
প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র। ছবি: সংগৃহীত।
এই লোকটিকে অনুসরণ করতে শুরু করল ধৃতিমান। লোকটি কালীঘাটের মন্দির আর টালি নালার উপর কালীঘাট ব্রিজের মাঝে থাকে। ব্রিজ-লাগোয়া নবগ্রহ মন্দিরের নিচে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে একটা ঘুপচি ঘরে একা থাকে। নিয়ম করে প্রত্যেক দিন রাত ন’টায় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে রাত দশটা থেকে পরের দিন ভোর ছটা পর্যন্ত ডিউটি সেরে বাড়ি ফেরে। সপ্তাহের সাতদিনই কাজ, কোনও ছুটি নেই। বাজার সেরে বাড়িতে ঢুকে রান্নাবাড়ি করে তারপর ঘুম। খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার রাত নটায় বেরিয়ে পড়া।
তার নাম মুকুন্দ। মুকুন্দ গুছাইত। মুকুন্দ যে জায়গাটায় থাকে সেটা শহরের যথেষ্ট অস্বস্তিকর জায়গা। সন্ধেবেলার পরে কালীঘাটের এই অঞ্চল বারবনিতাদের দখলে চলে যায়। তবে মুকুন্দ দীর্ঘদিন এখানকার বাসিন্দা তাকে কেউ কখনো বিরক্ত করে না। কখনও কাজে কামাই করে না মুকুন্দ, শুধু দিন ১৫ আগে দু’দিন সে কামাই করেছিল। টেলিফোন করে তার সকালের রিলিভারকে জানিয়েছিল বেদম জ্বরে পড়ে গিয়েছে দু’দিন যেতে পারবে না। সব থেকে অবাক করা কাণ্ড হল, যেদিন সকালে অমলেন্দুর মৃতদেহ পাওয়া যায় সেই দিন আর তারপর দিন মুকুন্দ কাজে কামাই করেছিল।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-৯১: অনুসরণ/১২

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম
সেই বাড়িতেই দুপুর কাটিয়ে বিকেল যখন এলো তখনই কড়া নেড়ে উপস্থিত হল ধৃতিমান।
—দেখুন মুকুন্দবাবু। আপনি আমাকে চেনেন না কিন্তু আপনার সব খবর আমি নিয়েছি। আপনি কোথায় কোন কোম্পানিতে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করেন কখন যান, কখন সেখান থেকে বের হন, রোজ ভোরবেলায় লালদীঘিতে স্নান সূর্য প্রণাম আচমন সেরে আপনি বাড়ি ফেরেন। আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কথা দিচ্ছি, আপনার কোনওরকম বিপদ হবে না। চাইলে পুলিশ বিভাগের গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবো। কিন্তু আমার বিশ্বাস যে, প্রতিদিন ভোরের মতো দিন ১৫ আগে এক ভোরবেলায় আপনি একটি লোকের মৃতদেহ দেখেছিলেন। লালদিঘির ঠিক পাড়ে একটা বেঞ্চের সামনে পড়ে ছিল মৃতদেহ। কীভাবে লোকটি মারা গিয়েছে আমরা জানি না। তবে আত্মহত্যার সম্ভাবনাই প্রবল। অথচ সবটা আমরা প্রমাণ করতে পারছি না। দু’জন নিরপরাধ মানুষ তার মৃত্যুর জন্য পুলিশের হাতে রয়েছে। আপনি যদি সত্যি কথা বলেন, তাহলে সেই মানুষ দু’জন অন্যায়ের শাস্তির হাত থেকে মুক্তি পাবেন।
—দেখুন মুকুন্দবাবু। আপনি আমাকে চেনেন না কিন্তু আপনার সব খবর আমি নিয়েছি। আপনি কোথায় কোন কোম্পানিতে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করেন কখন যান, কখন সেখান থেকে বের হন, রোজ ভোরবেলায় লালদীঘিতে স্নান সূর্য প্রণাম আচমন সেরে আপনি বাড়ি ফেরেন। আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কথা দিচ্ছি, আপনার কোনওরকম বিপদ হবে না। চাইলে পুলিশ বিভাগের গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবো। কিন্তু আমার বিশ্বাস যে, প্রতিদিন ভোরের মতো দিন ১৫ আগে এক ভোরবেলায় আপনি একটি লোকের মৃতদেহ দেখেছিলেন। লালদিঘির ঠিক পাড়ে একটা বেঞ্চের সামনে পড়ে ছিল মৃতদেহ। কীভাবে লোকটি মারা গিয়েছে আমরা জানি না। তবে আত্মহত্যার সম্ভাবনাই প্রবল। অথচ সবটা আমরা প্রমাণ করতে পারছি না। দু’জন নিরপরাধ মানুষ তার মৃত্যুর জন্য পুলিশের হাতে রয়েছে। আপনি যদি সত্যি কথা বলেন, তাহলে সেই মানুষ দু’জন অন্যায়ের শাস্তির হাত থেকে মুক্তি পাবেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৬: আমরা আসলে কাকে পুজো করছি? ঈশ্বরকে, নাকি রক্তমাখা অভ্যাসকে?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার
সব শোনার পর মুকুন্দ খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—
—আপনি আমার খোঁজ পেলেন কী করে?
—এই কেসটার সঠিক সমাধান হচ্ছিল না। অন্যান্য কেসে আমরা অপরাধী খুঁজে বেড়াই, আর এক্ষেত্রে অপরাধী বলে যাঁরা ধরা পড়েছেন, আমাদের সকলের বিশ্বাস তাঁরা আসল অপরাধী নন। আমরা তাদের বাঁচাবার চেষ্টা করছি, সঠিক প্রমাণ খুঁজছি। যুক্তি বুদ্ধি সবকিছু বারবার বলছে যে তাঁরা প্রকৃত অপরাধী নয়, অথচ কোনও যথাযথ প্রমাণ হাতে পাচ্ছি না! আপনাকে লক্ষ্য করেছিলাম মনে হয়েছিল আপনি প্রতিদিন ভোরবেলা লালদীঘিতে যান তারপর খোঁজ করতে করতে একটা অদ্ভুত যোগসূত্র পেলাম। যেদিন অমলেন্দুবাবুর মৃতদেহ পাওয়া যায় ঠিক সেই দিন আর তারপরদিন আপনি জ্বরের জন্য কাজে কামাই করেছিলেন।
—আপনি আমার খোঁজ পেলেন কী করে?
—এই কেসটার সঠিক সমাধান হচ্ছিল না। অন্যান্য কেসে আমরা অপরাধী খুঁজে বেড়াই, আর এক্ষেত্রে অপরাধী বলে যাঁরা ধরা পড়েছেন, আমাদের সকলের বিশ্বাস তাঁরা আসল অপরাধী নন। আমরা তাদের বাঁচাবার চেষ্টা করছি, সঠিক প্রমাণ খুঁজছি। যুক্তি বুদ্ধি সবকিছু বারবার বলছে যে তাঁরা প্রকৃত অপরাধী নয়, অথচ কোনও যথাযথ প্রমাণ হাতে পাচ্ছি না! আপনাকে লক্ষ্য করেছিলাম মনে হয়েছিল আপনি প্রতিদিন ভোরবেলা লালদীঘিতে যান তারপর খোঁজ করতে করতে একটা অদ্ভুত যোগসূত্র পেলাম। যেদিন অমলেন্দুবাবুর মৃতদেহ পাওয়া যায় ঠিক সেই দিন আর তারপরদিন আপনি জ্বরের জন্য কাজে কামাই করেছিলেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাময়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা
ধৃতিমান বলল, আগে কখনও আপনি একদিনের জন্যও কাজে কামাই করেননি। আমার মনে হয়েছিল আপনার ওপর কোনও একটা কিছু প্রভাব পড়েছিল। আর যে সময়ে মৃত্যুটা ঘটে প্রতিদিন প্রায় সেই সময়ে আপনি ওখানে যান।
—সত্যিই তাঁরা নিরাপরাধ। তাই ঈশ্বর এই যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছেন! আমার টিভি নেই কাগজ পড়ি না। ওই বীভৎস দৃশ্য আমি ভুলতে চেয়েছিলাম আমি জ্বরে পড়েছিলাম সাংঘাতিক জ্বর। আসলে আতঙ্কে এমন হয়েছিল। এত বয়স পর্যন্ত এভাবে কোনও মানুষকে মরতে দেখিনি।
—আপনি মৃতদেহ নয়, অমলেন্দুকে চোখের সামনে?
মুহুর্তের মধ্যে সেই ভয়ংকর স্মৃতি মুকুন্দকে যেন অসুস্থ করে দেয়। নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন—
—হ্যাঁ, সে নিজের গলায় নিজে খুর চালিয়েছিল, আমি দেখেছিলাম! তারপর দু’দিন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ি! খেতে পারিনি।
—মুকুন্দবাবু একটা কথা বলুন হাতের খুরটা পুলিশ কেউ খুঁজে পায়নি। আপনি কি…
—যেখানে লোকটা বসেছিল, সেখান বসেই আচমকা একহাতে খুরটা চালায় তারপর ধড়ফড় করতে করতে বেঞ্চ থেকে জলের দিকে গিয়ে পড়ে। তখনই হাত থেকে খুরটা লালদীঘির জলে পড়ে যায়। আমার জীবনে এমন ভয়ঙ্কর মৃত্যু আমি দেখিনি।
—সত্যিই তাঁরা নিরাপরাধ। তাই ঈশ্বর এই যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছেন! আমার টিভি নেই কাগজ পড়ি না। ওই বীভৎস দৃশ্য আমি ভুলতে চেয়েছিলাম আমি জ্বরে পড়েছিলাম সাংঘাতিক জ্বর। আসলে আতঙ্কে এমন হয়েছিল। এত বয়স পর্যন্ত এভাবে কোনও মানুষকে মরতে দেখিনি।
—আপনি মৃতদেহ নয়, অমলেন্দুকে চোখের সামনে?
মুহুর্তের মধ্যে সেই ভয়ংকর স্মৃতি মুকুন্দকে যেন অসুস্থ করে দেয়। নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন—
—হ্যাঁ, সে নিজের গলায় নিজে খুর চালিয়েছিল, আমি দেখেছিলাম! তারপর দু’দিন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ি! খেতে পারিনি।
—মুকুন্দবাবু একটা কথা বলুন হাতের খুরটা পুলিশ কেউ খুঁজে পায়নি। আপনি কি…
—যেখানে লোকটা বসেছিল, সেখান বসেই আচমকা একহাতে খুরটা চালায় তারপর ধড়ফড় করতে করতে বেঞ্চ থেকে জলের দিকে গিয়ে পড়ে। তখনই হাত থেকে খুরটা লালদীঘির জলে পড়ে যায়। আমার জীবনে এমন ভয়ঙ্কর মৃত্যু আমি দেখিনি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭১: পুষ্পধনু
জলের মধ্যে থেকে মার্ডার ওয়েপেন সেই খুর পাওয়া গিয়েছিল! মুকুন্দ গুছাইত কোর্টে এসে সাক্ষী দিতে রাজি হয়েছিলেন। কুন্তল ও প্রতিমা মুক্তি পেয়েছিল।
গোয়েন্দা দপ্তরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে অনেকগুলো রহস্য সমাধান করেছে ধৃতিমান চৌধুরী। সব জায়গায় যুক্তি-বুদ্ধির জাল বিস্তার করে অপরাধীকে পাকড়াও করেছে। কিন্তু অপরাধ থেকে নিরপরাধকে চিহ্নিত করার কাজ এই প্রথম করতে পারল।—শেষ
গোয়েন্দা দপ্তরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে অনেকগুলো রহস্য সমাধান করেছে ধৃতিমান চৌধুরী। সব জায়গায় যুক্তি-বুদ্ধির জাল বিস্তার করে অপরাধীকে পাকড়াও করেছে। কিন্তু অপরাধ থেকে নিরপরাধকে চিহ্নিত করার কাজ এই প্রথম করতে পারল।—শেষ
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।


















