কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

 

|| হার্ড ড্রাইভ-২ ||

চন্দননগরের ঐতিহ্য অনেক। চন্দননগর পৌরনিগমের শুরুটা ১৯৯৮ হলে প্রথম পৌরসভা তৈরি হয় ১৮৮০ সালে ফরাসি শাসনকালে। আরও আছে। সারা দুনিয়াতে চন্দননগরের খ্যাতির একটা প্রধান কারণ ছিল ফরাসডাঙার তাঁত। দুর্গাচরণ রক্ষিত বঙ্গ বিদ্যালয় যাঁর নামে সেই তিনি দুর্গাচরণ রক্ষিত এই তাঁতের শাড়ির ব্যবসা করেই হয়ে উঠেছিলেন এক বড়ো মাপের উদ্যোগপতি। কলকাতার এক ফরাসি ব্যবসায়ী ক্যামা সাহেব। তাঁর অধীনে কাজ করতে করতেই আমদানি রপ্তানির কাজে হাত পাকিয়েছিলেন তিনি। চন্দননগরে নির্মিত হয়েছিল দুর্গাচরণ রক্ষিত ঘাট। সেটা ১৯২১ সাল। ১৮৯৮ সনে তিনি মারা যান। ১৮৯৬ সালেই ভারতীয়দের মধ্যে সর্বপ্রথম ফরাসি দেশের সর্বোচ্চ সম্মান লে’জিয়ঁ দ’ ন্যর (Chevalier de legion d’Honour) সম্মান লাভ করেছিলেন তিনি। হ্যাঁ, সত্যজিৎ রায়ের অনেক আগে এই সম্মান তিনি পেয়েছিলেন। লে’জিয়ঁ দ’ ন্যর প্রদানের রেওয়াজ চালু করেছিলেন ফ্রান্সের সম্রাট এবং প্রবাদপ্রতিম বীরযোদ্ধা নেপোনিয়ন বোনাপার্ট।
সেই চন্দননগরের মোটামুটি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান পুলক। ছোটবেলা থেকে অসম্ভব উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ছোটখাট কিছু ভাবতে জানে না। বুদ্ধিমান পড়াশোনায় মোটামুটি আর মাথাটা দারুণ খেলে। সুবুদ্ধি-কুবুদ্ধি দুটোতেই সম্মান পারদর্শী। তাই চন্দননগর উৎসবে স্কুল থেকে পার্টিসিপেশনে গিয়েছিল। স্কুল দুর্গাচরণ রক্ষিত বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে ক্লাস নাইনের ছাত্র পুলক ভট্টাচার্য আর সেন্ট জোসেফ’স কনভেন্ট স্কুলের ক্লাস এইটের ইপ্সিতা। প্রথম পরিচয় কিন্তু ঝগড়া দিয়ে। উৎসব কাউন্টারে ব্যাজ নেওয়ার সময় ভিড় হয়েছিল। ইপ্সিতা ও তার স্কুলের বান্ধবীরা মেয়েদের জন্যে আলাদা লাইনের দাবি জানিয়েছিল। কড়া আপত্তি জানিয়েছিল পুলক।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৬৮: রামায়ণে পরস্ত্রীহরণের সিদ্ধান্তে বীরত্বের প্রকাশ নেই, আছে অনেক মৃত্যুর আবাহনবার্তা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৫ : শেষের খুব কাছে

এটা কী রেলওয়ে কাউন্টার, বাসের সিট নাকি দূর্গাপুজোর লাইন মেয়ে বলে প্রেফারেন্স? এখানে আমাদেএকটাই পরিচয় আমরা চন্দননগর উৎসবের পার্টিসিপেটিং স্টুডেন্টস। এরপর তো ক্লাসের পরীক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা সবেতেই প্রেফারেন্স চাইবে। র মানুষ হিসেবে ভাবো সবসময় বাড়তি সুযোগ পাওয়াটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যাবে।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা

ইপ্সিতা বা তার বান্ধবীরা জবাব খুঁজে পায়নি। অনুষ্ঠানের অয়োজকেরা ক্লাস এইটের কিশোরের মুখে এই দৃপ্ত যুক্তি শুনে অবাক। অবাক হয়েছিল ইপ্সিতা নিজেও। এই ধাক্কা থেকেই বোধহয় তাঁর মনের কোণে মিনমিনে ঘামের মতো জন্ম নেওয়া প্রেমের নির্যাস সারা শরীরে ও মনে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরের ধাক্কায় আরও চমকিত সকলে পুলক বন্ধুদের নিয়ে লাইন থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলেছিল
— তোমরা আগে ব্যাজ নিয়ে নাও! পরে নিলেও ব্যাজ শেষ হয়ে যাবে না!
অন্য বান্ধবীদের ব্যাপারটা অপমানজনক মনে হলেও ইপ্সিতার হয়নি! মনের ভাব শরতের আবহাওয়ার মতোই বদলে বদলে যায়। তবে পুলকের ভালোলাগাটা শুরু হল সেদিন সন্ধেবেলা।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৩ : অস্থান-জাতক—অসম্ভবের ছন্দ

সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৩৮: নন্দিতা কৃপালনি— বিশ শতকের বিদুষী

রবীন্দ্রসঙ্গীতে নাচের অনুষ্ঠান হয়েছিল প্রতিযোগীরা গান ক্যাসেটে বাজিয়ে নাচ করছিল। ৯০-এর দশকে এসে গিয়েছে সিডি, কম্প্যাক্ট ডিস। সে সিডিতে বেজে উঠলো ” আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি” — শিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায়। মঞ্চে অদ্ভুত এক মনোরম আলোর মধ্যে শরীরে ঢেউ তুলে নাচ শুরু করল সেন্ট জোসেফ’স কনভেন্ট স্কুলের ইপ্সিতা চট্টোপাধ্যায়। একে প্রথম সিডিতে শোনা গানের মূর্ছনা—সেই সঙ্গে আলোর মায়ায় ইপ্সিতার নাচের অমন মাদকতা। নাচ শেষ হবার পর উপস্থিত দর্শকদের স্তম্ভিত স্তব্ধতা। থমকে থাকা ভিড়ে প্রথম হাততালি বোধহয় পুলকই দিয়ে উঠেছিল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

ইপ্সিতা জানতো এই চমকগুলো কাজে লাগবে। সচরাচর ঢঙে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত না বেছে আরতি মুখোপাধ্যায়ের একটু সিনেমাটিকভাবে গাওয়া গানটা বেছে নেওয়া, নিজস্বভাবে আলো করতে চন্দননগরের নামী ইলেক্ট্রিশিয়ানের সঙ্গে আগে রিহার্সালের ব্যবস্থা করা। ক্যাসেট না বাজিয়ে সিডিতে গানটা নিজস্ব সিডি প্লেয়ারে বাজানো। বিউটি পার্লারের লোক ডাকিয়ে মেকআপ করানো, তারপর নাচটাকে পারফেক্ট করা, প্রতিটি কাজে নিষ্ঠা ও বুদ্ধির ছাপ! ইপ্সিতা প্রথম হবে এটা তো স্বাভাবিক। পুলক সে রাতে ঘুমোতে পারলো না। প্রাইজ ডিস্ট্রিবিঊশনের দিন আবার অতিথিদের সামনে একই নাচ একইভাবে আবার করতে হল। আবার ম্যাজিক ছড়িয়ে পড়ল। সেদিন বহুক্ষণ ধরে শার্টের ভেতরে প্লাস্টিকের মোড়কে যত্নে রাখা একটা টকটকে লাল গোলাপ বয়ে বেড়াচ্ছিল পুলক। ইপ্সিতাকে একা পেয়ে সেটা তাঁর হাতে তুলে দিয়ে কিশোর পুলক সেদিনই বলে দিয়েছিল— আই লাভ ইয়ু! —চলবে।

হার্ড ড্রাইভ পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে আগামী বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬।

* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘দুটি নভেলা’ ,‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content