সোমবার ৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

এই ডায়েরিতে পাওয়া তথ্য, অমলেন্দুর চিঠি, প্রতিমার চলে যাবার আগে রেখে যাওয়া চিঠি আর ভিন্ন ভিন্ন লোকের জবানবন্দি মিলিয়ে এই প্রথম ধৃতিমান একটা কেসস্টাডি করে ফেলল! সেই সব তথ্য নিয়ে বিভূতি চক্রবর্তীর পরিচিত এক নামকরা মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলো ধৃতিমান। অমলেন্দুর লেখা ডায়েরির হাতের লেখা এবং তার কাছে পাওয়া চিঠির হাতে লেখা মিলে গিয়েছে। পুরো অতীত বিশ্লেষণ করার পর মনোবিদ জানালেন, কৈশোর বয়স থেকেই অমলেন্দুর মধ্যে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য সে তার কর্মস্থলে বিপর্যস্ত হয়েছে। সে দায় পরিবেশ পরিস্থিতির এবং তার উপস্থিত বুদ্ধির অভাবের কারণে ঘটেছে সেখানে প্রতিমার বা কুন্তলের কোনও দায় নেই।
ডায়েরি থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিমা কখনোই অস্বীকার করেনি কুন্তলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু সে বারবার বলেছে সেই সম্পর্কের থেকে সে বেরিয়ে আসতে চায়। বিয়ের পর প্রতিমা বা কুন্তল কেউ কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। ডায়েরি থেকে পড়ে এটা বোঝা যাচ্ছে অমলেন্দু সন্দেহ করতে শুরু করেছিল যে কুন্তল ও প্রতিমা আবার পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। কিছু কিছু মানুষ হার সহ্য করতে পারে না। হেরে গেলে আক্ষেপ সকলের হয়। কিন্তু অতি দুর্বল মানসিকতার কেউ কেউ সেই হারকে সারাজীবনের একমাত্র ব্যর্থতা মনে করে। তাদের মধ্যে ভয়ঙ্কর প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়।

মনোবিদের বিচারে মৃত অমলেন্দু আত্মহত্যার কিছুদিন আগে থেকেই হয়তো ভয় কাটানোর জন্য হ্যাশ অয়েলের নেশা শুরু করেছিল। প্রাথমিকভাবে অমলেন্দুর শরীরের নমুনায় ড্রাগের টেস্ট করা হয়নি। মনোবিদের কথা অনুযায়ী তা আবারও করা হল। এবং অনুমান সঠিক প্রমাণিত হল। অফিসে গিয়েই লোকাল থানার উপস্থিতিতে তার বন্ধ ড্রয়ারের সিল করা লক খুলেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল তার লেখা দিনপঞ্জি। সেটাই মোক্ষম সূত্র, যার ভিত্তিতে ধৃতিমান মৃত অমলেন্দুর প্রকৃত চরিত্র বিশ্লেষণ শুরু করল। ধৃতিমান বারবার চেষ্টা করেছে যে এমন কিছু খুঁজে পাওয়ার যার ভিত্তিতে অতীতটা প্রমাণ হিসেবে আদালতের সামনে রাখা যায়।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-৯০: অনুসরণ/১১

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬২: আলাস্কা ঘুরে দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া দুষ্কর

অফিসেই কথা প্রসঙ্গে জানা গেল, অমলেন্দু ডায়েরি লিখতো যে ডায়েরিতে সে তার মনের সমস্ত কথা কৈশোর যৌবন থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত লিখে গিয়েছে! আর পাওয়া গেল আধুনিক কালে সিগারেট খাওয়ার ভেপ! তখন এসব খিদিরপুরের ফ্যান্সি মার্কেটে পাওয়া যেত। এখন তো ঘরে বসে অনলাইনে অর্ডার করলেই পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে হ্যাশ অয়েলের পরিত্যক্ত বোতল! সেই সব নেশার সামগ্রী, মলি বা (MDMA), এলএসডি (LSD Tablet) সব যুগেই মিলত। অমলেন্দু যে সিগারেট খেত না তার প্রমাণ তার অফিসে এবং প্রতিমার পাওয়া গিয়েছিল তাঁর মানে প্রতিমা যাবার পর লুকিয়ে লুকিয়ে সে এই নেশা শুরু করেছিল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৩: তত্ত্বতালাশ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৬: জয় বাবা ফেলুনাথ: রুকুর অন্দরমহল

মনোবিদ জানালেন, এই একা থাকার সময়ে যদি কোনওভাবে প্রতিমা ফিরে আসতো তাহলে হয়তো এসব কিছু ঘটতো না । আবার প্রতিমা হয়ত ভাবছিল অমলেন্দু আবার তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। পারস্পরিক অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝি থেকেই এমন মর্মান্তিক ভাবে দু’জনে দু’দিকে সরে গেল।
শুরুর থেকে অমলেন্দুর মৃত্যু পর্যন্ত কাহিনি যেভাবে এগিয়েছে তার সবটুকুই মৃত অমলেন্দু ডায়েরি থেকে নেওয়া। শেষ পাতায় লেখা আছে কতকগুলো আপাত সম্পর্কহীন গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। সেগুলি আবার লিখে পেন দিয়ে গোল সার্কেল করা হয়েছে—
বারবার হেরে যাওয়া, মানসিক দুর্বলতা, অকারণ না সঠিক সন্দেহ, একটু একটু করে শেষ হওয়ার থেকে একেবারে শেষ হয়ে যাওয়া অনেক সম্মানের! আমি যে যন্ত্রনা ভোগ করছি প্রতিমা ও কুন্তলকে সেই একই যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। প্রতিশোধ প্রতিহিংসা মুক্তি , সাহসই সেই মুক্তির পথ।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৮: লক্ষ্মী প্যাঁচা

কিন্তু এত কিছুর পরেও অমলেন্দু আত্মহত্যা করেছে নাকি খুন হয়েছে সেটা প্রমাণ করা যাচ্ছিল না। মনোবিদের মতে, প্রতিমা এবং কুন্তলের উপর প্রতিশোধ নিতে জীবনের পরীক্ষায় বারবার হারতে থাকা অমলেন্দু আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এমন এক আত্মহত্যা যাতে প্রতিমা এবং কুন্তলকে বিপর্যস্ত করে যাওয়া যায়। এমন ভাবে সে মৃত্যু ঘটবে যাতে প্রথম দেখায় সেটাকে খুন বলে মনে হয়। এখানে তা অকাট্য যুক্তি মৃত্যুটা হয়েছে ভোররাতে। খুনি কেন রাত ভোর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? আত্মহত্যার পরিকল্পনা থাকলেও সেই পরিণতিতে পৌঁছতে অমলেন্দু অনেকটা সময় নিয়েছে। রাতভোর মনের দোটানায় গোটা রাতের ভয়ংকর একাকীত্ব অমলেন্দুকে এই পরিণতিতে ঠেলে দিয়েছে।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৬: দীনদুখিনীর জননী সারদা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-১১: ভাগ্যের ফেরে হাস্যকর ‘লাখ টাকা’

এই সবকটা অনুমান সঠিক বলে মনে হলেও আদালতে প্রমাণ কি করে হবে? অমলেন্দু হ্যাশ অয়েল নিয়েছিল সেটার প্রমাণ হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে মাদকাসক্ত অবস্থায় সে নিজের গলায় নিজে খুর চালিয়েছে। কিন্তু মার্ডার ওয়েপন বা সেই খুরের কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি । যদি আবিষ্কারের পর পুলিশ নিয়মিত জায়গাটিকে কর্ডন করেছিল ভালো করে অনুসন্ধান করেছে, কিন্তু কোথাও মার্ডার ওয়েপন পাওয়া যায়নি।

কী ভেবে পর পর দু’ রাত ভোর হওয়া পর্যন্ত ধৃতিমান লালদিঘিতে কাটালো সেই দু’ রাতে সে নানা ধরনের চরিত্রকে দেখেছে। এতদিনকার রহস্য সমাধানের অভিজ্ঞতা থেকে সে কাউকে সন্দেহজনক পায়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম একজন বয়স্ক সিকিউরিটি স্টাফ। লালদীঘির ঠিক পাশে একটি অফিসে সিকিউরিটির কাজ করে লোকটি। ভোররাতে এসে লালদীঘির জলে স্নান করেন আচমন সারেন সূর্যপ্রণাম করেন, তারপর পোশাক বদলে নিজের গন্তব্যে চলে যান।—চলবে।
 

অমলেন্দু পাল মৃত্যুরহস্য। পরবর্তী পর্ব আগামী বৃহস্পতিবার ২৪ জুলাই, ২০২৫।

* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content