
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
গ্রাজুয়েট হবার পর বিশ্বনাথ পাল অনেক চাকরির চেষ্টা করেছেন। কিছু করে উঠতে পারেননি। তখন এই গ্যাস এজেন্সি নেওয়ার জন্য জমা করার মত টাকা-পয়সাও ছিল না। জেদ করে নিজেদের বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। আজ বিশু পালের দু-দুখানা বাড়ি গ্যাস এজেন্সি একটা ওষুধের দোকান। ওষুধের দোকানে অবশ্য তাঁর দাদার ছেলে বসে। সে বুদ্ধিমান। সপ্তাহে একবার করে তার সঙ্গে ব্যবসার কাগজপত্র দেখে নেন বিশু পাল। আর নিজে এখনও কড়া নজর রাখেন গ্যাস এজেন্সির ব্যবসায়।
তাঁর পূর্বপুরুষেরা কেউ ব্যবসা করেননি। ব্যবসা নিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বাভাবিক ভয় ছিল বাড়িতে। বাবা স্কুল শিক্ষক। তার বাবা মানে বিশুবাবুর দাদু ছিলেন সদাগরি অফিসের স্টেনো-টাইপিস্ট। ইংরেজিটা খুব ভালো জানতেন, শিক্ষার জোরেই বাবা স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। তবে আদর্শের কারণেই সুযোগ থাকলেও প্রাইভেট টিউশন করেননি। বিশুবাবু অবশ্য পড়াশোনায় সাধারণ মানের, তাই কলেজে ঢুকে গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করেই চাকরি চেষ্টা শুরু করেছিলেন। পাননি। অনেক জায়গায় ধাক্কা খেতে খেতে অবশেষে এই ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিজেদের একমাত্র মাথাগোঁজার ঠাঁই দোতলাবাড়ি। সেই বাড়ি বন্ধক রাখতে গিয়ে মা-বাবার মতোই তিনিও ভয় পেয়েছিলেন। কারও কাছে সেটা প্রকাশ করেননি কারণ ভয় পেলে তো না খেয়ে মরতে হবে। বাবা যে নামমাত্র পেনশন পেতেন, তা মাঝেমধ্যেই হোঁচট খেত। তাই নিরুপায় হয়ে দেওয়ালে পিঠ থাকা জেদটাই তাঁকে এগিয়ে দিয়েছিল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৬ : ভাগ্য যখন ফেরে

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৮: জরাসন্ধবধ ও জনার্দনের কৃতিত্ব
তবে অনেক ছোটবেলা থেকেই স্কুলশিক্ষক বাবার কাছে একটা বহু জানা বহু চেনা প্রবচন অন্যভাবে শিখেছিলেন। কথায় বলে “লোভে পাপ পাপে মৃত্যু”। আর আদর্শবান স্কুল শিক্ষক বাবা শিখিয়েছিলেন—“মনের পাপ থেকেই লোভ আর সেই লোভ থেকেই মৃত্যু”। তাই কখনও কোনওভাবে লোক ঠকানোর কথা মাথায় আসেনি। আজ নয় যুদ্ধের বাজারে গাসের টানাটানি। কিন্তু গত বছরেই তো এলপিজি কোম্পানিরা জোর করে গ্যাস গছিয়ে দিতো। সেটা পাইপলাইন গ্যাসের আমদানিতে এলপিজির প্রতি অনীহা। অথচ একটা সময় এই রান্নার গ্যাসের কানেকশনের জন্য রাজনৈতিক কানেকশন বের করতে হতো।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫০: তারখেল

ক্যাবলাদের ছোটবেলা, পর্ব-৩৭: লোকে যারে বড় বলে
সময় সব কিছু পাল্টে দেয়। একটা সময় ল্যান্ডলাইন টেলিফোনের কানেকশন পাওয়া যেত না। অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়ে লোকজন বছরের পর বছর গালে হাত দিয়ে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতেন। জানাশোনা তদবির করলে হয়তো রামের জায়গায় শ্যামের নামটা উপরে উঠে আসতো। মোবাইলের যুগ এল। লোকে ল্যান্ডলাইন টেলিফোনকে পরিত্যাগ করলো। অথচ এই ল্যান্ডলাইন কানেকশনকে পুজোর আগে কেটে দিয়ে টেলিফোন সারাইয়ের লোকেরাজোর করে বকশিশ আদায় করতো। বাবা আর একটি কথা বলতেন। বিশুবাবু আজও মনে রেখেছেন সে কথা। “চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায় আজকে যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়”। এই আদর্শ এই বোধ বিশু বাবুকে অন্যরকম ব্যবসায়ী তৈরি করেছে কিন্তু তার সুযোগসন্ধানী জামাইটি এসব আদর্শের ধার ধরেনা—বউয়ের সূত্রে পাওয়া এই গ্যাস এজেন্সির চেয়ারটা তার কাছে দাবি।
আরও পড়ুন:

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৬৮: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা
সব অফিসেই যেমন দুষ্টু লোকের গুপ্তচর থাকে বিশুপালের গ্যাস এজেন্সিতেও বিশুপালের জামাইয়ের তেমনি এক পেটোয়া শাকরেদ ছুটে গিয়ে খবর দিয়ে দেয় খোদ মালিক এসে উপস্থিত হয়েছেন, সঙ্গে ফিরে এসেছেন ওই মেয়েটি আর তার মা। ব্যাস! ধুরন্ধর জামাই তড়াক করে বিশুবাবুর চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠেই, চোখ বুজে ভেবে নেয় তাকে ঠিক কী কী মিথ্যা কথা বলতে হবে। মিথ্যে বলা যাদের অভ্যেস, মিথ্যে না বললে যাদের শরীর খারাপ হয়। মিথ্যেই যাদের শরীরের শিরায় শিরায় তন্তুতে তন্তুতে জড়ানো ছড়ানো, তাদের মিথ্যে বলবার জন্য মাথা খাটাতে হয় না। শুধু এটা ভাবতে হয় যে কখন, কোন মিথ্যেটা, ঠিক কীভাবে বলতে হবে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম
জামাই দরজা খুলতেই সামনেই শ্বশুরমশাই তার পিছনে দিয়া আর তার মা! ব্যাস! শুরু হয়ে গেল। গলা যতটা নরম করা সম্ভব, ততটা মিহি করে জামাই বলতে লাগলো—
—আরে দিদি একটু ধৈর্য ধরে শেষ পর্যন্তশুনবেন তো কথাটা? আমি তো আপনাদের পেছনে পেছনে চিৎকার করেডাকছি। জেরক্স মেশিন তো আমাদের এজেন্সিতেই আছে। সে কথা বলতে বলতেই আপনার মেয়ে আপনাকেনিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। ভাবলাম বুঝি আধার বা প্যান কার্ডের কোনও একটা বাড়িতে ফেলে এসেছেন।—চলবে।
—আরে দিদি একটু ধৈর্য ধরে শেষ পর্যন্তশুনবেন তো কথাটা? আমি তো আপনাদের পেছনে পেছনে চিৎকার করেডাকছি। জেরক্স মেশিন তো আমাদের এজেন্সিতেই আছে। সে কথা বলতে বলতেই আপনার মেয়ে আপনাকেনিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। ভাবলাম বুঝি আধার বা প্যান কার্ডের কোনও একটা বাড়িতে ফেলে এসেছেন।—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘দুটি নভেলা’ ,‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।


















