
গরম পড়েছে। তবে তেমন নয়। সন্ধেবেলা চৌবাচ্চার ধরা জল গায়ে দিলে কেমন শিরশির করে। আবার দিয়ার মাথায় কুচিন্তা ঘুরঘুর করছে। বিনি আর বিতান নিশ্চয়ই একে অপরের গভীর সান্নিধ্য ভীষণ উপভোগ করে! সেটাই তো স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক দাম্পত্য। সংসারের টুকরোটাকরা ঠোকাঠুকি। মতের অমিল। মন কষাকষি। সব কিছুর মকরধ্বজ ওষধি হল—সুখী দাম্পত্য জীবন।
আচ্ছা কি অদ্ভুত না! সখা-সখী! না অন্য বন্ধুবান্ধবী নয়। স্বামীস্ত্রী। তারা একে অপরের বিশ্বস্ত সখাসখী। সেই গভীর পারস্পরিক বিশ্বাস উবে গেলেই সব শেষ। তখন সবটুকু যন্ত্রের যন্ত্রণা । সুখহীন কালযাপন!
মা-বাবা কি সুখে ছিলেন?
আচ্ছা কি অদ্ভুত না! সখা-সখী! না অন্য বন্ধুবান্ধবী নয়। স্বামীস্ত্রী। তারা একে অপরের বিশ্বস্ত সখাসখী। সেই গভীর পারস্পরিক বিশ্বাস উবে গেলেই সব শেষ। তখন সবটুকু যন্ত্রের যন্ত্রণা । সুখহীন কালযাপন!
মা-বাবা কি সুখে ছিলেন?
দিয়া পিওর সায়েন্সের ছাত্রী। ইলেভেনে উঠে ফিজিক্স কেমিস্ট্রি ইংরিজি ও ম্যথেমেটিক্স কম্পালসরি সাবজেক্ট ছিল। অ্যাডিশনাল ফিফথ সাবজেক্ট ছিল—কম্পিউটার সায়েন্স। আর একটা ঐচ্ছিক বিষয় নেওয়া যেতো—সচরাচর অনেকেই নেয় না। দিয়া নিয়েছিলো। সাইকোলজি। মা মানা করেছিলেন। দিয়া মাকে বুঝিয়েছিল, কম্পিউটার সায়েন্সটা নিতে হবে – নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর সাইকোলজিটা নিজের কথা ভেবে একটা ভবিষ্যৎ গড়তে কাজে দেবে। আর একটা নিজেকে গড়তে প্রয়োজনীয়।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬২: আকাশ এখনও মেঘলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০০ : প্রাচীন ভারতের ‘স্টিং অপারেশন’-এরও নজির মেলে পঞ্চতন্ত্রের কূটনীতিতে!

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার
শুধু নম্বর নয়! দিয়া মনোবিজ্ঞানকে ভালোবেসে পড়েছে। তখনই জানতে পেরেছে ফ্রয়েডের মতে, বহুদিন ধরে জমে থাকা কোনও তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা জৈবিক চাহিদা যখন হঠাৎ পূরণ হয়, তখন আমরা সুখ অনুভব করি। অভাব থেকে প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে, তাই চাহিদা মেটানোর পর আর এই অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ফ্রয়েডের মতে, পূর্ণ সুখী হওয়া প্রায় অসম্ভব, কারণ আমাদের সীমাবদ্ধতা, বাইরের প্রতিকূলতা আর সামাজিক নিয়মনীতি সারাক্ষণ আমাদের চাহিদার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই মানুষের প্রচেষ্টা সবসময় সুখ খোঁজার চেয়ে দুঃখ কমানোর দিকেই বেশি ব্যস্ত থাকে। তাই মা-বাবা সারাক্ষণ দুঃখ কমানোর মধ্যেই সুখ খুঁজে বেড়াতেন। তার মাঝেই বাবার কালরোগ আরও একরাশ জমাট দুঃখ দিয়ে ভরিয়ে দিলো জীবন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৯ : ভোরের রক্তাক্ত কবিতা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৮ : বিনা বিচারে আটকদের নিয়ে রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যকে চিঠি লিখেন নেহরু
দিয়া তাই সুখ নয় শান্তি চেয়েছে। মায়ের শরীরটা যেন ঠিক থাকে। সে যেন একটা ভদ্রস্থ জায়গায় চাকরি করতে পারে। তাদের দু’জনের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনধারণের খরচার জন্য চিন্তা করতে না হয়। স্বপ্ন আর দেখে না দিয়া। স্বপ্নগুলো ছিল। কিন্তু ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ঘনিষ্টজনের মৃত্যু বড্ড বেশি সাদা কালো। মৃতদেহে সাদা চাদর ঢাকা। সাদা ফুল। সাদা মালা। খাটের চারপাশে সাদা সাদা ফুলের তোড়া। তাতে কালো ধুপ গোঁজা। সাদা রঙের শববাহী গাড়ি। দিয়াদের বাড়ির থেকে বাগবাজারের কাশী মিত্র ঘাট সাত কিলোমিটার মতো রাস্তা। হেঁটে গেলে মোটামুটি পৌনে দু’ ঘণ্টা। কিন্তু দিয়ার বাবাকে কাঁধে নিয়ে যাওয়ার মতো অতো লোকজন ছিল না। আর তার মা-ও কোনওরকম হুল্লোড় চায়নি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৩: জরাসন্ধ ও কৃষ্ণের কথোপকথন সূত্রে নিহিত আছে রাজনীতির পাঠ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৫ : য-এ যুদ্ধ
সাদা শববাহী যানের স্ট্রেচারে কিচকিচ শব্দ করতে করতে বাবার শরীরটা গাড়ির কাচঢাকা অংশে ঢুকে গেল। বাবা হাসপাতালে ছিলেন। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিলেন। মা কঠিনতম সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করেননি। মা জানতেন বাবা আর ফিরবেন না। শুধু শুধু শেষসময়ে হাসপাতালের চার দেওয়ালে তাকে কষ্ট দেওয়া কেন? আমরাও তাকে দেখি যতদিন যতক্ষণ দেখা যায়। তিনি দেখুন। অন্তত উপলব্ধি করুন। তার ঘনিষ্টজনেদের সঙ্গে নিজের ঘরে রয়েছেন। মায়ের দৃঢ়তা মায়ের সাহস দেখে সেদিন দিয়া চমকে উঠেছিল। বাবাকে বাড়িতে আনার দিন মা দিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বড়ো ডাক্তারের কাছে গেলেন।
—বলুন মা!
—বলার তো বিশেষ কিছু বাকি নেই! তবে বাড়ি নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও হঠকারিতা করছি কিনা সেটাই জানতে এসেছি।
—বলুন মা!
—বলার তো বিশেষ কিছু বাকি নেই! তবে বাড়ি নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও হঠকারিতা করছি কিনা সেটাই জানতে এসেছি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৪: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— অলিভ রিডলে কচ্ছপ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
ডাক্তারবাবু মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কয়েকমূহুর্ত। তিনি সচরাচর রোগী পরিবারের কাছ থেকে এধরণের কথা হয়ত খুব একটা শোনেন না।—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘দুটি নভেলা’ ,‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।


















