শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

নায়কে নায়ক! ছবি: সংগৃহীত।

ট্রেন ছুটে চলেছে রাজধানীর দিকে, নায়ক শয্যায় চিন্তালীন। একটু আগেই তিনি একটি ওষুধ খেলেন। এবার তাঁর মানসপটে এসে দাঁড়ালেন এক নারী, রাত, নায়কের ড্রয়িংরুম। এই দৃশ্যটি কিছুক্ষণ চলল, কিছু সংলাপ। সুন্দরী সপ্রতিভ মেয়েটির নাম প্রমীলা চ্যাটার্জি, সে দাবি জানায় নায়ক অরিন্দমের আগামী ছবি মনের মানুষের নির্বাচিত নায়িকাকে বাদ দিয়ে তাকে বেছে নিতে। কারণ তার প্রয়োজন বেশি, তাই এভাবে রাতেই আসতে হয়েছে। তাকে মানাবেও অনেক বেশি, তাও সে জানে। সে অভিনয় জানে, নায়ক কি কিছু একটা করতে পারেন না তাঁর ক্ষমতায়?
অরিন্দম তার প্রগলভতায় বিস্মিত হন, হয়তো খানিক আকৃষ্ট-ও। তবে নায়কসুলভ তথাকথিত দুর্বলতার বিপরীতে তিনি তখন সংযত, ভদ্র, শিষ্ট। স্তব্ধ রাত, একাকী এক নারী ও রূপোলী দুনিয়ার হার্টথ্রব নায়ক, মুচমুচে গল্পের জন্য এর চেয়ে আকর্ষণীয় আর কী হতে পারে? মেয়েটি কি বিবাহিতা? এই প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি ডুকরে কেঁদে ওঠে, বিচলিত অরিন্দম দু’ পা “এগোতেই” মেয়েটি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। অভিনয়! তা মেয়েটি অভিনয় জানে বটে, নাকি ছলনা? অরিন্দম তার নাম জানতে চান। কৌতূহল। প্রমীলা, পদবি চ্যাটার্জি। অরিন্দম-ও তো চ্যাটার্জি? এবার তাকে বিদায় করার চেষ্টা করেন নায়ক, রাত হয়েছে, রাত জাগার অভ্যাস তাঁর নেই। বরং কাল আসুন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৩: এ কে? এ কে গো?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৩: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৫: পূর্বোত্তরে আন্তরাজ্য সীমা বিবাদ

মেয়েটি জানায় রাত জাগার অভ্যাস তার দিব্যি আছে, কাল সে আসতেই পারে, রাতে? ততক্ষণে সে জানিয়েছে যে সে মিস প্রমীলা। যেন সে বলতে চায় ইঙ্গিতে অরিন্দম কি তাকে মিস করবেন? তিনিও তো ব্যাচেলর, কিন্তু পুরুষ তো! দর্শক ভাববেন হয়তো, এর পর কী হয়? দুশ্চরিত্র গল্পের নায়করা যেমন করেন তা-ই হবে হয়তো। হয়তো পরের দিন রাতেই মেয়েটি আসে আবার। কিন্তু এসব কিছু জানা যায় না। এই ভাবনার আগে দুটি বিপরীতগামী দুরন্ত ট্রেন দেখা যায়। একটি যাত্রীবাহী, দিল্লি চলেছে। অন্যটি মালগাড়ি, অভিমুখ বিপরীতে। মেয়েটিকে আগাগোড়া স্থির চোখে অরিন্দম যেন জরিপ করেন, সিগারেট ধরিয়ে। ধীরে ধীরে বিলম্বিত লয়ে ধোঁয়া ছেড়ে ভোগ করেন সেই জ্বলন্ত মুহূর্তগুলি। মেয়েটি খানিক অন্তরঙ্গ অপ্রাসঙ্গিক কথায় প্রবেশের চেষ্টা করে, অরিন্দম দৃশ্যত তাকে প্রশ্রয় দেন না বুঝি সেই রাতে, কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারেন ব্যাচেলর নায়ক ওই ব্যক্তিত্বময়ী নারীটিকে?
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩১: মহর্ষি চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে মৃত্যু

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৮: ছোট বাবুইবাটান

এরপর চিন্তার সূত্র খানিক শিথিল হয়, ক্রমে স্বপ্নে ঢুকবেন নায়ক তন্দ্রার পথে। অলস চিন্তা, জেগে ওঠা কিছু স্মৃতি ট্রেনের দুলুনির তালে তালে তাকে আচ্ছন্ন করে। স্বপ্নের নায়ক-ও স্বপ্ন দেখেন, জীবনের। দৃশ্য সহসা বদলায়। ট্রেন ছুটছে, এবার ক্যামেরার চোখে ট্রেনটিকে অন্যভাবে দেখা যায়, বিপরীতে কোনও ভিন্নধর্মী ট্রেনের অবকাশ নেই। দর্শক হয়তো চিনতে চাইবেন দুটি ভিন্ন মানুষকে, দুটি ভিন্ন ট্রেনের অনুষঙ্গে। অরিন্দমের মনুষ্যবাহী ট্রেনটি সহসা সান্নিধ্য পায় বস্তুনিষ্ঠ মালগাড়ির, প্রমীলার স্বার্থনিষ্ঠ আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্র দর্শক চিনতে পারেন। দ্বিতীয়বারের একাকী ট্রেনের যাত্রা কি এই কাহিনির পরিণতির কোনও ইঙ্গিত দেয়? হয়তো বা, হয়তো না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩০: অলৌকিকতার আবরণে লৌকিক-অনুভবের পরশ

দৃশ্য বদলায়, ট্রেনের অন্য অংশে দুই সহযাত্রী দাবা খেলে, কথা বলে নানারকম। সুরার প্রভাবে কথা কিছু অসংলগ্ন হয়। সামনে পাতা ছকে নীরব যুদ্ধ চলে। এক আধুনিক ফিটফাট সন্ন্যাসী নীরব ব্যবধানে খেলা দেখেন, সুগন্ধী আতরে চারপাশে জমে ওঠা ক্লেদের দুর্গন্ধকে সরিয়ে রাখেন। অরিন্দমের মনেও কি একটা যুদ্ধ চলছে? সকলেই জানে, সেদিনের কাগজে নায়কের শৈথিল্যের কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে। তিলে তিলে অর্জিত স্থানটি হারাতে বেশি সময় লাগে না যে!
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

খেয়াল করতে হয় প্রমীলা নামটিকে। এই রহস্যময়ী কি প্রতারণাকুশল ছলনাময়ী? সে বিদুষী, অরিন্দমের বিপরীতে নিজেকে প্রমীলা নামে প্রতিষ্ঠা দেয়। এ যেন এক মেঘনাদবধের পালা, বাস্তবের প্রমীলা কি অরিন্দমকে সুনিপুণ ছলনায় টেনে নামানোর কৌশলের ঘুঁটি? অরিন্দম কি তার মনের মানুষ? নাকি অরিন্দমের এই নিঃসঙ্গ জীবনে সে মনের মানুষ হয়ে উঠতে চায়? প্রমীলা নামটি যেন অরিন্দম মেঘনাদের অনুষঙ্গে নেপথ্যে চলতে থাকা এক যুদ্ধের ইঙ্গিতটুকু পৌঁছে দিতে চায়।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content