কলকাতায় বৃষ্টি

ঘাড়মুড়ার আবিষ্কৃত ভাস্কর্য।

মিজোরাম সীমান্তের ঘাড়মুড়ায় নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যের সঙ্গে পিলাকের বিগ্রহের নির্মাণ শৈলীর সাযুজ্য প্রসঙ্গে ড. নন্দী বলেছেন, দুই অঞ্চলের বিগ্রহের কটিবন্ধের মিল লক্ষ্য করা গিয়েছে। এ থেকে এমন ধারণা হয় যে, দুই অঞ্চলের শিল্প সৃষ্টিও সম্ভবত প্রায় একই সময়কালের। কিন্তু ত্রিপুরার পিলাক থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে এক পাহাড়ি এলাকায় কাদের পৃষ্ঠপোষকতায় হাজার বছরেরও অনেক আগে এই সব ভাস্কর্য সৃষ্টি হয়েছিল? তখন এই অঞ্চল কোন রাজবংশের শাসনাধীন ছিল?
অতীতে কাছাড় ত্রিপুরার রাজাদের শাসনাধীন ছিল। এমনকি ত্রিপুরার রাজবংশের গুণকীর্তন নির্ভর কাব্যগাঁথা ‘রাজমালা’তেও ত্রিপুরার রাজা ত্রিলোচনের সঙ্গে হেড়ম্ব অর্থাৎ কাছাড়ের রাজকন্যার বিবাহের উল্লেখ রয়েছে। সেটা মহাভারতের সময়কার কথা। তারও অনেক অনেক পরে হেড়ম্ব ও ত্রিপুরার রাজার যুদ্ধের কাহিনি জানায় ‘রাজমালা’। ঐতিহাসিক কৈলাসচন্দ্র সিংহ তাঁর সুবিখ্যাত ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ গ্ৰন্থে বলেছেন, ত্রিপুর বংশীয়গণ দক্ষিণ দিকে রাজ্য বিস্তারে যত্নবান ছিলেন। তারা ক্রমে ক্রমে উত্তর কাছাড় থেকে মধ্য কাছাড় এবং সেখান থেকে দক্ষিণ কাছাড় হয়ে বর্তমান ত্রিপুরার কৈলাসহরের দিকে গিয়েছিলেন। সেসব অবশ্য ঐতিহাসিক যুগের আগেকার সময়ের কথা। ঊনকোটি ও ভুবন তীর্থ গড়ে উঠার পিছনে ত্রিপুরার প্রাক মাণিক্য যুগের রাজাদের কোনও অবদান আছে কিনা তাও চর্চার বিষয়। কাছাড়ে ত্রিপুরার রাজাদের রাজত্ব সম্পর্কে শতাধিক বছর আগে প্রকাশিত ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘কথিত আছে যে অতি প্রাচীন কালে শিলচরের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে সোনাই থানার অধীনে রুকণী (রুক্মিণী) নদীর তীরে বর্ত্তমান ইসলামপুর মৌজার অন্তর্গত রাজঘাট নামক স্থানে ত্রিপুরার রাজধানী ছিল।’
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৬: বক্সনগরে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ স্তুপ, চৈত্যগৃহ ও একটি মঠ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৩: ডায়মন্ড হারবার, গৌরীর হারিয়ে যাবার দিন

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৭ : রাজা সাজা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৪: কবি-কন্যার প্রিয় বান্ধবী

শতাধিক বছর আগেও সেখানে জলাশয়, প্রাচীন ইঁট ইত্যাদির নিদর্শন ছিল বলে গ্রন্থটি জানায়। অসমের ইতিহাসে রয়েছে যে, ষোড়শ শতকে কাছাড়ে ত্রিপুরার আধিপত্য লুপ্ত হয়। কোচদের সঙ্গে এক ভীষণ যুদ্ধে ত্রিপুরার রাজা পরাজিত হন। কিন্তু ত্রিপুরার ‘রাজমালা’তে এই যুদ্ধের বিবরণ নেই। স্যার এডওয়ার্ড গেইট তাঁর সুবিখ্যাত ‘এ হিস্ট্রি অব আসাম’ গ্রন্থে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে কোচদের যুদ্ধ জয়ের কথা উল্লেখ করেও বলেছেন এর ঐতিহাসিক ভিত্তি পর্যাপ্ত নয়। তবে মাণিক্য যুগেও ত্রিপুরার পূর্ব প্রান্তের এক বিরাট এলাকা মাণিক্য রাজাদের শাসনাধীন ছিল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩১: সুন্দরবনের এক অনন্য প্রাণীসম্পদ গাড়োল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪১: যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে কেন কৃষ্ণের অনুমোদন প্রয়োজন?

মহারাজা বীরচন্দ্রের রাজত্বকালে (১৮৬২-৯৬খ্রিঃ) ১৮৭১ সালে ত্রিপুরার পূর্ব প্রান্তে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ কুকিদের বিরুদ্ধে এক বিরাট অভিযান চালিয়েছিল। বীরচন্দ্র এই অভিযানে ইংরেজদের নানা ভাবে সাহায্যও করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এক ঘোষণার দ্বারা ইংরেজ সরকার ত্রিপুরার ৮৫০ বর্গ মাইল এলাকা তাদের অধিকারভুক্ত করে নেয়। ইংরেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বহু লেখালেখির পরও তা আর ত্রিপুরাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। অসম-মিজোরাম সীমান্তের ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন কালেই সৃষ্টি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই সব ভাস্কর্যে হিন্দু দেবদেবীর মতো বৌদ্ধ প্রভাবও লক্ষ্য করা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১১৩: ডেসডিমোনার রুমাল / ১২

দশভুজা, সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৪৬: ঠাকুরবাড়ির লক্ষ্মী মেয়ে

তাহলে কি একদা এই অঞ্চল হিন্দুদের মতো বৌদ্ধ প্রভাব পুষ্টও ছিল? প্রত্ন সামগ্রীর মতো জনশ্রুতির সূত্র ধরেও অনেক সময় ইতিহাসের অন্ধকার পথে ঝিলিক দিয়ে উঠে আলোর রেখা।অসম-মিজোরাম সীমান্তের রিয়াং জনজাতিদের মধ্যে এমন জনশ্রুতি রয়েছে যে, যুদ্ধ জয়ের পর ত্রিপুরার সেনাপতি সেখানে দুর্গাপুজো করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ত্রিপুরার মধ্যযুগের বীর নৃপতি ধন্য মাণিক্যের (১৪৯০-১৫১৫ খ্রিঃ) বীর সেনাপতি ছিলেন রায় চয়চাগ। সে সময় কুকিদের সঙ্গে ত্রিপুরার যুদ্ধ হয়েছিল এবং দীর্ঘ মেয়াদী সেই যুদ্ধে ত্রিপুরার বিজয় লাভ ঘটেছিল। সব মিলিয়ে প্রাক মাণিক্য থেকে মাণিক্য যুগেও এই অঞ্চল যেন ত্রিপুরার আধিপত্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৬: সেফ শেলটার

ত্রিপুরার ঊনকোটি,পিলাক, দেবতামুড়া,বক্সনগর সহ কাছাড়ের ভুবন পাহাড় ও মিজোরাম সীমান্তের ঘাড়মুড়ার ভাস্কর্যের মধ্যে কোনও যোগসূত্র আছে কিনা তা নিঃসন্দেহে চর্চার বিষয়। ঊনকোটি, পিলাক সহ প্রতিটি প্রত্ন স্থলে আরও অনুসন্ধান, খনন প্রয়োজন। ধারণা করা হচ্ছে ঘাড়মুড়ার জঙ্গলেও আরও প্রত্ন সম্পদ আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। সব মিলিয়ে ত্রিপুরা ও সন্নিহিত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন সম্পদের আলোকে এই অঞ্চলের ইতিহাস চর্চায় এক নতুন মাত্রা আসবে বলে আশা করা যায়।—চলবে।

* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content