
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
পঞ্চ পাণ্ডবের কনিষ্ঠ দুই যমজ ভাইয়ের অন্যতম সহদেব, জ্যেষ্ঠ রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সুষ্ঠু সম্পাদনের জন্যে অপরাপর রাজাদের আনুগত্য আদায়ের লক্ষ্যে অগ্রজ ভীম ও অর্জুনের মতো চললেন দিগ্বিজয়ে। তিনি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে দক্ষিণে যাত্রা করলেন। প্রভাবশালী সহদেব প্রথমে সমগ্র শূরসেনদেশ জয় করলেন। বলশালী সহদেবের বলের কাছে মাথা নত করল মৎস্যরাজ্য। তিনি মৎস্যরাজকে বশে আনলেন। সহদেব, যুদ্ধে রাজশ্রেষ্ঠ মহাবলী দন্তবক্রকে জয় করে তাঁর রাজ্যকে করদরাজ্যে পরিণত করে তাঁকে আবার রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করলেন তিনি। সুকুমার ও সুমিত্র দেশ বশে আনলেন। অপর এক মৎস্যদেশ ও পটচ্চরদেশও তাঁর অধিগত হল। বুদ্ধিমান সহদেবোর বলের কাছে মাথা নত করল নিষাদরাজ্য, গিরিশ্রেষ্ঠ গোশৃঙ্গ এবং শ্রেণিমান রাজা।
অতঃপর নররাষ্ট্র জয় করে সহদেব কুন্তিভোজরাজার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। আনন্দসহকারে রাজা কুন্তিভোজ, তাঁর আদেশ স্বীকার করলেন (নিজের ভগিনী কুন্তীর সতীন মাদ্রীর পুত্র অর্থাৎ সম্পর্কে ভাগিনেয়হেতু)। চর্মন্বতীনদীতীরে তাঁর সঙ্গে রাজা জম্ভকের পুত্রের দেখা হল। তিনি ছিলেন কৃষ্ণের হাতে নিহত শত্রুদের মধ্যে অবশিষ্ট একজনমাত্র।তাঁর সঙ্গে সহদেবের যুদ্ধ হল। যুদ্ধে জয়ী হলেন সহদেব। তারপরে তিনি দক্ষিণাভিমুখে যাত্রা করলেন। মহাবলশালী সহদেব, সেক ও অপর এক দেশ জয় করে তাঁদের থেকে কররূপে বিবিধ রত্ন আদায় করে,তাঁদের সঙ্গে নিয়ে নর্মদানদীর অভিমুখে চললেন। ক্রমশ অশ্বিনীকুমারের ঔরসজাত পুত্র, প্রতাপশালী সহদেব বিশালসৈন্যদল-পরিবেষ্টিত অবন্তীদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ নামে দুই রাজাকে যুদ্ধে পরাস্ত করে,তাঁদের থেকে নতিস্বীকাররূপ রত্নসম্ভার নিয়ে ভোজকট নামে নগরে উপস্থিত হলেন। সেখানে দুই দিনব্যাপী যুদ্ধ হল। মাদ্রিপুত্র সহদেব, দুর্ধর্ষ ভীষ্মকরাজাকে জয় করে,কোশলরাজ ও বেণ্বানামের নদীতটের রাজাকে পরাজিত করলেন। এরপরে যথাক্রমে কান্তারক, প্রাকোটক, নাটকেয়, হেরম্বক এবং মারুষদেশ যুদ্ধে জয় করে,মহাবল পাণ্ডুপুত্র বল প্রয়োগ করে রম্যগ্রাম,নাচীন, অর্বূকদেশীয় সমস্ত অরণ্যের রাজাদের পদানত করলেন। বাতনামের দেশের রাজাকে বশীভূত করে, মহাবীর সহদেব পুলিন্দদের যুদ্ধে জয় করে আবারও দক্ষিণে এগিয়ে চললেন। পাণ্ড্যরাজের সঙ্গে দিবসব্যাপী যুদ্ধের পরে, তাঁকে জয় করে, নকুলের কনিষ্ঠ সহদেব দক্ষিণাপথের দিকে রওনা দিলেন। অবশেষে পৃথিবীখ্যাত কিষ্কিন্ধ্যাগুহায় উপস্থিত হলেন। সেখানে বানররাজ মৈন্দ ও দ্বিবিদের সঙ্গে সাতদিন যাবৎ যুদ্ধের পরেও সেই দু’জন রাজা ক্লান্ত হলেন না। পরে সহদেবের প্রতি সন্তুষ্ট মহান দুই রাজা পরমানন্দে প্রীতিভরে বললেন, সমস্ত রত্ন নিয়ে সহদেব চলে যান। বুদ্ধিমান ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের কাজটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হোক। অবিঘ্নমস্তু কার্য্যায় ধর্ম্মরাজায় ধীমতে। বহু রত্ন কর গ্রহণের পরে সহদেবের গন্তব্য মাহিষ্মতীনগর। সেখানে নীলরাজার সঙ্গে অপরবীরদের হন্তারক প্রতাপবান পাণ্ডব সহদেবের যুদ্ধ হল। সৈন্যক্ষয়কর, প্রাণসংশয়জনক, ভীরুদের ভয় উদ্রেকারী, ভয়ঙ্কর,মহাযুদ্ধে অগ্নিদেব নীলরাজকে সাহায্য করছিলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬২: যুদ্ধের নৃশংসতা নয়, জনমানসে ঠাঁই পায় শুধু যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৯ : আড়ালে আছে আততায়ী
তার ফলে অগ্নিদেবের প্রভাবে সহদেবের সৈন্যদের রথ, ঘোড়া, হাতি এবং কবচ প্রজ্জ্বলিত অবস্থায় দেখা গেল। অতিব্যস্ততার জন্যে সহদেব, পরে তাঁর কি কর্তব্য সেটা বলতে পারছেন না। এখন প্রশ্ন হল, সহদেব রাজসূয়যজ্ঞ (অগ্নির সন্তুষ্টিসাধনের জন্যে) করতে চলেছেন তাহলে যুদ্ধে অগ্নি কেন বিরুদ্ধশক্তি হলেন? অগ্নিদেব সেখানে মাহিষ্মতীনগরের বাসিন্দা ছিলেন। শোনা যায়, অতীতে তাঁকে পারদারিক বলে লোকে মনে করত। পৃথিবীতে নীলরাজার অতুলনাহীনা রূপবতী এক কন্যা ছিল। পিতার অগ্নিহোত্রযাগে অগ্নির উদ্বোধনের জন্যে সে সর্বদাই উপস্থিত থাকত। যতক্ষণ না সে, তার সুন্দর ওষ্ঠ দিয়ে বায়ু ফুঁ দিয়ে আগুন জ্বালাত ততক্ষণ হাওয়া দিলেও আগুন জ্বলত না। ক্রমে ভগবান অগ্নি সেই সুদর্শনা কন্যার প্রতি আসক্ত হলেন। এই বিষয়ে নীলরাজা ও অন্য সকলে অবগত হলেন। অগ্নিদেব ব্রাহ্মণরূপ ধারণ করে নিজের ইচ্ছামতো রতিশাস্ত্রানুযায়ী যখন রমণ করছিলেন সেই সময়ে রাজা নীল,তাঁকে শাসন করলেন। রাগে ভগবান অগ্নিজ্বলে উঠলেন।সেই দৃশ্য দেখে, বিস্মিত রাজা ত মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তাঁকে সম্মানিত করলেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০২ : ‘স্বজাতির্দূরতিক্রমা’—জন্মগত স্বভাব কি কখনও বদলায়? পঞ্চতন্ত্রের পাতায় এক অমোঘ রাজনৈতিক সত্যের

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৪: কুকুরমুখো ফল বাদুড়
রাজা যথাসময়ে যথারীতি শাস্ত্রসম্মত-আচারানুসারে ব্রাহ্মণরূপধারী অগ্নিদেবকে নতমস্তকে কন্যাদান করলেন। নীলরাজার সেই কন্যাকে গ্রহণ করে, রাজাকে অনুগৃহীত করলেন অগ্নি। শুভ ইচ্ছা পূরণকারী অগ্নি, রাজাকে অনুগ্রহ দান করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে, তাঁকে সন্তুষ্ট করলেন। সেই রাজাও তাঁর সৈন্য-সহ নিজের অভয়বর গ্রহণ করলেন। সেই থেকে যাঁরাই অজ্ঞতাহেতু (বরপ্রদান প্রভৃতি অভয়দান বৃত্তান্ত, না জেনে) সেই পুরী জয় করতে ইচ্ছুক হন তিনিই অগ্নির দহনের শিকার হন। সেই সময়ে মাহিষ্মতী নগরের নারীরা (পরপুরুষসংসর্গবিষয়ে) নিষেধ না মেনে স্বেচ্ছাচারিণী হয়ে উঠেছিল। এই নারীদের অপ্রতিরোধবিষয়ে অগ্নি নিজে বর দিয়েছিলেন। তাঁর প্রসাদ লাভ করে স্বেচ্ছাচারিণী নারীরা যথেচ্ছ বিচরণ করত। তখন থেকেই রাজারা সর্বদাই অগ্নির ভয়হেতু নগরটিকে এড়িয়ে চলত। ধর্মপ্রাণ সহদেব, চারিদিকে অগ্নিপরিবেষ্টিত সৈন্যদের ভয়ার্ত দেখে, পর্বতের মতোই অকম্পিত রইলেন। তিনি আচমন সম্পন্ন করে, পবিত্র হলেন। তার পরে, অগ্নিদেবের উদ্দেশে প্রণাম নিবেদন করে জানালেন অগ্নির জন্যেই এই উদ্যোগ (রাজসূয়যজ্ঞারম্ভ)। অগ্নি দেবতাদের মুখ। তিনিই স্বয়ং যজ্ঞ। অগ্নি পাবক। কারণ তিনি পবিত্র করেন। (যজ্ঞের)হবি বহন করেন তিনি, তাই তিনি হব্যবাহন। বেদসমূহ তাঁর জন্যেই জাত হয়েছে তাই তিনি জাতবেদা। বিভাবসু অগ্নিই চিত্রভানু,সুরেশ,অনল,স্বর্গদ্বার স্পর্শ করেন তিনি (প্রচুর ঘিয়ের আহুতি গ্রহণ করে তাঁর শিখা অতি ঊর্ধ্ব স্পর্শ করে), হতাশন, জ্বলন ও শিখী। তিনি বৈশ্বানর, পিঙ্কি, প্লবঙ্গ, ভূরিতেজা, কুমারসূ, ভগবান, রুদ্রগর্ভ এবং হিরণ্যকৃৎ। সহদেব আকুল প্রার্থনা জানালেন,হে অগ্নি আমাকে দান করুন তেজ, দান করুন বায়ু ও প্রাণ। দাও পৃথিবী, বল, জল ও মঙ্গল দান করুন। অগ্নির্দদাতু মে তেজো বায়ুঃ প্রাণং দদাতু মে। পৃথিবী চ বলং দদ্যাচ্ছিবঞ্চাপো দিশন্তু মে।।
আরও পড়ুন:

সাগর উঠে তরঙ্গিয়া

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
সহদেব অগ্নির স্তুতি শুরু করলেন, অগ্নি জল হতে জাত, মহাতেজা, জাতবেদা, দেবতাদের ঈশ্বর, তিনি দেবতাদের মুখ। সহদেবের প্রার্থনা— আপনি সত্যজ্যোতির মাধ্যমে আমায় পবিত্র করুন। ত্বং সত্যেন বিপুনীহি মাম্। ঋষি, ব্রাহ্মণ, দেব ও অসুরেরা নিত্য অগ্নির হবন করে থাকেন। যজ্ঞে সত্যপরশ দিয়ে সহদেবকে পবিত্র করুন অগ্নি। যজ্ঞেষু সত্যেন বিপুনীহি মাম্। অগ্নিই ধূমকেতু, শিখী, পাপবিনাশকারী, বায়ুজাত, সব প্রাণীদের মধ্যে নিত্য বিরাজমান, তিনি তাঁকে সত্য দিয়ে পরিশুদ্ধ করুন। সহদেব আনন্দিত ও পবিত্র হয়ে অগ্নিদেবের স্তুতি করছেন। সহদেবের প্রার্থনা— তুষ্টিং পুষ্টিং শ্রুতিঞ্চাগ্নে! প্রীতিঞ্চৈব প্রযচ্ছ মে। আমায় সন্তুষ্টি, পুষ্টি, জ্ঞান ও আনন্দ প্রদান করুন। এ ভাবে যিনি সর্বব্যাপী বিভূ সেই অগ্নির উদ্দেশ্যে মন্ত্র পাঠ করে যজ্ঞ করেন তিনি পবিত্র, সর্বদাই সংযতেন্দ্রিয় এবং সকল পাপ হতে মুক্ত থাকেন। সহদেব আরও বললেন, যজ্ঞবিঘ্নমিমং কর্ত্তুং নার্হস্ত্বং হব্যবাহন !। আপনি এই যজ্ঞে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারেন না। এই বলে, মাদ্রিপুত্র সহদেব ভীত ও উদ্বিগ্ন সমস্ত সৈন্যদের সামনে মাটিতে কুশঘাস বিছিয়ে, অগ্নিকে লক্ষ্য করে, বসে পড়লেন। মহাসমুদ্রের অনতিক্রম্য বেলাভূমির মতো, অগ্নি তাঁকে অতিক্রম করলেন না। অগ্নি সহদেবের কাছে ধীরে গেলেন। তিনি কুরুনন্দন সহদেবকে সান্ত্বনা দিয়ে ধীরে বললেন, হে কুরুবংশীয়, উঠুন, উঠে পড়ুন। আমার করা আপনার এটা নিছকই এক (ধৈর্যের) পরীক্ষামাত্র। উত্তিষ্ঠোত্তিষ্ঠ কৌরব্য! জিজ্ঞাসাবাদ ময়া কৃতা। তিনি জানালেন, সহদেব এবং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের সব মনোগত ইচ্ছা তাঁর জানা আছে। কিন্তু তাঁকে এই নগরী রক্ষা করতেই হবে যে। অগ্নির গলায় দৃঢ় প্রত্যয়ের সুর — যাবদ্রাজ্ঞো হি নীলস্য কুলে বংশধরা ইতি। ঈপ্সিতং তু করিষ্যামি মনসস্তব পাণ্ডব!।।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭২: আকাশ এখনও মেঘলা
যতদিন নীলরাজার বংশধর থাকবে ততদিন তাঁদের এবং সহদেবের অভীষ্টসিদ্ধি করবেন। সহদেব উঠে দাঁড়ালেন। হাতদুটি অঞ্জলিবদ্ধ করে, নতমস্তকে অগ্নির অর্চনা করলেন। ফিরে গেলোন অগ্নিদেব। রণাঙ্গনে উপস্থিত হলেন রাজা নীল। অগ্নির আদেশানুসারে নীলরাজা, নরশ্রেষ্ঠ সেনানায়ক সহদেবের সৌজন্যসহকারে অর্চনা করলেন। সহদেব তাঁর পূজা গ্রহণ করলেন। তার পরে বিজয়ী মাদ্রিপুত্র সহদেব, করদানবিষয়টিতে নীলরাজাকে সম্মতিসূচক মীমাংসায় রাজি করে, দক্ষিণদিকে যাত্রা করলেন। তিনি ত্রিপুরারাজকে বশীভূত করে, অতিতেজস্বী পৌরবরাজকে বলপ্রয়োগ করে জয় করলেন। মহাবাহু সহদেব আকৃতি নামের কৌশিকাচার্য (অস্ত্রগুরু) এবং সুরাষ্ট্ররাজকে স্ববশে আনলেন। সুরাষ্ট্রদেশে অবস্থানকালীন ধর্মাত্মা তিনি রুক্মীর কাছে এবং ভোজকটনগরে অবস্থানরত, বিশালরাজ্যের অধীশ্বর,বুদ্ধিমান ও ইন্দ্রের সাক্ষাৎ বন্ধু, রাজা ভীষ্মকের (রুক্মীর পিতা) কাছে দূত পাঠালেন। রাজা ভীষ্মক, স্বপুত্র রুক্মীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বাসুদেব কৃষ্ণের (তাঁর জামাতা কৃষ্ণের সঙ্গে যুধিষ্ঠিরের সুসম্পর্ক) সম্বন্ধে পর্যালোচনা করে আনন্দসহকারে সহদেবের আদেশ মেনে নিলেন। সেনাপতি সহদেব,ভীষ্মকরাজার (প্রদেয় কররূপ) রত্নধন গ্রহণ করে আবার যাত্রা শুরু করলেন। তার পরে মহাতেজস্বী মহাবলশালী তিনি শূর্পারক, তালীকট এবং দণ্ডকদেশের রাজাদের ও সাগরদ্বীপবাসী ম্লেচ্ছরাজবৃন্দদের নিজের অধীনে আনলেন। মহামতি সহদেব, নিষাদ, নরভোজী রাক্ষস, কর্নপ্রাবর (চামড়ায় ভালভাবে কান ঢেকে রাখে যারা), নর ও রাক্ষসে উভয়ের মিলনের ফলে জাত কালমুখগণকে, সমগ্র কোলগিরি, সুরভীপট্টন, তাম্রদ্বীপ, রামপর্বত, তিমিঙ্গিল রাজাকে বশীভূত করে একপাদ পুরুষদের,বনবাসী কেরলেদের, সঞ্জয়ন্তী, পাষণ্ড করহাটককে দূত পাঠিয়ে বশে আনলেন এবং করদানে বাধ্য করলেন। পাণ্ড্য, দ্রাবিড়, উড্র, কেরল, অন্ধ্র, তালবন, কলিঙ্গ, উষ্ট্রকর্ণিক, রমণীয় আটবীপুরী (বনস্থ পুরী) এবং যবনদের নগরে, দূত পাঠিয়ে তাদের আয়ত্তাধীন করে,কর সংগ্রহ করলেন। সমুদ্রের জলপ্রায়প্রদেশে অবস্থিত কচ্ছদেশে অবস্থান করে, বুদ্ধিমান ও ধর্মাত্মা, মাদ্রিপুত্র, শত্রুদমনকারী, সহদেব, মহান বিভীষণের কাছে প্রীতিভরে দূতদের পাঠালেন। বিভীষণও সহদেবের অনুশাসন প্রীতিভরে গ্রহণ করলেন। সেই আদেশ, যুগধর্মের প্রভাবের (ত্রেতাযুগের প্রভাবশালীদের শক্তি, দ্বাপরযুগে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে) ফল বলে মনে করলেন। তখন বিভীষণ বিবিধ রত্নরাজি, চন্দন, অগরুকাঠ, দিব্য অলঙ্কার, মহার্ঘ্য বসন, মহামূল্যবান রত্নসমূহ প্রভৃতি পাঠালেন। বুদ্ধিমান ও উদারমনা সহদেব সেগুলি নিয়ে ফিরে চললেন। এইভাবে বলপ্রয়োগ করে, সামনীতিব মাধ্যমে, কূটকৌশলমূলক বিজয়ের মাধ্যমে অন্য রাজাদের নিঃশেষে জয় করে, তাঁদের রাজ্যগুলি করদ রাজ্যে পরিণত করে, শত্রুদমনকারী সহদেব ফিরে গেলেন। কৃতকার্য সহদেব,ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের কাছে সব কিছু (বিজিতধনসমূহ) নিবেদন করে সুখে বাস করতে লাগলেন।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
যুধিষ্ঠির রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠান করতে উদ্যোগী হয়েছেন। তাঁর চাই অপ্রতিহত ক্ষমতা, একচ্ছত্র আধিপত্য। এ বিষয়ে সহযোদ্ধা হলেন তাঁর চার ভাই। ভারতভূমির চারদিকে দিগ্বিজয়ে গেলেন চার ভাই। অর্জুন উত্তরদিকে, ভীমসেন পূর্ব দিকে, সহদেব দক্ষিণে এবং নকুল পশ্চিমদিকে সসৈন্যে যাত্রা করলেন। চার ভাইয়ের লক্ষ্য এক এবং অভিন্ন। তাঁদের লক্ষ্য হল জ্যেষ্ঠর, ক্ষমতাসীন রাজা যুধিষ্ঠিরের স্বার্থরক্ষা। এই পর্যন্ত অর্জুন, ভীম ও সহদেব তিনজনের এই বিষয়ে বিশ্বস্ততার পরিচয় রেখেছেন। প্রত্যেকেই স্থির লক্ষ্যে এগিয়েছেন ও কৃতকার্য হয়েছেন। এক অভিন্ন লক্ষ্য — উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিকের সমস্ত রাষ্ট্রকে এক অপ্রতিহত ক্ষমতার ছত্রছায়ায় এনে তাঁদের আনুগত্য আদায় এবং করসংগ্রহের মাধ্যমে উভয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠার দিকটি সুরক্ষিত করা। এক দক্ষ শাসনাধীন রাষ্ট্রের অন্তর্গত অসংখ্য অনুগত রাষ্ট্রব্যবস্থা বোধ হয় ভরতবংশীয়দের চিরন্তন প্রশাসনিক ঐতিহ্য। পাণ্ডবদের দিগ্বিজয়ের দিগ্দর্শনের মধ্যে যেন আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার ছায়ার কিছুটা প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।
মহাভারতীয় ভৌগোলিক মানচিত্রে আধুনিক ভারতের প্রদেশগুলির নামোল্লেখ,তাদের প্রাচীনতা চিহ্নিত করে। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়মহাযজ্ঞ এক অখণ্ড উপমহাদেশের ঐক্যসূত্রটি ধরে রেখেছে। সকলে এক বৃহৎ রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করেও প্রত্যেকেই স্বাধীন এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। “বিবিধের মাঝে ওই মিলন মহান” যেন সত্যি হয়েছে। সহদেব শুধু সৈন্যবলের ওপরে নির্ভর করে যুদ্ধজয়ে উদ্যোগী হননি।তিনি একাধারে, বলপ্রয়োগ, সন্ধি ও কূটকৌশলের সাহায্য নিয়েছেন। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে বশে আনা যায়। অপরের আনুগত্য আদায়ের জন্য কোথাও প্রয়োজন শান্তির সন্ধি,এই বিষয়ে কোথাও বা রাজনৈতিক কূটকৌশলের প্রয়োগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। আধুনিক ভারতের অন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক বাতাবরণে এই তিনটির অবিরাম অন্তর্নিবেশ চলছে, এ বিষয়ে হয়তো অনেকেই সহমত হবেন।—চলবে।
মহাভারতীয় ভৌগোলিক মানচিত্রে আধুনিক ভারতের প্রদেশগুলির নামোল্লেখ,তাদের প্রাচীনতা চিহ্নিত করে। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়মহাযজ্ঞ এক অখণ্ড উপমহাদেশের ঐক্যসূত্রটি ধরে রেখেছে। সকলে এক বৃহৎ রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করেও প্রত্যেকেই স্বাধীন এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। “বিবিধের মাঝে ওই মিলন মহান” যেন সত্যি হয়েছে। সহদেব শুধু সৈন্যবলের ওপরে নির্ভর করে যুদ্ধজয়ে উদ্যোগী হননি।তিনি একাধারে, বলপ্রয়োগ, সন্ধি ও কূটকৌশলের সাহায্য নিয়েছেন। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে বশে আনা যায়। অপরের আনুগত্য আদায়ের জন্য কোথাও প্রয়োজন শান্তির সন্ধি,এই বিষয়ে কোথাও বা রাজনৈতিক কূটকৌশলের প্রয়োগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। আধুনিক ভারতের অন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক বাতাবরণে এই তিনটির অবিরাম অন্তর্নিবেশ চলছে, এ বিষয়ে হয়তো অনেকেই সহমত হবেন।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra : politics & diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।


















