রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

সমাপ্তি ছবির একটি দৃশ্য।

পাত্র এসেছে মেয়ে দেখতে। মেয়ে তার পছন্দ নয়, তবুও। গদগদ মেয়ের বাবা, সতৃষ্ণ চোখের সামনে মিষ্টির থালা ইত্যাদি প্রভৃতি অস্বস্তি কাটিয়ে মেয়ের পড়াশোনা কাজকর্মের নমুনা দেখাশোনার পর… গান হবে, কোন গান? কেন, রাজপুরীতে বাজায় বাঁশি। বাঁশি বাজার আগেই জানলা দিয়ে কী যেন ঘরে ঠিকরে পড়ে। মেয়ের পিছনে আঙুলের খোঁচা দিতে থাকা পিসিমা বা ঠাকুমা, চারপাশে জমে থাকা ভাই বোনের স্তূপ পার হয়ে বাইরে থেকে কুজ্ঝটিকার মতো এক মানসসুন্দরী এক লহমায় ঢুকে পড়ে খাটের তলায় সেঁধিয়ে যায়, সেখান থেকে বের করে আনে তার আকাঙ্ক্ষিত ‘চরকিকে’, ছোট জীবটিকে মুঠোবন্দি করে নিয়ে যাওয়ার সময় পাত্রীর নাকে ঘষে দিয়ে যায়। বাকি ঘটনা সিনেমাতেই দেখা যায়, ছবির নাম ‘সমাপ্তি’, রবীন্দ্রজন্ম-শতবর্ষে সত্যজিৎ রায়ের তিনকন্যার অন্যতম।

আজ চোখ থাকুক ওই চরকির দিকে। ওই ‘মানসসুন্দরী’ মৃন্ময়ীর পোষ্য কাঠবিড়ালী চরকিকে দেখা গেল বেশ ক’বার।

মৃন্ময়ীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে বাস। তার দারিদ্রক্লিষ্ট তেজি মা ‘পাড়াবেড়ানি’ মেয়ের নাম ধরে হাঁক পাড়ে। মৃন্ময়ী তখন খাঁচার মধ্যের চরকিটির সঙ্গে খুনসুটি করে, জল-খাবার দেয়।
মৃন্ময়ীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। নববধূর বেশে সকলকে লুকিয়ে রাতের বেলায় নদীর তীরে তার প্রমোদভূমিটিতে দোলনায় দুলে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই রথতলায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রথ, রথের কোন্ কোণটিতে পিঞ্জরগত চরকি, বটগাছের শাখা থেকে লম্বমান দোলনা, রাত্রির অপার্থিব মায়া, আলো আঁধারিতে সাজানো রহস্যময়ী ধরিত্রীর বুকে নিদ্রিত মৃন্ময়ীর মধ্যে জেগে থাকা মুক্ত প্রকৃতির ব্যঞ্জনাঘন দৃশ্যকাব্যের পরেও চরকিকে ভুলতে পারবেন না রসজ্ঞ দর্শক। ভুলবেন না রথের অনুষঙ্গটি।

শাশুড়ি পুত্রবধূর এবম্বিধ কীর্তিতে রুষ্ট হন। তাকে আটকে রাখেন। মৃন্ময়ী যা পায় হাতের কাছে, টোপর, ফুলদানি, বইপত্র ছুড়ে ভেঙে তছনছ করে। এই ভাঙচুরটাও খেয়াল রাখার।

তার বর বাবু অপূর্বকৃষ্ণ রায় অভিমানে কলকাতা চলে গেছে। মৃন্ময়ীকে রেখে গিয়েছে তার মায়ের কাছে। বলে গিয়েছে চিঠি লিখে ডাকলে সে চলে আসবে, চিঠিতে ‘আপনি’র বদলে ‘তুমি’ লিখলে সে সবিশেষ প্রীত হবে। সে মৃন্ময়ীর মধ্যের বিরাট শিশুর ছেলেমানুষীটাকে ছুঁতে পেরেছে ততক্ষণে।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

মুভি রিভিউ: সত্যিই তো, সবার নিজের নিজের মতো করে সবটাই নর্মাল

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না

পরের দৃশ্যটিতেই বন্ধনজর্জর চরকির উত্তেজিত ডাকাডাকি, খাঁচার মধ্যে সে আলোড়ন তোলে রথতলার রথের নিভৃত কোণটিতে।

মৃন্ময়ী শুয়ে আছে। দর্শক তাকেই শুধু পর্দায় দেখতে পান, আধো অন্ধকার মুখ, সাদা-কালো ডুরে শাড়ি, দৃশ্য জুড়ে কালো ছায়ান্ধকার, খেলার সাথীরা ডেকে ডেকে ফিরে যায়, মা বিশ্রী সুরে তর্জন করেন, তাদের ঝাপসা আসা যাওয়াটুকুই দৃশ্যমান, ক্যামেরার লেন্সের অভিমুখ মৃন্ময়ীর মুখের দিকে, মৃন্ময়ীর শয্যা ভূমিতলে, তাই পিছনের আবছা দরজার পথে আসা যাওয়াগুলোই দেখা যায়। আলো নিবে আসে যেন, রাতের অন্ধকারে বেশ ক’দিনের উপোসী মেয়ের কাছে ঘনিয়ে এসে মা আকুতি উজাড় করে দেন, অন্ধকার আরো আরো যেন তীব্র হয়, দু’জনের অশ্রুধারায় সিক্ত হয় রাত।

পরদিন সকাল। মৃন্ময়ী এখন একইভাবে শুয়ে, পরণে লালপেড়ে সাদা শাড়ি। মুখ প্রসন্ন, উজ্জ্বল, জানালার পথে আসা আলো তাকে আরও উজ্জ্বলতর করেছে। মৃন্ময়ীর ঠোঁটে জেগে আছে দুষ্টুমিভরা রহস্যের হাসি। পিছনের দরজা পথে তার খেলার বালক সঙ্গীটি আসে স্খলিত পদক্ষেপে, জানায় জল-খাবারের অভাবে চরকি মরে গেছে। প্রমাণস্বরূপ মৃত জীবটির ঝুলতে থাকা দেহটি দেখায়। মৃন্ময়ীর মুখের হাসি ম্লান বেদনার্ত হয়ে মিলিয়ে যায়, কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পরে ক্লিষ্ট বিষণ্ন মুখে তাকে ঘাটে পুড়িয়ে দিতে বলে, সে যাবে না। বালকটি স্খলিত দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে চলে যায়। মৃন্ময়ীর মুখে এক অনুপম হাসি ফুটে উঠল। সে একবার চোখদুটি বুজেই খুলে ফেলে, দৃষ্টি সামনে বাইরের দিকে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২২: মহর্ষির নির্দেশে ঘণ্টা বাজত জোড়াসাঁকোয়

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি

সেই রবীন্দ্রকবিতাটি বুঝি মনে পড়ে, “আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি। সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ।” সেই গ্রামের নাম খঞ্জনা, সেই নদীর নাম অঞ্জনা, আর সেই ‘তাহার’ নামটি রঞ্জনা। বাবু অপূর্বকৃষ্ণ তাকে চিনেছিল বুঝি।

এই পুরো অংশটিতে লক্ষণীয় হল রথ ও চরকির অনুষঙ্গ। রথ বহমান জীবনের প্রতীক। যুবতী মৃন্ময়ীর শিশু-কিশোর সঙ্গীদের নিয়ে বাল্যপ্রমোদের স্থানটি হল নদীতীরের রথতলা। রথটি যেন গ্রামবাংলার জীবন ও সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে ঘিরে জেগে থাকা প্রাণের মেলায় নেতৃত্ব দেয় মৃন্ময়ী, মাটির কন্যা। সে স্বয়ং ধরিত্রীদেবী যেন। তার উচ্ছল বেগ ব্যাহত হয় আকস্মিক বৈবাহিক বন্ধনে। এ যেন নদীর বুকে বাঁধ।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২০: সত্য ও ন্যায় পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, তবে? ঔজ্জ্বল্য বেশি কার?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২১: খেলা শুরুর প্রস্তুতি

চরকির আবাস ওই রথে। রথটি যদি হঠাৎ থেমে যাওয়া জীবনবেগ আর বহমান জগত্-সংসারের রূপকল্পটিকে জাগিয়ে তুলতে চায়, তাহলে চরকি ওই মৃন্ময়ীর রূপক, সে বন্য জীব, কিন্তু প্রকৃতির রূপ হয়েও বদ্ধ, জীবন-সংসার-সমাজ-নিয়মের খাঁচায় বন্দি। তবে কি মহাসমারোহে না আসা গোপনচারী প্রেমের উদ্ভাস তাকে মুক্তি দেবে?

চরকি মরে যায়। তার এই মরে যাওয়াটা ভবিতব্য ছিল। চরকি না মরে গেলে মৃন্ময়ীর স্বাতন্ত্র্য জাগতো না। অনন্তবন্ধনমাঝে মহানন্দময় মুক্তিকে যিনি যাপন করতে চান, তাঁর জন্মের শতবর্ষে এমন শ্রদ্ধার্ঘ্যই তাঁর মাথার মুকুট। চরকির মৃত্যু সংবাদে মৃন্ময়ীর মুখে শোকোত্তীর্ণ এক অপূর্ব হাসি জেগে ওঠে, তার পূর্ব সত্তাটির বিনাশ ঘটে তখন নবরূপে জেগে উঠছে নতুন মানুষ। মানুষের জীবনে এই স্বাভাবিক উত্তরণটি না এলে বুঝি জীবনদেবতার অবমাননা হয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৩: দুর্জনের সম্মান, সাধুর জন্য ফাঁদ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৬: বাজ

মৃন্ময়ী যে দুটি সত্তায় বিভাজিত, প্রথম থেকে দ্বিতীয়টিতে উত্তরণের পথ কি মসৃণ? না তো, বরং সংঘর্ষসঙ্কুল, দ্বন্দ্বদীর্ণ। এই দ্বন্দ্বের অনেকটাই নিজের সঙ্গে নিজের। এই পথের শেষে একরকম আত্মজাগরণ, আত্ম-উন্মোচন। বন্ধ ঘরে ভাঙচুরের দৃশ্যটি মনে পড়ে? এ যেন স্তরে স্তরে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে জেগে ওঠা। আর সেই জাগরণের পর চরকির সত্তাটি আর বাঁচে না, মুক্ত জীবনানন্দের নির্বাধ গতির মধ্যেও কোথাও একটা অসমাপ্তি থাকে, তাই মৃত চরকি আগুনে লুপ্ত হয়, নব আনন্দে জেগে ওঠার মধ্য দিয়ে আসে অনিঃশেষ সমাপ্তি।
কলকাতায় বৃষ্টি

সত্যজিৎ রায়।

সমাপ্তি তিনকন্যার তৃতীয় তথা চূড়ান্ত কাহিনি। এই ক্রমান্বয় যদি পরিচালকের বার্তা হয় তবে এই তৃতীয় কন্যার আত্মজাগরণটিই হয়তো বা তাঁর অভিপ্রেত। রতন বা মণিমালিকার জীবনবোধের পরেও মৃন্ময়ীর উত্তরণের ক্ষেত্রটিকে দেখা যায়। রবীন্দ্র-সমকাল ও স্বাধীনতার পরবর্তী কালে রবীন্দ্রচেতনা ও ভারতবর্ষের শাশ্বত নারীসত্তার তাৎপর্যপূর্ণ মূল্যায়ন হয়ে থাকবে তিনকন্যা। দেশ ও বিশ্ব থেমে থাকে না ওই চির গতির প্রতীক রথের মতো, তার বুকে জেগে থাকা, মরে যাওয়া ও নবরূপে আত্মপ্রকাশের চরকিগুলি থেকে স্বেচ্ছাধীন অগ্নিস্ফূরণ কখনও কখনও ক্রমে ক্রমে আলো হয়ে ফুটে ওঠে। এই চলচ্চিত্র হতে পারে নারীর জীবনভাষ্য, হতেও পারে নারীমুক্তির ভাষ্য, হয়তো বুঝতে চায় জীবন ও মুক্তির নানা সংজ্ঞাকে, কিন্তু ওই রথ আর চরকির অনুষঙ্গ বৃহত্তর পরিসরে মানবীয় জীবনবোধকে এক নবতর দ্যোতনা দেয়, উন্নীত করে এক নতুন আনন্দলোকে। এই সমাপ্তি এক নতুন সূচনা তাই।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content