্সদের তাই ভালো না বাসলে রক্ষা করা যাবে না।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content