বুধবার ১৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

শ্রীরামকৃষ্ণ।

“তিন টান একত্র হলে তবে তিনি দেখা দেন। বিষয়ের বিষয়ের উপর, মায়ের সন্তানের উপর, আর সতীর পতির উপর টান। এই তিন টান যদি কারও একসঙ্গে হয়, সেই টানের জোরে ঈশ্বরকে লাভ করতে পারে।” [কথামৃত পৃঃ ২১]
ঈশ্বরীয় প্রেম সর্বদাই কথা ও শব্দের আড়ালে মানুষ লৌকিক ভালোবাসার সামঞ্জস্য খুঁজে। কিন্তু লোকত্ত্বর সে ভালোবাসার সামঞ্জস্য ও গভীরতা বোধগম্যের পারে। মানবের সহজ প্রবৃত্তি হল তুলনামূলক বিচারের দ্বারা ধারণা উৎপাদন করা।
বাস্তবিক, মানব মন বুদ্ধির পারে চিরকালীন অব্যক্ত প্রেম রয়েছে তাকে গ্রহণ করতে পারে না। ‘আমি’ কে না হারিয়ে যা পাওয়া যায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টাও করেছে। সে জন্য পূর্ণ আনন্দ লাভের বঞ্চিত হয়ে রয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণ, ভগবানের সঙ্গে ভক্তের একাত্মবোধের চেষ্টা করতে পার্থিব তিন ঘনিষ্ঠ ও একান্ত ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২২: য পলায়তি, স জীবতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

অনন্ত এক পথ পরিক্রমা, পর্ব-৮৫: আত্মানং রথিনং বিদ্ধি

“কথাটা এই ঈশ্বরকে ভালোবাসতে হবে। মা যেমন ছেলেকে ভালোবাসে, সতী যেমন পতিকে ভালোবাসে, বিষয়ে যেমন বিষয় ভালোবাসে। এই তিনজনের ভালোবাসা, এই তিন টান একত্র করলে যতখানি হয়; ততখানি ঈশ্বরকে দিতে পারলে তাঁর দর্শন লাভ হয়।” [কথামৃত পৃঃ ২১]
শ্রীরামকৃষ্ণ একটি অদ্ভুত প্রশ্ন করেছেন, যা তার কাছে অস্বাভাবিক লেগেছে এই ভেবে যে, এই সব (জাগতিক ভোগের) বস্তুতে মানুষ ঈশ্বরকে ছেড়ে কেন মন দেয়? কেন ঈশ্বরকে ভুলে যায়? যেখানে আমাদের মন সর্বদাই ঈশ্বরকে ছেড়ে বিষয় ভোগের জন্য ব্যথিত হয়, সেখানে ঠাকুর এক বিপরীত মুখী এই প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। সিঁড়ির উপরে ধাপে পড়ে যাওয়া বল ক্রমাগত সিড়ির নিচের ধাপে পড়তেই থাকে, আর ধরা যায় না, মন বিষয় ভোগ করতে করতে ভুলে যায় বিচার করতে। ক্রমাগত নিচের দিকে যেতেই থাকে। সত্যতা বিচারে অসমর্থ হয়। বিষয় টান এতই প্রগাঢ় হয় যে এর বাইরে সত্য থাকতে পারে ভাবতেই পারে না।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৬: জয় বাবা ফেলুনাথ: রুকুর অন্দরমহল

শ্রীশ্রী ঠাকুর বিশেষ কিছু করণীয় বলেছেন, মাঝে মাঝে নির্জন বাস, তাঁর নাম গুণ কীর্তন ও বস্তুবিচার। এখানে ভক্তি ও জ্ঞান সহায়ে মনের পরিচর্যা। আরেকটি বিষয়, তিনি তিন টানের লক্ষ্যার্থ হিসাবে জগতের তিনটি উপমা নিয়েছেন। মানুষের শরীর ধারণের জন্য যে সকল বাসনা মূলত দায়ী, সেগুলিকেই তিনি নিয়েছেন। তবে এই টানের মাত্রার প্রবলতাগুলি বিচার্য। সেই প্রবলতার সর্বোচ্চ মাত্রা যখন পৌঁছয়, তখনই বস্তু লাভ হয়। তেমনি সেই প্রবল মাত্রাগুলি একত্র করলে যে প্রবলতম মাত্রা ধারণ করে, সেই পরিমাণ ঈশ্বরের প্রতি টান আসলে তবেই তাঁর দর্শন লাভ হয়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২২: রামের পাদুকাগ্রহণের মাহাত্ম্য, ভরত কী রামের ছায়াশ্রিত প্রশাসক?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৭: আমুর বাজ

বিষয়ের প্রতি টান সকলের চেয়ে প্রবলতম। তার অন্য সকল মানুষিক বৃত্তিগুলি এতটা ক্রিয়াশীল নয়, তার বিষয়ের সংরক্ষণ ও বর্ধনের জন্য তিনি যেমন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। তেমনি মায়ের সন্তানের প্রতি টান এতটা প্রবল যে, মা হিংস্র প্রাণীর ভয়ে আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যায়, কিন্তু সন্তানকে রক্ষা করার জন্য নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না বা হিংস্র প্রাণীর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে সন্তানকে রক্ষা করেন। তেমনি সতীর পতি-র প্রতি টান , যে টানে সমস্ত অন্যান্য ভাবগুলি লুকিয়ে থাকে— সখ্য, মধুর, দাস্য ইত্যাদি। ফলে সে প্রবলতম।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৬: দীনদুখিনীর জননী সারদা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-২৬: যিনি নিরূপমা তিনিই ‘অনুপমা’

শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, এই তিনটান যখন একত্র হবে, যে তীব্র হবে, তার সমপরিমাণ তীব্রতা ঈশ্বরের প্রতি হলে ঈশ্বর দেখা দেন। তিনি কিন্তু মোড় ফিরিয়ে দিতে বলেননি। কোনও একটি ভাবকে মোড় ফিরিয়ে দিলে সম্ভবত, তার সঙ্গে কামনা বাসনাগুলিও সঙ্গে আসতে পারে। অর্থাৎ বিষয় পরিবর্তনে ভালোবাসার প্রকারের পরিবর্তন হবে না। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা অহেতুক, স্বতঃস্ফূর্ত, স্বচ্ছ। শুদ্ধ মন; সংস্কার বিমুক্ত হতে হবে। সে-জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ পথও আবিষ্কার করেছেন। মনকে মনেতেই বদ্ধ করতে বলেছেন। ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোনও বস্তুতে খরচ করতে মানা করেছেন। বনে অর্থাৎ সংস্কার থেকে দূরে থাক রাখতে মনকে। কোনে অর্থাৎ বিচার দ্বারা সমস্ত আগাছাকে দূরে সরিয়ে ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যাওয়া যেমন উদাহরণ দিয়েছেন, ‘দুধ জলের সাথে মিশে যায় কিন্তু ছানা করে জলে রাখলে মিশে না।’ মন-যোগ যখন সেই সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছয় তখনই ঈশ্বরের লাভ হয়।—চলবে।
* অনন্ত এক পথ পরিক্রমা (Ananta Ek Patha Parikrama) : স্বামী তত্ত্বাতীতানন্দ (Swami Tattwatitananda), সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ফিজি (Fiji)।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content