স্বপ্নদৃশ্য শুরু হয়। শুরু হয় শুটিংয়ের মতো করে। অ্যাকশন বললে অরিন্দম এগিয়ে চলেন। কে যেন ডেকে ওঠে নাম ধরে। এখন তিনি ব্রজেশ্বর। নেপথ্যে তাঁর গলা, যিনি এককালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ কোপণস্বভাব প্রসিদ্ধ অভিনেতা, যিনি পরে কাজ হারিয়ে নিঃস্ব। অরিন্দম তাঁর সঙ্গে সংঘাত ও অপমানের প্রতিটি স্তর সাফল্যের সঙ্গে পার হয়ে আজ শীর্ষে। জীবনের প্রথম চরিত্র ব্রজেশ্বর হয়ে তিনি পথ চলেন মাটিতে শুকনো পাতা মাড়িয়ে একটা সাদা সরলরেখা ধরে ধরে। নেপথ্যে উত্তাল সময়ের গণ আন্দোলনের বৈপ্লবিক স্লোগান শোনা যায়।
চারপাশে ঘন আঁধার, এ যেন এক বনস্পতিঘেরা গা ছমছমে নিবিড় অরণ্য, একটা শিহরণ জাগে শরীরে, যেন নরকের পথ। মাঝে মাঝে শুটিংয়ের তীব্র স্পটলাইট। নেপথ্যে প্রমীলার ডাক শোনা যায়। অরিন্দমকে নাম ধরে ডাকার নেপথ্যে অব্যক্ত রসায়নটুকুর ইঙ্গিত। প্রমীলা গাছপালার আড়ালে আবডালে চঞ্চলা হরিণীর মতো ছুটে চলে। পিছনে দেওয়ালে সিনেমার বিজ্ঞাপন। মনের মানুষ, প্রমীলাকে আলিঙ্গনরত অরিন্দম, পাশে তাদের নাম জ্বলজ্বল করছে। বোঝা যায় অনুক্ত ইঙ্গিতটুকু, তবে এ সত্য নাকি কল্পনা তার নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তবে স্বপ্ন তো বাস্তবের মিশ্র-বিকৃত প্রতিরূপ বটে!
এ এক মৃগয়াক্ষেত্র যেন। তবে কি মেঘনাদবধ আসন্ন? প্রমীলাকে অনুসরণ করে, তাড়া করেই যেন অরিন্দম ঘোরলাগা দুষ্যন্তের মতো প্রবেশ করেন এক হল ঘরে। এখন তিনি ব্রজেশ্বর, প্রমীলা যেন দেবী চৌধুরাণী, তাঁকে লুটে নিয়েছে এই অব্যক্ত সম্পর্কের আভাস, তিনি এখন এক ডাকাতের জঙ্গলে যেন।
পার হন যেন স্বর্গের বিপুল শ্বেতশুভ্রদ্বার, প্রমীলা ওই গেট ঠেলেই ভিতরে মিশে গেছে ভিড়ে। ঝড়ের আগের স্তব্ধতা, তাকে বাড়িয়ে দেয় সামান্য ঝিঁঝিঁ আর, অস্পষ্ট অনুচ্চ পাখির ডাক। অরিন্দম এই বিশাল গথিক সৌষ্ঠবে নির্মিত দরজা ঠেলে ঢুকে পড়েন এক সাদা কালো দুনিয়ায়, যেন শেষ বিচারের আশায়। ঢুকতেই শোনা যায় চার্চের উদাত্ত ঘন ঘন ঘণ্টাধ্বনি। জ্বলে ওঠে আলো। ভিতরে পার্টি চলছে, ইতস্তত নানা টেবিলে উপবিষ্ট নারী পুরুষ, আলো-আঁধারিতে। এখানেও অরণ্য কিংবা উপবন যেন। তার মধ্যেই ফটোফ্রেম ঝোলে, মাথার ওপরে জ্বলে ঝাড়বাতি, সোফা কোচের পাশে দণ্ডায়মান ল্যাম্প জ্বলে। সাহেবী পোষাক পরা সুবেশ পুরুষ, সুবেশা নারীরা ইতস্তত আলোচনারত। টেবিলে টেবিলে খাদ্য পানীয়। পাশ দিয়ে চলে যায় বেয়ারা। এখানেও যুদ্ধের খেলা চলছে, তাস। অরিন্দম ঘুরে ঘুরে দেখেন সব। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, সকলের চোখেই কালো সানগ্লাস। নেপথ্যে ঘণ্টাধ্বনি। অন্তিম সময় বুঝি আসন্ন।
গাছের শাখাপ্রশাখার ফাঁকে ফাঁকে চোখ রেখে রেখে অরিন্দম খোঁজেন প্রমীলাকে, নাম ধরে ডাকেন। প্রমীলার সেই খিলখিল হাসি যেন অদ্ভুত তীক্ষ্ণ হায়নার হাসির মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। এমন সময় একটি টেবল থেকে সানগ্লাসে মোড়া কোনও এক পুরুষ উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চান অরিন্দম কি তাঁর স্ত্রীকে খুঁজছেন? স্ত্রী? মিস প্রমীলার এমন আকস্মিক পরিচয়ে অরিন্দম হতবাক, পুরুষটি অনুচ্চ মাখন-গলায় “ন্যাকামো হচ্ছে? স্কাউন্ড্রেল!” বলে ভর্ৎসনা করলে অরিন্দম তীব্র ঘুষিতে তাকে ধরাশায়ী করে দেন। প্রমীলার প্রকৃত মেঘনাদটি দেখা দেন, সম্পর্কের সমীকরণ যেন নিমেষে বাঁক নেয়। তবে যা ঘটার তা ঘটে যায়, মেঘনাদবধ ঘটে যায়। অরিন্দম আর অজেয় থাকেন না বোধহয়।
এ কি কোনও ফাঁদ? বাস্তবেও তো রেলযাত্রায় এমন এক বিজ্ঞাপণ-ব্যবসায়ীকে দেখা যায়, যিনি কাজ পাওয়ার লোভে দুশ্চরিত্র রাঘব বোয়ালকে খেলিয়ে তুলতে স্ত্রীকে ব্যবহার করতে চাইছেন। দাবার যুদ্ধে যাদের একটু আগেই দেখা গেছে। কোনও পার্টিতে গিয়ে জনপ্রিয় নায়কের হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাটাই তো চাউর হয়েছে, চাপা দেওয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও দুটি সংবাদপত্রে বেরিয়ে গেছে ঘটনাটা। মত্ত নায়কের প্রহারে মহিলাদের সামনে তম্বি করতে আসা এক পুরুষ ঘুষি খেয়েছেন নায়কের। এ তো সিনেমার শুরুতেই দেখা গিয়েছে। অবচেতনে চলতে থাকা ঘাত-প্রতিঘাত, জমতে থাকা ভয়, আসন্ন কিংবা সম্ভাব্য পতনের আশঙ্কা স্বপ্নে ইঙ্গিতময় হয়ে উঠেছে। ছিটকে উঠে বসেন নায়ক, রেলের কুপে, সহযাত্রীদের, ঠিক স্বপ্নদৃশ্য থেকে উঠে আসা এক বেয়ারাকে দেখা যায়। ছায়ার জগতে বিচরণ করা সরকারি পুরস্কারজয়ী স্বপ্নের নায়কের স্বপ্নসৌধ অক্ষুণ্ণ থাকবে তো? —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com