বুধবার ১৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

সামনে থেকে চামচিকা। ছবি : সংগৃহীত।

আমার শৈশবে আমাদের গ্রামের বাড়ির পূর্বদিকে মাঠের ওপারে মানে বাড়ি থেকে মাত্র শ’খানেক ফুট দূরে একটা পোড়ো বাড়ি ছিল। এক কামরার মাটির দেয়াল ও টালির ছাউনি দেওয়া সেই বাড়ির দরজায় প্রায় সারা বছরই তালা দেওয়া থাকত। সবাই বলত ওটা সাধুর বাড়ি। কারণ বছরে একবার ৫-৬ দিনের জন্য দেখতাম এক সাধুবাবা এসে হাজির হতেন। বাবা বলত ওঁর নাম শ্রীনিবাস সাধু। গেরুয়া বসন ও শ্মশ্রু গুম্ফ জটাধারী ওই সাধুবাবার শুনেছি মেদিনীপুরে নাকি আশ্রম ছিল। লোকে বলত সাধুর বাড়িতে ভূত আছে। সেই জন্য পাড়ার বাচ্চারা ওই বাড়ির ধারে কাছে যেত না। আমার আবার ছোট থেকেই ভূতের ভয়ডর নেই। তাই মাঝে মাঝেই দিনের বেলা সাধুর বাড়ির ভাঙ্গা জানালায় উঁকি মারতাম। আর দেখতাম বাড়ির ভেতরে বাঁশের কাঠামো থেকে অসংখ্য চামচিকা ঝুলে রয়েছে। পরিণত বয়সে এসে যখনই চামচিকা দেখি তখনই কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা ‘পুরোনো কুঠি’ কবিতাটা মনে পড়ে যায়।
এই কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“এইখানে একা আমি—দিনরাত কাটিতেছে জীবনের ছুটি
এইখানে, এই আমি চাই
চামচিকা-অন্ধকার-বেনোজল ভূত ছাড়া আর কিছু নাই”
সুন্দরবন এলাকায় যেসব চামচিকা দেখা যায় তাদের ইংরেজিতে বলে ‘Indian Pipistrelle’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Pipistrellus coromandra’। তবে এই চামচিকা ভারতের সব জায়গাতেই পাওয়া যায়। চামচিকা যেন বাদুড়ের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। কিন্তু বাদুড়ের সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে বিস্তর— সেটা যেমন আকারে তেমনই স্বভাবে। এই চামচিকা লম্বা হয় মাত্র ৩৪ থেকে ৪৯ মিলিমিটার। আর ওজন মাত্র ৩-১৩ গ্রাম। তবে অগ্রপদ দুটো তুলনামূলকভাবে বেশ লম্বা, ২৫ থেকে ৩৫ মিলিমিটার। এদের কিন্তু একটা ছোট্ট লেজ আছে যা বাদুড়ের নেই। সারা গা গাঢ় বাদামি ঘন লোমে ঢাকা। তবে পেটের দিকের লোম অপেক্ষাকৃত হালকা রঙের হয়। এদের দুটো কান ইঁদুরের মতো বেশ ছোটো আর তিনকোনা। বাদুড়ের ক্ষেত্রে যেমন পুরুষের আকার সামান্য বড় হয়, চামচিকার বেলায় উল্টো— স্ত্রী চামচিকা পুরুষের থেকে সামান্য বড়। চামচিকা যখন ডানা মেলে তখন দুই ডানার দু’প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তার হয় ১৯ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার। ডানার রঙ বাদামি এবং ডানার প্রান্তের দিকের রং অপেক্ষাকৃত হালকা ও স্বচ্ছ। এদের মুখটা কিন্তু বাদুড়ের মতো সূচালো নয় বরং অনেক ভোঁতা।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৪: কুকুরমুখো ফল বাদুড়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৩: রাজসূয় মহাযজ্ঞের প্রস্তুতিপর্বে পাণ্ডবদের দিগ্বিজয় যেন রাজনীতির আনুগত্য-আদায়ের পাঠ

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি

আগেই বলেছি, পোড়ো বাড়ি বা পরিত্যক্ত কোনও বাড়ি কিংবা বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে এমন কোনও বাড়ির ভিতর চাল বা মাচা থেকে চামচিকাদের দল বেঁধে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। খড়ের ছাউনি দেওয়া বা টালির চালের ঘর হলে তো কথাই নেই। এদের গোয়াল ঘরেও আস্তানা গাড়তে দেখা যায়। শৈশবে গ্রামের বাড়িতে আমাদের গোয়াল ঘরের মাচাতে অনেক চামচিকাকে ঝুলে থাকতে দেখেছি। সুন্দরবনের জঙ্গলেও এদের আস্তানা রয়েছে। সেক্ষেত্রে অনেক পুরনো বিশালাকার ম্যানগ্রোভ বৃক্ষের গুঁড়ির মধ্যে কোটর, গোলপাতা গাছের ঘন ঝোপ কিংবা সুন্দরী ও হেতাল গাছের অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘন-জঙ্গলে শাখার নিচে এদের ঝুলে থাকতে দেখা যায়।
কলকাতায় বৃষ্টি

চামচিকার পিঠের দিক। ছবি : সংগৃহীত।

চামচিকা প্রধানত কীটপতঙ্গভুক প্রাণী। সুন্দরবনের বসতি এলাকায় এবং সুন্দরবনের অরণ্যে এদের খাদ্য তালিকায় কীটপতঙ্গের ক্ষেত্রে তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। তবে উভয় পরিবেশেই এদের খাদ্য তালিকায় সাধারণ খাদ্য হল মশা, মথ, বিভিন্ন প্রজাতির ছোট ছোট গুবরে জাতীয় পোকা, ফড়িং, ঘাসফড়িং, ম্যানটিস, আরশোলা, ঝিঁঝি পোকা, উইপোকা, মাছি, পিঁপড়ে, মাকড়সা ইত্যাদি। এদের মধ্যে অন্যতম প্রিয় খাদ্য হল মশা। একটা চামচিকা এক রাতে তিন হাজার মশা খেতে সক্ষম। হ্যাঁ, ছাপার ভুল নয়, তিন হাজার মশা। একটা চামচিকা যদি এই বিপুল পরিমাণ মশা প্রতি রাতে খেতে পারে তাহলে তার জীবনকাল কমপক্ষে চার বছরে কত পরিমাণ মশা খেতে পারে হিসেব করে দেখুন ৪৩,৮০,০০০! একটি চামচিকা যদি এই বিপুল পরিমাণ মশা নিধন করতে পারে তাহলে কোনও এলাকায় অনেক চামচিকা বাস করলে প্রাকৃতিকভাবেই মশা এবং সঙ্গে মশাবাহিত রোগ যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গ্ গোদ, চিকুনগুনিয়া, এনকেফালাইটিস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৩: স্মৃতিশাস্ত্রের রক্তচক্ষু বনাম এক স্নেহশীল পিতা: মূষিক-কন্যার বিবাহ-উপাখ্যান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭১ : গুহার বাইরে তখন

যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন চামচিকা কী প্রচণ্ড গতিবেগে উড়তে পারে এবং উড়ন্ত অবস্থাতেই পুরোপুরি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যেতে পারে। এজন্য ওদের বিপুল পরিমাণ শক্তি খরচ হয়। আর তাই ওদের প্রতি রাতে নিজের দেহের ওজনের এক তৃতীয়াংশ ওজনের খাবার খেতে হয়। উড়তে উড়তেই ওরা ডানা দিয়ে উড়ন্ত কীটপতঙ্গকে আঘাত করে বাতাস থেকে ধরে নেয়। দেখা গেছে প্রতি মিনিটে একটি চামচিকা গড়ে দশটি পতঙ্গ শিকার করে। অন্ধকারের মধ্যে ইকোলোকেশন পদ্ধতিতে ওরা শিকারের সন্ধান করে। মাটি থেকে সাধারণত ২৫ থেকে ৩৮ ফুট উচ্চতার মধ্যে ওরা ওড়াউড়ি করে শিকার ধরে। তবে সারারাত ধরে নয়। সূর্য ডোবার পর ঘন্টা দেড়েক ওরা এই শিকার ধরে ভোজন পর্ব সারে। শুধু মশা নয়, ফসলের বিভিন্ন ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ শিকার করে চামচিকা সাধারণ মানুষ এবং কৃষকের প্রভূত উপকার করে।
কলকাতায় বৃষ্টি

চামচিকার বাচ্চা। ছবি : সংগৃহীত।

গর্ভবতী হলে স্ত্রী চামচিকারা একসাথে এক জায়গায় দলবদ্ধভাবে থাকে। পরে যখন বাচ্চা প্রসব করে তখন বাচ্চাদের নিয়ে তারা সেই জায়গায় থাকে। জায়গা বলতে সেই পোড়ো বা পরিত্যক্ত বাড়ি কিংবা বৃক্ষের কোটর কিংবা তালগাছ বা ঘন জঙ্গলের বৃক্ষশাখা। এরা একসাথে একটি বা দুটি বাচ্চার জন্ম দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি বাচ্চা। বছরে একাধিকবার এদের প্রজনন হয়। জুলাই-আগস্ট আর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এদের প্রজনন ও বাচ্চা পালন করতে দেখা যায়। এদের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল স্ত্রী চামচিকা যৌন মিলনের পর কিছুদিনের জন্য পুরুষের শুক্রাণু সঞ্চয় করে রাখতে পারে। অর্থাৎ যতদিন না বাচ্চার জন্ম দেওয়ার মতো উপযুক্ত আবহাওয়া ও সময় পাওয়া যায় ততদিন শুক্রাণু জমিয়ে রাখে। আবার ডিম্বাণুর নিষেক হওয়ার পর ভ্রুণের পরিস্ফুরণ দীর্ঘায়িত হতে পারে যদি খাদ্যাভাব বা উষ্ণতা বৃদ্ধি বা পরিবেশগত অন্য কোনও সমস্যা হয়। এসব ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা একটু বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে। তবে গড়ে এদের গর্ভাবস্থায় স্থায়িত্ব ৪৪-৫০ দিন।
আরও পড়ুন:

সাগর উঠে তরঙ্গিয়া

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

প্রতিকূল অবস্থায় চামচিকাদের আংশিক নিষ্ক্রিয় হয়ে বেঁচে থাকার ক্ষমতা রয়েছে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে ‘Torpor’। এই সময় এদের দেহের তাপমাত্রা এবং হৃদস্পন্দন হার কমে যায়। এই কারণে গর্ভাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়। সদ্য জন্মানো চামচিকার বাচ্চাদের গায়ে লোম থাকে না, আর চোখও ফোটে না। এই সময় এদের ওজন হয় মাত্র ১-২ গ্রাম। সাধারণত এক সপ্তাহ বয়স হলে গায়ে ঘন কালো ভেলভেটের মতো লোম জন্মায় এবং ৩-৪ সপ্তাহ বয়স হলে উড়তে শেখে। ৪ সপ্তাহের পর এরা মায়ের সঙ্গে স্বাধীনভাবে উড়তে পারে। আর ৬ সপ্তাহ পর নিজেই খাবার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। বাচ্চাদের লালন পালনের ভার সম্পূর্ণ মা চামচিকার উপর বর্তায়। বাবার বাচ্চা লালন পালনের কোনও দায় নেই।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৩: আকাশ এখনও মেঘলা

প্রত্যেক বছর বছরের শেষের দিকে আবহাওয়া ক্রমশ ঠান্ডা হতে শুরু করলে সন্ধে নাগাদ প্রায় প্রত্যেকদিন আমার বাড়িতে চামচিকার আনাগোনা শুরু হয়। এরা কোথা থেকে আসে আর কেনইবা ঘরের মধ্যে উড়ে বেড়ায় আমার মাথায় ঢোকে না। এমনকি শীতকালে যখন সমস্ত জানালা সন্ধে থেকেই বন্ধ থাকে তখনও দেখি কোথা থেকে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আমার বাড়ির মধ্যে ওদের থাকার মতো অনুকূল কোনও জায়গা নেই। একমাত্র সম্ভাবনা ভেন্টিলেটর। তবে দিনের বেলা বাড়ির সমস্ত ভেন্টিলেটর খুঁজে একটাও চামচিকার দেখা পাইনি। ঘরের মধ্যে যখন ওরা ঢুকে যায় তখন সব ঘরেই কমবেশি আলো জ্বলে। জানি আলোতে ওদের দেখতে অসুবিধা হয়। কিন্তু ওদের ইকোলোকেশন যে অসাধারণ তা বুঝতে পারি যখন কোথাও ধাক্কা না লাগিয়ে ওরা আমার বেডরুম, ডাইনিং, করিডোর এবং ড্রয়িংরুমের মধ্যে দিয়ে রীতিমতো চারটে দরজা পেরিয়ে দ্রুতগতিতে এধার থেকে ওধার উড়তে থাকে। সমস্ত রুমে আসবাব রয়েছে, সিলিং-এ ফ্যান রয়েছে কিন্তু কোথাও ওদের ধাক্কা লাগে না। এমনকি যখন সিলিং ফ্যান ঘুরতে থাকে তখন অদ্ভুত কৌশলে ওরা চলন্ত ফ্যানকে এড়িয়ে যেতে পারে। এই সময়ে আমাকে সব ঘরের আলো নিভিয়ে জানালাগুলো খুলে দিতে হয়। তখন ওরা অনায়াসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
কলকাতায় বৃষ্টি

চামচিকা। ছবি : সংগৃহীত।

সুন্দরবন অঞ্চলে তথা ভারতবর্ষে আপাতত চামচিকা বিপন্ন নয়। আর তাই ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে এরা সংরক্ষিত নয়। কিন্তু যেভাবে এরা দিন দিন বাসস্থান হারাচ্ছে তাতে আগামী দিনে এরা যে বিপন্ন হবে তা বোঝার জন্য উচ্চ মেধার প্রয়োজন নেই। মশাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ভক্ষণ করে চামচিকা আমাদের পরম বন্ধু হিসেবে উপকার করে। আর তাই তাদের থাকার জায়গাটুকু করে দেওয়া আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content