সোমবার ৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

দিয়া সাহা। ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম। আর পাঁচটা স্কুলপড়ুয়া বন্ধুদের মতো নয়। বেণীতে জীবন জড়িয়ে বড় হয়নি। কাঁধ-ছাপানো হাফচুল। ফ্রক ছেড়ে শাড়ির আঁচল সামলে মাথা নিচু করে পায়ে পায়ে মেপে চলা মেয়ে নয়। জট ছাড়ানো চুল আঁচড়ে বেণী বাঁধার সময় ছিল না মায়ের। বাবার চাকরিটা লগবগে ব্যাঁখারির মতোই ছিল চিরকাল। লাঠির মতো ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলে ভার নিতে পারতো না! বেঁকে নুয়ে পড়ত। পাছে ওই অবলম্বনটুকু ভেঙ্গে যায় তাই মা একটা সেলাই স্কুলে দুপুরে সেলাইয়ের কাজ করতো। ভাগ্যিস। তারপর আচমকা বাবা চলে গেলেন। সেলাই স্কুলের কাজের রোজগারে মেয়েকে পড়িয়ে দু’ বেলা ভাতের জোগাড় করা অসম্ভব। বিশু পালের এই গ্যাস এজেন্সির অফিসের কাজটা পেয়ে একটু যেন দম পেল দিয়ার মা শান্তি! সিগারেট খেতে খেতে বাবা আচমকা দম হারিয়ে ফেলেছিলেন। বুকের ফুসফুস হাওয়ার যোগান দিতে পারছিল না। মারণ রোগ খেয়ে ফেলেছিল হাওয়ার থলি।
যে সময়ে প্রেম আসে। মনে ভালোবাসার প্রজাপতি ফরফর করে। বিশেষ কাউকে আড়চোখে দেখতে চোখ দুটো অবাধ্য হয়ে ওঠে। ঠিক সেই বয়সে বাবার ছবির সামনে আপেলে-গোঁজা ধূপকাঠি জ্বলছিল। মায়ের পাশে বসে বাবাকে কল্পনা করে ব্রাহ্মণের বলা মন্ত্র বলে বলে পারলৌকিক ভোজ্যবস্তু তুলে দিতে হয়েছিল দিয়াকে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যা শুনছে আর যা বলছে তারমধ্যে ফাঁক থেকে যাচ্ছে। কিন্তু শুধরে নেওয়ার তো উপায় নেই। মন্ত্রোচ্চারণ এমনই হয়। ঈশ্বর নিজগুণে ক্ষমা করে দেন। বাবাও ঐশ্বরিক পথে হাঁটছেন। তিনিও দেবেন। কারও কারও আপত্তি সত্ত্বেও দিয়াকে দিয়ে বাবার মুখাগ্নি করিয়েছিলেন মা শান্তি। দিয়া আগে কখনও কলাগাছের পেটোর উপর চাল-কলা-কালোতিল মাখা সাদাকালো তলতলে পিণ্ডগুলো এতও কাছ থেকে দেখেনি।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫৬: আকাশ এখনও মেঘলা

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৮: সুজাতজাতক—তবু অনন্ত জাগে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২১: বিবাহ সংবাদ, আদিনাথ-গোরা

অনেক ছোটবেলায় স্কুলে বা পাড়ায় স্পোর্টসে দৌড়ের সময় বাবা দুটো লাইন দেখিয়ে বলেছিলেন
—দিউ মা! দু’পাশের ওই দুটো লক্ষণ রেখা। দৌড়াতে গিয়ে যেন কোনওভাবে ডাঁয়ে-বাঁয়ে পা না ছুঁয়ে যায়!
—ছুঁলে কী হবে?
—সব চেষ্টা বরবাদ!
—মানে
— ডিস্কোয়ালিফায়েড! অকৃতকার্য। হারার আগেই হেরে যাওয়া।

পরে যখন দেহে-মনে বড় হয়ে গেল। তখন আর স্পোর্টসে নাম দিত না। ওর অনেক বন্ধুরা দৌড়োতো। ওকে ডাকতো। কিন্তু মাথা উঁচু করে চলা মেয়ে হলেও ক্ষতের একটা স্মৃতি ওকে বুঝিয়েছে এটাও এক লক্ষণরেখা! পাড়ার রঞ্জুকাকার স্টেশনারি দোকান। দোকানটা তার বাবা হাবুল দত্তের। তার তখন বয়েস হয়েছে। রঞ্জুকাকা বাবার থেকে অল্প ছোট! তাই হিসেব মতো দিয়ার হাবুল দাদু বলা উচিত। কিন্তু কেন জানি না সে হাবুল জেঠু বলতো। ছোটবেলায় প্রতিবার দৌড়ে ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড কিছু একটা হতো। সেবার পারলো না। একটু তফাতে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছিল। হঠাৎ চেনা গলা শুনে ফিরে তাকাল।
—কিরে বেটি! এবার তো পারলি না! ভারী হয়ে গিয়েছিস!
হাবুল জেঠু মিটিমিটি হাসছে। চশমার ভিতর থেকে তার চোখ দুটো দিয়ার শরীরের ওপর কিলবিল করছে!
—হুঁ।
এই একটা শব্দ করে দেওয়া ছুটে সেখান থেকে চলে গিয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল। এই জেঠু দাদুদের চোখের সামনে দিয়ে এরপর তার আর ছুটোছুটি করা ঠিক নয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৭: জরাসন্ধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মত ও তাঁর নামের মাহাত্ম্য

এই লক্ষণরেখাই স্কুলে কলেজে বরাবর তাকে প্রথম পাঁচজনের মধ্যে রেখেছে। প্রেম-প্রীতি ব্রেকআপ ব্রেক ডাউনের জগতে অবিচল রেখেছে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিষয় বেছে নিয়েছে দিয়া। সেক্টর ফাইভের চৌহদ্দির মধ্যে ঘোরাফেরা। রোজ। কিন্তু একদিনও অতনু সেনের মুখোমুখি হয় না সে। রাস্তা পার হওয়ার সময়। ট্রাফিক জ্যামে। গাড়িতে কাঁচের জানালায়। না। কোথাও দেখা যায় না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৯: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — চিতল হরিণ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৩ : শহরের ইতিকথা

শাড়ি পড়া বয়সে নাগেরবাজার রথেরমেলার সময় মাটিতে শতরঞ্চি পেতে তারা বসতো। হার দুল খেলনার দোকানের মতো স্টল করে বসতে কখনও তাদের দেখেনি। জিলিপি কটকটি ঝুরিভাজার দোকানদারেরাও ছড়িয়ে বসতো। কিন্তু এরা ভিড় এড়িয়ে একটু দূরে পলিথিনের ওপর বইগুলো সাজিয়ে বসতো। বাগান করার দু’ একটা বই। এটা সেটা বিষয়। আর সেই বইগুলো। অদ্ভুত তার নাম। অদ্ভুত মলাট। লেখকের নাম নেই। মলাট জোড়া নিষিদ্ধ বই। কখনও মায়ের সঙ্গে কখনও বা বন্ধুদের সঙ্গে যেতে যেতে তাকিয়ে দেখেছে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯২: কৈলাসচন্দ্র সিংহ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

এ দোকানের খরিদ্দারেরাও অদ্ভুত। দরদাম করে না। ইশারায় কথা বলে। টাকা দেয় খবরের কাগজ মোড়ে বই নিয়ে চলে যায়। খুব ইচ্ছে ছিল জানার। ওই বইতে কী এমন থাকে যার জন্য ওরকম লুকোচাপা। জানা হয়নি। সেদিনও। আজ এতটা বড় হয়েও। তবে আজ ইন্টারনেট ঘেঁটে বুঝতে পারে কেন নানা বয়সের কিশোর যুব প্রৌঢ় সে বইয়ের আকর্ষণে ঘুরঘুর করতো। এতদিন বাদে দিয়ার কেমন যেন মনে হয় অতনু সেন তার কাছে সেই মলাটজোড়া নিষিদ্ধ বইয়ের মতো। কী আছে মানুষটার মধ্যে?—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘দুটি নভেলা’ ,‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content