রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

মুনিবর জাবালি, নাস্তিক্যবাদের সমর্থনে পিতার কাছে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, সত্যবদ্ধ রামচন্দ্রকে অযোধ্যায় ফিরে যেতে অনুরোধ জানালেন। দ্বিজশ্রেষ্ঠ জাবালির বক্তব্য—প্রয়াত পিতা এখন প্রত্যক্ষগোচর নন, তাঁর কাছে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি মূল্যহীন। তাই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, বনবাসজীবন পরিত্যাগপূর্বক রাম, অযোধ্যার রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হন। সত্যপরায়ণ রাম তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। তাঁর মূলবক্তব্য অনুসারে, সত্যের বিকল্প কিছু হতে পারে না। অবশেষে রণে ভঙ্গ দিলেন, দ্বিজশ্রেষ্ঠ জাবালি। তিনি অকপটে স্বীকার করলেন, তিনি গভীরভাবে আস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী। তিনি যা কিছু বলেছেন, তার একটিই লক্ষ্য, যে কোনও কৌশল অবলম্বন করে রামকে বনবাস থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।

উত্তেজিত রামকে শান্ত করতে এ বারে ঋষিবর বশিষ্ঠ জাবালির সমর্থনে জাবালির সদুদ্দেশ্য সম্বন্ধে ধারণা দিলেন। এই প্রসঙ্গে বশিষ্ঠমুনি জগতের উৎপত্তি বিষয়টি বর্ণনা করলেন। সর্বত্র জলমগ্ন অবস্থা হতেই পৃথিবীর উদ্ভব। তারপরে সেখানে দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মার আবির্ভাব হল। ব্রহ্মা বরাহরূপ ধারণ করে জল হতে পৃথিবীকে উদ্ধার করলেন এবং শৌর্যশালী আত্মজগণের সঙ্গে সমগ্র জগৎ সৃষ্টি করলেন। ব্রহ্মা আকাশসম্ভূত,শাশ্বত, নিত্য ও অব্যয়। তিনি মরীচির জন্মদাতা, মরীচি হতে কশ্যপ এবং কশ্যপের পুত্র বিবস্বান। বিবস্বান হতে জন্ম হয় বৈবস্বত মনুর। বৈবস্বত মনুর পুত্র ইক্ষ্বাকু। মনু প্রথম ইক্ষ্বাকুকে সমৃদ্ধ ভূমি দান করেন। সেই ইক্ষ্বাকু এই অযোধ্যার প্রথম রাজা। ইক্ষ্বাকুর পুত্র শ্রীমান কুক্ষি নামে খ্যাত ছিলেন। কুক্ষির পুত্র ছিলেন বীর বিকুক্ষি।বিকুক্ষির পুত্র মহাতেজস্বী শৌর্যশালী বাণ। বাণের অনরণ্য নামে মহাতপস্বী এক পুত্রের জন্ম হল। সজ্জন অনরণ্যের রাজত্বকালে, অনাবৃষ্টি বা দুর্ভিক্ষ বা চৌর্যবৃত্তি,কোনটাই দেখা যায়নি।
অনরণ্যের পুত্র পৃথু। কালক্রমে পৃথু রাজা হলেন। পৃথুর পুত্র মহাতেজস্বী ত্রিশঙ্কু। সত্যবাদিতা গুণের জন্য, ত্রিশঙ্কুর সশরীরে স্বর্গপ্রাপ্তি হয়েছিল। ত্রিশঙ্কুর পুত্র ধুন্ধুমার ছিলেন মহাযশস্বী। ধুন্ধুমার এর ঔরসে যুবনাশ্ব নামে পুত্রের জন্ম হল। যুবনাশ্বর পুত্র মান্ধাতা। মান্ধাতার পুত্র মহাতেজা সুসন্ধি। সুসন্ধির দুই পুত্র—ধ্রুবসন্ধি ও প্রসেনজিৎ। যশস্বী ধ্রুবসন্ধির পুত্র শত্রুহন্তা ভরত। ভরতের পুত্র মহাবলশালী অসিত। হৈহয়, তালজঙ্ঘা, শূর ও শশবিন্দু প্রভৃতি রাজারা অসিতের বিপক্ষাবলম্বী ছিলেন। রাজা অসিত, যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে প্রবাসে আশ্রয় নিলেন। রাজা অসিত, মুনিবৃত্তি গ্রহণ করে, কোনও এক রমণীয় শ্রেষ্ঠ পর্বতে মুনিবেশে অবস্থান করতে লাগলেন। শোনা যায়, তাঁর দুই পত্নী অন্তঃসত্তা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কমলনয়না, উত্তমপুত্রাকাঙ্খিনী একজন, সুপুত্র কামনায়, দেবোপম তেজস্বী ভৃগুনন্দনকে বন্দনা করলেন।

অপর রাজ্ঞী সপত্নীর গর্ভ নষ্ট করবার জন্যে তাঁকে বিষপ্রয়োগ করলেন। হিমালয়ে অবস্থানরত ভৃগুনন্দন ঋষি চ্যবনের কাছে রাজা অসিতের কালিন্দী নাম্নী প্রথমা মহিষী উপস্থিত হলেন। অভিবাদনরতা বরপ্রার্থিনী রাজমহিষীর প্রতি প্রীত ঋষি আশীর্বাদ করলেন, পুত্রস্তে ভবিতা দেবি মহাত্মা লোকবিশ্রুতঃ। ধার্মিকশ্চ সুভীমশ্চ বংশকর্ত্তারিসূদনঃ।। তোমার এক মহাত্মা পৃথিবীখ্যাত পুত্র হবে। সে হবে, ধার্মিক, ভীমসদৃশ সুগঠিতরূপধারী, বংশবৃদ্ধিকর ও শত্রুহন্তা। আশীর্বচনধন্যা রাজ্ঞী কালিন্দী, পদ্মপত্রসমনেত্রবিশিষ্ট ও পদ্মগর্ভসমোজ্জ্বল প্রদক্ষিণান্তে, ঋষির অনুমতি নিয়ে, নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি যথাসময়ে একটি পুত্রের জন্ম দিলেন। গর্ভবিনাশেচ্ছু সপত্নী তাঁকে গর (বিষ)-প্রয়োগ করায়, গরলসহ অর্থাৎ বিষসহ ভূমিষ্ঠ পুত্রের নাম হল সগর। সেই সগররাজা এক পূর্ণিমাতিথিতে সবেগে, প্রজাদের ত্রাস সৃষ্টি করে, সমুদ্র খনন করিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৯: মাংস জাতক— বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২১: মহারাজ অফ শান্তিনিকেতন

শোনা যায়, সগর পাপকার্যে নিরত পুত্র অসমঞ্জকে ত্যাজ্যপুত্র করেন।অসমঞ্জের পুত্র শৌর্যবান অংশুমান, অংশুমানের পুত্র দিলীপ, দিলীপের আত্মজ ভগীরথ,ভগীরথের তনয় ককুৎস্থ, যাঁর নামানুসারে বংশধরেরা কাকুৎস্থ নামে অভিহিত হলেন। ককুৎস্থের পুত্র রঘু, যাঁর থেকে বংশধরেরা রাঘব নামে খ্যাত হলেন। রঘুর পুত্র সৌদাস, যিনি প্রবৃদ্ধ, নরষাদক, কল্মাষপাদ নামে (অভিশাপের ফলে) প্রসিদ্ধ ছিলেন। সৌদাস অর্থাৎ কল্মাষপাদের পুত্র শঙ্খণ। শোনা যায়, শৌর্যবান হওয়া সত্ত্বেও তিনি সসৈন্যে ধ্বংস হয়েছিলেন। শঙ্খণের একটি বীর ও সুপুরুষ পুত্রের জন্ম হল, তাঁর নাম সুদর্শন। সুদর্শনের পুত্র অগ্নিবর্ণ। অগ্নিবর্ণের পুত্র শীঘ্রই। শীঘ্রগর পুত্র মরু। মরুর পুত্র প্রশুশ্রব। প্রশুশ্রুবের পুত্র মহাত্মা অম্বরীষ।অম্বরীষের পুত্র সত্যপরায়ণ নহুষ। নহুষের পরম ধার্মিক পুত্রের নাম নাভাগ।

নাভাগের দুই পুত্র,অজ ও সুব্রত। অজ ছিলেন ধর্মাত্মা রাজা দশরথের পিতা। ঋষি বশিষ্ঠ রামকে জানালেন, রাম রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র। রাম রাজ্যের স্বীকৃত উত্তরাধিকারী। তাই তাঁর অনুরোধ— তদ্ গৃহাণ স্বকং রাজ্যমবেক্ষস্ব জগন্নৃপ। হে নৃপ, তুমি তোমার নিজরাজ্য গ্রহণ করে পরম্পরাগত ঐতিহ্য বজায় রাখ। তাঁর মতে, ইক্ষ্বাকুকুলে জ্যেষ্ঠই রাজা হন,অনুজ নন। জ্যেষ্ঠ রাজপদে অভিষিক্ত হয়ে থাকেন। বশিষ্ঠের কাতর আবেদন, রাম রাঘুবংশীয়দের এই পরম্পরাগত সনাতন কুলধর্ম পরিত্যাগ করতে পারেন না। তিনি, পিতার তুল্য মহাযশস্বী হয়ে বহুরত্নশালিনী বিশালরাষ্ট্রযুক্ত এই পৃথিবী শাসন করুন। স রাঘবাণাং কুলধর্ম্মমাত্মনঃ সনাতনং নাদ্য বিহন্তুমর্হসি। প্রভূতরত্নামনুশাধি মেদিনীং প্রভূতরাষ্ট্রং পিতৃবন্মহাযশাঃ।।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৫: গাঙচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

রাজপুরোহিত বশিষ্ঠ রঘুবংশের রাজাদের মধ্যে প্রচলিত বংশপরম্পরাক্রমে জ্যেষ্ঠপুত্রের উত্তরাধিকারলাভের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে, পূর্বপূরুষদের যে ক্রমটি তুলে ধরেছেন সেটি তথ্যপূর্ণ। রাজপুরোহিত এবারে তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে গুরূপদেশের যাথার্থ্য কেন? এই প্রসঙ্গান্তরের সূচনা করলেন। তিনি বললেন, নবজাতক পুরুষের তিনজন গুরু হয়ে থাকেন আচার্য,পিতা ও মাতা। পিতা জন্মদাতা, আচার্য পরম জ্ঞানদাতা,তাই আচার্য গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হন।বশিষ্ঠ রামের যোগ্য উপদেশদাতা কেন? বিষয়টি আরও বিশদে বোঝালেন বশিষ্ঠ। আমি তোমার পিতার এবং তোমার দুজনেরই আচার্য। তাই, তুমি আমার কথা মান্য করলে তোমার সৎগতি ব্যাহত হবে না। স তেঽহং পিতুরাচার্য্যস্তব চৈব পরন্তপ। মম ত্বং বচনং কুর্ব্বন্ নাতিবর্ত্তে সতাং গতিম্।।

এই রাজপরিষৎ, জ্ঞাতিগণ, অধীনস্থ রাজবৃন্দ, এদের মধ্যে অবস্থানকালীন, রাম কখনও সজ্জনাশ্রিত ধর্মপথ হতে ভ্রষ্ট হবেন না। বশিষ্ঠ রামকে কর্তব্যবিষয়ে আরও অবহিত করলেন, বৃদ্ধা ধর্মশীলা মায়ের কথা অমান্য করা উচিত নয়। তাঁর আদেশ পালন করলে, রাম, সৎব্যক্তির যোগ্য পথ হতে বিচ্যুত হবেন না। ভরতের প্রার্থনা পূরণ করলে,সত্য যাঁর শক্তির উৎস, সেই রাম নিজে পথহারা হবেন না। নিকটে উপবিষ্ট রাজপুরোহিত বশিষ্ঠ এই সব মধুর বচন বলতে লাগলেন। রাম প্রত্যুত্তরে বললেন, পুত্রের প্রতি মাতাপিতা সর্বদা যথাসামর্থ্য দান, শয়ন, অঙ্গে তৈলমর্দন করে, প্রিয়সম্ভাষণে তাকে পরিণত করে তোলেন। পুত্রের প্রতি তাঁদের এই সব কর্তব্যের প্রতিদান সন্তানের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। বশিষ্ঠের প্রতি রামের সশ্রদ্ধ উক্তি, স হি রাজা দশরথঃ পিতা জনয়িতা মম। আজ্ঞাপয়ন্মাং যৎ তস্য ন তন্মিথ্যা ভবিষ্যতি।।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা

রাজা দশরথ আমার জন্মদাতা পিতা। তাঁর আদেশ মিথ্যা হবার নয়। রাম এই কথা বলামাত্র, বিশালবক্ষা ভরত বিষণ্ণমনে, নিকটস্থ সুমন্ত্রকে বললেন, হে সারথি, আঙিনাটি কুশঘাসের আস্তরণে ঢেকে দিন। ইহ তু স্থণ্ডিলে শীঘ্রং কুশানাস্তর স্বার্থে। আর্য রাম যতক্ষণ না প্রসন্ন হচ্ছেন, ততক্ষণ অনশনরত ভরত সেখানে কুশশয্যায় অবস্থান করবেন। যতক্ষণ না রাম তাঁর অনুরোধ স্বীকার করছেন ভরত ততক্ষণ অনাহারে, অন্ধকারে, ধনহীন ব্রাহ্মণের মতো রামের কক্ষের দ্বারদেশে শয়ন করবেন। নিরাহারো নিরালোকো ধনহীনো যথা দ্বিজঃ।শয়ে পুরস্তাচ্ছালায়াং যাবন্মাং প্রতিযাস্যতি।।

সুমন্ত্র রামের দিকে তাকিয়ে রইলেন দেখে, ব্যথিতমনে ভরত স্বয়ং কুশের আস্তরণ বিছিয়ে ভূমিতে পড়ে রইলেন। তখন মহাতেজস্বী শ্রেষ্ঠ রাজর্ষি রাম, ভরতকে বললেন,আমি কী করেছি যে, তুমি মৃত্যুকামনায় উপবেশন করেছ? কিং মাং ভরত কুর্ব্বাণং তাত প্রত্যুপবেক্ষ্যসে। ব্রাহ্মণ, মানুষদের পথটি, একপাশে রুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু ক্ষত্রিয়দের প্রায়োপবেশনের (মৃত্যুকামনায় উপবেশনের) বিধি নেই। ভরতের প্রতি রামের আর্তি, হে রঘুবংশীয় নরোত্তম,উঠে দাঁড়াও, এই কঠোর ব্রত পরিত্যাগ করে, সত্বর অযোধ্যাপুরীতে ফিরে যাও। উত্তিষ্ঠ নরশার্দ্দূল হিত্বৈতদ্দারুণং ব্রতম্। পুরবর্য্যামিতঃ ক্ষিপ্রমযোধ্যাং যাহি রাঘব।।

ভরত সেখানে বসে রইলেন। চারিদিকে নিরীক্ষণ করে, তিনি সমবেত পৌরজনপদবাসীদের উদ্দেশ্যে বললেন, কিমার্য্যং নানুশাসথ। কেন তাঁরা আর্য রামকে মিনতি করছেন না? পুরজনপদবাসিগণ মহাত্মা ভরতকে বললেন, কাকুৎস্থ রামকে তাঁরা জানেন, রাঘব রাম উচিত কথাই বলেছেন। এই মহান রাম, পিতার বচনে আস্থাশীল। তাঁকে সহসা ফেরানো সম্ভব নয়। তাঁদের বচনের গভীরতা অনুভব করে রাম বললেন, ভরত, ধর্মদ্রষ্টা সুহৃদবর্গের কথার গুরুত্ব অনুধাবন করুন। উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে যাথার্থ্য বিবেচনা করুন। মহাবীর ভরত উঠে দাঁড়ান। একযোগে রামকে স্পর্শ করুন ও জলও স্পর্শ করুন। অতঃপর জল স্পর্শ করলেন ভরত। পারিষদবর্গ, মন্ত্রী ও বণিকশ্রেণিদের সম্বোধন করে ভরত বলিষ্ঠকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ন যাচে পিতরং রাজ্যং নানুশাসামি মাতরম্। আর্য্যং পরমধর্মজ্ঞং নানুজানামি রাঘবম্।। যদি ত্ববশ্যং বস্তব্যং কর্ত্তব্যঞ্চ পিতুর্বচঃ। অহমেব নিবৎস্যামি চতুর্দ্দশ বনে সমাঃ।।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২০: একেজি কলিং

আমি পৈত্রিক রাজ্য প্রার্থনা করি না, জননীকে মিনতিও করিনি। আর্য পরমধার্মিক রামকে (এই বনবাসবিষয়ে) আমি আর অনুরোধ করছি না। পিতার বচনরক্ষা করা কর্তব্য, বনে অবশ্যই বাস করা উচিত। তাই আমিও চতুর্দশ বছর বনে বাস করব। ধর্মাত্মা রাম, ভাইয়ের সত্যভাষণে বিস্মিত হয়ে পৌর ও জানপদবাসীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন, পিতার জীবদ্দশায় পিতা যা কিছু বিক্রয়, দান ও ক্রয় করেছেন, সেগুলি রাম বা ভরত কেউই নাশ করতে পারেন না। নিন্দিত হয়ে ও অপবাদের বোঝা বয়ে রাম এই বনবাস প্রত্যাহার করতে পারেন না। রামের মতে,দেবী কৈকেয়ী যুক্তিযুক্ত কথাই বলেছেন, পিতাও সঠিক কাজ করেছেন। ক্ষমাশীল ও গুরুজনদের প্রতি সেবাপরায়ণ ভরতকে রাম জানেন। সত্যপ্রতিজ্ঞ সেই মহানুভব ভরতের মধ্যেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। গভীর বিশ্বাসে রাম বললেন,অরণ্য থেকে ফিরে এসে, তিনি আবার এই ধার্মিক ভাইয়ের সঙ্গসহ পৃথিবীর অধীশ্বর হবেন।

রাজপুরোহিত বশিষ্ঠর পৃথিবীর সৃষ্টিবিষয়ক কাহিনি এবং সেই প্রসঙ্গে সূর্যবংশের উৎপত্তির বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন। তিনি সূর্যসম্ভূত বংশের রাজাদের ক্রমিক নামের বিবরণও দিয়েছেন। বংশের জ্যেষ্ঠপুত্রের সিংহাসনের উত্তরাধিকারবিষয়ে রামকে অবহিতকরা, ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। পুরোহিত বশিষ্ঠকৃত প্রসঙ্গক্রমে ইক্ষ্বাকুকুলের রাজাদের নাম ও তাঁদের পরম্পরা বর্ণনা যেটি কাব্যের আঙ্গিকে তথ্য পরিবেশনার অনন্য একটি ধারা বলা যেতে পারে। অতীতে, সনাতন রাজকীয় পরিমণ্ডলে শুধুমাত্র জ্যেষ্ঠ পুত্র সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়ে রাজপদের প্রকৃত যোগ্যতা অর্জন করেছেন, যদিও পিতার ইচ্ছায় পুত্র সিংহাসন হারিয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়। রাজা সগরের পুত্র অসমঞ্জ স্বকৃত পাপের শাস্তি ভোগ করেছিলেন,তিনি রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হয়েছিলেন। উত্তরাধিকারের যোগ্যতা অর্জন করতে হয় শুধু জন্মসূত্রেই অধিকার লাভ করা যায় না। সেই যোগ্যতার মান হয়তো উত্তীর্ণ হয়েছিলেন অবিসংবাদী রাম। তাই রাজপুরোহিত, মন্ত্রী, পুরজনপদবাসী, রাজপরিষদের সকলে মিলিত হয়ে তাঁকে রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করতে আগ্রহী হয়েছেন। রাজপুরোহিতের মতে। একজন ব্যক্তির জীবনে পিতা,মাতা ও আচার্যের গুরুত্ব সমধিক। পিতা, মাতা ও আচার্যদেবের কথার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। পুত্রের জীবনে মাতাপিতার ভূমিকার কোন বিকল্প নেই। সন্তানের মঙ্গলার্থে তাঁদের অবদান অবশ্যস্বীকার্য এবং এই প্রতিদানহীন উপকার স্বতঃস্ফূর্ত, স্বতোৎসারিত, অনন্য অতুলনীয়, এই বাৎসল্যরসের প্রকাশ।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাম পিতৃসত্যরক্ষার মাধ্যমে পিতার স্নেহের প্রতিদান দিতে প্রয়াসী হয়েছেন। ভরত কী পিতার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়েছেন? না। ভরত, পিতার অসঙ্গত, অযৌক্তিক আদেশের বিরুদ্ধে নিজের অজ্ঞাতসারেই এক মানসযুদ্ধ শুরু করেছেন হয়তো।রাম রাজা দশরথপ্রদত্ত সত্যরক্ষার আদর্শে বিশ্বাসী, ভরতের বিরোধিতা রামের সত্যপরায়ণতার বিরুদ্ধে। তিনি পিতৃসত্যপালনে চতুর্দশ বৎসর বনবাস যাপনের অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন। তাঁর একটাই দাবি—সিংহাসনের পরম্পরাগত ঐতিহ্যের মান্যতা দান করে,জ্যেষ্ঠ রামকে রাজ্যাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। বশিষ্ঠকথিত রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্ণয়ের যে পরম্পরা, ভরত সেই ঐতিহ্য বজায় রাখতে ইচ্ছুক, রামের কাছে পিতার সত্যরক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। পরম্পরাগত ঐতিহ্যের ধারা ও সত্যরক্ষার সংঘাতে হয়তো সত্যের দিকে পাল্লাটা একটু বেশিই ভারী। কারণ, সত্য চিরন্তন কিন্তু পরম্পরাগত রীতি পরিবর্তনশীল। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ধ্যান, ধারণা, মানসিকতা পরিবর্তিত হয়, সত্য কিন্তু অমূল্য, অবিসংবাদী। সত্যের ভিত ধৈর্য্যের ওপরে প্রতিষ্ঠিত। সত্যকে সার্বজনীন, বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্যতায় পৌঁছতে হলে অনেকক্ষেত্রে অপেক্ষা, অধ্যবসায় ও সহিষ্ণুতা, ত্যাগস্বীকার প্রয়োজন। রাম এই শর্তগুলি পূর্ণ করেছিলেন। ন্যায়বিচারের ভিত্তি মূল্যবোধ, ধার্মিকতা, ব্যক্তিবিশেষের দৃষ্টিভঙ্গী ও বিচারবুদ্ধির ওপরে নির্ভরশীল, যেগুলির সবটাই আপেক্ষিক, চিরন্তন নয়।ভরত সত্যকে অস্বীকার করেননি, তাঁর মূল্যবোধ, তিতিক্ষা,ধর্মবোধ, রাজ্যাধিকারে বঞ্চিত জ্যেষ্ঠকে রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়ার প্রেরণা হয়েছে। সত্যের সঙ্গে ভরতের বিরোধ নেই কোনও, আছে আপোষ। রাম নির্দ্বিধায় সত্যকে মেনে নিয়েছেন। সত্যর চিরন্তন রূপটি রামের নিঃশর্ত, আপোষহীন সত্যনিষ্ঠতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।

রাম ও ভরত, এক প্রজন্মের দু’জন, যথাক্রমে সত্য ও ন্যায়ের ধ্বজাধারী। তাঁদের জীবনাদর্শ কী আজও ভারতবাসীর জীবনের পাথেয় হতে পারে? —চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content