
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
“কতকাল সুখে নৃপে রাজত্ব করিল।
দৈবগতি মহারাজার বসন্ত হইল।।
এই রূপে মহারাজার স্বর্গপ্রাপ্তি হৈল।
মহাদেবী কমলা যে সহগামী গেল।।”
দৈবগতি মহারাজার বসন্ত হইল।।
এই রূপে মহারাজার স্বর্গপ্রাপ্তি হৈল।
মহাদেবী কমলা যে সহগামী গেল।।”
এই ভাবে ‘রাজমালা’য় উল্লেখ রয়েছে ত্রিপুরার মহারাজা ধন্য মাণিক্যের রানি কমলা মহাদেবীর সতী হবার ঘটনা। ‘রাজমালা’র তথ্যানুসারে ত্রিপুরার রাজপরিবারে ষোড়শ শতকে প্রথম ধন্য মাণিক্যের রানির সতী হবার ঘটনার কথা জানা যায়। এ থেকে ধারণা করা যায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ত্রিপুরাতেও প্রাচীনকাল থেকেই সতীদাহ প্রথা চলে আসছিল। কিন্তু মধ্যযুগে রাজপরিবারের মতো ত্রিপুরার প্রজাবর্গের মধ্যে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল কিনা তা আজ আর জানার উপায় নেই। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে রাজ্যের প্রজাদের মধ্যেও সতীদাহ প্রথার চল ছিল তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে সরকারি নথিতে। যাইহোক, ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে বীরচন্দ্রের রাজত্বকালে মূলত ইংরেজদের উপুর্যপরি চাপে ত্রিপুরায় সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি সতীদাহ প্রথা রদ করার বিষয়ে রাজা ইংরেজ কর্তৃপক্ষের কিছুটা হুমকির মুখেও পড়েছিলেন।
ভারতে সুপ্রাচীন কাল থেকেই সতীদাহ প্রথা চলে আসছিল। মহাভারতেও এর উল্লেখ রয়েছে। কিছু পুরাণ ও সংহিতাকারগণ সতীদাহের মাহাত্ম্য সম্পর্কে বলেছেন, যে সকল রমণী মৃত পতির সহগামিনী হবেন তারা সবাই পবিত্র হবেন। মহাভারতে রয়েছে পাণ্ডুর পরলোক গমনের পর রাজার অন্ত্যেষ্টির সময় তাঁর পত্নী কুন্তী সপত্নী মাদ্রীকে উল্লেখ করে বলছেন—”মাদ্রী, আমি পতির জ্যেষ্ঠা ধর্মপত্নী। ধর্মফল লাভের আমিই প্রধান অধিকারিণী। তুমি আমাকে অবশ্যম্ভাবী বিষয়ে প্রতিনিবৃত্ত করিও না। আমিই মৃত পতির অনুগমন করিব, তুমি পতির মৃতদেহ পরিত্যাগ করিয়া উত্থিত হও এবং সন্তান দিগকে রক্ষা কর।” কিন্তু কুন্তীর আহ্বান টলাতে পারেনি মাদ্রীকে।
আরও পড়ুন:

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৩৯: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২০

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৯: বিড়ালীকৌশিক-জাতক —অতি ইচ্ছার সঙ্কট
সতী হবার জন্য মাদ্রীর আগ্রহাতিশয্যের জন্য কুন্তী আর পতির চিতায় আরোহণের সুযোগ পাননি। স্বামীর সঙ্গে সহমৃতা হয়েছিলেন মাদ্রী। এই ভাবে মহাভারতের যুগ থেকে পরবর্তী শত সহস্র বছরে, এমনকি অপেক্ষাকৃত আধুনিক যুগেও ভারতের নানা প্রান্তে সতীদাহের বিস্তর উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। মহাভারতে যেমন আমরা দেখেছি মাদ্রী পতি পাণ্ডুর সহগামিনী হয়েছিলেন, তেমনই বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যা কাণ্ডে দেখা যায়, রামের জননী কৌশল্যা পতি দশরথের সঙ্গে সহগামিনী হবার অভিলাষ ব্যক্ত করেছিলেন। রানি কৌশল্যা বলছেন—”পতিব্রাত্য ব্রত পালনের জন্য আমি প্রাণ ত্যাগ করব। স্বামীর শরীর আলিঙ্গন করে আমি অগ্নিতে আরোহণ করব।”
অবশ্য বশিষ্ট মুণির হস্তক্ষেপে শেষপর্যন্ত কৌশল্যা স্বামীর চিতায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারেননি অর্থাৎ পতির সহগামিনী হতে পারেননি। এই ভাবেই সুপ্রাচীন কালের ভারতে সহমরণের কথার উল্লেখ পাওয়া যায়।
অবশ্য বশিষ্ট মুণির হস্তক্ষেপে শেষপর্যন্ত কৌশল্যা স্বামীর চিতায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারেননি অর্থাৎ পতির সহগামিনী হতে পারেননি। এই ভাবেই সুপ্রাচীন কালের ভারতে সহমরণের কথার উল্লেখ পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৩: রাজসূয় মহাযজ্ঞের প্রস্তুতিপর্বে পাণ্ডবদের দিগ্বিজয় যেন রাজনীতির আনুগত্য-আদায়ের পাঠ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৫: চামচিকা
গ্রিক ঐতিহাসিক ডিওডোরাস সিকিউলাস খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫ সালে আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময়কালে ভারতের ‘কাথি’ জাতির মধ্যে সহমরণের কথা উল্লেখ করেছেন। তখন সেই জাতির মধ্যে সদ্য বিধবা স্ত্রীদের স্বামীর সঙ্গে পুড়িয়ে মারা হতো। কোনও এক স্ত্রীলোক তার স্বামীকে বিষ খাইয়ে হত্যা করার পর এই ভয়াবহ প্রথার প্রচলন হয় বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে যে সব বিদেশি পর্যটক ভারত সফরে এসেছিলেন তাদের ভ্রমণ বৃত্তান্তেও উল্লেখিত হয়েছে সতীদাহের কথা। ফরাসি পর্যটক জন ব্যাপটিস্ট টাভের্নিয়ার শাহজাহান ও ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে বার কয়েক ভারত সফরে এসেছিলেন। তিনিও তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে সতীদাহের কথা উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৩: স্মৃতিশাস্ত্রের রক্তচক্ষু বনাম এক স্নেহশীল পিতা: মূষিক-কন্যার বিবাহ-উপাখ্যান

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
ভারতের প্রায় সর্বত্র সতীদাহ প্রথা ছিল। মোগল যুগে জহরব্রতের কথা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। যুদ্ধ বিগ্রহে বিজিত সেনানীদের পত্নীগণ একযোগে আগুনে ঝাঁপ দিতেন। প্রতিপক্ষ বাহিনীর হাতে লাঞ্ছিত হবার আশঙ্কায় হয়তো রমণীগণ এই প্রথা অবলম্বন করতেন। তবে মোগল সম্রাট আকবর সহমরণ প্রথার বিরোধী ছিলেন বলে জানা যায়।অবশ্য আকবরের এমনটাও অভিমত ছিল যে,যারা স্বেচ্ছায় পতির সহগামিনী হবেন তাদের বাধা দেওয়া সঙ্গত নয়। কিন্তু স্বামীর চিতায় ঝাঁপ দেওয়ার জন্য কারও উপর জোর জবরদস্তি করা অন্যায়। জানা যায়, যোধপুর রাজপরিবারে একটি সহমরণের সংবাদ পেয়ে সম্রাট আকবর তা বন্ধ করতে স্বয়ং একশ মাইল দূরের ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। পরবর্তী সম্রাট জাহাঙ্গীরও সতীদাহের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু মোগল সম্রাটরা সতীদাহের বিরোধী থাকলেও তাদের রাজত্বকালে তা ঘটতে থাকে। এমনকি নানা কারণে জোর জবরদস্তির ঘটনাও বাড়তে থাকে। আবার এমনটাও অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে, সম্পত্তির লোভে আত্মীয়বর্গ সদ্য বিধবাকে সতীদাহের নামে বলপ্রয়োগ করে স্বামীর শবদেহের সঙ্গে বেধে পুড়িয়ে মারত!
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭০ : চার্চ হাসপাতালের সেই সকাল
আবার স্বেচ্ছায় সতী হওয়া অর্থাৎ স্বামীর সহগামিনী হবার উদগ্র বাসনার অনেক নজিরও প্রত্যক্ষ করেছেন ইংরেজ শাসকগণ। বকল্যান্ড সাহেবের ‘Bengal under Lieutenant Governor’s’ গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট একটি ঘটনা এই রকম: বঙ্গদেশের ভূতপূর্ব লেঃ গভর্নর স্যার হ্যালিডে তখন জেলার ম্যাজিস্ট্রেট পদে কর্মরত। একদা তাঁর আবাসস্থলের অদূরে গঙ্গাতীরে সতীদাহের আয়োজন হয়েছে জেনে তিনি ডাক্তার ও ধর্ম যাজককে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। তাঁরা সতীর নিকট গিয়ে এই সঙ্কল্প ত্যাগ করার জন্য অনেক অনুরোধ জানান। ‘আত্মহত্যায়’ বিরত থাকার জন্য অনেক যুক্তিও প্রদর্শন করেন তারা। কিন্তু সতী তাঁর স্হির সিদ্ধান্তে অবিচল। তিনি স্বামীর চিতায় আরোহণের জন্য ব্যাকুল হয়ে সকলের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। ম্যাজিস্ট্রেট শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিলেও ধর্ম যাজক পাদরি সাহেব তা মেনে নিতে পারলেন না।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















