
পুজোর মতো নাটকেও উৎসর্গকৃত হতে হয়। ১৯ তারিখ কলকাতায় পা রেখেই সন্ধ্যেবেলায় অন্য থিয়েটারের নাটক পাঠের আমন্ত্রণ। ইদানীং যতবার কলকাতা এসেছি, প্রতিবার অন্য থিয়েটারের ‘চায়ের ধোঁয়া’ নামের নাট্যকারের নাটক পাঠের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছি। নাটক পড়ে শোনাবার একটা সুপ্ত ইচ্ছে তো থাকেই, তার মধ্যেই আরো একটা বড় আকর্ষণ হল প্রতিবারই অনেক বিশিষ্ট বিদগ্ধ নাট্যমোদীদের মধ্যে বাংলা নাটকের এক অন্যতম পুরোধা নাট্যকার অভিনেতা পরিচালক স্বয়ং বিভাস চক্রবর্তীর উপস্থিতি। ১৯ তারিখ সন্ধ্যেবেলা অন্য থিয়েটারে নাটক পড়েই নাটকের পুজো দিলাম।
সুজন বা নিবেদিতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আগে কখনও আলাপ হয়নি। সুজনের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন সব টেলিফোনেই। আমরা যখন অ্যাকাডেমিতে উপস্থিত হলাম, তখন চারিদিক পরিপাটি সাজানো। সে সময় সুজন ছিলেন না। জানিয়েছিলেন, ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে টেলিসিনে অ্যাওয়ার্ড-এর সরকারী অনুষ্ঠান সেরে অ্যাকাডেমিতে আসবেন। কারও সঙ্গে আলাপ নেই! তখনও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজনে সকলে ব্যস্ত। আমাদের দেখেই চেতনার বুক কাউন্টারে থাকা এক দিদি চেতনার সম্পাদক অমিতাভ ঘোষের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। অমায়িক ভদ্রলোক। মেঘে ঢাকা ঘটকের সূত্রে একবার ফোনে কথা বলেছিলাম। তিনি মুহূর্তের মধ্যে আমাদের দু’জনকে ওঁদের গ্রুপ ফটোতে সামিল করে নিলেন। এই মুহূর্ত থেকে আমরা এই চারটি দিন দলের সকলের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছি। সুশোভন এবং মেঘে ঢাকা ঘটক নাটকের সকল অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবি দেখেছি তাদের সঙ্গে চাক্ষুষ দেখা হল। সুজন এলেন, আবার সুজনকে নিয়ে সকলের সঙ্গে আরও এক দফা গ্রুপ ফটো সেরে অডিটরিয়ামে ঢুকলাম।
২০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে ৭টা: ‘তিন এক্কে তিন’
ঠিক সন্ধে সাড়ে ছটায় প্রকাশিত হল চেতনার ৫৩ বছরের নাট্য উৎসবের বিশেষ স্মারক। প্রখ্যাত পরিচালক ও অভিনেতা সুজন মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে বিগত নাটকের পোস্টার ও ছবি নিয়ে একটি সুন্দর সংকলন প্রখ্যাত চিত্রকর হিরণ মিত্রের হাতে তুলে দিলেন সপ্তর্ষি প্রকাশনার সৌরভ মুখোপাধ্যায়।
সাতটায় শুরু হল তন্বী চৌধুরী রচিত নাটক তিন এক্কে তিন। পরিচালনা অবন্তী চক্রবর্তী। রোমিও জুলিয়েট, মাই নেম ইজ জান , বিনোদিনী অপেরা….পরিচালিকা অবন্তীর একের পর এক সার্থক সৃষ্টি। নাটক এবং তার উপস্থাপনাকে যে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন অবন্তী সেখান থেকেই শুরু হল নতুন নাটক তিন এক্কে তিন। সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়, উষসী চক্রবর্তী, ইন্দুদীপা এবং স্বয়ং নাট্যকার তন্বী চৌধুরীর অভিনয়ে দীপ্ত আজকের সামাজিক অবস্থায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং স্পষ্ট একটি নাটক। ঠিক নাটক নয়, খানিকটা প্রতিবাদী কথন। যুগে যুগে কালে কালে নারীনিগ্রহের বিরুদ্ধে তীব্র সোচ্চার এক প্রতিবাদ। তাই তিন এক্কে তিন নাটকটি চিরাচরিত ধারায় শুরু বা শেষ কোনওটাই হয় না। সুদূর বোস্টনে ডাইনি সন্দেহে নারীনিগ্রহ থেকে হালের আরজিকর সবকিছু যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গীয়েছে। শুধু চরিত্রের নাম আলাদা। তাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা একই রকম।
থমকে যাওয়ার শুরুর মতোই থমকে যাওয়া শেষের পর অভিনেত্রীরা নিজেদের ব্যক্তিজীবনের পরিচয় দেন। স্পষ্ট বোঝা যায় নাটকে অভিনয় নয় নিজেদের অভিজ্ঞতাই যেন তাঁরা ভাগ করে নিয়েছেন। এ নাটকের অভিনেত্রী এবং আরজিকরের ডাক্তার ইন্দুদীপা যখন তার ব্যক্তি অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, শুনতে শুনতে শিউরে উঠেছিলাম। ৫৩-এর নাট্য উৎসবে শুরুতেই এই নাটকটি বেছে নেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১০: ডেসডিমোনার রুমাল/৯

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৫ : Twoকি!

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪২: কুইক অ্যাকশন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে
২১ নভেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যে ৬-৩০টা ‘জগন্নাথ’
সালটা ঠিক মনে পড়ছে না বোধহয় ১৯৮১-৮২ সালে দেখা বা আরও পরে হতে পারে। অরুণ মুখোপাধ্যায় ও বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী অভিনীত জগন্নাথ দেখেছিলাম। মোটামুটি চল্লিশ বছর পর আবার ফিরে গেলাম যৌবনে। বাংলা নাটকের ঐশ্বর্য চেতনার কালোত্তীর্ণ প্রযোজনা জগন্নাথের স্রষ্টা স্বয়ং অরুণ মুখোপাধ্যায়ের পাশের আসনে বসে সুজন মুখোপাধ্যায়ের জগন্নাথ দেখতে পাবার বিরল সুযোগ করে দিয়েছেন সুজন। আমি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ। এ নাটকে নিজের অভিনয় নিয়ে সবসময়ে যথেষ্ট বিনীত থাকলেও দাপটের সঙ্গে মঞ্চ জুড়ে অভিনয় করলেন সুজন। বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম ৪০ বছর আগে। দর্শকের কাছেই শুনেছিলাম এর মাঝের জগন্নাথের প্রযোজনায় জগন্নাথ ও নন্দের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সুজন এবং তাঁরই দাদা অভিনেতা নাট্যকার পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়। এদিন সুজনের সঙ্গে সাবলীলভাবে সঙ্গত করলেন নন্দের ভূমিকায় শুভ্রজিৎ দত্ত। গাঙ্গুলিবাবুর মজাদার চরিত্রে গুণী অভিনেতা সুপ্রিয় দত্ত জমিয়ে দিলেন।
জগন্নাথ নিয়ে দেশে-বিদেশে গত প্রায় ৪৮ বছর ধরে এত প্রশংসার বন্যা বয়ে গীয়েছে সেখানে নতুন করে কিছু বলার জায়গা বা যোগ্যতা কোনওটাই নেই। নাটক শেষে সুজন জানালেন ২০২৭-র ১৬ ফেব্রুয়ারি অরুণবাবুর জন্মদিন জগন্নাথের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে পরবর্তী অভিনয়। অরুণবাবু মঞ্চে উপস্থিত হলেন অনবদ্য দক্ষতায় জগন্নাথের সংলাপ বললেন। করতালিতে ফেটে পড়ল সারা প্রেক্ষাগৃহ।
জন্মদিন ছিল ২২ নভেম্বর। কিন্তু অরুণবাবুর উপস্থিতিতে সাজঘরে কেক কেটে প্রাকজন্মদিন পালিত হল। সুজন নিবেদিতা অমিতাভদা সুশোভন-সহ দলের সকলে গেয়ে উঠলেন, জগন্নাথের সেই আইকনিক গান—
প্রকৃতির কত লীলা / মানুষের কত রূপ
বাঁচতে যে কী সুখ রে / বাঁচতে যে কী সুখ
পুত্র সুজনের অনুরোধে স্বয়ং অরুণবাবু চড়ায় গান ধরলেন। সঙ্গ দিলেন সুজন-নিবেদিতা। গলা মেলালেন সকলে—
ও মন তোর মন বুঝিতে / ফিরে ফিরে আসি
দেখবো বলে ঐ মুখেতে / একটু খানি হাসি
গ্রামবাংলার লোকগানের ঘরানায় বাঁধা এই গানের অনবদ্য সুরের ছোঁয়ায় বার বার মনে হচ্ছিল দুঃখকষ্ট সমস্যায় জর্জরিত হয়েও, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার, মনের মানুষের মন বুঝতে পারার, তার মুখে একটু হাসি দেখতে পাবার বড় সুখ। আর এরকম বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকাটাই মনে হচ্ছিল এ জীবনের এক সাঙ্ঘাতিক প্রাপ্তি!

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি
২২ নভেম্বর শনিবার দুপুর তিনটে ‘গোপাল উড়ে এন্ড কোং’
শনিবার ছিল ডার্বি। চেতনার জন্মদিন। হইহই করে বিদ্যাসুন্দরের রোমান্টিক কাহিনি নিয়ে অল্পস্বল্প খেউড়-সহ নাচে গানে রঙ্গতামাশায় পরিপূর্ণ জমজমাট প্রযোজনা। প্রশংসনীয় মঞ্চ ভাবনা পোশাকে অনুষঙ্গে পুরনো জমিদার আমলকে অসাধারণ দক্ষতায় মঞ্চে এনেছেন পরিচালক সুজন। এ নাটকে সমবেত নৃত্য ও সংগীত এক সম্পদ! নাটকের হিউমারের মধ্যেই সমসাময়িক ঘটনার প্রহসন মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গিয়েছে। এ নাটকের বাড়তি পাওনা হল সুজন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একের পর এক অনবদ্য গান। রীতিমতো টপ্পাধর্মী পুরাতনী বাংলাগান গেয়ে মানুষকে মোহিত করে দিয়েছেন সুজন। তাই বোধহয় নাটক শেষে দর্শকের অনুরোধ রাখতে আবার সেই গান গাইতে হল। এই নাটক মাহিন্দ্রা এক্সিলেন্স আওয়ার্ডে ভূষিত পুরস্কার পেয়েছিলেন জমিদারবাবু চরিত্রে তরুণ ভট্টাচার্য ও মালিনীর ভূমিকায় নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়। যথার্থ ও সঠিক নির্বাচন। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল শ্রেষ্ঠ নাটক এবং শ্রেষ্ঠ সংগীত হিসেবেও পুরস্কৃত হওয়া উচিত ছিল। নাট্যকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের লেখা চোখের পলক সরতে না দেওয়া একটি নাটক। তিনি এই মুহূর্তের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। দেশজ সুরে সমৃদ্ধ গানে গানে সংগীতকার সুজন এ নাটককে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন, সুজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মালিনীর গানে চমৎকৃত করেছেন অভিনেত্রী-শিল্পী নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়। এই নাটকে নায়ক-নায়িকার মিলনদৃশ্যে কাপড়ের পটে কায়া ও ছায়াকে মিলিয়ে দিয়ে মঞ্চে এক আশ্চর্য রূপকল্প তৈরি করেছিলেন নির্দেশক। বিদ্যার ভূমিকায় অভিনেত্রী আনন্দরূপা এবং সুন্দরের ভূমিকায় রাজু বেরার উপস্থাপনা ছিল আকর্ষণীয়।

২২ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যে ৬-৩০টা ‘হরিপদ হরিবোল’
চেকভের রচনা থেকে ইন্দ্রাশিস লাহিড়ীর লেখা পরের নাটক হরিপদ হরিবোল। বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে নাটককার ইন্দ্রাশিস লাহিড়ীর অবদান চিরস্মরণীয়। নাটকটির মুখ্যচরিত্রে সুজন এবং নিবেদিতা দুরন্ত অভিনয় করেছেন। বস এবং বস-এর স্ত্রীর চরিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রী-সহ অফিসের আরেক সহকর্মীর ভূমিকায় সুশোভন গুহ অত্যন্ত সাবলীল। পুরো উপস্থাপনায় পরিপূর্ণ রসবোধ সংলাপের তীব্র শ্লেষ আর সমবেতসঙ্গীত নাটককে অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়। মঞ্চকে নানাভাবে ব্যবহার করেছেন পরিচালক। প্রমোশনের লোভে অফিসের বসের পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে কেরানী হরিপদ’র নাটক দেখতে যাওয়ার বিরল সুযোগ নেওয়া এবং অসাবধানবশত বসের গায়ের ওপর হেঁচে ফেলায় বসের কাছে ক্ষমা চেয়েও চাকরী হারিয়ে অপমানিত হতে থাকা হরিপদর আত্মহত্যা। এই নিয়ে অপূর্ব এক নাটক। সহজ কথায় বলা অত্যন্ত গভীর বিশ্লেষণ।

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’
২২ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যে ৭-৩০টা ‘ভুল রাস্তা’
এদিনের ক্লাইম্যাক্স জন্মশতবর্ষে বাদল সরকারের নাটক ভুল রাস্তা। ২৭ বছর আগের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া দুই বন্ধুর একত্র নিবেদনের পুনরুত্থান! সুজন মুখোপাধ্যায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। দু’জনেই সু-অভিনেতা এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাই এদের যুগলবন্দি দেখার আগ্রহে দর্শকাসন পরিপূর্ণ। হিন্দি বাংলা মেশানো দেহাতি ভাষায় গানে গল্পে অভিনয়ে বলা এক চিরাচরিত ঘটনা। রাজার অনুরোধে রাজপুত্র জঙ্গলে গেলেন এক বিশেষ ফল নিয়ে আসতে কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলে ক্ষুধাতৃষ্ণার জ্বালায় তাকে তারই প্রজা জঙ্গলের কাঠুরিয়ার সঙ্গে দিন কাটাতে বাধ্য হতে হলো, কাঠুরিয়া হয়ে বছর কাটাতে হল। সেই ভুল রাস্তায় গিয়ে জীবনের ঠিক রাস্তা খুঁজে পেল কি সেই রাজকুমার? নিরাভরণ মঞ্চে আঙ্গিক আর শারীরিক বিভঙ্গে হাতি ঘোড়া জঙ্গল গাছ চিতার অনুষঙ্গ অবলীলায় মঞ্চে আসছে। দুই সহপাঠীর নাচগান আর দুর্দান্ত অভিনয়ে এই দুই পালাকার বন্ধুর গল্প মঞ্চে রূপকথা হয়ে উঠল। এই নাটকের মাঝেই হঠাৎ করে বিশ্রামের অছিলায় দুই অভিনেতা মঞ্চ ছেড়ে দিলেন চেতনার সম্পদ মেরি আচার্যের পাণ্ডবানি গানের জন্য। এ গান এ আঙ্গিকের পুরোধা স্বয়ং তিজনবাঈকে মঞ্চে দেখার বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তাঁরই স্বল্প সময়ের ছাত্রী মেরি আচার্য চমকে দিলেন। আবার ফিরলেন সুজন শিবপ্রসাদ, নাটক পরিণতিতে পৌঁছল। আর সেখান থেকেই বোধহয় এই প্রথমবার দেহাতি মানুষজন এ ধরনের অনুষ্ঠান করে যেভাবে মানুষের থেকে পয়সা চান ঠিক সেভাবেই একাডেমীর একতলায় সুজন মুখোপাধ্যায় আর দোতলায় গেলেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মানুষের ভালবাসা কুড়োতে। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। সাক্ষী হলাম নাটক শেষে সাজঘরে কেক কেটে-মেখে বন্ধুত্ব ও দলের জন্মদিন পালনের একত্র উৎসবের।

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৯: শো-কেস শহর, উপসাগরীয় শিস এবং গোরার দিনরাত্রি

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে
২৩ নভেম্বর রবিবার দুপুর ৩টে ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’
এবারের চেতনার উৎসবে অত্যন্ত সফল এবং বিশিষ্ট নাট্যকারদের ছড়াছড়ি। সেই তালিকায় রয়েছেন বাদল সরকার অরুণ মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রাশিস লাহিড়ী, উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, সুজন মুখোপাধ্যায়, প্রবাসী তন্বী চৌধুরী। এঁদের মতো গুণী মানুষদের সঙ্গে জায়গা পেয়েছে আমার লেখা নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’।
নাটক দেখার পর এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমি যদি এই নাটক না লিখতাম সুদূর মহারাষ্ট্রে বসে, যদি এই নাটকের প্রতিটি নাট্যমুহূর্ত তৈরির পুঙ্খানুপুঙ্খ না জানতে পারতাম। এই নাটকের ঐতিহাসিক আবহ সংগীত যদি প্রায় প্রতিদিন একবার করে না শুনতাম, তাহলে বোধহয় আশেপাশের অসংখ্য দর্শকের মত, সেই মুহূর্তে এ নাটক দেখার পর আমিও ভেঙ্গেচুরে আবিষ্ট হতে পারতাম। তাই ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ আমার কেমন লেগেছে এর উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে খুব শক্ত। ভীষণ ভালো লেগেছে এ কথা অনস্বীকার্য, কিন্তু সেই মুহুর্তে যদি ঈশ্বর আমাকে সব ভুলিয়ে দিতেন তাহলে না জানি আরও কত ভালো লাগতে পারতো। তবু অদ্ভুত ব্যাপার এই যে নাটকের সবটুকু জানা চেনা বারংবার আলোচিত এবং অসংখ্য দর্শকের অনুভূতি অভিব্যক্তি জানা সত্ত্বেও আমার চোখ ভিজে যাচ্ছিল আমার গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠছিল। এবং আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি তার সবটুকু কৃতিত্ব এই নাটকের অনবদ্য নির্মিতি, অসাধারণ অভিনয়, ঐতিহাসিক আবহ, আবহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তীক্ষ্ণ জ্যামিতিক মঞ্চস্থাপত্য আলো আর ঈর্ষণীয় দলগত সমন্বয় ও অভিনয়ের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। আমার লেখা নাটক গোটা বাঙ্ময় ছবিটার পটভূমি মাত্র। ছবিটা ফুটিয়ে তুলেছেন ওঁরা সকলে মিলে।
সংগীত বিষয়ে আমার জ্ঞান একেবারেই সীমিত। তবু ঋত্বিকের গভীরতা প্রকাশে সরোদের অতুলনীয় ব্যবহার আর তার সঙ্গে বেহালার নিয়ন্ত্রিত ধ্বনিমিশ্রণ যেন তাঁর জীবনের রুক্ষতাকে প্রকাশ করেছে। সংগীত ভাবনায় ঋদ্ধ এক সংগীত পরিচালকের সঙ্গে মুখ্য অভিনেতা ও নাট্যপরিচালকের সাঙ্গীতিক মেলবন্ধনই সম্ভবত এমন এক আশ্চর্য ঐতিহাসিক সমাপতন ঘটিয়েছে। আমি জেনে বুঝে ঐতিহাসিক শব্দ ব্যবহার করেছি। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উৎপল দত্ত পরিচালিত নাটকের আবহ সৃষ্টি করেছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য সে নাটক দেখার সুযোগ ঘটেনি। তবে সুজন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত মেঘে ঢাকা ঘটকের আবহসৃষ্টি আমার কাছে এমনই এক ঐতিহাসিক সমাপতন। ঋত্বিকের বিপরীতে সুরমার মুগ্ধতাকে বাঁশিতে ধরা হয়েছে। সংলাপে রয়েছে অত্যধিক গরমে সুরমা ঋত্বিকের কাছে যেন কালো দিঘির শান্ত জলে অবগাহন। ঠিক সেই অনবদ্য অভিজ্ঞতা। ম্যানিকুইনের দৃশ্য লেখার পর খুব ভয় ছিল। দ্বিতীয়ার্ধের তীব্রতার মধ্যে আচমকা এই দৃশ্য বেমানান হবে না তো? সুজনের দৃশ্যভাবনা প্রবুদ্ধের অসামান্য স্বপ্নময় আবহসৃষ্টি আর মেরি এবং অগ্নির অভিনয়ের দ্যুতি দ্বিতীয়ার্ধের দমবদ্ধ জীবনযুদ্ধের বেসামাল পরিস্থিতিতে যেন আচমকা একঝলক অক্সিজেন নিয়ে আসে। চমকিত করে পিছনের পর্দায় প্ল্যাটফর্মে ছবির বিমলের সংলাপে আমাদের সামনে নাটকের বিমলের একই ছন্দে দৌড়তে দৌড়তে অবলীলায় ঠোঁট মিলিয়ে দেওয়া! এ নাটকে উমেন্দ্র ভৌমিক, তরুণ ভট্টাচার্য, সুশোভন গুহ, মেরি, অগ্নি, রজত নারায়াণ, পায়েল, সৃষ্টি, ঐন্দ্রিলা, আরাত্রিকা, দীপেন্দু, সায়ক অভিনয়ে এবং নির্দেশক সুজন মুখোপাধ্যায়, সহযোগী নির্দেশক নিবেদিতা ও রাজু বেরা আমার কল্পনায় দেখা চরিত্রদের আমার সামনে নিয়ে এসেছেন। চাকরি করে নানান ঋণশোধ করেছি, কিন্তু চেতনার কাছে এই বিপুল ঋণের ইএমআই আজীবন শোধ করতে পারবো না। স্বীকার করতে কোনও দ্বিধা নেই। চেতনার দলগত অভিনয় গান সমন্বয়, সুজন এবং নিবেদিতার সম্ভবত এ যাবৎ শ্রেষ্ঠ অভিনয়, আলো আবহ মঞ্চস্থাপত্যের সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় ফুটে ওঠা চলচ্চিত্রের অংশের আশ্চর্য মেলবন্ধন এই নাটককে এক আশাতীত উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই অসামান্য সাফল্যই হয়তো-বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে ঈর্ষারও একটা অন্যতম কারণ হয়ে উঠবে। তবে এমন একটি প্রযোজনার অংশ হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।
এই নাটকের প্রতি অভিনয়ের শেষে দর্শকের করতালি থামতে চায় না, এ ছবি আগেও দেখেছি। সেদিন সাক্ষী হলাম। দর্শকের উচ্ছ্বাস আর শিলঙের একটানা বৃষ্টির মতো হাততালি চলছে তো চলছেই! খুব ইচ্ছে করছিল সুজনের পাশে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরি! কিন্তু কেন জানি না সকলের সামনে যেতে মন চাইল না। প্রাণভরে হাততালি দিতে লাগলাম। সাজঘরে গিয়ে তো দেখা করবোই!

২৩ নভেম্বর রবিবার সন্ধ্যে ৭টা ‘হিজিবিজি বাহিনী’
উৎসবের শেষে যেমন একটা উৎসব হয় ঠিক সেভাবেই ছোটবড় সকলকে মিলিয়ে দিয়ে স্বরচিত হিজিবিজি বাহিনী নাটকে এক অদ্ভুতুড়ে মজাদার ম্যাজিকাল ফ্যান্টাসির জগত তৈরি করেছেন নাট্যকার পরিচালক ও সংগীতকার সুজন মুখোপাধ্যায়। একই নাটকের মধ্যে মর্জিনা আবদাল্লা আলাদিন ও জিন এবং সুকুমার রায় মিলেমিশে একাকার। এই ঝাঁ চকচকে জমজমাট উপস্থাপনায় গব্বর সিং কালিয়ার থেকে দুষ্টু জাদুকর সব্বাই রয়েছেন। আলো-আঁধারি মঞ্চমায়ায় অবাক হয়ে যাচ্ছি একটার পর একটা ঘটনায়। চেতনার বড়দের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করছে একরত্তি সব খুদেরা! এ নাটকে সুজন অর্কেষ্ট্রাসহ এক আধুনিক বিবেক। মর্জিনা চরিত্রে নিবেদিতা অসামান্য অভিনয় করেছেন। গাধা চরিত্রে অগ্নিজিৎ সেনের সাবলীল অভিনয়ে মন ভরে যায়। চমৎকৃত করেছেন ডাকাত সর্দার, আলাদীন, জিন, ক্ষুদে আলি ও তার পূর্ণবয়স্কা স্ত্রী ফতিমা কাসেম তার পুঁচকে স্ত্রী সাকিনা আর মর্জিনা বিবির একরত্তি প্রেমিক পায়ের জুতোয় আলো জ্বালিয়ে হেঁটে বেড়ানো হুসেন। আর নজর কেড়েছেন চাইনিজ চরিত্রের অভিনেতা। ডাকাতদলের ক্ষুদেরাও দারুণ! এই প্রযোজনা প্রমাণ করে যে জগন্নাথ থেকে গোপাল উড়ে হয়ে হিজিবিজি বাহিনীতেও চেতনা সমান স্বছন্দ এবং অনবদ্য। এঁদের প্রযোজনায় সবচেয়ে বড় সম্পদ অসাধারণ সমবেত গান দলগত অভিনয় ও নিখুঁত সমন্বয়। আর সেই অরুণ বাবুর সময় থেকেই গান এই দলের ইউএসপি, যে ধারা মারীচ সংবাদ থেকে মেঘে ঢাকা ঘটক পর্যন্ত সমানভাবে বহমান।
নাটক শেষেই সুজনকে ছুটতে হবে গোয়াতে পরদিন ইন্ডিয়ান প্যানারোমা নির্বাচিত ছবি বড়বাবুর প্রদর্শনের জন্য। পরদিনই ভোরবেলা আমাদেরও ফিরতে হবে। তাই হিজিবিজি শুরু হবার আগেই সকলের সঙ্গে দেখা করে বিদায় নিয়ে এসেছি।
অ্যাকাডেমি থেকে ফেরার পথে মনটা যেন খারাপ হয়ে গেল। চার-চারটে দিন অনবরত যাওয়া-আসা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে! নাটক চা আড্ডা …চা আড্ডা নাটক …আবার কবে? আগামী ৫৪ বছরের নাট্যোৎসবে? নাকি ২০২৭-এ জগন্নাথের ৫০ বছরে? জানি না।
চিত্র সৌজন্য: চেতনা
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।


















