
জয় বাবা ফেলুনাথ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৯-র গোড়ায়।
রুকু, ভালো নাম রুক্মিণীকুমার ঘোষাল। লাল হাফ প্যান্ট, সঙ্গে চেক চেক ফুলস্লিভ শার্ট। তাকে প্রথম দেখা যাবে ঘোষালবাড়ির ছাদের কার্ণিসে দাঁড়িয়ে বন্দুক তাক করে ফায়ার করতে। এখন সে আমাদের সামনে, মুখে চিউয়িংগাম, ছাদের আধ-খোলা আধা-বন্ধ দরজার একটি আংশিক ভাঙা পাল্লার ফ্রেমের এপারে চিত্রবত্ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে ফেলু, তোপসে, জটায়ু। কাশীর ঘোষালবাড়ির প্রশস্ত ছাদের একটি অংশে সিঁড়ি ভেঙে নেমে মোড় ঘুরে ক্যাপ্টেন স্পার্কের ঘর, রুকুর অন্দরমহল। এখানে সোজা পথে পৌঁছনো যায় না, বাঁক ঘুরে, সিঁড়ি ভেঙে গভীরে প্রবেশ করতে হয়।
রুক্মিণীকুমার হলেন কৃষ্ণ-রুক্মিণীর পুত্র প্রদ্যুম্ন, ব্যূহবাদে স্বীকৃত অন্যতম যাদববীর। আমাদের সামনে যে রুকু দাঁড়িয়ে, তার দুটি সত্তা। পোষাকি আবরণে সে রুকু হলেও তার আড়ালে, অন্দরে সে ক্যাপ্টেন স্পার্ক। তার সেই অন্তর্জগতের দৃশ্যায়ন চলচ্চিত্রের ভাষায় কীরকম?
লালনের গানে দেহের প্রতীক হয়ে সাতমহলা হাওয়াঘরের, দুচাকার ওপরে চলা গাড়ির অনুষঙ্গ এসেছে। ওপরের সর্বোন্নত অংশটি শ্রেষ্ঠ, মানুষের মাথা, তার সম্বল হল মস্তিষ্ক। ফেলুদা প্রদোষচন্দ্র মিত্র বুদ্ধিজীবী, বলা ভালো মস্তিষ্কজীবী। হীরকের রাজা যে মগজ ধোলাই করেন, সেই মগজাস্ত্রে ভর করেই ফেলু কামাল করে। তার কাজটা ঠিক কি? সত্যসন্ধান, গোয়েন্দা সে। কিন্তু মামুলি চোর-পুলিশ-ডাকাত-বাবু খেলার পরেও ফেলুদার গল্প মনস্তাত্ত্বিক।
তাই ঘোষালবাড়িতে এসে ক্রমে ক্রমে বাড়ির মাথায়, ছাদে পৌঁছয় সে, যেখানে রহস্য কেন্দ্রীভূত হয়, জট পাকায়, খুলেও যায়। রুকুর খেলার ঘরটাতো সেখানেই। শুধু ঘর নয়, অন্তর্লোক। যেখানে হেঁয়ালি আছে, সাসপেন্স আছে, শৈশবটা বাঁধা পড়ে আছে, আছে ছোটবেলা জুড়ে ঘুরতে থাকা আবছায়া রহস্য, কল্পনা, ফ্যান্টাসি। এটাই সব পেয়েছির দেশ।
রুক্মিণীকুমার হলেন কৃষ্ণ-রুক্মিণীর পুত্র প্রদ্যুম্ন, ব্যূহবাদে স্বীকৃত অন্যতম যাদববীর। আমাদের সামনে যে রুকু দাঁড়িয়ে, তার দুটি সত্তা। পোষাকি আবরণে সে রুকু হলেও তার আড়ালে, অন্দরে সে ক্যাপ্টেন স্পার্ক। তার সেই অন্তর্জগতের দৃশ্যায়ন চলচ্চিত্রের ভাষায় কীরকম?
লালনের গানে দেহের প্রতীক হয়ে সাতমহলা হাওয়াঘরের, দুচাকার ওপরে চলা গাড়ির অনুষঙ্গ এসেছে। ওপরের সর্বোন্নত অংশটি শ্রেষ্ঠ, মানুষের মাথা, তার সম্বল হল মস্তিষ্ক। ফেলুদা প্রদোষচন্দ্র মিত্র বুদ্ধিজীবী, বলা ভালো মস্তিষ্কজীবী। হীরকের রাজা যে মগজ ধোলাই করেন, সেই মগজাস্ত্রে ভর করেই ফেলু কামাল করে। তার কাজটা ঠিক কি? সত্যসন্ধান, গোয়েন্দা সে। কিন্তু মামুলি চোর-পুলিশ-ডাকাত-বাবু খেলার পরেও ফেলুদার গল্প মনস্তাত্ত্বিক।
তাই ঘোষালবাড়িতে এসে ক্রমে ক্রমে বাড়ির মাথায়, ছাদে পৌঁছয় সে, যেখানে রহস্য কেন্দ্রীভূত হয়, জট পাকায়, খুলেও যায়। রুকুর খেলার ঘরটাতো সেখানেই। শুধু ঘর নয়, অন্তর্লোক। যেখানে হেঁয়ালি আছে, সাসপেন্স আছে, শৈশবটা বাঁধা পড়ে আছে, আছে ছোটবেলা জুড়ে ঘুরতে থাকা আবছায়া রহস্য, কল্পনা, ফ্যান্টাসি। এটাই সব পেয়েছির দেশ।
রহস্যটা ঠিক কি? প্রাচীন মহামূল্য গণেশমূর্তির অন্তর্ধান ও তার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। এর মধ্য দিয়েই আসে ভিলেন, চোরাচালান, ভদ্রবেশী অসত্ লোক, মনে চুরি থেকে কাজে চুরির বড়দের সংকীর্ণ কলুষিত দুনিয়া। কিন্তু রুকুর জগতের হিরো কিংবা ভিলেনের দুনিয়া নিষ্কলুষ ফ্যাণ্টাসির। ক্যাপ্টেন ফেলু, যার ডাক নাম প্রদোষচন্দ্র, সে ঢুকে পড়েছিল সেই রূপকথার জগতে, রহস্যরোমাঞ্চ গল্পের লেখক জটায়ু আর তরুণ তোপসেকে নিয়ে।
কিন্তু ক্যাপ্টেন স্পার্কের সহকারী ‘RAXIT’ কোথায়? “কবিরেব প্রজাপতি” হয়ে করালকুম্ভীরের স্রষ্টা জটায়ু ব্যখ্যা করে দেন চরিত্রের সাত-সতেরো। ক্ষুদিরাম রক্ষিত্ থেকে ‘RAXIT’, ডাকু গণ্ডারিয়া তাদের শত্রু। ক্যাপ্টেন স্পার্ক রুকু জানায়, গণেশটা আফ্রিকার রাজার কাছে আছে, সেটা উদ্ধার না করলে চলে যাবে জলের নিচে আটলাণ্টিসের কল্পলোকে। ক্যাপ্টেন স্পার্ক বোঝে, জানতে চায় ফেলুদা কি গোয়েন্দা? তাহলে তার অস্ত্র আছে? থাকলে কোথায়? কী অস্ত্র? তার ইলেকট্রিক হারপুন আছে? অন্যকিছু?
শৈশবের নানা জিজ্ঞাসার ভিড়ে রুকুর অন্তর্লোকটিকে দর্শক চিনতে থাকেন। সেটা আলো আলো, ছায়া ছায়া। ফেলুর সিরিয়াস অনুসন্ধান, অনুসন্ধিত্সা, সত্যসন্ধান এই ঘরে কোথাও যেন রুকুর অ্যাডভেঞ্চারনিষ্ঠ, মনে প্রাণে স্পার্ক কিংবা রূপকথা, অতিকথার নায়কের ঝলকে ওঠা শৌর্যের সঙ্গে মিলে যায়, মিশে যায় অনায়াসে। চলচ্চিত্রে ঘনিয়ে ওটা রহস্যটুকুর পাশে এই রহস্যমেদুর মনোজগত্টাও সমতুল আকর্ষণীয়, তার উদ্ঘাটন-ও ঘটে।
কিন্তু ক্যাপ্টেন স্পার্কের সহকারী ‘RAXIT’ কোথায়? “কবিরেব প্রজাপতি” হয়ে করালকুম্ভীরের স্রষ্টা জটায়ু ব্যখ্যা করে দেন চরিত্রের সাত-সতেরো। ক্ষুদিরাম রক্ষিত্ থেকে ‘RAXIT’, ডাকু গণ্ডারিয়া তাদের শত্রু। ক্যাপ্টেন স্পার্ক রুকু জানায়, গণেশটা আফ্রিকার রাজার কাছে আছে, সেটা উদ্ধার না করলে চলে যাবে জলের নিচে আটলাণ্টিসের কল্পলোকে। ক্যাপ্টেন স্পার্ক বোঝে, জানতে চায় ফেলুদা কি গোয়েন্দা? তাহলে তার অস্ত্র আছে? থাকলে কোথায়? কী অস্ত্র? তার ইলেকট্রিক হারপুন আছে? অন্যকিছু?
শৈশবের নানা জিজ্ঞাসার ভিড়ে রুকুর অন্তর্লোকটিকে দর্শক চিনতে থাকেন। সেটা আলো আলো, ছায়া ছায়া। ফেলুর সিরিয়াস অনুসন্ধান, অনুসন্ধিত্সা, সত্যসন্ধান এই ঘরে কোথাও যেন রুকুর অ্যাডভেঞ্চারনিষ্ঠ, মনে প্রাণে স্পার্ক কিংবা রূপকথা, অতিকথার নায়কের ঝলকে ওঠা শৌর্যের সঙ্গে মিলে যায়, মিশে যায় অনায়াসে। চলচ্চিত্রে ঘনিয়ে ওটা রহস্যটুকুর পাশে এই রহস্যমেদুর মনোজগত্টাও সমতুল আকর্ষণীয়, তার উদ্ঘাটন-ও ঘটে।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৫: সমাপ্তি: শেষ হয়ে হইল না শেষ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না
ছবিতে দেখা যাবে, ঘোষাল বাড়ির একতলায় বৈঠকখানার মধ্যে প্রবেশ করার পরে আরও ভিতরে বাড়ির চাতালে তৈরি হচ্ছে দুর্গাপ্রতিমা। দুর্গাপুজো আসন্ন। কাশীর প্রবাস, সেখানকার বাঙালি, দুর্গাপুজো, বনেদিয়ানা ও নস্ট্যালজিয়ার হাত ধরে একটা সাংস্কৃতিক পরিসর রহস্যের অংশ হয়ে ওঠে। যে অন্তর্লোকের সন্ধানে, অ্যাডভেঞ্চারে দর্শক বেরিয়েছেন, সেই রহস্যপুরীর ভিতরে তিলে তিলে অসুরনাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে। বাইরের অসুরের পাশাপাশি, বলাবাহুল্য, মনের অন্ধকারলোকের অ-সুরটাকেও প্রদোষকালের, গোধূলিবেলা পেরিয়ে দিনের আলো, রাতের আঁধার যখন মিলেমিশে একাকার, সেই সময়ে জেগে ওঠা চন্দ্রালোকে মুছে দেওয়ার প্রস্তুতি চলতে থাকে। অসুর জাগছে ভিতর ভিতর, বোধন হলে শক্তিরূপিণী দেবী তাকে বিনাশ করেন, ততক্ষণ কী হয় কী হয়ের একটা টানটান উত্তেজনা।
রুকু আর তার দাদু, ক্যাপ্টেন স্পার্ক আর ‘RAXIT’ মিলে যে রহস্যটি বুনেছিল, তা ফেলুদার মগজাস্ত্রের ধারের কাছে নেহাত বালখিল্য, ছেলেমানুষী। আসল গণেশ ব্যাঙ্কের লকারে লুকিয়ে রেখে গোয়েন্দাগল্প পড়ে পড়ে রহস্যমনস্ক দাদু রেপ্লিকার অন্তর্ধান নিয়ে রহস্য বোনেন। নাতির সঙ্গে পরামর্শ করে আফ্রিকার রাজার, সিংহের কাছে রাখা থাকে মূর্তি চিউয়িংগামে আটকে। ভাসানের আগে সেটা খুলে নিতে হবে, নইলে তা চলে যাবে জলের নিচে আটলান্টিসে। কিন্তু তার আগেই গণেশ পেয়ে যান পালমশাই, ঠাকুর তৈরি করতে করতে। তার হাতে থেকে বিকাশ সিংহের হাতে, কী আশ্চর্য, ইনিও সিংহ। তার হাত থেকে মগনলাল, মছলিবাবা, খুন, পুলিশ, হুমকি, চোরাচালান, প্রতিশোধের রহস্যকুটিল সিরিয়াস অপরাধের দুনিয়ায়। পাশাপাশি থাকে রহস্য রহস্য খেলা অ্যাডভেঞ্চারের বড় সুন্দর, মেদুর এক রহস্যলোক।
রুকু আর তার দাদু, ক্যাপ্টেন স্পার্ক আর ‘RAXIT’ মিলে যে রহস্যটি বুনেছিল, তা ফেলুদার মগজাস্ত্রের ধারের কাছে নেহাত বালখিল্য, ছেলেমানুষী। আসল গণেশ ব্যাঙ্কের লকারে লুকিয়ে রেখে গোয়েন্দাগল্প পড়ে পড়ে রহস্যমনস্ক দাদু রেপ্লিকার অন্তর্ধান নিয়ে রহস্য বোনেন। নাতির সঙ্গে পরামর্শ করে আফ্রিকার রাজার, সিংহের কাছে রাখা থাকে মূর্তি চিউয়িংগামে আটকে। ভাসানের আগে সেটা খুলে নিতে হবে, নইলে তা চলে যাবে জলের নিচে আটলান্টিসে। কিন্তু তার আগেই গণেশ পেয়ে যান পালমশাই, ঠাকুর তৈরি করতে করতে। তার হাতে থেকে বিকাশ সিংহের হাতে, কী আশ্চর্য, ইনিও সিংহ। তার হাত থেকে মগনলাল, মছলিবাবা, খুন, পুলিশ, হুমকি, চোরাচালান, প্রতিশোধের রহস্যকুটিল সিরিয়াস অপরাধের দুনিয়ায়। পাশাপাশি থাকে রহস্য রহস্য খেলা অ্যাডভেঞ্চারের বড় সুন্দর, মেদুর এক রহস্যলোক।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২২: য পলায়তি, স জীবতি
আচ্ছা, রুকুর মুখে ক্রমাগত স্থানপরিবর্তন করা চিউয়িংগামের চলন, চর্বিতচর্বণ কিছু বলতে চায়? কুমীরের মুখে হিরে লুকিয়ে রাখার কনসেপ্ট জটায়ুর গোয়েন্দাগল্পে পড়ে সেটাকেই পুনঃপ্রয়োগে চর্বিতচর্বণ আছে বটেই। এই ছেলেমানুষীটুকু ফেলুদার ধরে ফেলতে সময় লাগেনি। ফেলুদা পরতে পরতে খুলেছে হেঁয়ালি, কেটেছে রহস্যের জাল। নকল গণেশ ফিরে এসেছে। কিন্তু রুকুর রহস্যলোক এসবের মধ্যে থেকেও স্বতন্ত্র এক জগৎ, নীরব এক চরিত্র যেন, যা চলচ্চিত্রভাষায় বাঙ্ময়।
রুকুর ঘরে ফেলুদারা দুবার ঢুকেছে। সংলাপে যেন সেয়ানে সেয়ানে পরস্পর মোকাবিলার মজা, বয়সের পার্থক্য মুছে গেছে, যেন দুজনেই বড়, কিংবা দুজনেই ছোট। রুকু দরজা থেকে পিছিয়ে আসে, ফেলুদার প্রবেশ ঘটে। মাথার ওপর কড়িকাঠ দেখা যায়। এই প্রবেশটুকু, ঢুকেপড়ার ইঙ্গিতটা যেন চিত্রভাষায় ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। ঘরের আনাচে ছড়িয়ে থাকা নানা দ্রব্যসম্ভার যেন ব্যঞ্জনাবহুল, কথা বলতে চায়। ঘর আলো আলো ছায়ামাখা, দেয়ালে চুনের রঙে সাদামাটা ভাবটার পাশেও রহস্যময় নীলচে আভা, ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। মাটিতে পড়ে নানা ইংরেজি গল্পের বই, ছবির বই, প্যাস্টেল, অরণ্যদেবের অপটু হাতে আঁকা ছবি।
রুকুর এই মনোজগতের নির্মাণে যে পাশ্চাত্ত্য দুনিয়ার ফ্যাণ্টাসির লোক সক্রিয় বোঝা যায়। পাশাপাশি ক্যাপ্টেন স্পার্কের তাকে সাজানো বই খুঁজে পায় তোপসে। জটায়ু অসতর্ক হাতে খুলে ফেলেন কার্ডবোর্ডে তৈরি ত্রিমাত্রিক কাট-আউটে সাজানো ছবিতে গল্পের বই। দেয়ালে চেবানো চিউয়িংগামে আটকানো ছবিতে এক সারল্যে ভরা অদ্ভুত ইচ্ছাপূরণের দুনিয়ার উঁকিঝুঁকি। পরিচালক চিউয়িংগামের দিকে কি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান? হয়তো। আজব জিনিস বটে চিবোলেই চটচটে। বহুব্যবহারে তার চরিত্র বদলায়, হয়ে ওঠে আঠালো, তার জট তখন ভীষণ।
রুকুর ঘরে ফেলুদারা দুবার ঢুকেছে। সংলাপে যেন সেয়ানে সেয়ানে পরস্পর মোকাবিলার মজা, বয়সের পার্থক্য মুছে গেছে, যেন দুজনেই বড়, কিংবা দুজনেই ছোট। রুকু দরজা থেকে পিছিয়ে আসে, ফেলুদার প্রবেশ ঘটে। মাথার ওপর কড়িকাঠ দেখা যায়। এই প্রবেশটুকু, ঢুকেপড়ার ইঙ্গিতটা যেন চিত্রভাষায় ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। ঘরের আনাচে ছড়িয়ে থাকা নানা দ্রব্যসম্ভার যেন ব্যঞ্জনাবহুল, কথা বলতে চায়। ঘর আলো আলো ছায়ামাখা, দেয়ালে চুনের রঙে সাদামাটা ভাবটার পাশেও রহস্যময় নীলচে আভা, ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। মাটিতে পড়ে নানা ইংরেজি গল্পের বই, ছবির বই, প্যাস্টেল, অরণ্যদেবের অপটু হাতে আঁকা ছবি।
রুকুর এই মনোজগতের নির্মাণে যে পাশ্চাত্ত্য দুনিয়ার ফ্যাণ্টাসির লোক সক্রিয় বোঝা যায়। পাশাপাশি ক্যাপ্টেন স্পার্কের তাকে সাজানো বই খুঁজে পায় তোপসে। জটায়ু অসতর্ক হাতে খুলে ফেলেন কার্ডবোর্ডে তৈরি ত্রিমাত্রিক কাট-আউটে সাজানো ছবিতে গল্পের বই। দেয়ালে চেবানো চিউয়িংগামে আটকানো ছবিতে এক সারল্যে ভরা অদ্ভুত ইচ্ছাপূরণের দুনিয়ার উঁকিঝুঁকি। পরিচালক চিউয়িংগামের দিকে কি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান? হয়তো। আজব জিনিস বটে চিবোলেই চটচটে। বহুব্যবহারে তার চরিত্র বদলায়, হয়ে ওঠে আঠালো, তার জট তখন ভীষণ।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২১: পরিবেশ শুধু প্রাকৃতিক বাতাবরণ নয়, এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পৃক্ত

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৭: আমুর বাজ
মানুষগুলোও বদলায় না কি? ওই চর্বিতচর্বণের ছেলেমানুষীটুকু ধরতে না পারলে রুকুর দুনিয়ায় প্রবেশ কেবল আক্ষরিক থেকে যায়। ফেলু ঘড়ি দেখে, আবার সে চলে যাবে বাস্তবের গতে বাঁধা জগতে। চলচ্চিত্রের ভাষা বলতে চায়, এখানে কাটানো অমূল্য সময়টুকু ঘড়ির মাপে নয় হয়তো, তার পরিমাপ ও পরিধি অন্যতর। বারবার নানা অনুষঙ্গে সেটা জেগে ওঠে, ওই ছোট দুনিয়ার পথেই ফেলুর মগজাস্ত্রের রহস্যসন্ধান এসে পৌঁছোয় বাস্তবের হিসেবে মোড়া, বুদ্ধিগম্য জগতের মাটিতে।
এরপরে যখন ষষ্ঠীর বোধন হয়ে গেছে, অপরাধ সংঘটিত, ছোটদের রহস্য তখন মোড় নিয়েছে বড়দের স্বার্থের দুনিয়ার দিকে। ডাকু গণ্ডারিয়ার যাবতীয় দুর্ধর্ষ কাজকর্ম এখন বইয়ের পাতার মজা থেকে বেরিয়ে, বাস্তবে দাঁত নখ শাণিয়ে শ্বাপদের মতো তীব্র, তীক্ষ্ণ, ভয়ানক। গণেশ ভ্যানিশ, দুর্গতিনাশিনীর বোধন হয়েছে, রহস্যস্রোত উদ্বেল হয়ে যেন আছড়ে পড়তে চায়। তৈরি করা নকল রহস্যটা এখন উন্মোচিত, কিন্তু এই অযাচিতভাবে জমে ওঠা অন্য রহস্যটি তুঙ্গে পৌঁছচ্ছে, ধৈর্যের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। রহস্য আসল হোক বা নকল, সরল হোক বা ভীষণ জটিল, তার ভিত্তিভূমির মানসলোকগুলি সমান চমকপ্রদ। যে মনে বাসা বাঁধে রহস্যতৃষ্ণা, শৈশবের ফ্যান্টাসি, সেই মন সংকীর্ণ লোভ, দুষ্প্রবৃত্তি আর অপরাধের চোরাবালিতে ঢাকা।
এরপরে যখন ষষ্ঠীর বোধন হয়ে গেছে, অপরাধ সংঘটিত, ছোটদের রহস্য তখন মোড় নিয়েছে বড়দের স্বার্থের দুনিয়ার দিকে। ডাকু গণ্ডারিয়ার যাবতীয় দুর্ধর্ষ কাজকর্ম এখন বইয়ের পাতার মজা থেকে বেরিয়ে, বাস্তবে দাঁত নখ শাণিয়ে শ্বাপদের মতো তীব্র, তীক্ষ্ণ, ভয়ানক। গণেশ ভ্যানিশ, দুর্গতিনাশিনীর বোধন হয়েছে, রহস্যস্রোত উদ্বেল হয়ে যেন আছড়ে পড়তে চায়। তৈরি করা নকল রহস্যটা এখন উন্মোচিত, কিন্তু এই অযাচিতভাবে জমে ওঠা অন্য রহস্যটি তুঙ্গে পৌঁছচ্ছে, ধৈর্যের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। রহস্য আসল হোক বা নকল, সরল হোক বা ভীষণ জটিল, তার ভিত্তিভূমির মানসলোকগুলি সমান চমকপ্রদ। যে মনে বাসা বাঁধে রহস্যতৃষ্ণা, শৈশবের ফ্যান্টাসি, সেই মন সংকীর্ণ লোভ, দুষ্প্রবৃত্তি আর অপরাধের চোরাবালিতে ঢাকা।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৪: যুদ্ধ করতে সব সময় পেশীশক্তি নয়, দরকার বিশ্বাসের গল্পও

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি
দ্বিতীয় সাক্ষাতে রুকুর অশ্রুসজল মুখটি ওই রহস্যলোকে বড় মায়াময় লাগে। তার হিসেব নিকেশ অতো সোজা সরল লাভ ক্ষতির দুঃখ-সুখে মোড়া গতানুগতিক নয়। চোখে পড়ে দেওয়ালে আটকানো ঘুড়িটা। চোখে পড়ার মতো করে রাখা দুটি মুগুরসদৃশ কিছু, ক্রিকেট ব্যাট বুঝি, যেন যুদ্ধের আয়োজন। এবার ঘরের বাইরে স্পষ্ট চোখে পড়ে দেয়াল লিখন, লেখা আছে ক্যাপ্টেন স্পার্ক। ঘরে আগের মতোই রঙের নানা সাজ সরঞ্জাম ছড়ানো, দেয়ালে আটকানো কাগজে আঁকা ভরাট ছবি। এখন ঘরটি যেন আরো স্বতন্ত্র, বাঙ্ময় ও মেদুর মনে হয়। শৈশবের নানা চিহ্ন বুকে নিয়ে সে যেন আস্ত একটা রহস্যলোক।
ওদিকে অসুর বধের পালা তখন আসন্নপ্রায়। ফেলু তার দেওয়া কথামতো রিভলভার বের করে তার কার্যপদ্ধতি দেখায়, তারপর মগজাস্ত্র দিয়ে ভেদ করা নকল রহস্যের কিছু কিছু তুলে ধরে। এই ঘরে রুকুর নকল পিস্তল, নকল রহস্য, ফ্যান্টাসির পাশে আসল আগ্নেয়াস্ত্র, আসল রহস্য আর ঘোর বাস্তবটুকুর অভিঘাত রুকুর কল্পলোককে কি নতুন কোনও অপূর্ব লোকে পৌঁছে দেয়?
শিশুমনে লালিত রহস্যটুকু বাস্তবে সত্যি হয়ে উঠলে তা আর ফ্যাণ্টাসি থাকে না, বলাবাহুল্য। ওই ঘরটা সেই কল্পলোকের একটি পরিসর, যে মনস্তাত্ত্বিক আলোছায়া থাকে বলেই শৈশব মধুর। কিন্তু যাদের ছোটবেলা থাকা ঘুচে গিয়েছে বহুদিন, যারা প্রকাশ্যে ছোট করে অন্যকে, গোপনে ছোট হতে থাকে নিজেই, যাদের ছোটবেলার অজানার অন্ধকার আমেজটুকু অন্তর্হিত বহুদিন, কিন্তু সেখানে জাঁকিয়ে বসেছে অন্য অন্ধকার, যা ছাড়বার নয় সহজে, ঠিক ওই চিউয়িংগামের মতোই, যারা গুণ্ডা দিয়ে নিরীহ লোককে খুন করায়, যারা টাকার লোভে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে, তারা টাকা দিয়ে রেহাই পায় না ফেলুদার কাছে। তার উদ্যত রিভলভার থেকে গুলি ছুটে আসে, যবনিকা নামে। কিন্তু এই বাস্তবের সংঘাতটুকু কদর্যতা ঝেড়ে ফেলে মোড় নিয়েছে আবার ফ্যান্টাসির লোকে। ফেলুর আসল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে আগুনের ঝলক তো ক্যাপ্টেন স্পার্কের হয়ে প্রতিবাদ, ছোটদের নিষ্কলুষ রহস্যলোকটাকে রক্তে, লোভে, লালসায় ভেজা জঘন্য ষড়যন্ত্রে পঙ্কিল ‘আসল’ করে তোলার বিরুদ্ধে।—চলবে।
ওদিকে অসুর বধের পালা তখন আসন্নপ্রায়। ফেলু তার দেওয়া কথামতো রিভলভার বের করে তার কার্যপদ্ধতি দেখায়, তারপর মগজাস্ত্র দিয়ে ভেদ করা নকল রহস্যের কিছু কিছু তুলে ধরে। এই ঘরে রুকুর নকল পিস্তল, নকল রহস্য, ফ্যান্টাসির পাশে আসল আগ্নেয়াস্ত্র, আসল রহস্য আর ঘোর বাস্তবটুকুর অভিঘাত রুকুর কল্পলোককে কি নতুন কোনও অপূর্ব লোকে পৌঁছে দেয়?
শিশুমনে লালিত রহস্যটুকু বাস্তবে সত্যি হয়ে উঠলে তা আর ফ্যাণ্টাসি থাকে না, বলাবাহুল্য। ওই ঘরটা সেই কল্পলোকের একটি পরিসর, যে মনস্তাত্ত্বিক আলোছায়া থাকে বলেই শৈশব মধুর। কিন্তু যাদের ছোটবেলা থাকা ঘুচে গিয়েছে বহুদিন, যারা প্রকাশ্যে ছোট করে অন্যকে, গোপনে ছোট হতে থাকে নিজেই, যাদের ছোটবেলার অজানার অন্ধকার আমেজটুকু অন্তর্হিত বহুদিন, কিন্তু সেখানে জাঁকিয়ে বসেছে অন্য অন্ধকার, যা ছাড়বার নয় সহজে, ঠিক ওই চিউয়িংগামের মতোই, যারা গুণ্ডা দিয়ে নিরীহ লোককে খুন করায়, যারা টাকার লোভে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে, তারা টাকা দিয়ে রেহাই পায় না ফেলুদার কাছে। তার উদ্যত রিভলভার থেকে গুলি ছুটে আসে, যবনিকা নামে। কিন্তু এই বাস্তবের সংঘাতটুকু কদর্যতা ঝেড়ে ফেলে মোড় নিয়েছে আবার ফ্যান্টাসির লোকে। ফেলুর আসল আগ্নেয়াস্ত্র থেকে আগুনের ঝলক তো ক্যাপ্টেন স্পার্কের হয়ে প্রতিবাদ, ছোটদের নিষ্কলুষ রহস্যলোকটাকে রক্তে, লোভে, লালসায় ভেজা জঘন্য ষড়যন্ত্রে পঙ্কিল ‘আসল’ করে তোলার বিরুদ্ধে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















