
(বাঁদিকে) ওঝাপালি নৃত্য। (ডানদিকে) বাদ্যযন্ত্র তোকারি।
মানুষের সুখ-দুঃখ এবং জীবন দর্শনের বিভিন্ন দিক ফুটে ওঠে লোকগানে। গান সভ্যতার শুরুর লগ্ন থেকেই ছিল মানুষের মনের ভাব, অনুভূতি প্রকাশ করার বিশেষ মাধ্যম। জীবন দর্শনের অনেক কঠিন বিষয় উঠে আসে প্রচলিত লোকগানে। বেশির ভাগ লোকগান লোকমুখে প্রচলিত হয়, কিন্তু তার রচয়িতার নাম জানা থাকে না। নদী ও পাহাড়ে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অসমের সঙ্গে লোকসঙ্গীত এক অনন্য মাত্রা আনয়ন করে। অসমের বন্ধুর মাটির মতো অসমের লোকসঙ্গীতেও বৈচিত্র দেখা যায়।
অসমে গাওয়া বোনগীতের মধ্যে অসমের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। বোন-জঙ্গল, ফুল ইত্যাদি নিয়ে বেশ রোমান্টিক ধরনের গান এই বোনগীত। অসমের প্রচলিত গানগুলি আসলে অসমের সংস্কৃতি, লোক উৎসব এবং অসমের বৈচিত্রের কথা বলে। অসমের গান-বাজনা নিয়ে কথা বলতে গেলে বিহুগীতের প্রসঙ্গ খুব সহজেই ছলে আসে। বিহুগীত বিহুর সময় মূলত গাওয়া হয়ে থাকে। বিহু কৃষি নির্ভর উৎসব। তবে বিহুর গানগুলি সম্পূর্ণ ভাবে জীবনী শক্তিতে পরিপূর্ণ। আনন্দের গান বিহু গান।
আরও পড়ুন:

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৫৯: ‘ফুলেরতল’ বরাক পারের এক ছোট শহর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৯: শেফালিকার বিপদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৭: বিলেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অস্ত্রোপচার

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৬: বিষণ্ণ সকাল, নিঃসঙ্গ আদিনাথ
অসমে বিভিন্ন ধরনের লোকগান শুনতে পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিক বা ভক্তিমূলক গান যেমন—সদা শিবর নাম, লক্ষ্মীদেবীর নাম, আজান ফকিরার গীত ইত্যাদি। আইনাম গাওয়া হয় আরোগ্য কামনার্থে, বিশেষ করে ‘স্মল পক্স’ হলে তা দেবীর দয়া বলে বিশ্বাস করেন অনেকে। তাই বেদীকে তুষ্ট করার জন্য গাওয়া হয় এই গান। অসমের গান নিয়ে কথা বলতে গেলে বড়গীতের কথাও বলতে হয়। মূলত নব বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শঙ্কর দেব এবং মাধবদেব ব্রজবুলি ভাষায় আধ্যাত্মিক গান রচনা করেন। এই সব গানকেই বড়গীত বলা হয়। এই বড়গীত গাওয়ার সময় সাধারণত খোল এবং বাঁশির ব্যবহার করা হয়।
বিভিন্ন উৎসব কেন্দ্রিক গানের মধ্যে ওঝাপালি গান, কাতি পূজাগীত এবং আরও অনেক পূজা-পার্বণের গান আছে। তাছাড়া বিহুগীত তো রয়েইছে। ওঝাপলি গানের নাটকীয়তা লক্ষণীয়। প্রাচীনকাল থেকেই এই ওঝাপালি গান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
বিভিন্ন উৎসব কেন্দ্রিক গানের মধ্যে ওঝাপালি গান, কাতি পূজাগীত এবং আরও অনেক পূজা-পার্বণের গান আছে। তাছাড়া বিহুগীত তো রয়েইছে। ওঝাপলি গানের নাটকীয়তা লক্ষণীয়। প্রাচীনকাল থেকেই এই ওঝাপালি গান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৪: সুন্দরবনের পাখি: গোত্রা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’
কথিত আছে, এই ওঝাপলি অর্জুন স্বর্গ থেকে মর্তে নিয়ে আসেন। ওঝাপলি গীত দুই ধরনের হয়—এক: সুকনানী ওঝা পালির কাহিনি দেবী মনসা এবং চাঁদ সওদাগরের কাহিনি কেন্দ্রিক। আর অন্যটি হল, রামায়ণ গায়েন ওঝা। এই দুই ধরনের গায়েনদের গান যেমন আলাদা, তেমনি তাঁদের পোশাক পরিচ্ছেদেও পৃথক্য লক্ষ্য করা যায়। সুকনানী ওঝাপালির বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে দেওধানী নৃত্য। লখিন্দরকে পুনরুজ্জীবিত করতে বেহুলা এই নৃত্য করেছিল বলে মনে করা হয়। দেওধানী নৃত্যে মহিলা চুল খোলা রেখে, লাল শাড়ি পড়ে নৃত্য করেন। এক সময় রক্ষণশীল ভাবনার জন্য এই দেওধানী নৃত্য শিল্পীর সংখ্যা কমতে থাকে। কারণ দেওধনী নৃত্যশিল্পীরা যেহেতু বেহুলার চরিত্র ফুটিয়ে তুলতেন, তাই তাদেরকে বিবাহিত বলে গণ্য করা হতো। তাদেরকে সতী বলা হতো। যদিও পরবর্তী সময়ে এই ভাবনার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?
অসমীয়া লোকোগানের মধ্যে কিছু কিছু গল্প নির্ভর গানও পাওয়া যায়। অনেকটা বাংলা গীতিকার মতোই, যেমন তেজিমালার গল্প। তেজিমালার কুরুন কাহিনির বর্ণনা আছে এই গানে। অঞ্চল ভেদে আবার লোকগীতের চেহারাও অনেকটা পাল্টে যায়। কামরূপিয়া লোকোগীত অসমের দক্ষীণ প্রান্তে গাওয়া হয় এর সঙ্গে গোলায়ালপাড়িয়া লোকোগীতের পার্থক্য দেখা। কামরূপিয়া গীতগুলি অসমের লোক জীবনশৈলীর ছবি তুলে ধরে। এই গানগুলিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাপন এবং অসমের প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা বলা হয়েছে। টোকারি গীত অসমের আরও একটি জনপ্রীয় লোক সঙ্গীতের ধরণ। হাতে একতার বিশিষ্ট টোকারি নামক বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এই গান পরিবেশন করা হয়। সাধারণত পুরুষ সঙ্গীত শিল্পীই এই ধরনের গান গেয়ে থাকেন। একাধিক ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনিকে গান গেয়ে পরিবেশন করা হয় এই টোকারি গীতে। বিয়া নাম বিবাহ অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়ে থাকে। বিয়া নামের গানে ব্যান রাজার কন্যা ঊষা এবং শ্রীকৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধের বিবাহের কাহিনি বর্নিত হয়। এই বিয়া নাম সাধারণত বিবাহ বাসরে মহিলা গেয়ে থাকেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!
লোকসাহিত্য বিষয়টি আসলে যথেষ্ট বিস্তৃতি দাবি করে। অসমের লোক-সাহিত্যের পরিসরও যথেষ্ট বড়। লোকগীতের ধারাও অনেক রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র পাড়ের লোকগীত সমূহের সঙ্গে বরাক উপত্যকার গানগুলির পার্থক্য রয়েছে। রয়েছে অনেক রকমের প্রাদেশিক বাদ্যযন্ত্রও। এমন কী ঝুমুর গানও অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন রকমের হয়। এই বৈচিত্রময়তাই তো অসমের তথা সমগ্র ভারতের বৈশিষ্ট।—চলবে।
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।


















