মঙ্গলবার ৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

আজ জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। এদিন মূর্তি রথে চড়েন। পথ দিয়ে রথ টেনে নিয়ে যায় ভক্তের দল। কবি বলেছেন, ওই মূর্তি কিংবা রথ অথবা পথটাই নাকি নিজেকে দেবতা ভেবে খানিক আত্মতুষ্টি পায়, অন্তর্যামী আড়াল থেকে হাসেন। দেবতা এদিন রথে নাকি অগণিত ভক্তকুলের মাঝে নাকি এসব থেকে নিরাপদ দূরে অন্তরতর হয়ে থাকেন বলা কঠিন, তবে রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, তার একটি সাংস্কৃতিক রূপ আছে, তার নেপথ্যে আছে দার্শনিক তাত্পর্য ও তাত্ত্বিক পরিসর, কেবল দেবতার আরাধনাতেই তার শেষ নয়, দেবতাও এখানে ততটা প্রকট নন, যতটা তাঁর রথ।

মানুষ সভ্যতার উষাকালে চাকা তৈরি করে ফেলেছিল। চাকা এমন একটা কিছু, যাকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও দর্শন আবর্তিত হচ্ছে। চাকা মানে গতি, চাকা মানে পরিবর্তন, চাকা গণিত থেকে শিল্পের তত্ত্বে ও প্রয়োগে, চাকা কালের আবর্তনে, সূর্যের রূপে, বৈশিষ্ট্যে, গতিতে। একটা বৃত্তাকার রেখা যখন সাকার হয় তখন তাকে চাকা বলে। এই চক্রে ভর করে চলে গাড়ি, শকট। রাজা কিংবা দেবতার শকট হল রথ। রথযাত্রা আসলে নাকি সূর্যের বার্ষিক গতির রূপায়ণের সামাজিক উদযাপন। বলা হয়ে থাকে, মানুষের দেহটাই নাকি একটা রথের মতো, তাকে টেনে নিয়ে চলতে নানা উপাদান হল ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, মন ইত্যাদি আর সবকিছু। অন্তরাত্মা সেই রথের দেবতা, প্রাণের অধীশ্বর অন্তর্যামীর জীবাত্মা হয়ে পার্থিব লীলার সফল অনুষ্ঠান ঘটে নানা দৈহিক জৈবিক কায়িক বৌদ্ধিক ক্রিয়ায়। দেহের জন্য, জীবনের জন্য যেমন চরৈবেতির মন্ত্র, তেমন রথের জন্য ওই যাত্রাটাই প্রকৃত, রথযাত্রা তাই যুগে যুগে ভারতীয়, লৌকিক জীবনযাত্রায়, লোকজীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে।
বছরের অন্য সময় রথগুলি শহরে নগরে জেলায় মফঃস্বলে ঠায় দাঁড়িয়ে এই দিনগুলোর অপেক্ষা করে। রথযাত্রায় পুণ্যক্ষণে রথের রশিতে টান পড়ে, গড়গড়িয়ে চলে যায় আরেক জায়গায়, দিনসাতেক সেখানে থেকে পুনর্যাত্রায় উল্টোরথের আবার ফিরে আসা। এই যাওয়া আসাটা এখন প্রায় প্রতীকী। রথ ব্যাপারটাই তো প্রতীক, তাই রথ কতটা চলল সেটার থেকে বড় ব্যাপার হল উদযাপন। সেই উদযাপন হল রথের মেলা। এমনকী রথ না থাকলেও রথের মেলা বসে, কিন্তু রথ আছে মেলা নেই এটা ভাবাই যায় না যেন। রথযাত্রায় তাই রথের মেলাটাই মূল আকর্ষণ। সেই উপলক্ষ্যে রথ দেখাটাও হয়ে যায়, কথায় বলে, রথ দেখা কলা বেচা, আর কোনও ধর্মীয় যাপনে স্নিগ্ধ মাটির গন্ধে এত রং মিশে যায় না বুঝি!

এই রঙটা আসলে ছোটবেলার, শৈশবের। কড়ায় গণ্ডায় মানা নিয়ম নয়, বরং এক বন্ধহীন ছন্দ রথের দিনের বিকেল গুলোয় জেগে ওঠে। গতির উত্সবে চাকা গড়ায়। হিসেবি চলন নয়, হিসাবহীন খেয়ালখুশির পাতার বাঁশির সুরটাই রথযাত্রার প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে। আবালবৃদ্ধবনিতার একটু রথকে ছুঁয়ে দেখার, প্রদক্ষিণ করার আকাঙ্ক্ষার আসা যাওয়ার পথের ধারে জগন্নাথের পুজোর ডালা নিয়ে পশরা সেজে ওঠে “চিনি কলা চিনি কলা”… শাস্ত্র বলেন, মোক্ষের পথ ক্ষুরধার দুর্গম। দুপুরের পর ভারি একপশলা বৃষ্টি হয়েছে, জগন্নাথ জগতে পদার্পণ করেছেন বুঝি। রথ দেখার পথ হয়ে উঠবে পিচ্ছিল, কাদামাখা, সেখানে দর্শনার্থী ভক্তরা ঠেলাঠেলি করে রথ দেখবেন, খুদে ভল্যান্টিয়ার তর্জন করবে, তাকে কলা দেখিয়ে রথ দেখার শেষে কলা বাতাসার প্রসাদ নিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসে মেলায় ঢুকবেন আপনি, আপনার শৈশবের সবটুকু সত্তা নিয়ে।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৯: মাংস জাতক— বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২১: মহারাজ অফ শান্তিনিকেতন

দেখবেন, ছোট, বড়, মেজ, সেজ নানা আকারের রথ নিয়ে ছোটরা যাচ্ছে আসছে। ওইগুলো আসলে ওদের অন্তর্লোক। সারাদিন সাজানোর পরে ঠাকুরদের ঠায় বসিয়ে ছোট্ট ছোট্ট থালা গ্লাসে আপ্যায়িত করে একেকটা ভেঞ্চার চলে পথ জুড়ে। প্রসাদী নকুলদানা নিলে দক্ষিণাটুকু দিয়ে দিলেই আপনার ছুটি। একটা রঙবেরঙের দড়ি, সামনে আটকে থাকা একটা ছুটন্ত ঘোড়া, ছুটন্ত রথে ভিতরে কম্পমান অমিতবিত্ত ঈশ্বর, সামনে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে পৌঁছে যাওয়ার আনন্দে মশগুল ছুটন্ত স্বপ্নগুলো… এই হল রথযাত্রা। আপনি ভক্ত হলে রথ আর রথের মেলা যতটা আপনার, যিনি অবিশ্বাসী, মেলা ততটাই তাঁর-ও।

আপনার পথের দুপাশে সারি সারি দোকান। পাঁপড়ভাজা কিংবা জিলিপি পার হয়ে বেগুনি ফুলুরির স্তুপের পাশ দিয়ে জলের গামলায় ছুটতে থাকা স্পিডবোটকে বামে রেখে, বেলুন আর তালপাতার সেপাইয়ের পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে ভিড়ে ঠেলে ঠেলে কাঠের সরঞ্জাম, মাটির খেলনাবাটি, মাটির পুতুল, লাল নীল সবুজ রথের সারি, ঢোল, একতারা, মাটির বেহালার পার হয়ে হয়ে আপনি কোথায় পৌঁছবেন? ঘুঘনি, চটপটি ফুচকা রোল চাউয়ের জগতের পাশেই বেল, চাঁপা, টগর, আম জামের সবুজ চারা, ছোট বট, রঙিন দোপাটির পাশেই জলসত্র, সঙ্গে বাতাসা। ওপাশে সার সার কটকটি, জিবেগজা, বাদাম ভাজার ফাঁকেই কোয়ালিটি আইসক্রিম, পাশে ঘোড়ার ঘূর্ণি রাইড। এসব পার হলেই ভুট্টা পোড়ানোর ধোঁয়া জিলিপির সুগন্ধে মিশলো একটু আগেই। একটু আগেই একটা ছেলে হলুদ গাড়িটার জন্য বায়না করতে গিয়ে চড় খেয়েছে, এখন সে সবুজ গোলাপি বাঁশিটা পেয়ে বেশ খুশি। সবটা দেখে কাঠবুড়োর মতো লোকটা স্প্রিঙের মাথাটা নেড়ে নেড়ে রহস্যের হাসি হাসছে, হাসছেন অন্তর্যামীও।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৫: গাঙচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

বঙ্কিমের রাধারাণীর মতো মেয়েটার হরিণচোখ মাটির হরিণের মাথাটায় আটকে গিয়েছিল, তার মা পাশেই একটা চটের ব্যাগ নেড়েচেড়ে দেখছিল, এখন মেয়েটা আর মাকে দেখতে পাচ্ছে না, তার হতভম্ব ছলছলে চোখ এদিক ওদিক ছুটছে, মাইকে ভেসে আসছে কীর্তনের সুর-মাখা কোনও এক নিরুদ্দিষ্টের ঘোষণা, যা নেবে কুড়ি টাকার দোকানে রুমালটা আঁকড়ে ধরে এক মা সবেমাত্র খেয়াল করেছে মেয়েটা পাশে নেই, কারা যেন পকেটমার ধরেছে, খুব হই-চই, বেহালার একটা তার থেকে ককিয়ে ককিয়ে উঠছে “বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িতে গেলাম দেখা পাইলাম না”, কাঠের নাগরদোলাটার জায়গায় ইদানিং ইলেকট্রিক রাইড লেগেছে, আকাশটা যেন ঘনিয়ে আসছে মনে হয়, একটা ঠাণ্ডা হাওয়া এইমাত্র জামরুলের পাতাগুলো দুলিয়ে দিয়ে খিচুড়ির লাইনটা পাশ কাটিয়ে ফিসফ্রাইয়ের গন্ধ মেখে লাল নীল মিষ্টি জলের দোকানটার দিকে ছুটে গেল।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা

বিকালের জমে ওঠা সূচ্যগ্র মেদিনী না ছাড়ার যুদ্ধ ভুলে আইসক্রিম-দাদা এখন পাশের খেলনাকাকুর সঙ্গে খুনসুটি করছে, মা মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে “এত ক্যাবলা হলে চলে না, মেলায় হারিয়ে গেলে কী হতো” বলতে বলতে এক্ষুণি ওই রিকশাস্ট্যাণ্ডের দিকে চলে গেল। ওই ছেলেটা মোবাইল তাক করে জিলিপির ছবি তুলছে, ওই মেয়েটা এক্ষুণি স্ট্যাটাস দিল “ফিলিং হ্যাপি অ্যাট চ্যারিয়ট ফেস্টিভ্যাল”, ওই দাদু নাতি-নাতনির হাতে তুলে দিচ্ছে খেলার ব্যাট নাকি উত্তরাধিকারের ব্যাটন, ওই দিদিমা, বাবা, মায়েরা হাতে জিলিপি পাঁপড়, মাটির টব, হাওয়া-ঠাসা বল নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। ঝুমঝুমির পাশেই দুলছে ভিডিও গেমস, ম্যাজিকের দোকানে অবাক চোখগুলোর সামনে একটু আগেই নীল রুমালটা লাল হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২০: একেজি কলিং

সেই হাওয়াটা দুষ্টু কোকিলের মতো মেলার এদিক ওদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে, লাল ভুলো রথের লাইনে ছোট্ট পাপাইয়ের পাশেই ঠেলাঠেলি করছে এগোবে বলে, চিনি কলা ফুরিয়ে এলো, বোটটা এখনও ঘুরছে, নতুন করে বেগুনি ছাঁকা তেলে ছাড়া হল, জিলিপির নতুন ব্যাচ থালায় নামতে না নামতেই মিলিয়ে যাচ্ছে যেন, জেনারেটরের আওয়াজটা আর একঘেয়ে লাগছে না, ঢোলের টরে টরে টক টক আওয়াজের সঙ্গে বেশ মিশে গেছে যেন, আলুর দম শেষের দিকে, পাশে সেদ্ধ ডিমগুলো হাসছে, কে যেন আরেকটু টক দিতে বলল, কেউ বললো ঝাল কম, কাপ প্লেট আর প্লাস্টিকের ঝুড়িগুলোর ফাঁকে সদ্য ঝরে পড়া বৃষ্টির জল চিকচিক করছে, সেই হাওয়াটা একটু আগেই কদমফুলের সুবাস মেখে জিলিপির থালায় আছড়ে পড়েছে, ল্যাণ্ডফল।

মেলায় লোকজন কমছে, একটা মিহি পলিথিন ওপরের তারে আটকে গিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে এইমাত্র হাল ছেড়েছে, তাকে পাশ কাটিয়ে লাল গ্যাসবেলুনটা উড়ে যাচ্ছে ওপরের আকাশটার দিকে, একটু বিদ্যুৎ চমকাল যেন, অন্তর্যামী হাসছেন, সকালের ধুলোপথ এখন সজল হয়ে মিলিয়ে গেছে পায়ের তালে তালে, রথ এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজে নতুন রঙে ঝকঝকে, মূর্তি অজস্র কলা আর রজনীগন্ধার ওপারে স্থানু, হাওয়াটা এখন আড়বাঁশির সুর হয়ে রথের মেলার ওপরে ভাসছে, স্থির হয়ে। তার গায়ে রথের লাল গোলাপি রং ধরেছে জুঁইফুলের মন্দমধুর গন্ধ মেখে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content