রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

এই জাতককথার কেন্দ্রে আছে মাংস। কিন্তু মাংসই কেন, অন্য কিছু কেন নয়? তার উত্তর সন্ধান করা যেতে পারে কাহিনির শেষে। গল্পটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু পরিপূর্ণ।

সেবার বারাণসীতে ব্রহ্মদত্তের রাজত্বকালে বোধিসত্ত্ব এক শ্রেষ্ঠীর কুলে জন্ম নিয়েছেন। একদিন চারজন শ্রেষ্ঠিপুত্র বারাণসী নগরের বাইরে যেখানে অনেক পথ মিলিত হয়েছে, আজকের শ্যামবাজারের পাঁচমাথা কিংবা পার্কসার্কাস সেভেন পয়েণ্টের মতো আর কী, সেরকমই একটি স্থানে বসে নিজেদের মত বিনিময় করছিল। কে কী দেখেছে, কতটা দেখেছে এইসব নিয়ে আলোচনা করছিল। টেনিদার গল্প যাঁরা পড়েছেন তাঁরা এইসব আলোচনার, বলা ভালো, আড্ডার, রস-কষ-শিঙাড়া-বুলবুলি উপলব্ধি করবেন। এমনকী পরের অংশেই এবার যে বিষয়টি আসবে তা বড়লোক বাবার ছেলেদের বাল্যখেয়াল, সেটিও বাড়ি বসে বসে হয় না। উদ্দীপন বিভাবের জন্য ওই রাস্তার মোড়, রক, ছেলেমানুষী মন আর সাহস থাকতে হবে বৈকী!
পথ দিয়ে এক ব্যাধ তার শকট মাংসে পরিপূর্ণ করে নগরে বেচতে যাচ্ছিল। ছেলেরা তাকে দেখে পরামর্শ করল নিজেদের মধ্যে এর কাছ থেকে একখণ্ড করে মাংস আদায় করা যাক না কেন! যেমন ভাবা তেমন কাজ। এসব কাজে পিছিয়ে আসলে বুঝি নিন্দে হয়, সকলে একবাক্যে স্বীকৃত হল। যাও, যাও! দেখো কী আদায় করা যায়!

প্রথম শ্রেষ্ঠিপুত্র ব্যাধের কাছে গিয়ে বলল, “অ্যাই! খানিক মাংস দে তো।”

ভ্রূ কুঁচকে গেল কি? বেশ একটা সামাজিক অবমাননার ইঙ্গিত যেন না? ব্যাধের-ও ভ্রূ কুঁচকে গেল বৈকী। চেয়ে খাচ্ছো বাপু, মুখের ভাষাটায় লাগাম দেবে না? অন্যের কাছে যাচ্ঞা করতে গেলে প্রিয়ভাষী হতে হয় হে। যেমন তোমার কথা, তেমনটাই পাবে। ছেলেটিকে ব্যাধ মৃতপশুর চামড়া আর মাংসের মধ্যস্থিত নীরস ও অখাদ্য সাদা পর্দা খানিক দিল।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৮: বারেরুজাতক: কা-কা না কেকা?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০২: শ্রীমার অন্তিম সময়কালীন ভবিষ্যবাণী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬২: এক নির্বাসিত রাজপুত্রের কথা

প্রথমজন এভাবে অপমানিত হয়ে ফিরে এলে দ্বিতীয় জন সবটা জানল। সে ব্যাধের কাছে গিয়ে বলল, “দাদা, একখণ্ড মাংস দেবে?”
ব্যাধ বলল, “তোমার বাক্যের অনুরূপ মাংস পাবে।”
কীরকম?

লোকে বলে, ভাই অর্থাৎ সহোদর অঙ্গতুল্য। অঙ্গ যেমন অঙ্গীর সঙ্গে ওতপ্রোত সম্পর্কে যুক্ত, অঙ্গের সঙ্গে বিচ্ছেদ যেমন অপূরণীয়, ভ্রাতার সঙ্গে সম্পর্ক-ও তা-ই। সুতরাং ছেলেটিকে ব্যাধ পশুর অঙ্গমাংস দিল।

তৃতীয় জন সবটা জেনে ব্যাধকে গিয়ে বলল, “বাবা! একখণ্ড মাংস দাও না!”

পুত্রের আহ্বান যেমন পিতৃহৃদয়কে রসসিক্ত করে, অপূর্ব বাত্সল্য ও স্নেহরসে মাধুর্য দেয়, তেমনই হবে এবার। ব্যাধ বলল, “তোমার বাক্যের অনুরূপ মাংস পাবে।” ছেলেটি “বাবা” বলে সম্বোধন করে ব্যাধের হৃদয় হরণ করেছিল। সে ছেলেটিকে পশুর হৃদপিণ্ড এবং মধুর স্বাদু মাংস দিল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৪: ভুবন চিল ও শঙ্খচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?

এবার চতুর্থ জনের পালা। ইন্টারভিউতে শেষে যে ঢোকে, মঞ্চে শেষে যে ওঠে তারা জ্বালা অনেক। সব জেনে জেনে তার মন উদ্বেল। এসব তো ধরবে না, তাহলে অজানা কী ধরে কে জানে! কী গাইব, কী বলব এতো এতো বিদগ্ধের পরে এসব কথা সে ভেবেছিল কীনা জানা নেই, জানা নেই যে “ওস্তাদের মার শেষ রাতে” বলে যে কথাটা আছে সেটাও তার জানা ছিল কীনা!

কিন্তু এই ছেলেটাই সেই জন্মের বোধিসত্ত্ব। সেও আগের জনের সবটা জেনে ব্যাধকে গিয়ে বলল “বন্ধু! একখণ্ড মাংস দাও তো!”

বন্ধু!!
যাচ্ঞা, অথচ কী মধুর। মহাকবি বলবেন, “হে বন্ধু মোর, হে অন্তরতর… ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা প্রভু, তোমার পানে…”
বন্ধু কে? শাস্ত্র বলবেন, “অত্যাগসহনো বন্ধুঃ” যার বিচ্ছেদ অসহ্য, অর্থাৎ যার সঙ্গে প্রাণের অচ্ছেদ্য বন্ধন, সে-ই বন্ধু। বয়সের কথা এখানে কিন্তু কিছু বলা হয়নি খেয়াল রাখতে হবে।

ছেলেটি ব্যাধকে বন্ধু বলে সম্মান দিয়েছিল। বিমুগ্ধ ব্যাধ বলেছিল, “তোমার বাক্যের অনুরূপ মাংস পাবে।”

যে তোমার সুখে সুখী, তোমার দুঃখে সমান দুঃখী সে তোমার বন্ধু। বন্ধুহীন গ্রাম অরণ্যতুল্য, “বন্ধু” এই বিষয়ের সঙ্গে অপ্রিয়ের কোনও যোগ নেই, তাই ব্যাধ সকল মাংস বন্ধুকে সমর্পণ করল। শ্রেষ্ঠীর গৃহে নিজে শকট চালনা করে পৌঁছে দিল সকল মাংস। শ্রেষ্ঠিপুত্র ব্যাধকে সসম্মানে গৃহে আতিথ্য দিল, তার স্ত্রী-পুত্রকে আনালো, ব্যাধকে বৃত্তি ত্যাগ করিয়ে নিজের অধিকারে তার বসবাসের ব্যবস্থা করলো, এবং, অভেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মৈত্রীভাবে যাবজ্জীবন বাস করতে লাগল।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৯: নীল হ্রদের পারে, নীল আকাশের নিচে লাল রঙের হেলিকপ্টার অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল

গল্পটি এখানেই সমাপ্ত। এবার কয়েকটি বিষয় উত্থাপন করা যাক। কি কি দেখা গেল এই কাহিনিতে?

শ্রেষ্ঠীর পুত্রদের অর্থাভাব না থাকলেও, পরের কাছে হাত পাততে তাদের সম্মানে বাধেনি, তবে তারা প্রতারণার আশ্রয় নেয়নি।
যাচ্ঞা, অর্থাত্ অপরের আনুকূল্য চাইতে গেলে প্রীতিসম্ভাষণ করতে হবে। যাচ্ঞা ও দাবীর পার্থক্য আছে, যা আজকাল উভয়পক্ষ-ই বিস্মৃত হন।
চারজন শ্রেষ্ঠিপুত্র চাররকম সম্ভাষণ করেছে। এখানে ম্যানেজমেন্টের সূত্র স্মরণে আসতে পারে। দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সংযোগের সেতু রচনা করে দেয় ভাষা ও ভঙ্গী। দুটি অপরিচিত মানুষের মধ্যে স্বার্থবন্ধন থাকুক বা না থাকুক, ভাবী অথবা সম্ভাব্য হৃদয়বন্ধন, আত্মিকতার মূলে রয়েছে তাদের ভাষাব্যবহার, আন্তরসৌন্দর্য, সমাজবোধ ও জীবনদর্শন। যেমন কর্ম, তেমন ফল-ই কার্যক্ষেত্রে নেমে আসে।
যে শেষে ব্যাধের কাছে গেছে, সে পূর্বের পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। সেই শিক্ষা থেকে তার সিদ্ধান্ত এসেছে।
মনে হতে পারে, শ্রেষ্ঠিপুত্রেরা যা বলছিল, তা মন থেকে বলছিল কি? প্রথম জনই তার সমাজদর্শনে সত্, বাকিরা তৈলমর্দনের প্রচলিত নিয়মে প্রাপ্য ফলের মাধুর্যকেই কেবল বাড়াতে চেয়েছে, স্বার্থ তো একটা আছেই। এর উত্তর হতে পারে এই যে, মানুষ তার সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে ঋদ্ধ হয়। এখানে সামাজিক মানুষের কথা প্রতিপাদ্য যে পলে পলে নিজেকে শুদ্ধতর করে শুদ্ধাত্মা হয়। তার মধ্যে সত্য ও ভ্রান্তি দুটিই থাকে। তার কর্মে মহাপুরুষোচিত অলৌকিক ঔদার্য কিংবা ঔদাসীন্যের বদলে সামাজিক মানুষের মানবিকতা ও বাস্তবোধের উদ্বোধন অথবা উদ্ভাসটুকুই এই কাহিনির প্রতিপাদ্য।
ব্যাধকে নতুন জীবনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন শ্রেষ্ঠিপুত্র। গ্লানিকর বৃত্তি থেকে উন্নততর জীবনে তাকে উত্তীর্ণ করেছেন। মাংসজাতকের কেন্দ্রে মাংস তথা হত্যার অনুষঙ্গ থাকলেও তা অহিংসায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ

দেখা গেল, সামাজিক সংজ্ঞায় চিহ্নিত সম্পর্কের থেকেও এখানে বন্ধুত্বের আদর্শকে উন্নততর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে, অথবা সকল সম্পর্কের সাফল্য বন্ধুত্বে, অচ্ছেদ্যবন্ধনে। সে যুগে বন্ধুত্বের যে সংজ্ঞা ও আদর্শ তা আজকের “ফ্রেণ্ডশিপের” সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে গেলে থমকাতে হবে খানিক। আজ “যাবজ্জীবনের”ও ভ্যালিডিটি ফুরায়। বোধিসত্ত্ব ও ব্যাধের যে বন্ধুত্ব স্থাপিত হল তা নিঃস্বার্থ ও অনন্ত। তাই এই বন্ধুত্ব খানিক ভিন্নতর।

মাংস ও বন্ধুত্ব এই দুটি বিষয় এই কাহিনীতে দুটি তাৎপর্যপূর্ণ অঙ্গ। বৌদ্ধগ্রন্থ মাংসকে উপলক্ষ্য করে মানুষের মর্মলোকের কথা বলেছে, বাক্য থেকে প্রবেশ করেছে হৃদয়ে। মাংসভক্ষণ আকাঙ্ক্ষিত হোক বা না হোক, এই মাংস জীবশরীরের নির্মাণে একটি প্রধান অঙ্গ। শোণিত, মজ্জা, মাংসে যে নশ্বর দেহ রূপ লাভ করে, সেই দেহধারী মানুষের বাহ্য থেকে অন্তর্লোকে, স্থূল থেকে সূক্ষ্মতর লোকে, চেতনার গভীরতর, বোধের উন্নততর পর্যায়ে অবিরত নিত্যযাত্রা তাকে মহত্তর করে। অন্তরের অন্তরতর যিনি, সেই অন্তর্যামীর সঙ্গে অচ্ছেদ্যবন্ধনে আবদ্ধ হলে মানুষের নিজেকে জানা পরিপূর্ণ হয়। তখন যুগে যুগে কর্মবলে শুদ্ধতর চেতনায় উত্তীর্ণ অন্তরাত্মার বোধি জাগে। এই জাতককথা সেই মর্মবাণীকেই স্মরণ করাতে চায়।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content