সোমবার ১৫ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের সম্পর্ক এক বহু আলোচিত অধ্যায়। রবীন্দ্র সাহিত্যে ত্রিপুরার সামান্য উপস্থিতিও অসামান্য গর্বের সঙ্গেই উচ্চারিত হয়ে থাকে। ত্রিপুরার ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহের সূত্রে ঐতিহাসিক কৈলাসচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগের কথা জানা যায়। কিন্তু ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগের ক্ষেত্রে কেন যে কৈলাসচন্দ্রের নাম অনুক্ত থেকে গেল এটা এক প্রশ্ন! বঙ্কিমচন্দ্র একদা যে কৈলাসচন্দ্রকে রবীন্দ্রনাথের ‘নায়েব’ বলে উল্লেখ করেছেন সেই কৈলাসচন্দ্র ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে কবির সুদীর্ঘকালের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেন অনুক্ত থেকে গেলেন? সে কি কৈলাসচন্দ্রের মহারাজা বীরচন্দ্রের বিরুদ্ধাচরণের জন্য?
১২৯২ বঙ্গাব্দে ‘বালক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘রাজর্ষি’। কিন্তু তার আগে তিনি লিখেছিলেন ত্রিপুরার ইতিহাস নির্ভর ‘মুকুট’। ‘রাজর্ষি’র ঐতিহাসিক উপাদান চেয়ে তিনি ১২৯৩ বঙ্গাব্দে ত্রিপুরার রাজাকে পত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই তিনি উপন্যাসের ২৬টি অধ্যায় লিখে ফেলেছিলেন। তা হলে দেখা যায় ‘রাজর্ষি’র গোবিন্দ মাণিক্যের কিছু কিছু ইতিহাস আগে থেকেই তাঁর সংগ্রহে ছিল। আর শুধু ‘রাজর্ষি’ কেন, ‘মুকুট’-এর ঐতিহাসিক উপাদানও রবীন্দ্রনাথ আগেই সংগ্রহ করেছিলেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৩: খাটাস

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কী ভাবে সে সব সংগ্রহ করেছিলেন? ধারণা করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ‘রাজমালা’ প্রণেতা বিশিষ্ট পণ্ডিত কৈলাসচন্দ্র সিংহের কাছ থেকে ত্রিপুরার কিছু কিছু ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। কৈলাসচন্দ্রের সঙ্গে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সম্পর্কের সূত্রেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল। অল্প বয়সে, লেখালেখির প্রথম পর্যায়েই এ ভাবে কবি ত্রিপুরার নানা ঐতিহাসিক তথ্যাদি সংগ্রহ করেছিলেন। একদা পদস্থ রাজকর্মচারী কৈলাসচন্দ্র ছিলেন মহারাজা বীরচন্দ্রের প্রবল বিরোধী। রাজার বিরুদ্ধে নবদ্বীপচন্দ্রের (শচীন দেববর্মণের পিতা) মামলায় তিনি ছিলেন তাঁর প্রধান সহযোগী। ধারণা করা যায় এ জন্যই হয়তো ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে কবির সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৈলাসচন্দ্রের প্রসঙ্গ চাপা পড়ে যায়!
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১৫: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৪

১২৮৯ বঙ্গাব্দ। মহারাজা বীরচন্দ্র তাঁর প্রিয়তমা রানির অকাল মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান। শোকাকুল হৃদয়ে প্রৌঢ় রাজা, যিনি আবার একজন কবিও, বিরহের কবিতা লিখে লিখে শোকভার লাঘব করতে চাইছেন। এমন সময়েই রাজার হাতে আসে তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথের ‘ভগ্ন হৃদয়’। বীরচন্দ্রের বিরহী অন্তরে নাড়া দেয় এই কাব্যগ্ৰন্থ। কবিকে অভিনন্দন জানানোর জন্য মহারাজা তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি রাধারমণ ঘোষকে পাঠিয়ে দেন কলকাতায়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৬: কুণ্টণি জাতক : ক্ষতির খতিয়ান

এ প্রসঙ্গে ‘জীবনস্মৃতি’তে কবি লিখেছেন— “…মনে আছে, এই লেখা বাহির হইবার কিছুকাল পরে কলিকাতায় ত্রিপুরার স্বর্গীয় মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্যের মন্ত্রী আমার সহিত দেখা করিতে আসেন। কাব্যটি মহারাজের ভালো লাগিয়াছে এবং কবির সাহিত্য সাধনার সফলতা সম্বন্ধে তিনি উচ্চ আশা পোষণ করেন, কেবল এই কথাটি জানাইবার জন্যই তিনি তাঁহার অমাত্যকে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৫: পরবাস প্রস্তুতি (এক)

‘ভগ্ন হৃদয়’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন—”…প্রধানা মহিষীর অকাল মৃত্যুতে মহারাজ বিরহীর মর্মবেদনা প্রকাশ করিয়া কবিতা লিখিতেছিলেন। কবি বীরচন্দ্রের তখনকার মানসিক ভাবের সহিত ‘ভগ্ন হৃদয়’-এর কবিতাগুলি সায় দিয়াছিল। তিনি রবীন্দ্রনাথের রচনার মধ্যে প্রতিভার প্রথম সূচনা দেখিতে পাইয়া তাঁহার খাস-মুন্সী রাধারমণ ঘোষকে কলিকাতায় রবীন্দ্রনাথের নিকট প্রেরণ করেন; ভগ্ন হৃদয় কাব্যখানি মহারাজকে প্রীত করিয়াছে, তজ্জন্য তাঁহাকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করিতে তিনি জোড়াসাঁকোয় আসিয়া তরুণ কবির সহিত সাক্ষাৎ করেন। ইতিপূর্বে রবীন্দ্রনাথ বা তাঁহার পরিবারের কাহারও সহিত ত্রিপুরারাজের সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল না। অতঃপর বীরচন্দ্র মাণিক্য কলিকাতায় যখনই যাইতেন, তখনই রবিবাবুকে ডাকাইয়া আনিতেন। বয়সে এই দুই কবির বিশেষ পার্থক্য থাকিলেও বীরচন্দ্র বাৎসল্যভাবে কিশোর সৌম্যদর্শন কবি রবীন্দ্রনাথের মুখে কবিতা পাঠ এবং সংগীত শুনিতে বড়ই ভালোবাসিতেন।” উল্লেখ করা যায় যে, মহারাজা বীরচন্দ্র ছিলেন সে যুগের একজন সুবিখ্যাত বৈষ্ণব কবি। তাঁর ছয়টি কাব্যগ্ৰন্হের কথা জানা যায়।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content