সোমবার ৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

অগ্নিগড়। তেজপুর।

অসম সব সময়ই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণ কেন্দ্র হয়ে রয়েছে। এখানকার প্রকৃতি, পাহাড়, ঝর্ণা, চা বাগান, কামাখ্যা মন্দির সব কিছুই অসমের প্রতি মানুষের কৌতুহলকে বাড়িয়েছে। অসমের এই সব আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান ছাড়াও অসমের বুকে লুকিয়ে রয়েছে অনেক ইতিহাস। রয়েছে অনেক মিথ কেন্দ্রিক কাহিনীও। সে রকমই একটি জায়গা হল অসমের তেজপুর।
তেজপুর শোণিতপুর জেলার অন্তর্গত। শোণিতপুর জেলা প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। অনেক রকমের অনেক প্রজাতির হরেক রঙের পাখি আসে এখানে। এই জেলায় রয়েছে বুঢ়া চাপরি অভয়ারণ্য। ১৯৭৪ সালে এই অরণ্যটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্গত করা হয়। তার পর ১৯৯৫ সালে অভয়ারণ্য বলে ঘোষিত করা হয়। এই অভয়ারণ্যটি তেজপুর শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই শোণিত পুরেই রয়েছে সোনাই রূপাই অভয়ারণ্য। বন্যপ্রাণী এবং বনজ উদ্ভিদের সম্ভার যথেষ্ট সমৃদ্ধ হলেই একটি জেলায় দুটি অভয়ারণ্য থাকা সম্ভব। গোটা শোণিতপুর জেলাই আসলে সবুজে ভরপুর, ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের এই জেলা এক কথায় অনবদ্য। এই জেলার মোট তিনটি মহকুমা রয়েছে—তেজপুর, বিশ্বনাথ এবং গহপুর। উল্লেখ্য, এই গহপুরেই স্বাধীনতা সংগ্রামী শহিদ কনকলতা বড়ুয়ার জন্ম।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫১: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৩: খাটাস

এই তেজপুর ছিল এক সময় কোচ রাজত্বের অধীনে। তারপর ১৬শ শতকে আহোম রাজত্বের অন্তর্গত হয়। তেজপুর বিভিন্ন সময়ের একাধিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এই তেজপুর নামের সঙ্গে মহাভারতের একটি যোগসূত্রও রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, মহাভারতে যে বান রাজার কথা বলা হয়েছে সেই বান রাজা এই তেজপুরেরই অধিনায়ক ছিলেন। বান রাজার রূপবতী এবং গুণবতী কন্যার নাম ছিল ঊষা। রাজকুমারী ঊষাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য রাজা বান মায়াবলে আগুন দ্বারা নির্মিত একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। দুর্গটিতে ঊষা নিরাপদে এবং খুব ভালোভাবে ছিলেন।

একদিন রাজকুমারী ঊষা স্বপ্নে এক সুদর্শন যুবকের দর্শন লাভ করে মুগ্ধ হয়ে যান। তার সখী চিত্রলেখা রাজকুমারীর স্বপ্নের বর্ণনা শুনে সেই যুবকের ছবি আঁকেন। ছবিতে যুবকের চেহারা ফুটে ওঠার পর ঊষা সেই যুবকের খোঁজ নেওয়া শুরু করেন। অবশেষে জানা যায়, ইনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধ।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

চিত্রলেখার মাধ্যমে রাজকীমারী ঊষার এবং অনিরুদ্ধের প্রেম পর্ব শুরু হয়। কিন্তু রাজা বানের এই প্রেমে এবং তাদের বিবাহে সম্মতি ছিল না। তাই অনিরুদ্ধ এবং ঊষা গন্ধর্ব মতে বিয়ে করেন। বানরাজা ক্রোধিত হয়ে অনিরুদ্ধকে বন্দি করেন যার বানরাজা এবং অনিরুদ্ধের পিতামহ শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে যুদ্ধ হয়। শ্রীকৃষ্ণের সেনার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য শিব উপাসক বানরাজা শিবের সাহায্য প্রার্থনা করেন। শ্রীকৃষ্ণের নারায়ণী সেনা এবং শিবের সেনা বাহিনী ভঙ্কর যুদ্ধের সম্মুখীন হয়। সমগ্র অঞ্চলটি রক্তে লাল হয়ে যায়, অসমীয়া ভাষায় রক্তকে তেজ বলে, তাই এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় তেজপুর।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৫: অকৃতজ্ঞ-জাতক : কৃতঘ্ন

তেজপুরের কাছেই একটি ভৈরবী মন্দির রয়েছে। কথিত আছে, বানরাজার কন্যা ঊষা এই মন্দিরে দেবীর পুজো করার জন্য আসতেন। এই ভৈরবী মন্দিরের থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে মহাভৈরব মন্দির। মন্দিরটিতে বহু প্রাচীন এক শিবলিঙ্গ রয়েছে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, এই শিবলিঙ্গ রাজা বানের দ্বারাই প্রতিষ্ঠ হয়েছে। তেজপুর শহর ব্রহ্মপুত্রের পাড়েই অবস্থিত। এখানে একটি ঐতিহাসিক গড়ও রয়েছে। অগ্নিগড়। কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বান রাজা নগরের চারিদিকে আগুনের বেড়া দিয়ে রেখে ছিলেন। আগুন অর্থাৎ অগ্নি থেকেই এই গড়ের নাম অগ্নিগড়।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৫: পরবাস প্রস্তুতি (এক)

তেজপুরে বামুনী পাহাড় নামের একটি ছোট পাহাড় রয়েছে। এই পাহাড়ে পাথরে খোদাই করা নবম এবং দশম শতকের কিছু কিছু নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। ১৯০৬ সালে নির্মিত চিত্রলেখা উদ্যানও তেজপুরের একটি দর্শনীয় স্থান। সুতরাং এ কথা মেনে নিতেই হয় গোটা শোণিতপুর জেলাটিতে দেখার জানার অনেক কিছু রয়েছে। বেশ কয়েকটি চা বাগানও রয়েছে। শোণিত পুর জেলায় অসমীয়া ভাষার লোক বেশি। তবে কার্বি, বড়ো, বাঙালি এবং অন্যান্য জাতির লোকও রয়েছেন। এখানে বিহু খুব হর্ষ উল্লাসের সঙ্গে পালিত হয় তবে প্রত্যেক জাতির লোকেরাই নিজেদের উৎসব পালন করে থাকেন। শোণিত জেলাটি আসলে এক শান্তিপূর্ণ জেলা।
কলকাতায় বৃষ্টি

ভৈরবী মন্দির। তেজপুর।

আমাদের ভারত ভূমি আসলে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির দিক দিয়ে যথেষ্ট সম্বৃদ্ধ। তার প্রতিটি রাজ্যের বিভিন্ন জেলা, বিভিন্ন অঞ্চলে লুকিয়েই রয়েছে অনেক কাহিনির আকর, রয়েছে ইতিহাসের হাতছানি। একই সঙ্গে আছে একাধিক সংস্কৃতির মেল বন্ধন, যা আমাদের ভারতকে সবার থেকে আলাদা করে তোলে। এমন সুন্দর দেশের এমন সুন্দর রাজ্যগুলির ইতিহাসই হোক বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সব কিছুকে ধরে রাখার দায়িত্বও এসে পড়ে আমাদের উপর। আমরা সেই দায়িত্ব পালন করে উত্তরসুরিদেরকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে পারলে শোণিতপুরের মতো অনেক জেলাই বহিঃবিশ্বের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।—চলবে।
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content