
শনিবার অফিস ছুটি। কলকাতার জেমস লং সরণির ফ্ল্যাট থেকে চুঁচুড়া। সঙ্গে একগাড়ি উপহার। প্রচুর বইপত্র শুকনো খাবারদাবার আবাসিকদের পোশাক-আশাক খেলাধুলোর সরঞ্জাম। আর মাসের শুরুতে নিয়মিত একটা মোটা আর্থিক অনুদান।
প্রথমবার ফাদার স্যামুয়েল বলেছিলেন
— এতও কিছু কেন মাই সন।
— সারাজীবনেও চার্চের আপনার ঋণশোধ করতে আমি পারবো না! এটা গুরুদক্ষিণা!
প্রথমবার ফাদার স্যামুয়েল বলেছিলেন
— এতও কিছু কেন মাই সন।
— সারাজীবনেও চার্চের আপনার ঋণশোধ করতে আমি পারবো না! এটা গুরুদক্ষিণা!
প্রতি শনিবার চার্চে আসার আগে অতনু নিয়ম করে দিনের শুরুতেই প্রথমে যেতো আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। যেখানে একদিন বন্দি হয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, হেমচন্দ্র কানুনগো, কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্র নাথ বসু, গোপীনাথ সাহা, দিনেশ গুপ্ত, বীরেন্দ্রনাথ শাসমাল, জওহরলাল নেহেরু, বিধানচন্দ্র রায়, চারু মজুমদাররা। সেখানেই আছেন অতনুর বাবা দুলাল সেন। চক্রান্ত করে একটা সুস্থ স্বাভাবিক অনমনীয় স্বাধীনচেতা মানুষকে কলঙ্কিত করা হয়েছিল। বিচার ব্যবস্থাকে প্রহসন বানিয়ে তাঁকে জেলে পোরা হল। বোধহয় এই পরিণতি দুলাল সেন মেনে নিয়েছিলেন। ধাক্কা খেলেন অতনুর মা, দুলালের স্ত্রী তৃপ্তির আত্মহত্যার পর।
আরও পড়ুন:

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৫ : শেষের খুব কাছে

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৫ : নিশীথে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩
আজ এতবছর পর ভাবতে গিয়ে অতনুর মনে হয় সেটা কি আত্মহত্যা ছিল? অতনু ছিল না। মা তার আগেই অতনুকে চার্চে ফাদার স্যামুয়েলের কাছে রেখে এসেছিলেন। অতনু সেদিন ছিল স্কুলের হোস্টেলে। তাঁর দু’দিন পরে ফাদার নিজে গিয়ে চার্চে নিয়ে এসেছিলেন। চার্চেই রেখেছিলেন। সারাদিন একটু একটু করে জানিয়েছিল মা মারা গিয়েছেন। কী ভাবে মারা গিয়েছেন সেটা সেদিন বলেননি। বলেছেন অনেকদিন বাদে। খানিকটা বড় হবার পর। সেদিন মাকে মর্গ থেকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেদিন দুলাল যে জেল থেকে আসবেন দাহকার্য্যে সেটা ফাদার বলেছিলেন। কিন্তু শ্মশানে কী হয়েছিল সেটা অতনু জেনেছিল আইএসসি পাশ করার পর।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৮: কালো ইঁদুর
প্রতিহিংসা নেবার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। একটা ভয়ংকর যন্ত্রণা নিয়ে তৃপ্তির মুখাগ্নি করে জ্বলন্ত চিতার দিকে তাকিয়ে ছিল দুলাল সেন। কিন্তু সেই আগুনের শিখার অপরদিকে স্নিগ্ধার দিকে নজর যেতেই দুলালের মাথার মধ্যে জ্বলন্ত চিতার আগুন সবকিছু গোলমাল করে দিলো। স্নিগ্ধা কি নিজে চোখে দুলালের সুখ সংসার তৃপ্তির ছারখার হয়ে যাওয়া উপভোগ করতে এসেছে? আচমকা মনে হল তৃপ্তি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের ভিতর থেকে দুলালের দিকে তাকিয়ে আছে। তৃপ্তি যেন দেখতে চায় দুলাল কী করে? যে অপরাধ করেনি তার সাজা ভুগতে হচ্ছিল তাতে আক্ষেপ ছিল। অপমান ছিল। দূর্ভাগ্যের হতাশা ছিল। প্রতিশোধের কোন আকাঙ্ক্ষা ছিল না। কিন্তু আচমকা চোখ পড়ল কনস্টেবলের বন্দুকের দিকে। নকশাল আমলে শোনা যায় বন্দুক ছিনতাই রুখতে চেন দিয়ে শরীরে বন্দুক বাঁধা থাকতো। তারপর আর সে-সব বালাই নেই!
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৭: রাজসূয়যজ্ঞ কী শুধু একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রদর্শনী? না স্বতঃস্ফূর্ত গণসমর্থনলাভের উদ্যোগ?

সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৩৮: নন্দিতা কৃপালনি— বিশ শতকের বিদুষী
দুলাল সেই বন্দুকের ভারী কাঠের চকচকে বাঁট দিয়ে চকিতে স্নিগ্ধার মাথাটা থেঁতলে দিয়েছিল। তারপর লুটিয়ে পড়া রক্তাক্ত স্নিগ্ধার শরীরে সেই রক্তমাখা বন্দুক ঠেকিয়ে দু’হাতে দিয়ে ধরে ট্রিগার টিপে বন্দুক ফেলে দিয়েছিল দুলাল সেন।
বাবার সঙ্গে এসব নিয়ে কখনও কোনওদিন কথা বলে না অতনু। বাবা যেন সেখানে একা থাকেন। অতনু থাকে অন্যত্র। সপ্তাহন্তে গিয়ে দেখা করে। এটা ওটা কথা। গল্পকথা। দুলাল গল্প উপন্যাস পড়তে ভালবাসে। অতনু নিয়ে যায়। দুলাল আগেও স্বল্পভাষী ছিল। কিন্তু ইদানীং কথা বলে না। শোনে। কখনও সখনও এক বা দু’বার হুঁ, হ্যাঁ বা না।
বাবার সঙ্গে এসব নিয়ে কখনও কোনওদিন কথা বলে না অতনু। বাবা যেন সেখানে একা থাকেন। অতনু থাকে অন্যত্র। সপ্তাহন্তে গিয়ে দেখা করে। এটা ওটা কথা। গল্পকথা। দুলাল গল্প উপন্যাস পড়তে ভালবাসে। অতনু নিয়ে যায়। দুলাল আগেও স্বল্পভাষী ছিল। কিন্তু ইদানীং কথা বলে না। শোনে। কখনও সখনও এক বা দু’বার হুঁ, হ্যাঁ বা না।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা
সপ্তাহে একবার আসে। বাবা খবরের কাগজ পড়েন না। ফলে রাজ্য রাজনীতি কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আলোচনার মধ্যে আনা যায় না। তাই মাঝে মাঝে অতনুর অফিসের কথা এসে পড়ে। অতনু কথা বলে। বাড়ির কথা। চুঁচুড়ার কথা। সবেতে পাঁচিল দিয়ে রাখতে হয়। অতনু নিজেও চায় না পুরনো কথা মনে করতে। স্মৃতি এক অদ্ভুত অনুভূতি। জোর করে ভোলা যায় না! চুঁচুড়ার বাড়িটা বিক্রি হয়ে গিয়েছে। মায়ের মৃত্যুর পর ও বাড়ি বন্ধ ছিল। অতনু তো ফিরে যায়নি সেখানে।—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘দুটি নভেলা’ ,‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।


















