
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
পঞ্চবটীবনে রামের মুখোমুখি হয়েছে সসৈন্যে শূর্পনখার ভাই খর। রাক্ষসসৈন্যদল রামের অস্ত্রাঘাতে বিধ্বস্তপ্রায়। তাদের নিহত হতে দেখে, রাক্ষসসেনাপতি দূষণ, যুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য, অত্যন্ত বেগবান, যুদ্ধবিমুখ নয়, এমন পাঁচ হাজার রাক্ষসকে আদেশ দিল। রাক্ষসরা চারিদিক হতে রামের উদ্দেশে শূল, পট্টিশ, খড়্গ, পাথর ও গাছ নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্ষণ করতে লাগল। ধর্মাত্মা রাম, তীক্ষ্ণ বাণাঘাতে প্রাণঘাতী সেই বর্ষণ প্রতিহত করলেন। বৃষ যেমন নিমীলিতচোখে, বর্ষণ উপভোগ করে তেমনই রাম, সেই অস্ত্রবর্ষণ অনায়াসে প্রতিহত করে, সমস্ত রাক্ষসদের বধের জন্যে অত্যন্ত ক্রোধাবিষ্ট হলেন। ক্রোধান্বিত রাম, তেজে প্রজ্বলিত হয়ে দূষণ ও তার সৈন্যদের তীরের আঘাতে আচ্ছন্ন করে ফেললেন। শত্রুঘাতী রাক্ষসসেনাপতি দূষণ, রামের দিকে সক্রোধে বজ্রতুল্য বাণ নিক্ষেপ করত লাগল। ভয়ঙ্কর রাগে রাম ক্ষুরাস্ত্র দিয়ে দূষণের বিশাল ধনুকটি এবং অপর চারটি বাণে চারটি ঘোড়াকে ছিন্নভিন্ন করলেন। বীর রাম তীক্ষ্ণ শরে হত্যা করলেন চার চারটি ঘোড়াকে। তিনি অর্দ্ধচন্দ্র বাণে সারথির মাথা ছিন্ন করে, তিনটি বানে তার বুক বিদ্ধ করলেন।
দূষণের ধনুক ছিন্ন, রথ বিধ্বস্ত, ঘোড়াগুলি মৃত, সারথি নিহত —এই অবস্থায় সে রোমহর্ষক গিরিশৃঙ্গতুল্য পরিঘ তুলে নিল। সেই পরিঘ-অস্ত্রটি সোনার পাতে মোড়া, দেবসেনাদের পর্যন্ত মথিত করতে সক্ষম, সুতীক্ষ্ণ লোহার শঙ্কুতে পরিপূর্ণ,শত্রুর মেদে সিক্ত, পরশ তার বজ্রের মতো এবং শত্রুর প্রবেশদ্বার বিদীর্ণ করবার সামর্থ্যযুক্ত। যুদ্ধে নিষ্ঠুরকাজে অভ্যস্ত নিশাচর দূষণ,বিরাট সাপের মতো পরিঘটি নিয়ে,রামের দিকে ধেয়ে গেল। রাম, দুই বাণে তাঁর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত দূষণের অলঙ্কারশোভিত হাত দুটি কেটে ফেললেন। দূষণের হাতদুটি ছিন্ন হলে বিশালাকার পরিঘটি রণভূমিতে ইন্দ্রধ্বজের মতো লুটিয়ে পড়ল। হাতদুটি কাটা—এমন অবস্থায়,দুটি দাঁত ক্ষয়প্রাপ্ত এমন বিশাল হাতির মতোই ভূলুণ্ঠিত হল দূষণ। ভূপতিত ও যুদ্ধে নিহত দূষণকে দেখে সমস্ত প্রাণীরা ‘সাধু’ ‘সাধু বলে কাকুৎস্থ রামকে সম্মানিত করল। এই অবসরে, অগ্রবর্তী ক্রুদ্ধ তিন সেনানায়ক যেন মৃত্যুপাশে আবদ্ধ হয়ে একযোগে ছুটে গেল। এই তিন জনের নাম — মহাকপাল,স্থূলাক্ষ ও মহাবলশালী প্রমাথী। মহাকপাল এক বিশাল শূল উদ্যত করে, স্থূলাক্ষ পট্টিশ এবং প্রমাথী পরশু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে — দেখে, রাঘব রাম, সমাগত অতিথির মতো সুতীক্ষ্ণ তীর দিয়ে তাদের স্বাগত জানালেন। তিনি মহাকপালের শিরশ্ছেদ করলেন অগণিত তীর দিয়ে প্রমাথীকে পিষে দিলেন এবং স্থূলাক্ষর স্থূল চোখদুটি সম্পূর্ণভাবে বাণবিদ্ধ করলেন। নিহত স্থূলাক্ষ, শাখাপ্রশাখা-সহ বিশাল মহীরুহের মতো মাটিতে পড়ল। রাম ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তাঁর পাঁচ হাজার বাণে দূষণের অনুগত পাঁচ হাজার রাক্ষসকে যমালয়ে পাঠিয়ে দিলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬১: আধুনিক ক্ষমতাদখলের লড়াই ও রাজসূয়যজ্ঞের প্রেক্ষিতে যুদ্ধজয় ও অধিকারপ্রতিষ্ঠার মধ্যে সাযুজ্য কোথায়?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৩: বাদুড়

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০২ : ‘স্বজাতির্দূরতিক্রমা’—জন্মগত স্বভাব কি কখনও বদলায়? পঞ্চতন্ত্রের পাতায় এক অমোঘ রাজনৈতিক সত্যের
দূষণ তার অনুগামী-সহ নিহত হয়েছে শুনে, খর সক্রোধে মহাবলশালী সেনাপতিদের আদেশ দিল, দূষণ ও তার অনুচরবর্গ যুদ্ধে নিহত হয়েছে। তোমরা, সমস্ত রাক্ষসরা, বিরাট সেনাবাহিনী-সহ দুর্জন রামের সঙ্গে যুদ্ধ করে,নানা অস্ত্রশস্ত্রে তাকে বধ কর। মহত্যা সেনয়া সার্দ্ধং যুদ্ধ্বা রামং কুমানুষম্। শস্ত্রৈর্নানাবিধাকারৈর্হনধ্বং সর্ব্বরাক্ষসাঃ।। এই বলে ক্রুদ্ধ খর ছুটে গেল রামের দিকে। শ্যেনগামী, পৃথুগ্রীব, যজ্ঞশত্রু, বিহঙ্গম, দুর্জয়, করবীরাক্ষ, পরুষ, কালকার্মুক, হেমমালী, মহামালী, সর্পাস্য ও রুধিরাশন এই বারজন মহাবল সেনাপতি সসৈন্যে সেরা বাণগুলি নিক্ষেপ করতে করতে রামের দিকে ধেয়ে গেল। তখন তেজস্বী রাম, আগুনের মতো সোনার বজ্রভূষিত শর নিক্ষেপ করে অবশিষ্ট সৈন্যদের হত্যা করলেন। বজ্র যেমন বিশাল গাছগুলিকে ধ্বংস করে, তেমনই সোনার পুচ্ছবিশিষ্ট, ধূম-সহ আগুনের মতো বাণগুলি রাক্ষসদের বিনাশ করল। রাম রণাঙ্গনে একশ রাক্ষসকে কর্ণি নামের অস্ত্রে এবং হাজারসংখ্যক রাক্ষসকে হাজার শরে বধ করলেন। রাক্ষসদের বর্ম, আভরণ, ধনুক ছিন্নভিন্ন, এই অবস্থায় রক্তাক্তদেহে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কুশে আস্তীর্ণ যজ্ঞবেদীর মতো ধরাতল যুদ্ধে পড়ে থাকা মুক্তকেশ, রক্তাক্তশরীর, রাক্ষসে পরিপূর্ণ হল। সেই সময়ে নিহত রাক্ষসদের মাংস ও রক্তে কাদায় ভরা অরণ্য যেন ভয়ঙ্কর নরক হয়ে উঠল। পদাতিক সেনার মতো একাকী রাম ভয়ানক কাজে অভ্যস্ত, চোদ্দ হাজার রাক্ষসকে ধ্বংস করলেন। সৈন্যদের মধ্যে মহারথ খর, ত্রিশিরা রাক্ষস অবশিষ্ট রইলেন, আর রইলেন শত্রুহন্তা রাম। রণক্ষেত্রে মহাপরাক্রমশালী, ভয়ঙ্কর, অসহনীয়বিক্রম অবশিষ্ট রাক্ষসরা লক্ষ্মণের জ্যেষ্ঠ ভাই রামের হাতে নিহত হল। মহাযুদ্ধে তুলনায় অতিরিক্ত বলশালী রাম ধর্মানুসারে ভয়ানকবলশালী সৈন্যদের হত্যা করেছেন— দেখে, খর বিশাল রথে আরোহণ করে, বজ্রনিক্ষেপে উদ্যত ইন্দ্রের মতো রামের কাছে উপস্থিত হল।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯১ : বিপাশা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৯ : আড়ালে আছে আততায়ী
রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করছেন খর— দেখে, রাক্ষসসেনাপতি ত্রিশিরা তার সামনে এসে বলল, পরাক্রমশালী আমায় নিযুক্ত করুন। আপনি এই দুঃসাহস ত্যাগ করুন। দেখুন, আমি যুদ্ধে মহাবীর রামকে পরাস্ত করবই। মাং নিযোজয় বিক্রান্তং ত্বং নিবর্ত্তস্ব সাহসাৎ। পশ্য রামং মহাবাহুং সংযুগে বিনিপাতিতম্।। ত্রিশিরা অস্ত্রহাতে সত্যপ্রতিজ্ঞা ঘোষণা করলেন, সকল রাক্ষসদের কাছে বধের যোগ্য রামকে আমি বধ করব সেটা শুধু দেখুন। যথা রামং বধিষ্যামি বধার্হং সর্ব্বরক্ষসাম্। ত্রিশিরা প্রবল আত্মবিশ্বাসে খরকে নিশ্চিত করল, যুদ্ধে হয় তার নিজের, না হয় রামের মৃত্যু হবে। তাই তার প্রস্তাব —বিনিবর্ত্ত্য রণোৎসাহং মুহূর্ত্তং প্রাশ্নিকো ভব। আপনি মুহূর্তকাল যুদ্ধের উন্মাদনা ত্যাগ করে পরীক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ত্রিশিরা আরও বললেন, ত্রিশিরা রামকে হত্যা করলে, খর সন্তুষ্টমনে জনস্থানে চলে যাবেন। আর ত্রিশিরা যদি নিহত হয় তবে রামের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন স্বয়ং খর। ত্রিশিরার কথায় মৃত্যুলোভ থেকে প্রসন্ন হল খর। অনুমতি দিল, গচ্ছ যুধ্যেত ইতি যাও, যুদ্ধ কর। আজ্ঞা পালন করে, ত্রিশিরা যুদ্ধে গেল। ত্রিশিরা ঘোড়ায় বাহিত উজ্জ্বল রথে রামের দিকে ছুটল, মনে হল, তিনটি শৃঙ্গবিশিষ্ট পর্বত যেন রামের দিকে ধেয়ে চলেছে। মহামেঘের মতো শরধারাবর্ষণরত ত্রিশিরা জলে ভেজা দুন্দুভির মতো গুরুগম্ভীর গর্জন শুরু করল। রাম ত্রিশিরাকে আসতে দেখে, ধনুকে শাণিত তীর নিক্ষেপ করে প্রতিরোধ করলেন। রাম ও ত্রিশিরার তুমুল যুদ্ধ শুরু হল। মনে হল, সে যুদ্ধ যেন বলশালী পশুরাজের সঙ্গে হাতির যুদ্ধ।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
ত্রিশিরার নিক্ষিপ্ত তিনটি বাণ রামের কপালে আঘাত করল যেই, রাম ধৈর্য হারিয়ে, অস্থিরভাবে সক্রোধে বলে উঠলেন, ওরে রাক্ষস এই তোর মহাবীরত্ব, এত শক্তি তোর? আমার কপালে তোর শরের আঘাত, ফুলের আঘাতের মতো মনে হচ্ছে। আমার গুণমুক্ত বাণগুলি এবারে গ্রহণ কর। অহো বিক্রমশূন্যস্য রাক্ষসস্যেদৃশং বলম্। পুষ্পৈরেব শরৈর্যোঽহং ললাটেঽস্মি পরিক্ষতঃ। মমাপি প্রতিগৃহ্ণীষ্ব শরাংশ্চাপগুণাচ্চ্যুতান্।। এই বলে উত্তেজিত, ক্রুদ্ধ রাম বিষধর সাপের মতো চোদ্দটি শরে ত্রিশিরার বুক বিদীর্ণ করলেন। তিনি চারটি নতপর্ব (অগ্রভাগ বড়শির মতো নীচের দিকে বাঁকা) বাণে ত্রিশিরার চারটি ঘোড়াকে মাটিতে ফেললেন। রাম আটটি বাণে ত্রিশিরার সারথিকে রথের ওপর থেকে মাটিতে ফেললেন এবং একটি বাণে উন্নত পতাকাটি ছিন্ন করলেন। ভাঙা রথ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাক্ষস ত্রিশিরা। এই অবস্থায় রাম তার বুকটি বিদীর্ণ করায় সে জড়বস্তুতে পরিণত হল। উত্তেজনায় অপরিমেয় দক্ষতার অধিকারী রাম, তিনটি বেগবান শরে ত্রিশিরার তিনটি মাথা কেটে ফেললেন। রামের বাণাঘাতে জর্জরিত, যুদ্ধরত, ত্রিশিরা ধোঁয়ার সঙ্গে রক্ত উগরে দিয়ে সেই কাটা মাথাগুলির সঙ্গে নিজেও পড়ে গেল। খরের আশ্রিত হতাবশিষ্ট রাক্ষসরা ভেঙে পড়ল, তারা বাঘের ভয়ে ভীরু হরিণগুলির মতো পালিয়ে গেল। রাক্ষসদের পালিয়ে যেতে দেখে, তাদের ফিরিয়ে আনার জন্যে, চাঁদকে গ্রাস করতে উদ্যত রাহুর মতো ক্রুদ্ধ খর দ্রুত রামের দিকে ধেয়ে গেল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

হয়তো আগামী ছবির নাম রাখতেন ‘হাওয়া-মোরগ’
শূর্পনখার অবমাননার প্রতিশোধ নিতে রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছে প্রথমে শূর্পনখার ভাই খর, তার পরে অপর ভাই দূষণ।। পাঁচ হাজার রাক্ষস দূষণের সহযাত্রী হতে প্রস্তুত। রাম প্রথমে রাক্ষসদের ঔদ্ধত্যসহ আক্রমণ উপভোগ করলেন। তার পরে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করলেন। একাকী আক্রান্ত রামের প্রতি নৃশংস রাক্ষসরা নির্মম সমরাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। রামও রাক্ষসদের সেনানায়ক দূষণকে যেভাবে বধ করলেন তার বর্ণনা দূষণের নিষ্ঠুর আক্রমণ থেকে কোনও অংশে কম নয়। এ ছাড়া তাঁর কোন উপায় ছিল না। যুদ্ধে নীচাশয়রা হয়ে ওঠেন নির্মম, আর প্রতিশোধস্পৃহা মানুষকে করে তোলে অমানবিক, নিষ্ঠুরতম। প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব রাম তার ব্যতিক্রম নন। তার ওপরে তাঁর ধমনীতে বয়ে চলেছে রাজরক্ত। তার প্রভাবও রয়েছে। দূষণ ও তার পারিপার্শ্বিকের তিন রাক্ষসের রোমহর্ষক হত্যাবিবরণ নৃশংসতার উদাহরণ বললে বোধ হয় অত্যন্ত হয় না। এই যুদ্ধে অগণিত রাক্ষস নিহত হল। খর চলল যুদ্ধাভিযানে। ত্রিশিরা তাকে নিরস্ত করল। সে সেনাপতির কর্তব্য পালন করতে উদ্যোগী হল। যুদ্ধে অধস্তনের কাজ—ঊর্ধ্বতন প্রভুকে সুরক্ষাদান। ত্রিশিরা সেনাধ্যক্ষের এই কর্তব্যভার নিষ্ঠাভরে পালন করেছে। প্রভু খরের ভূমিকা শুধু পরীক্ষকের বা সাক্ষীর। যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থায় বা অনেকক্ষেত্রেই সর্বাধিনায়ক তথাকথিত যুদ্ধবাজ প্রভুদের অবস্থান দর্শক বা সাক্ষী মতোই। বলি হয় সাধারণ সৈন্যদের প্রাণ। আধুনিক যুদ্ধে সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনও। যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী অভিঘাত রাক্ষসদের ঠেলে দিয়েছিল অনিশ্চিত জীবনের দিকে। অস্তিত্বের সঙ্কটে বিপন্নতার সম্মুখীন হয়েছিল রাক্ষসকুল।রাক্ষসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, রামের জীবন যৌবন শ্রেষ্ঠ সময় গ্রাস করেছিল, মুছে দিয়েছিল তাঁর অরণ্যবাসের মাধুর্য। পরবর্তীকালে এর সূত্র ধরে রামের দাম্পত্যসম্পর্ক প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন হয়েছিল। যুদ্ধ এমনই অনিশ্চয়তার জটিলতাময়।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
একজন ঋষিকবি বর্ণনা করেছেন ত্রিশিরার আক্রমণবৃত্তান্ত এবং নায়ক রামের ত্রিশিরারাক্ষসের হত্যার বিবরণ। যুদ্ধবিবরণ লিপিবদ্ধ করছেন মহর্ষি বাল্মীকি। ঋষিসুলভ নির্লিপ্ততামুক্ত সেই বর্ণনা। একজন দ্রষ্টার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি যেন স্বচক্ষে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করছেন। একটি মহাকাব্য তার স্রষ্টার জীবনবীক্ষণের সুচিন্তিত ফসল। মহর্ষি বাল্মীকি এই বিষয়ে বিশ্বস্ততার পরিচয় রেখেছেন। জীবনের কদর্য অভিঘাতকে অস্বীকার করে সার্থক সাহিত্য হতে পারে না নিশ্চয়ই। রামের যুদ্ধ, ঋষিদের রাক্ষসদের কবলমুক্ত করতে, প্রতিশ্রুতিরক্ষার্থে একক যুদ্ধ। তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞারক্ষায় নির্মম, নৃশংস। নিষ্ঠুর ত্রিশিরাকে বধ করতে তিনি মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হননি। কারণ হয়তো তাঁর নিজের প্রাণরক্ষার তাগিদ এবং যথার্থ ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রতীক্ষারত ঋষিগণের অত্যাচারমুক্তির ব্যাকুলতা। যুদ্ধের উদ্দেশ্য যত মহৎ হোক যুদ্ধের বীভৎসতা হৃদয়বিদারক এবং তার কুপ্রভাব যুগ-যুগান্তরব্যাপী। যুগ যুগান্তর ধরে রাম ভারতীয়দের জাতীয় নায়ক। ভারতবাসী তাঁর রাক্ষসবধকে মনে রেখেছে, অশুভর বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়রূপে। তাঁরা যুদ্ধের নৃশংসতা মনে রাখেননি, রঘুপতি রাঘবের রাজকীয় করুণাঘন ভাবমূর্তি মনে রেখেছেন। তাঁদের স্মৃতিতে ঠাঁই পেয়েছেন অনুগত ভাই লক্ষ্মণ। চরম পিতৃতান্ত্রিক ভারতবর্ষ শ্রদ্ধার স্মরণে, নত হয় রামের পরিত্যক্তা স্ত্রী সীতার সামনেও। সাধারণ মানুষ গার্হস্থ্যপরিমণ্ডলের গণ্ডীতে চিরপরিচিত জনদের মনে রাখে শ্রদ্ধার ভালবাসায়, স্নেহাকুলতাময় সম্পর্কের নিরিখে। তাঁরা নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা ভুলে ভালটাই মনে রাখে, মন্দগুলো নয়। এটাই বোধ হয় চিরকালীন জীবনরস, যা জারিত রাখে ভারতীয় জীবন।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















