টেক সলিউশন একটা রেসিডেন্সিয়াল ফ্ল্যাট থেকে করা অফিস। তাই দেখানে দুটো ছোট ছোট টয়লেট ভেঙে একটা বড় টয়লেট করা হয়েছিল। অতনু সিইও হলেও নিজের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা রাখেনি। অতনু কী ভেবে উঠে টয়লেটে গিয়ে দেখল সেই ছেলেটি বেসিনে হাত রেখে হাউ হাউ করে কাঁদছে।
টেক সলিউশন একটা রেসিডেন্সিয়াল ফ্ল্যাট থেকে করা অফিস। তাই দেখানে দুটো ছোট ছোট টয়লেট ভেঙে একটা বড় টয়লেট করা হয়েছিল। অতনু সিইও হলেও নিজের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা রাখেনি। অতনু কী ভেবে উঠে টয়লেটে গিয়ে দেখল সেই ছেলেটি বেসিনে হাত রেখে হাউ হাউ করে কাঁদছে।
আমার এমন ছেলে চাই যে ঘণ্টার ঘণ্টার পর একটা জিনিস নিয়ে পড়ে থাকতে পারে, ভাবতে পারে। কিন্তু তাকে ফ্রিডম দিতে হবে। এই ফ্রিডমটা পায় না বলেই যথেষ্ট বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও এরা কম্পিটিটিভ এক্সাম ক্র্যাক করতে পারে না। সে অকারণে বিদ্যে জাহির করে না কিন্তু ইয়েস ম্যানও নয়। নিজের টার্মসে কাজ করতে ভালোবাসে।
“এই অর্গানাইজেশনে কোনওদিনই কোনও রিশেপসনিস্ট থাকবেন না! ইনফ্যাক্ট আজ আ পলিসি আমরা কোনও লেডিকে রিক্রুট করবো না, নট ইন এনি পজিশন!
কথাটার মধ্যে এতটাই কনভিকশন ছিল সুবিমলের দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে হয়নি কেন? মহিলারা এই স্টার্ট-আপে কাজ পাবেন না! No means no.!”
অতনুবাবু, ঝুঁকি কোনওদিন নিতে পারিনি। আজকে আমি আর আমার স্ত্রী। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বোনেরা সংসার করছে। অনেকটা ঝাড়া হাত-পা। তাই এবার একটু ঝুঁকি নিতে চাই। আর একটা কথা। আপনার মতো যুবক আমি ছোটবেলা থেকে বড় হওয়ার মধ্যে দেখিনি কাউকে। তাই ঝুঁকিটা আপনার সঙ্গে নিতে চাই।
দরজা ঠেলতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে আসে। চিকেন চাপ আর বিয়ারের রাতভোর জমে থাকা ককটেল। বাড়িতে ফ্রিজেরাখা কপির তরকারিতেও একই কাণ্ড ঘটে। আলো-আঁধারি। রেস্তঁরার মালিক বোধহয় সকালের বিদ্যুৎ বাঁচান। নো লাইট, নো ফ্যান! একটা মোটা থপথপে লোক। মাথায় রোঁয়াওঠা খাড়াখাড়া চুল। লালরঙের সানমাইকার কাউন্টারে বসে আছে। পাশে ঝুল কালি-নিন্দিত একটা টেবলফ্যান। ঘরঘর করে ঘুরছে। তবে লোকটার মোটা খসখসে চামড়া টপকে সে হাওয়া তাঁর শরীরে পৌঁছচ্ছে কিনা সন্দেহ।
অতনু জানেই না যে তার অজান্তে সিকিউরিটি এজেন্সির বিতান ঘোষ তার সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়েছেন। প্রয়োজনটা তার নয়। প্রয়োজন অতনু সেনের রেকমেন্ডেশনে রবীন চ্যাটার্জির কোম্পানি অ্যাথেনা ইনফোটেকের কর্মরতা দিয়া সাহার। তবে দিয়ার কেন অতনুকে জানার প্রয়োজন সেটা সে বোধহয় নিজেও জানে না।
রাতে দিয়া ঘুমোতে পারে না! অতনু সেনের জন্যে খুব খারাপ লাগছিল। এতদিন দিয়া ভাবতো তার মতো কষ্ট কেউ পায়নি। তাকে পড়াশোনা করাতে এতকষ্ট করেছেন তার মা-বাবা। কিন্তু তার সাফল্য দেখার আগেই মারণ রোগে বাবা চলে গেলেন। মা এখনও গ্যাস এজেন্সিতে কাজ করেন। পরিশ্রম হয়। অসুস্থ হন। তবু কাজে যেতে হয়। গ্যাস এজেন্সিতে ছুটি নেই।
ছুটি হতেই দিয়া দ্রুত পায়ে রাস্তায়। কলেজ মোড়ে বাসযাত্রীদের চাকচাক ভিড়। বাসস্ট্যান্ড থেকে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়া আরও ঘরফিরতি মানুষজন। সেক্টর ফাইভের বহুতল থেকে দেখলে ঠিক যেন কৌটোতে মৌরী ঢালতে গিয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়তি মৌরীর মতো দেখাবে। রান্নাঘরে মৌরি নিতে গিয়ে দিয়া রোজ ফেলে আর মা রোজ চটে যান। দিয়া আরও খানিকটা তফাতে দাঁড়াল।
ওয়েলেসলি জুটমিলের টাইম অফিসের কর্মী ছিল দুলাল সেন। মজদুর ইউনিয়নের সেই জুটমিলের মালিক কানাইলাল মহেশ্বরী। আরও আনুষাঙ্গিক ক'জন। সেই ভয়ংকর রাতে স্নিগ্ধার শ্লীলতাহানির মিথ্যে অভিযোগে দুলালকে দোষী সাজানোর কারিগর। হঠাৎ উপস্থিত হওয়া সেই দু’জন, বিয়েবাড়ির ভিডিওগ্রাফার আর তার শাকরেদ। ওয়েলেসলি জুট মিলের গাড়ির ড্রাইভার যে মিথ্যে সাক্ষী দিয়েছিল। থানার ওসি বীরেশ দও। সৎ স্বচ্ছ সাব-ইন্সপেক্টর হাসান আলি অনেক চেষ্টা করেও ওসির বিরোধিতার জন্য দুলাল বা তাঁর স্ত্রী তৃপ্তিকে কোনওভাবেই সাহায্য করতে পারেননি। আরও ছিলেন দুলালের মামলার...
…আরও একটা কারণে ছোট পিসেমশাইকে চুঁচুড়া আসতে হত। অতনুদের বাড়ি। মানে যেটা অতনুর দাদু স্কুল শিক্ষক অমৃতলাল সেন অনেক কষ্ট করে একটু একটু করে গড়ে তুলেছিলেন। সেই বন্ধ বাড়ির তদারক করতেন ছোট পিসেমশাই। দুলালের সঙ্গে দেখা করে তার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে বড় বা মেজ শালিকার সঙ্গে কথা বলে বাড়ি বিক্রি করা টাকা সকলকে সমানভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন ছোট পিসেমশাই।
অতনু সপ্তাহে একবার আসে। বাবা খবরের কাগজ পড়েন না। ফলে রাজ্য রাজনীতি কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আলোচনার মধ্যে আনা যায় না। তাই মাঝে মাঝে অতনুর অফিসের কথা এসে পড়ে। অতনু কথা বলে। বাড়ির কথা। চুঁচুড়ার কথা। সবেতে পাঁচিল দিয়ে রাখতে হয়। অতনু নিজেও চায় না পুরনো কথা মনে করতে। স্মৃতি এক অদ্ভুত অনুভূতি। জোর করে ভোলা যায় না! চুঁচুড়ার বাড়িটা বিক্রি হয়ে গিয়েছে। মায়ের মৃত্যুর পর ও বাড়ি বন্ধ ছিল। অতনু তো ফিরে যায়নি সেখানে।
দুলালেরও ভীষণ কৌতূহল হয়েছিল। বিখ্যাত অ্যাডভোকেট। নিখরচায় কেস তিনি করতেই পারেন। কিন্তু যে কেসে পুলিশ চোখের সামনে খুনটা হতে দেখেছে এবং খুনি নিজে ভরা আদালতে বিচারকের সামনে যে খুনের কথা স্বীকার করেছেন। সেখানে সাজা তো হবেই! তবু তিনি দুলাল সেনের কেসটা হাতে নিয়ে তিনি তাঁর মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন কেন?
ফাঁসি নিশ্চিত ছিল। দুলাল মানসিকভাবে তৈরি ছিল। কিন্তু প্রখ্যাত অ্যাডভোকেট অবনী চৌধুরী বিনা পয়সায় প্রো-বোনো কেস লড়ে সাজা ফাঁসি থেকে যাবজ্জীবন করেছিলেন। ফাদার স্যামুয়েল বিশ্বাসের কাছে দুলাল ও তৃপ্তির একমাত্র সন্তান এই অতনু সেন। পিতৃমাতৃহীন অতনুকে পুত্রস্নেহে চার্চে রেখে মানুষ করেছেন ফাদার। অতনুর কাছে অতীতের সবকিছু বলেছেন।
হঠাৎ ঘুম থেকে ডাকলেও ঘাবড়ে গিয়ে মায়ের বুক ধড়ফড় করে। কোনও কারণে ঝড়বৃষ্টিতে বা প্রতিবাদ প্রতিরোধের মিছিল মিটিঙের ভিড়ে একটু দেরি হলেই মা আতঙ্কিত হয়ে ফোন করতে থাকেন। মায়ের কথা ভেবেই দামি ব্লু-ট্যুথ কিনতে হয়েছে দিয়াকে। যাতে চটপট উত্তর দিয়ে মাকে শান্ত করতে পারে। শরীরের পক্ষে অতিরিক্ত রেডিয়েশনের জন্যেই ব্লু-ট্যুথ ভাল নয় এটা জেনেও ব্যবহার করতে হয়। সাধারণ তারওয়ালা ইয়ারফোন নিয়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করা যায় না।
বিতান গাড়ি চালাচ্ছে। শরীর থেকে কোলনের গন্ধ নাকে আসছে। বিনিকে দিয়ার কথা বিতান ঠিক কী বলেছে? কতটা বলেছে? মানে বন্ধু বলেছে। আর কী? সরস্বতী পুজোর অঞ্জলির ফুলে দিয়াকে প্রেমের প্রস্তাব লেখা কাগজ গুঁজে দেওয়ার কথাটা কি বলেছে? এতটা সৎসাহস দেখিয়ে কারও মনের সাঁকো নাড়ানো বোধহয় ঠিক নয়! সিকিউরিটি সার্ভিস চালানো বিতান সেটা বোঝে।