বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

একটা অদ্ভুত অস্থিরতাকে যেন বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে অমলেন্দু। বাসে মিনিবাসে বা ডালহৌসির রাস্তায় আচমকা কেউ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে সে বিরক্ত হয়ে চোয়াল শক্ত করে মুখ ঘুরিয়ে নিত। কেউ হয়তো মুখ ফসকে জিজ্ঞেসই করে ফেলল—
—আচ্ছা আপনাকে কোথায় দেখেছি বলুন তো?
—কেন?
—না মানে মুখটা খুব চেনাচেনা লাগছে?
—তার মানে?
—ও হ্যাঁ, আপনি কি ফেয়ারলি প্লেসে রেলওয়ে…
কথা শেষ হতে না দিয়েই অমলেন্দু সেই লোকটিকে জেরা করতে শুরু করতো।
—কে বলুন তো আপনি? কী উদ্দেশ্য আপনার?
লোকটি আশেপাশের কৌতুহলী মানুষজনের সামনে পরিস্থিতি সামলাতে বলে ওঠে
—আরে না না আমি সেরকম ভাবে কিছু…
—না না এক্সাক্টলি আপনি কী চান বলুন তো? কেন আমার পেছনে পড়ে রয়েছেন?
লোকটি হতভম্ব।
—আমি? আমি তো আজই প্রথম আপনাকে দেখলাম।
—একদম বাজে কথা বলবেন না। আমি বেশ কয়েকদিন লক্ষ্য করে তবে আজকে কথাটা আপনাকে বলছি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-৮৬: অনুসরণ/৭

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০২: শ্রীমার অন্তিম সময়কালীন ভবিষ্যবাণী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬২: এক নির্বাসিত রাজপুত্রের কথা

এবার আশপাশের কৌতুহলী লোকজন আরও উৎসাহ পায় তারা প্রশ্ন-শুরু-করা লোকটিকে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে এবং অমলেন্দুর প্রতি স্বাভাবিকভাবেই একটু সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। লোকটি এখন বেকায়দায় পড়ে গিয়েছে। তার গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে গিয়েছে যে প্রশ্নটা “আপনি কি পাগল নাকি?” এটা সে কিছুতেই ঠোঁট দিয়ে বলতে পারছে না! আচমকা বাড়ির রাস্তায় টিকিটকাটা মিনিবাসে সিট পাওয়া অমলেন্দু দাঁড়িয়ে উঠে বলে ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৪: ভুবন চিল ও শঙ্খচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?

—গাড়িটা একটু দাঁড় করাবেন ভাই আমি নেমে যাব।
এখানে কেউ নামতে পারে সেটা না ভেবেই ড্রাইভার গাড়িটাকে টেনে চালাচ্ছিল। অমলেন্দু গিয়ে টিনের ওপরে ধপধপ করে শব্দ করে বলে।
—শুনতে পেলেন না বললাম গাড়িটা দাঁড় করান!
প্রশ্নকরা লোকটি এতক্ষণ ধরে বিব্রত হলেও হঠাৎ করে সামনেই অমলেন্দু ছেড়ে যাওয়া সিটটা পেয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত !
অমলেন্দু মিনিবাস থেকে কার্জন পার্কের কোনাকুনি নেতাজির ‘দিল্লি চলো’ স্ট্যাচুর কাছে নেমে উদভ্রান্তের মতো মেট্রো সিনেমার দিকে হাঁটতে শুরু করল। ইদানীং অমলেন্দুর মনে হয় সর্বক্ষণ কয়েকজোড়া চোখ তাকে, তার গতিবিধিকে লক্ষ্য করছে। তাই সে স্বাভাবিকভাবে একবারও ভাবতে পারে না যে, আকাশবাণীর গ্রাউন্ড ফ্লোরের রিসেপশনে বা উডল্যান্ডস হসপিটালের লিফটের আগেই ডেস্কে যিনি নিয়মিত বসেন বা ফেয়ারলি প্লেসের নানান টিকিট কাউন্টারে যাঁরা বসেন, রোজ দেখতে দেখতে তাঁদের মুখচেনা হয়ে যায়। সেলিব্রিটি না হয়েও লোকজন রাস্তাঘাটে তাঁদের চিনতে পারেন। এতে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই, দূরভিসন্ধি নেই! এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। যিনি প্রশ্নটা করেছেন তিনি তো জানেন না যে অমলেন্দুর সঙ্গে ফেয়ারলি প্লেস-এর রেলওয়ে টিকিট কাউন্টারে কী দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে যার ফলে তাকে সেখান থেকে ডেসপ্যাচে বদলি হতে হয়েছে। আর এখনই বা তার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে! আবার মানসিক চাপে বিধ্বস্ত অমলেন্দুর ক্ষেত্রে এই ব্যবহার অদ্ভুত হলেও অনভিপ্রেত নয়!
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২০: রবীন্দ্রনাথ আশ্রমের একমাত্র তাঁকেই প্রণাম করতেন

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা

বাইরের এই অস্বাভাবিকতা ঘরেও ঢুকে পড়ল! কোনওদিন বাড়িতে ফিরে প্রতিমাকে একটু বেশি সাজগোজ করা দেখলেই।
—কোথাও বেরিয়েছিলে?
—আমি?
—এই ঘরে তুমি ছাড়া আর কে আছে?
— আরে কি হয়েছে তোমার?
— কিছু হয়নি
— তাহলে এরকম টিভি সিরিয়ালমার্কা কথা বলছ কেন?
—আমি সিরিয়াল দেখি না তুমি দেখো তাই সেগুলো তোমার মাথার মধ্যে সর্বক্ষণ ঘোরে
প্রতিমা বুদ্ধিমতী। তাই সে কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকল। অমলেন্দুর অফিসে যে একটা সমস্যা হচ্ছে সেটা সে মুখে না বললেও প্রতিমা বুঝতে পারে। অমলেন্দু কথায় কথায় চটে যায় ঠিকই, কিন্তু এরকম খিটখিটে সন্দেহবাতিক সে আগে ছিল না। প্রতিমা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও অমলেন্দু ছাড়বার পাত্র নয়!
—আমার প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু আমি পাইনি!
মাঝে কোন কথার ভনিতা না রেখে প্রতিমা উত্তেজনায় জল ঢালতে সরাসরি উত্তর দিল।
—কোথাও যাইনি আমি।
—তাহলে এত সাজগোজ কিসের?
—কি এমন সাজগোজ? কী বলছো এসব?
—কেউ এসেছিল!
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৩: পরেশের পরশপাথর

বারবার দ্বন্দ্ব এড়িয়ে যেতে চাইলেও কেউ যদি জোর করে ধাক্কা দিতে থাকে তখন তার সামনে দেওয়ালের মতো দাঁড়াতে হয়। বাড়িতে স্কুলেকলেজে প্রতিমা এই মানসিক অস্ত্র অনেকবার ব্যবহার করেছে।
—ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রশ্ন করো না? মনে কোন সন্দেহ থাকলে প্রশ্ন থাকলে সরাসরি সে কথাটা বল?
—আমি তোমাকে একটা সাধারণ প্রশ্ন করেছি তার থেকে সন্দেহের কথা আসছে কেন ?
রজনীগন্ধার মালা পারফিউম নতুন শাড়ির গন্ধে ম ম করতে থাকা প্রতিমা এতদিনে কণে বউ থেকে ঘরণী হয়ে উঠেছে।
—মনটা তোমার। সন্দেহটা তোমার। তাই প্রশ্নের উত্তরটা তুমি আমার থেকে বেশি ভালো দিতে পারবে!
—সেদিন শ্রীরামপুর থেকে ফেরার সময় সেই চিঠিটা কুঁচিকুঁচি করে ছিঁড়ে জানালার বাইরে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু চিঠিতে লেখা কথাগুলো ভুলিনি!

সব সংশয় কাটিয়ে বিয়ের পর সুখের ফেনায় কমবয়সে করা ভুলের সব ক্লেদ প্রতিমার শরীর থেকে ধুয়ে গিয়েছিল।সেদিন আবার অমলেন্দু সেই চিঠি প্রসঙ্গ তোলার পর কোথায় যেন জমে থমকে থাকা সময়ের সব গ্লানি সব কালিমা তার গোটা শরীরকে যেন আবার বিষাক্ত করে তুলল!—চলবে।

অমলেন্দু পাল মৃত্যুরহস্য। পরবর্তী পর্ব আগামী বৃহস্পতিবার ২৬ জুন ২০২৫

* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content