
(বাঁদিকে) উড়ন্ত স্ত্রী আমুর বাজ। উড়ন্ত স্ত্রী আমুর বাজ। (ডান দিকে) পুরুষ আমুর বাজ। ছবি: সংগৃহীত।
অনেক পাঠক নাম শুনে সন্দিগ্ধ হতে পারেন এই ভেবে যে আমুর হল উত্তর-পূর্ব এশিয়ার বিখ্যাত এক নদী। রাশিয়া ও চিনের মধ্যে সীমান্ত হিসেবে প্রবাহিত এই নদী। তাহলে সুন্দরবনের পাখি নিয়ে আলোচনায় এই নামের পাখির কথা আসে কী করে? আসলে আমুর বাজপাখি কিন্তু সুন্দরবনের স্থায়ী কোনও বাসিন্দা নয়। আমুর নদীর অববাহিকা হল এদের মুখ্য প্রজননস্থল। এটি পরিযায়ী বাজ। এদের ইংরেজিতে ‘Amur falcon’ এবং বাংলায় আমুর বাজ বলা যায়। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Falco amurensis’ ।
আমুর বাজ আমি কখনও নিজের চোখে দেখিনি। তবে সুন্দরবনের সংরক্ষিত অরণ্য অংশে যে কখনও কখনও এদের দেখা যায় তা পর্যটকদের কথায় এবং ছবিতে সাম্প্রতিককালেও জানা গিয়েছে। আর খুব ছোটবেলায় আমার ঠাকুমার মুখে শুনেছি। মাঝে মাঝে বছরে এক আধবার নাকি ছোট আকারের একরকম অনেক বাজপাখি এলাকায় দেখা যেত আর তারা নাকি ফড়িং ধরে খেত। ঠাকুরমার মুখে শোনা এইটুকু তথ্য থেকে আমার নিশ্চিত ধারণা যে ঠাকুমা আমুর বাজের কথাই বলতে চেয়েছে। যদিও আমাদের এলাকায় আমুর বাজ আমার কখনও দৃষ্টিগোচর হয়নি বা পরিচিত কারও নজরে পড়েছে বলে কখনো শুনিনি। তবুও যেহেতু সুন্দরবনের সংরক্ষিত অঞ্চলে এদের আনাগোনা আজও রয়েছে তাই আমুর বাজকে সুন্দরবনের পাখি বলাই যায়।
আমুর বাজ আমি কখনও নিজের চোখে দেখিনি। তবে সুন্দরবনের সংরক্ষিত অরণ্য অংশে যে কখনও কখনও এদের দেখা যায় তা পর্যটকদের কথায় এবং ছবিতে সাম্প্রতিককালেও জানা গিয়েছে। আর খুব ছোটবেলায় আমার ঠাকুমার মুখে শুনেছি। মাঝে মাঝে বছরে এক আধবার নাকি ছোট আকারের একরকম অনেক বাজপাখি এলাকায় দেখা যেত আর তারা নাকি ফড়িং ধরে খেত। ঠাকুরমার মুখে শোনা এইটুকু তথ্য থেকে আমার নিশ্চিত ধারণা যে ঠাকুমা আমুর বাজের কথাই বলতে চেয়েছে। যদিও আমাদের এলাকায় আমুর বাজ আমার কখনও দৃষ্টিগোচর হয়নি বা পরিচিত কারও নজরে পড়েছে বলে কখনো শুনিনি। তবুও যেহেতু সুন্দরবনের সংরক্ষিত অঞ্চলে এদের আনাগোনা আজও রয়েছে তাই আমুর বাজকে সুন্দরবনের পাখি বলাই যায়।
আমুর বাজ পাখিরা হল দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকার বাসিন্দা। কিন্তু এরা প্রজননের জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাশিয়ার পূর্ব সাইবেরিয়া ও বৈকাল হ্রদের পূর্ব এলাকা, উত্তর কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং পূর্ব চীনের প্রজননভূমিতে পৌঁছায়। এজন্য একটি আমুর বাজপাখিকে আসা যাওয়ায় প্রতিবছর ২২ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। এরা খুবই সামাজিক পাখি। এরা যেমন একসঙ্গে একটি এলাকায় দল বেঁধে থাকে, বাসা বাঁধে, প্রজনন করে তেমনই হাজার হাজার আমুর বাজপাখি ঝাঁক বেঁধে একসাথে পরিযান করে। আসা যাওয়ার পথে এরা উত্তর-পূর্ব হিমালয় ও পূর্ব ভারতের পার্বত্য রাজ্যগুলি, পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের উপকূল, মায়ানমার, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার উপর দিয়ে যায়। কখনও কখনও মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার উপর দিয়েও অতিক্রম করে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৬: বাজ

মুভি রিভিউ: সত্যিই তো, সবার নিজের নিজের মতো করে সবটাই নর্মাল

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না
স্বাভাবিকভাবেই এদের আসা-যাওয়ার পথে ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চল পড়ে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় এদের ক্লান্তি দূর করার এবং খাদ্য সংগ্রহ করে বাকি পথ অতিক্রম করার শক্তি সঞ্চয়ের জন্য জন্য কয়েক দিনের জন্য কোথাও কোথাও অবতরণ করতে হয়। তারপর প্রচুর ফড়িং, উইপোকা ইত্যাদি খায়। মূলতঃ পূর্ব ভারতের মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও অসম এদের অবতরণভূমি হলেও সুন্দরবন অঞ্চলেও এরা অবতরণ করে। নইলে পর্যটকরা কিংবা অতীতে আমার ঠাকুমার মতো সুন্দরবনের আদি বাসিন্দারা আমুর বাজপাখিদের দেখলেন কী করে? এদের আসা-যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরের উপর দিয়ে দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে হয়। এই দূরত্ব প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার। শিকারি পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে সমুদ্রের উপর দিয়ে একটানা এত পথ অতিক্রম করার ক্ষেত্রে আমুর বাজ প্রথম স্থান দখল করেছে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২২: মহর্ষির নির্দেশে ঘণ্টা বাজত জোড়াসাঁকোয়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২১: খেলা শুরুর প্রস্তুতি
কয়েকদিন আগে সংবাদ পত্র থেকে জানলাম, রেডিও চিহ্নিত একটি আমুর বাজ পাখি পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া থেকে এই বছর (২০২৫) এপ্রিল মাসের শেষে উড়তে শুরু করে মাত্র ৯৩ ঘণ্টায় ৪ হাজার কিলোমিটার পথ একটানা অতিক্রম করে ভারতে পৌঁছেছে। ওয়াইল্ড লাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII)-র একদল বিজ্ঞানী ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর মনিপুরের তামেমলং জেলার একটি গ্রাম থেকে ধরা একটি পুরুষ আমুর বাজপাখির শরীরে রেডিও ট্যাগ লাগিয়েছিলেন। উপগ্রহের মাধ্যমে জিপিএস ট্র্যাকিং করে ওই বাজপাখির গতিবিধি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। আমুর বাজপাখিটির নামকরণ করা হয়েছে ‘চিউলুয়ান ২’।
মণিপুরের ওই গ্রামের নামে এই নামকরণ। সমুদ্রের ওপর দিয়ে যখন দীর্ঘ পথ এরা উড়ে আসে তখন কোথাও কোনোভাবেই বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকে না আর তাই এদের ওড়ার গতিও হয় অনেক বেশি। ‘চিউলুয়ান ২’ -এর রেডিও ট্যাগের পাঠানো সংকেত থেকে জানা গিয়েছে সমুদ্রের ওপর দিয়ে ওড়ার সময় তার গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৪১ কিলোমিটার। ভাবা যায়! উড়তে উড়তে এরা কি কোন খাবারদাবার খায় না? জানা গিয়েছে এরা আরব সাগরের উপর দিয়ে যখন ওড়ে তখন প্রচুর পরিমাণে এক জাতের উড়ন্ত ড্রাগন ফড়িং (Pantala flavescens) শিকার করে।
মণিপুরের ওই গ্রামের নামে এই নামকরণ। সমুদ্রের ওপর দিয়ে যখন দীর্ঘ পথ এরা উড়ে আসে তখন কোথাও কোনোভাবেই বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকে না আর তাই এদের ওড়ার গতিও হয় অনেক বেশি। ‘চিউলুয়ান ২’ -এর রেডিও ট্যাগের পাঠানো সংকেত থেকে জানা গিয়েছে সমুদ্রের ওপর দিয়ে ওড়ার সময় তার গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৪১ কিলোমিটার। ভাবা যায়! উড়তে উড়তে এরা কি কোন খাবারদাবার খায় না? জানা গিয়েছে এরা আরব সাগরের উপর দিয়ে যখন ওড়ে তখন প্রচুর পরিমাণে এক জাতের উড়ন্ত ড্রাগন ফড়িং (Pantala flavescens) শিকার করে।

(বাঁদিকে) ঘাসজমির মাঝে আমুর বাজ। (ডান দিকে) ফড়িং ধরে খাচ্ছে আমুর বাজ। ছবি: সংগৃহীত।
আশ্চর্যের ব্যাপার হল, ড্রাগন ফড়িং ওরা শিকার করে সেগুলোও পরিযায়ী এবং তারাও একই সময়ে আরব সাগরের উপর দিয়ে পরিযান করে। জিপিএস ট্র্যাকিং থেকে জানা গেছে ‘চিউলুয়ান ২’ এপ্রিল মাসের শেষে যাত্রা শুরু করে মাত্র ৯৩ ঘণ্টায় ৩০ এপ্রিল এসে পৌঁছোয় ওড়িশার কালাহান্ডি জেলার করলাপাট অভয়ারণ্যে। তারপর সেখানে তিন দিন কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে ৩ মে, আর ২০ মে সে আরো ৬ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সহযাত্রীদের সঙ্গে পৌঁছে গিয়েছে উত্তর-পূর্ব চিনের মাঞ্চুরিয়ান উপসাগরের উপকূলে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হল, সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান এবং বাতাসের গতিপথ ওদের ওই নির্দিষ্ট যাত্রাপথকে চিনিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২০: সত্য ও ন্যায় পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, তবে? ঔজ্জ্বল্য বেশি কার?

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৫: সমাপ্তি: শেষ হয়ে হইল না শেষ
আমুর বাজের আকার আগেই বলেছি অন্যান্য বাজের থেকে ছোট। আকারে প্রায় পায়রার মতো। ওজন মাত্র ১৮০ গ্রাম। এদের স্ত্রী পুরুষ আলাদা ভাবে চেনা যায়। পুরুষদের মাথা ও পিঠের রং কালচে ধূসর, গলা ও বুকের রং হালকা ধূসর এবং উদরের তলদেশের রং ইটের মতো। এদের পুরো পালক লালচে বাদামি এবং ডানার নিচের রং সাদা। স্ত্রী আমুর বাজের উপর দিকের রং হালকা ধূসর, মাথার রং স্লেট পাথরের মতো। এদের বুকের রং ফ্যাকাশে হলেও সারা বুক ও পেট জুড়ে রয়েছে কালো রঙের ছোপ। এদের ঊরুর পালকেও যেমন ছোপ রয়েছে তেমনই ডানার উড্ডয়ন পালক ও লেজের পালকের প্রান্তেও রয়েছে কালো ছোপ।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৩: দুর্জনের সম্মান, সাধুর জন্য ফাঁদ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি
পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের চোখের বর্ডারে রয়েছে কমলা রঙের বলয় আর উপরের চঞ্চুর গোড়ায় অবস্থিত সিরির রঙও কমলা। একইভাবে উভয়ের পায়ের রঙও উজ্জ্বল কমলা। পরিযানের সময় এরা প্রধানত, উন্মুক্ত তৃণভূমি, জলাভূমি বা বনভূমি অঞ্চলে কয়েকদিন অবস্থান করতে পছন্দ করে। কীটপতঙ্গই এদের প্রধান খাবার। তবে সুযোগ পেলে ছোট পাখি, স্তন্যপায়ী ও উভচর প্রাণীও শিকার করে। এদের দৃষ্টিশক্তি এতটাই প্রখর যে অনেক দূরে থেকে ছোটো ড্রাগন ফড়িংকে নিশানা করতে পারে। এরা খুব ভোরে এবং সন্ধ্যার সময় খাবার সংগ্রহ করতে পছন্দ করে। মে থেকে জুন মাসের মধ্যে এরা জোড় বাঁধে এবং অন্যান্য শিকারি পাখিদের বা কাকেদের পরিত্যক্ত বাসায় কিংবা গাছের কোটরে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। দু’দিনের ব্যবধানে স্ত্রী আমুর বাজ তিন বা চারটি ডিম পাড়ে। পুরুষ ও স্ত্রী মিলে প্রায় এক মাস ধরে তা দেয়। তারপর বাচ্চা জন্মালে প্রায় এক মাস ধরে বাবা ও মা তাদের লালন-পালন করার দায়িত্ব নেয়।

(বাঁদিকে) সুন্দরবনে আমুর বাজ। (ডান দিকে) স্ত্রী আমুর বাজ। ছবি: সংগৃহীত।
একসময় নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে স্থানীয় মানুষ মাংসের লোভে প্রচুর পরিমাণ আমুর বাজপাখি শিকার করত। ২০১২ সালেও ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছে প্রচুর আমুর বাজ। শিকার করা হত পূর্ব আফ্রিকাতেও। বর্তমানে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি কঠোরতায় ভারতে আমুর বাজপাখি হত্যা বন্ধ হয়েছে। আর তাই একদিকে আফ্রিকা, একদিকে রাশিয়া—পৃথিবীর সুদূর দুই প্রান্তের পিয়াসী আমুর বাজ হয়তো অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবনে আরও অনেক বেশি বেশি দেখা যাবে। পক্ষীপ্রেমীরা আশায় বুক বাঁধতেই পারেন।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















