সম্ভবত ২০০৯ সাল। কলকাতা থেকে বাড়িতে কয়েকজন আত্মীয় এসেছেন ডিসেম্বরের শেষে। এই সময় আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবরা এলে সাধারণত একদিন বরাদ্দ থাকে বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জ বেড়ানোর জন্য। সকাল সকাল রওনা দিয়ে বকখালির সৈকতে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে একটা হোটেলে লাঞ্চ সেরে নিলাম। তারপর গন্তব্য ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত। ফ্রেজারগঞ্জ সৈকতে পৌঁছে আপন খেয়ালে উত্তর দিকে কিছুটা এগিয়ে যেতেই বেশ কিছুটা দূরে দেখি সমুদ্র সৈকতে আগে কখনও না-দেখা সাত-আটটি পাখি। অনেকটা দূরে বলে ভালো বুঝতে পারছিলাম না। কিছুটা এগিয়ে যেতেই চেহারাটা মোটামুটি নজরে এল। জলপিপিদের মতো লম্বা পা ফেলে খাবার খুঁজছে। ঢেউ এসে ওদের পা কিছুটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। তাতে অবশ্য ওদের কুছপরোয়া নেই।
পাখিগুলিকে দেখে মনে হল লাল কাঁকড়া বা ছোটো শামুক-ঝিনুক শিকার করছে। পাখিগুলোকে আগে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না। মাঝারি সাইজের মুরগির মতো আকার। গায়ের রং ধুসর বাদামি কিন্তু পিঠ, ডানা, ঘাড় ও গলা জুড়ে সাদা ছিট। বুক ও পেটের রং আবশ্য ফ্যাকাসে সাদা। ছোট্ট লেজটা ডাহুকের মতো। নিচের দিকে সাদা। তবে সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় এদের চঞ্চু। সরু ও লম্বা চঞ্চুর আগার দিকটা নিচের দিকে কিছুটা বাঁকা। আর নিচের চঞ্চুর গোড়ার দিকের রং সামান্য লালচে। মাথার চাঁদির রঙ মনে হল কালচে বাদামি। কিন্তু ঠিক মাঝখানে যেন হালকা সাদা রঙের একটা তিলক কাটা!
এদের ছোট্ট কালো চোখের ওপরে হালকা সাদা রঙের একটা রেখা আর চঞ্চুর নিচে থুতনিও ফ্যাকাসে সাদা রঙের। পাখিটা যে এই প্রথম দেখলাম তা নিশ্চিত, ফলে চিনতে পারলাম না। তখন আমার হাতে পুরনো দিনের সস্তার একটা ফিল্ম ক্যামেরা ছিল। তা দিয়ে দূর থেকে পাখির ছবি তোলা সম্ভব নয়, আর তুললেও বোঝা সম্ভব নয়। তাই অকারণে ছবি তুলে ফিল্ম অপচয় করিনি। আর পাখিটার কথা পরে আর মনেও ছিল না।
২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে অর্থাৎ করোনাকালের শেষের দিকে সপরিবারে গিয়েছিলাম বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জে। এবার বকখালির সৈকতে আবার ওই পাখিগুলিকে দেখলাম। ছয়টি পাখি খাবার খুঁজছে। ২০০৯ সালের কথা মনে পড়ে গেল। তখন হাতে মোবাইল। মোবাইলবন্দি করার জন্য বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতেই উড়ে পালাল। আর ওড়ার সময় ‘টেট্টি টেট্টি টেট্টি’ শব্দ করল। বাড়ি ফিরে পাখিটির পরিচয় জানার জন্য খুব বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হল না। দেখলাম ওদের নামের সাথে আমার পরিচয় আগেই ছিল। আর পাখির সাথে পরিচয় তো ২০০৯ সালে হয়েইছিল। কিন্তু এরা যে সেই পাখি সেটা জানতাম না। এরা হল ছোট গুলিন্দা।
আর একটা বাংলা নামও রয়েছে, সরলা বাটান। অবশ্য ইংরেজি নামটাই বেশি প্রচলিত ‘Whimbrel’। অনেকে বলেন ইউরেশিয়ান হুইমব্রেল। বিজ্ঞানসম্মত নাম umenius phaeopus। গণ ‘Numenius’ কথাটির প্রাচীন গ্রিক শব্দে অর্থ হল নতুন চাঁদ, অর্থাৎ কাস্তে আকারের চাঁদ। এদের চঞ্চুর গঠন ওইরকম বাঁকা বলেই এই নাম দেওয়া হয়েছে। আর গ্রিক শব্দে প্রজাতি ‘phaeopus’–এর অর্থ হল কালচে পা। ছোট গুলিন্দার টিঙটিঙে লম্বা পায়ের রং কিন্তু এমনই।
ছোট গুলিন্দা লম্বায় হয় প্রায় ১৫ থেকে ১৯ ইঞ্চি, আর ডানা মেললে তার বিস্তার হয় ৩০ থেকে ৩৫ ইঞ্চি। এদের ওজন হয় ২৭০ থেকে ৫০০ গ্রাম। ছোট গুলিন্দা হল পরিযায়ী পাখি। সাধারণত শীতকালে এরা ভারতসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় পরিযান করে। ছোট গুলিন্দাদের পৃথিবীজুড়ে পাঁচটি উপপ্রজাতি পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সুন্দরবন অঞ্চলে দুটি উপপ্রজাতি আসে। একটি হল ‘N. p. phaeopus’ এবং অপরটি ‘N. p. variegatus’ । ফ্রেজারগঞ্জ ও বকখালিতে যে ছোট গুলিন্দাদের দেখেছিলাম সেগুলি প্রথম উপপ্রজাতি।
দ্বিতীয় উপপ্রজাতিটি সুন্দরবনে খুব কম দেখা যায় বলে জেনেছি। দ্বিতীয় প্রকারটির গায়ের রঙ অপেক্ষাকৃত গাঢ় এবং ছিটগুলিও অনেক বেশি ঘন ঘন থাকে। সুন্দরবন অঞ্চলে প্রথম উপপ্রজাতির ছোট গুলিন্দা সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সমুদ্র, নদী ও খাঁড়ির তীরে যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। এরা প্রচন্ড শীতে উত্তর-মধ্য সাইবেরিয়া, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া ও উত্তর স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চল দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় চলে আসে। অস্ট্রেলিয়া ও তার আশেপাশের দ্বীপপুঞ্জগুলোতেও এরা পরিযান করে।
ছোট শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া অর্থাৎ কবচি ও কম্বোজ জাতীয় প্রাণীরাই এদের প্রিয় খাদ্য। অবশ্য কখনও কখনও কীটপতঙ্গ খেতেও দেখা যায়। উত্তর গোলার্ধে যখন প্রবল শীত তখন এরা দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে চলে আসে। জোয়ার ভাঁটা খেলে এমন নদীর তীরে, সমুদ্র সৈকতে বা জোয়ারের সময় ডুবে যায় ও ভাঁটায় জেগে ওঠে এমন চড়ায় নরম কাদার ওপর ৫ থেকে ১৫টি ছোট গুলিন্দাকে দল বেঁধে খাদ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায়। সুন্দরবন অঞ্চলে এদের সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দেখা গেলেও কখনও কখনও মে মাসেও দেখা গিয়েছে। হয়তো প্রজননে অক্ষম কিছু কিছু ছোট গুলিন্দা আরও কিছুদিন থেকে যায়।
এদের প্রজননস্থল কিন্তু সুন্দরবন বা দক্ষিণ এশিয়ায় নয়। উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে তুন্দ্রা অঞ্চলে এরা স্বল্প উদ্ভিদ সম্পন্ন অঞ্চলে বা মসযুক্ত ভেজা বা জলাভূমি সংলগ্ন অঞ্চলে বাসা বাঁধে। এদের বাসা হল মাটিতে আঁচড়ে সামান্য গর্ত করে সেখানে অল্প কিছু ঘাস বা মস বিছিয়ে তৈরি করা বাসা। স্ত্রী ছোট গুলিন্দা একসঙ্গে তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। জলপাই সবুজ রঙের ডিম, আর ডিমের ওপরে বাদামি ছিট দেখা যায়। যদিও স্ত্রী ও পুরুষ ছোট গুলিন্দা বাহ্যিকভাবে দেখতে একই রকম তবে মনে হয় স্ত্রীর আকার সামান্য বড় হয়। পুরুষ পাখি বাসা বাঁধা, ডিমে তা দেওয়া এবং বাচ্চা লালন পালন করার ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা নেয়। এই সময় আশেপাশে থাকা অন্য পাখি বা প্রাণীদের প্রতি এরা খুব হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। ক্ষতি করতে পারে বুঝলে তাড়া করে যায়।
সুন্দরবন অঞ্চলে ছোট গুলিন্দাদের এখন যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। প্রতিবছরই শীতের শুরুতে এরা দল বেঁধে চলে আসে। সুন্দরবন অঞ্চলে এদের খাবারের যে সংকট নেই এবং আপাততঃ কোনও বিপদ নেই তা এদের উপস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছে। এতে সমস্ত পাখিপ্রেমী তথা সুন্দরবনপ্রেমীর খুশি হওয়ারই কথা।
— চলবে
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com