
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
কৃষ্ণ, মগধরাজ বৃহদ্রথের পুত্র জরাসন্ধের বিচিত্র জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করছেন। পরিণত বয়সেও রাজার ঔরসে, তাঁর দুই পত্নী, যমজ কাশিরাজকন্যাদ্বয়, পুত্রের মা হতে পারলেন না। উদারমনা গৌতমবংশীয় চণ্ডকৌশিকমুনির অনুগ্রহে, তাঁরা একটি দ্বিখণ্ডিত ফল গ্রহণ করে, দুই খণ্ডিত শরীরের অংশে প্রসব করলেন। দুই রানি খণ্ডিত দেহাংশ দুটি পরিত্যাগ করলেন। পরিশেষে রাজা বৃহদ্রথের রাজ্যে সসম্মানে বসবাসকারিণী জরা নামে এক রাক্ষসী রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত দুই খণ্ডিত দেহাংশ যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ, বীর, বলশালী শিশুতে পরিণত করেছিল। মগধরাজ বৃহদ্রথের সেই পুত্রটি ক্রমে ক্রমে শারীরিক শক্তিতে বলশালী হয়ে উঠল।
কিছুকাল অতিক্রান্ত হলে, আবারও মগধদেশে উপস্থিত হলেন ভগবান চণ্ডকৌশিক। সস্ত্রীক, রাজা, অমাত্যগণ, সুহৃদ্বর্গ-সহ তাঁকে স্বাগত জানালেন। রাজা স্বয়ং পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনের সামগ্রী দিয়ে, পুত্রটিকে মুনিকে নিবেদন করলেন। মুনি রাজাকে জানালেন, দিব্যদৃষ্টিবলে তিনি ইতিমধ্যেই সবকিছু জেনেছেন। মুনি পুত্রটিসম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন। গমনশীল গরুড়ের গতি যেমন অন্য পাখিরা অনুকরণ করতে পারে না, সেইভাবেই অন্য রাজারাও শৌর্যবান এই পুত্রটির অনুকরণে অক্ষম হবেন। এর বিরুদ্ধশক্তিদের বিনাশ হবে। নদীবেগ যেমন পর্বতের কষ্টের কারণ হয় না তেমনই দেবতাদের নিক্ষিপ্ত অস্ত্রসমূহ তাঁর উৎপীড়নের কারণ হবে না। মুনি চণ্ডকৌশিক, জরাসন্ধের ভাবি প্রভাবের বৃত্তান্ত আরও বিশদভাবে বর্ণনা করলেন। সমস্ত রাজাদের জ্যোতির্বলয়ের প্রভাব খর্ব করে তিনি মাথার ওপরে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে অবস্থান করবেন। আগুনের নিকটবর্তী পতঙ্গের মতো তাঁর দ্বারা আক্রান্ত রাজারা সৈন্যবল ও বাহনসহ ধ্বংস হবে। বর্ষায় জলে পরিপূর্ণ নদীগুলিকে যেমন তাঁদের স্বামী সমুদ্র গ্রহণ করে, তেমনই সব রাজাদের সমৃদ্ধি তিনি গ্রহণ করবেন।
কিছুকাল অতিক্রান্ত হলে, আবারও মগধদেশে উপস্থিত হলেন ভগবান চণ্ডকৌশিক। সস্ত্রীক, রাজা, অমাত্যগণ, সুহৃদ্বর্গ-সহ তাঁকে স্বাগত জানালেন। রাজা স্বয়ং পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনের সামগ্রী দিয়ে, পুত্রটিকে মুনিকে নিবেদন করলেন। মুনি রাজাকে জানালেন, দিব্যদৃষ্টিবলে তিনি ইতিমধ্যেই সবকিছু জেনেছেন। মুনি পুত্রটিসম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন। গমনশীল গরুড়ের গতি যেমন অন্য পাখিরা অনুকরণ করতে পারে না, সেইভাবেই অন্য রাজারাও শৌর্যবান এই পুত্রটির অনুকরণে অক্ষম হবেন। এর বিরুদ্ধশক্তিদের বিনাশ হবে। নদীবেগ যেমন পর্বতের কষ্টের কারণ হয় না তেমনই দেবতাদের নিক্ষিপ্ত অস্ত্রসমূহ তাঁর উৎপীড়নের কারণ হবে না। মুনি চণ্ডকৌশিক, জরাসন্ধের ভাবি প্রভাবের বৃত্তান্ত আরও বিশদভাবে বর্ণনা করলেন। সমস্ত রাজাদের জ্যোতির্বলয়ের প্রভাব খর্ব করে তিনি মাথার ওপরে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে অবস্থান করবেন। আগুনের নিকটবর্তী পতঙ্গের মতো তাঁর দ্বারা আক্রান্ত রাজারা সৈন্যবল ও বাহনসহ ধ্বংস হবে। বর্ষায় জলে পরিপূর্ণ নদীগুলিকে যেমন তাঁদের স্বামী সমুদ্র গ্রহণ করে, তেমনই সব রাজাদের সমৃদ্ধি তিনি গ্রহণ করবেন।
শস্যসমৃদ্ধা বিপুলা বসুন্ধরার মতো শুভাশুভ-সহ চতুর্বর্ণের ধারণকারী হবেন রাজা জরাসন্ধ। প্রাণরূপ বায়ুর আজ্ঞাবাহী দেহধারীর মতো সব রাজারা তাঁর আজ্ঞাধীন হবেন। সমস্ত লোকের মধ্যে অতি বলশালী মগধরাজ জরাসন্ধ, ত্রিপুরাসুরের হত্যাকারী বিধ্বংসী রুদ্ররূপ মহাদেবের প্রত্যক্ষ দর্শনলাভ করবেন। জরাসন্ধের ভবিষ্যতবিষয়ে এমন ইঙ্গিত দিয়ে চণ্ডকৌশিক মুনি নিজের কাজের কথা চিন্তা করে বৃহদ্রথকে সসম্মানে বিদায় দিলেন। রাজধানীতে পৌঁছে, জ্ঞাতিপরিবৃত মগধরাজ বৃহদ্রথ, জরাসন্ধকে অভিষিক্ত করে পরম সুখ লাভ করলেন।জরাসন্ধের অভিষেকের পরে, রাজা বৃহদ্রথ, দুই পত্নী-সহ তপোবনে প্রস্থান করলেন। পিতা ও মাতারা বনবাসী হলে জরাসন্ধ নিজের শৌর্যবলে অন্যান্য রাজাদের বশে আনলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৮: শূন্যতা ও পূর্ণতার প্রতীক, রামের প্রিয় অপরূপ হেমন্ত

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৮ : শত্রুরা যখন নিজেদের মধ্যে লড়ে, আখেরে লাভ হয় তৃতীয় ব্যক্তিরই

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫৮: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫০: বালোদক-জাতক—বীরভোগ্যা বসুন্ধরা
দীর্ঘকাল অতিবাহিত হল। রাজা বৃহদ্রথ কঠোর তপশ্চর্যার মাধ্যমে তপোবনে বাস করে পত্নীদের সঙ্গে স্বর্গলাভ করলেন। জরাসন্ধও চণ্ডকৌশিকমুনির ভবিষ্যদ্বাণী-অনুসারে বর লাভ করে, সমগ্র সাম্রাজ্য লাভ করলেন এবং রাজ্য শাসন করতে লাগলেন। কৃষ্ণ জানালেন, ইতিমধ্যে তিনি হংস, ডিম্বক ও কংসকে বধ করবার ফলে, জরাসন্ধের সঙ্গে শত্রুতার সূত্রপাত হল। মগধরাজ জরাসন্ধ, গিরিব্রজনগর হতে নিরানব্বই বার ঘুরিয়ে, গদা নিক্ষেপ করলেন। মথুরাবাসীরা অদ্ভুত সব কাজ করতেন। তাঁদের ধ্বংস করতে নিক্ষিপ্ত সেই অশুভ গদাটি নিরানব্বই যোজন দূরে মথুরায় গিয়ে পড়ল। নাগরিকবৃন্দ সেটি দেখে, কৃষ্ণকে জানালেন। সেই কারণে মথুরার নিকটবর্তী স্থানটি গদাবসান নামে খ্যাত হল। জরাসন্ধের সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রণাভিজ্ঞদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নীতিশাস্ত্রবিদ, অস্ত্রের দ্বারা অবধ্য হংস ও ডিম্বক নামে দুই জন। কৃষ্ণ যাঁদের কথা আগেই যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছিলেন। কৃষ্ণের বিবেচনায়, এই তিনজন, ত্রিলোক ধ্বংস করবার জন্যে যথেষ্ট ছিল। জরাসন্ধ ছিলেন এমনই। বলশালীর সঙ্গে যুদ্ধ নয়—এই নীতি-অনুসরণ করলেন, কুকুর, অন্ধক ও বৃষ্ণিরা। তাঁরা জরাসন্ধকে উপেক্ষা করলেন।
যুধিষ্ঠিরের প্রতি কৃষ্ণের পরামর্শ হল—হংস ও ডিম্বকের পতন হয়েছে। অনুচর-সহ কংসও নিহত, জরাসন্ধহত্যার এখন সেই সময় সমাগত। যুদ্ধে দেবাসুর, সকলে যাঁকে জয় করতে অক্ষম, দৈহিকশক্তি প্রয়োগ করে তাঁকে জয় করতে হবে। কৃষ্ণ, জরাসন্ধহত্যার পরিকল্পনা প্রকাশ করলেন। কেমন হবে সেই পরিকল্পনা? পথনির্দেশরূপ নীতি নির্ধারণ করবেন কৃষ্ণ নিজে,ভীমের আছে শক্তি, তাঁদের দুজনের রক্ষক হবেন জয় অর্থাৎ অর্জুন। যজ্ঞসাধক তিনটি অগ্নির (দক্ষিণাগ্নি, গার্হপত্য ও আহবনীয়) মতো তাঁরা তিন জনে, মগধরাজের মৃত্যু ঘটাবেন। কৃষ্ণ বিশদে বর্ণনা করলেন,নির্জনে তিনজনের মুখোমুখি হলে জরাসন্ধ নিঃসন্দেহে একজনকে যুদ্ধের জন্যে বেছে নেবেন। অন্য দু’জনের সঙ্গে যুদ্ধ অসম্মানজনক, (ভীমের সঙ্গে যুদ্ধের) লোভহেতু, বাহুবলের আধিক্যহেতু গর্বিত জরাসন্ধ যুদ্ধের জন্য নিশ্চিতভাবে ভীমকেই নির্বাচন করবেন। যম যেমন পরিণত জনমণ্ডলীর নিয়ন্তা তেমনই মহাবলশালী মহাবাহু ভীমসেনও তাঁর সমতুল্য প্রতিপক্ষ। যুধিষ্ঠিরের কাছে কৃষ্ণের প্রস্তাব—যদি আপনি আমার মনোভাব বোঝেন,আমার প্রতি যদি আপনার বিশ্বাস থাকে, তবে ভীমসেন ও অর্জুনকে আমায় ন্যাস অর্থাৎ গচ্ছিতরূপে দান করুন। যদি মে হৃদয়ং বেৎসি যদি তে প্রত্যয়ো ময়ি। ভীমসেনার্জ্জুনৌ শীঘ্রই ন্যাসভূতৌ প্রচ্ছন্ন মে।।
যুধিষ্ঠিরের প্রতি কৃষ্ণের পরামর্শ হল—হংস ও ডিম্বকের পতন হয়েছে। অনুচর-সহ কংসও নিহত, জরাসন্ধহত্যার এখন সেই সময় সমাগত। যুদ্ধে দেবাসুর, সকলে যাঁকে জয় করতে অক্ষম, দৈহিকশক্তি প্রয়োগ করে তাঁকে জয় করতে হবে। কৃষ্ণ, জরাসন্ধহত্যার পরিকল্পনা প্রকাশ করলেন। কেমন হবে সেই পরিকল্পনা? পথনির্দেশরূপ নীতি নির্ধারণ করবেন কৃষ্ণ নিজে,ভীমের আছে শক্তি, তাঁদের দুজনের রক্ষক হবেন জয় অর্থাৎ অর্জুন। যজ্ঞসাধক তিনটি অগ্নির (দক্ষিণাগ্নি, গার্হপত্য ও আহবনীয়) মতো তাঁরা তিন জনে, মগধরাজের মৃত্যু ঘটাবেন। কৃষ্ণ বিশদে বর্ণনা করলেন,নির্জনে তিনজনের মুখোমুখি হলে জরাসন্ধ নিঃসন্দেহে একজনকে যুদ্ধের জন্যে বেছে নেবেন। অন্য দু’জনের সঙ্গে যুদ্ধ অসম্মানজনক, (ভীমের সঙ্গে যুদ্ধের) লোভহেতু, বাহুবলের আধিক্যহেতু গর্বিত জরাসন্ধ যুদ্ধের জন্য নিশ্চিতভাবে ভীমকেই নির্বাচন করবেন। যম যেমন পরিণত জনমণ্ডলীর নিয়ন্তা তেমনই মহাবলশালী মহাবাহু ভীমসেনও তাঁর সমতুল্য প্রতিপক্ষ। যুধিষ্ঠিরের কাছে কৃষ্ণের প্রস্তাব—যদি আপনি আমার মনোভাব বোঝেন,আমার প্রতি যদি আপনার বিশ্বাস থাকে, তবে ভীমসেন ও অর্জুনকে আমায় ন্যাস অর্থাৎ গচ্ছিতরূপে দান করুন। যদি মে হৃদয়ং বেৎসি যদি তে প্রত্যয়ো ময়ি। ভীমসেনার্জ্জুনৌ শীঘ্রই ন্যাসভূতৌ প্রচ্ছন্ন মে।।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২২: সঞ্চারিত অনুরাগের রেশ
কৃষ্ণ আবেদন জানালেন। অতঃপর যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন সন্তুষ্ট মুখে অবস্থান করছেন দেখে,প্রত্যুত্তরে বার বার বললেন, পাণ্ডবদের প্রভু ও আশ্রয় অচ্যুত কৃষ্ণ, যেন এমন কথা না বলেন। যুধিষ্ঠির স্বীকার করেন, গোবিন্দ যা বলছেন সেগুলি যথার্থই বটে। তিনি জানেন, লক্ষ্মীর প্রতি যাঁরা বিমুখ, কৃষ্ণ তাঁদের সম্মুখে যান না। জরাসন্ধ নিহত, (কারারুদ্ধ) রাজারা মুক্ত, রাজসূয়যজ্ঞফললাভ—এই সবকিছুই কৃষ্ণের নির্দেশাধীন। যুধিষ্ঠিরের অনুরোধ—নরশ্রেষ্ঠ, জগন্নাথ, সতর্ক হয়ে দ্রুত এই কাজটি সম্পন্ন করুন। তাঁর আকুল প্রার্থনা—ধর্ম্ম, অর্থ ও কামবিহীন রোগাক্রান্ত দুর্গত মানুষের মতো আমি তোমাদের তিনজনকে ছাড়া বেঁচে থাকতে পারি না। ত্রিভির্ভবদ্ভির্হি বিনা নাহং জীবিতুমুৎসহে। ধর্ম্মকামার্থরহিতো রোগার্ত্ত ইব দুর্গতঃ।। যুধিষ্ঠিরের অভিমত, অর্জুনের অস্তিত্ব কৃষ্ণবিনা নেই, আবার কৃষ্ণবিনা অর্জুন, অর্জুন হতে পারেন না। এই পৃথিবীতে এই দুজনের অজেয় কেউ নেই।
যুধিষ্ঠির মনে করেন বলিশ্রেষ্ঠ, কান্তিমান এবং বীর বৃকোদর ভীম, বাকি দু’জনের সঙ্গে মিলিত হয়ে কি না করতে পারেন? অর্থাৎ এই অবস্থায় ভীমের দ্বারা সব কিছুই সম্ভব। একজন বিচক্ষণ সেনানায়কের দ্বারা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত সেনাদল উত্তম কাজ করে থাকে।তা না হলে,সৈন্যবল অন্ধ বা জড়বৎ হয়ে পড়ে। তাই বলা হয়, বিচক্ষণদের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া উচিত। কৃষ্ণের প্রতি উপদেশচ্ছলে বুঝিয়ে বললেন, সুবিধানুসারে কাজ করা উচিত, এটির উদাহরণ হল— যেমন মৎস্যজীবী ধীবরগণ নীচু জায়গা হতে এবং যেখানে ছিদ্র সেখান হতেই জল নিয়ে থাকে। যুধিষ্ঠির বললেন, ধীবরদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে, কার্যসিদ্ধির জন্য পৃথিবীখ্যাত, কৌশলপ্রয়োগে বিশেষজ্ঞ, কৃষ্ণকে আশ্রয় করে তিনি চেষ্টা করে চলেছেন।
যুধিষ্ঠির মনে করেন বলিশ্রেষ্ঠ, কান্তিমান এবং বীর বৃকোদর ভীম, বাকি দু’জনের সঙ্গে মিলিত হয়ে কি না করতে পারেন? অর্থাৎ এই অবস্থায় ভীমের দ্বারা সব কিছুই সম্ভব। একজন বিচক্ষণ সেনানায়কের দ্বারা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত সেনাদল উত্তম কাজ করে থাকে।তা না হলে,সৈন্যবল অন্ধ বা জড়বৎ হয়ে পড়ে। তাই বলা হয়, বিচক্ষণদের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া উচিত। কৃষ্ণের প্রতি উপদেশচ্ছলে বুঝিয়ে বললেন, সুবিধানুসারে কাজ করা উচিত, এটির উদাহরণ হল— যেমন মৎস্যজীবী ধীবরগণ নীচু জায়গা হতে এবং যেখানে ছিদ্র সেখান হতেই জল নিয়ে থাকে। যুধিষ্ঠির বললেন, ধীবরদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে, কার্যসিদ্ধির জন্য পৃথিবীখ্যাত, কৌশলপ্রয়োগে বিশেষজ্ঞ, কৃষ্ণকে আশ্রয় করে তিনি চেষ্টা করে চলেছেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪০: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বুনো শুয়োর

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী
কাজে সাফল্যের জন্য বুদ্ধি, কৌশল, শক্তি, অধ্যবসায় এবং সাম-দান-দণ্ড-ভেদ প্রভৃতি উপায়সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা যাঁর আছে সেই কৃষ্ণকে সামনে রেখে তিনি কাজে প্রবৃত্ত হয়েছেন। কৃষ্ণের কাছে যুধিষ্ঠিরের প্রস্তাব— কার্যসিদ্ধির জন্যে অর্জুন যদুকুলশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণের, ভীম অর্জুনের, অনুসরণ করবেন। শৌর্যপ্রকাশ করতে হলে, নয় অর্থাৎ কৌশলরূপ কৃষ্ণ, জয়হেতুরূপ অর্জুন এবং বলের আধারূপ ভীম—এই তিনের সমন্বয়ে সাফল্যলাভ সম্ভব হবে। অর্জুনঃ কৃষ্ণমন্বেতু ভীমোঽন্বেতু ধনঞ্জয়ম্। নয়ো জয়ো বলঞ্চৈব বিক্রমে সিদ্ধিমেষ্যতি।। যুধিষ্ঠিরের বক্তব্য শেষ হলে, কৃষ্ণসহ বিপুল তেজস্বী ভাইরা মগধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তাঁদের পরনে তেজস্বী স্নাতক গৃহস্থ ব্রাহ্মণদের বেশ, শুভাকাঙ্খীরা শুভেচ্ছাবার্তায় তাঁদের অভিনন্দন জানাল। তাঁরা ক্রোধে উত্তপ্ত হলেন। জ্ঞাতিরাজগণের উদ্ধারের জন্যে যেন সূর্য, চন্দ্র এবং অগ্নির মহাতেজধারণকারী তাঁদের শরীরগুলি উদ্দীপ্ত হল। ভীমের সামনে কার্যোদ্ধারে উদ্বুদ্ধ, যুদ্ধে অজেয়, কৃষ্ণ ও অর্জুনকে দেখে, সকলে মনে করল, জরাসন্ধ মৃত। সবকাজের নিয়ামক, ধর্ম অর্থ, কামের ও সব লোকের প্রেরণা, সেই দু’জন মহাত্মা ছিলেন স্বয়ং ভগবান। কুরুদেশ হতে তাঁদের যাত্রা শুরু হল, মধ্যে ছিল কুরুজাঙ্গল দেশ, মনোরম পদ্ম সরোবর। ক্রমে তাঁরা কালকূটদেশ অতিক্রম করে, গণ্ডকী, মহাশোণ, সদানীরা এবং একপর্বতকদেশের সব নদী পার হলেন। এর পরে সুন্দরী সরযূনদী অতিক্রম করে, পূূর্বকোশলদেশ দেখে, চর্মন্বতীনদী পার হয়ে মিথিলায় উপস্থিত হলেন। কুশের কৌপীনবেশধারণকারী এবং মহাবীর্যশালী তাঁরা তিনজন, পূবমুখে গঙ্গা ও শোননদী উত্তীর্ণ হয়ে মগধদেশে পৌঁছলেন। অবশেষে কৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীমসেন সর্বদাই গোধনে ভরপুর, বহু জলাশয়, শুভ তরুরাজিসমাকীর্ণ গোরথপর্বতে উপস্থিত হয়ে মগধনগর দেখতে পেলেন।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
মগধরাজ জরাসন্ধ, চণ্ডকৌশিকমুনির বরপুত্র। জরা রাক্ষসীর অনুগ্রহে তিনি জীবন লাভ করেছিলেন। দেবাদিদেব মহাদেবের প্রত্যক্ষদর্শনলাভে ধন্য হয়েছিল তাঁর জীবন। দিব্যদ্রষ্টা মুনি চণ্ডকৌশিকের ভবিষ্যদ্বাণী সবটাই সত্যে পরিণত হল। অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হলেন জরাসন্ধ। জরাসন্ধের পিতা বৃহদ্রথের প্রতি কৃতজ্ঞা জরা, জরাসন্ধের জীবনদান করে প্রত্যুপকার করেছিলেন। কৃষ্ণের বর্ণানুসারে, চতুষ্পথে নিক্ষিপ্ত দ্বিখণ্ডিত শিশুশরীরকে রক্তমাংসভোজিনী রাক্ষসী জরা গ্রহণ করেছিলেন তে চতুষ্পথনিক্ষিপ্তে জরা নামাথ রাক্ষসী। জগ্রাহ মনুজব্যাঘ্র! মাংসশোণিতভোজনা।। বিধাতার বিধানানুসারে জরা, কুড়িয়ে পাওয়া দেহাংশ দুটোকে সুখজনক একটি আকৃতি দিয়ে সংযুক্ত করেছিলেন। কর্ত্তুকামা সুখবহে শকলে সা তু রাক্ষসী। সংযোজয়ামাস তদা বিধানবলচোদিতা।।
জরা রাক্ষসী হলেও সমবেদনা, কৃতজ্ঞতাবোধ, প্রত্যুপকারের তাগিদ, এই মানবিক সুকুমারবৃত্তি তাকে মহীয়সীর মহিমা দান করেছে। জরা যাঁকে জীবনদান করল তিনি কিন্তু ভাগ্যের কৃপাধন্য মানবজনমের অবমাননা করেছেন। জরাসন্ধের জন্মবৃত্তান্ত প্রমাণ করে, মানুষের অমূল্য জন্ম অনুকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে হলেও সেটির তথাকথিত সাফল্য বা পূর্ণতা ব্যক্তিবিশেষের মানসিকতানির্ভর। জরাসন্ধের জন্ম প্রতিকূলতাপূর্ণ হলেও বিধাতা তাঁর প্রতি সদয়, তাই তিনি চণ্ডকৌশিকমুনি ও রাক্ষসী জরার আনুকূল্যে একটি সুস্থ শরীর লাভ করে ক্রমে ক্রমে পৈত্রিক মগধরাজপদ লাভ করেছেন। তিনি কিন্তু তাঁর এই দৈবদত্ত জীবনে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তাঁর মন্ত্রণাদাতার অভাব ছিল না। তিনি মথুরাবাসীদের উত্যক্ত করলেন। সমন্ত্রী জরাসন্ধের অপরিমিত শক্তিকে সমীহ করে কৃষ্ণের যাদবকুল জরাসন্ধকে উপেক্ষা করলেন। প্রকৃত বুদ্ধিমান ব্যক্তিত্বরা প্রবলের সঙ্গে বিরোধিতা, উচিত কাজ বলে মনে করেন না। তাঁরা শুধু সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করে থাকেন। প্রখর শাণিত বুদ্ধিবলে কৃষ্ণ অর্জুন ও ভীমের সাহায্য নিয়ে জরাসন্ধবধের পরিকল্পনা করেছেন।
জরাসন্ধ তাঁর দুই মন্ত্রণাদাতার মৃত্যুতে সহায়হীন হয়েছেন। তাঁর রয়েছে অসীম দৈহিক শক্তি। মন্ত্রণাহীন বৌদ্ধিক উৎকর্ষতা হারিয়ে মানুষের জন্যে পড়ে থাকে শুধু দৈহিকবলের দরুণ আত্মতৃপ্তি। জরাসন্ধ, এর ব্যতিক্রম নন। সমপর্যায়ের সমশক্তিধর মানুষের মুখোমুখি হতে তিনি পিছুপা হন না। কৃষ্ণ অনুমান করেছেন, মহাবীর ভীম জরাসন্ধের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী। অর্জুন হবেন কৃষ্ণ ও ভীমের রক্ষক। জীবনযুদ্ধে সমপর্যায়ের প্রতিপক্ষ প্রয়োজন, সঙ্গে থাকবেন কৃষ্ণের মতো নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা, সুরক্ষা বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন অর্জিতশক্তিবলে আত্মবিশ্বাসী অর্জুনের মতো কোন নিকটজন। তবেই হয়তো যুদ্ধজয় সম্ভব।
জরা রাক্ষসী হলেও সমবেদনা, কৃতজ্ঞতাবোধ, প্রত্যুপকারের তাগিদ, এই মানবিক সুকুমারবৃত্তি তাকে মহীয়সীর মহিমা দান করেছে। জরা যাঁকে জীবনদান করল তিনি কিন্তু ভাগ্যের কৃপাধন্য মানবজনমের অবমাননা করেছেন। জরাসন্ধের জন্মবৃত্তান্ত প্রমাণ করে, মানুষের অমূল্য জন্ম অনুকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে হলেও সেটির তথাকথিত সাফল্য বা পূর্ণতা ব্যক্তিবিশেষের মানসিকতানির্ভর। জরাসন্ধের জন্ম প্রতিকূলতাপূর্ণ হলেও বিধাতা তাঁর প্রতি সদয়, তাই তিনি চণ্ডকৌশিকমুনি ও রাক্ষসী জরার আনুকূল্যে একটি সুস্থ শরীর লাভ করে ক্রমে ক্রমে পৈত্রিক মগধরাজপদ লাভ করেছেন। তিনি কিন্তু তাঁর এই দৈবদত্ত জীবনে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তাঁর মন্ত্রণাদাতার অভাব ছিল না। তিনি মথুরাবাসীদের উত্যক্ত করলেন। সমন্ত্রী জরাসন্ধের অপরিমিত শক্তিকে সমীহ করে কৃষ্ণের যাদবকুল জরাসন্ধকে উপেক্ষা করলেন। প্রকৃত বুদ্ধিমান ব্যক্তিত্বরা প্রবলের সঙ্গে বিরোধিতা, উচিত কাজ বলে মনে করেন না। তাঁরা শুধু সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করে থাকেন। প্রখর শাণিত বুদ্ধিবলে কৃষ্ণ অর্জুন ও ভীমের সাহায্য নিয়ে জরাসন্ধবধের পরিকল্পনা করেছেন।
জরাসন্ধ তাঁর দুই মন্ত্রণাদাতার মৃত্যুতে সহায়হীন হয়েছেন। তাঁর রয়েছে অসীম দৈহিক শক্তি। মন্ত্রণাহীন বৌদ্ধিক উৎকর্ষতা হারিয়ে মানুষের জন্যে পড়ে থাকে শুধু দৈহিকবলের দরুণ আত্মতৃপ্তি। জরাসন্ধ, এর ব্যতিক্রম নন। সমপর্যায়ের সমশক্তিধর মানুষের মুখোমুখি হতে তিনি পিছুপা হন না। কৃষ্ণ অনুমান করেছেন, মহাবীর ভীম জরাসন্ধের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী। অর্জুন হবেন কৃষ্ণ ও ভীমের রক্ষক। জীবনযুদ্ধে সমপর্যায়ের প্রতিপক্ষ প্রয়োজন, সঙ্গে থাকবেন কৃষ্ণের মতো নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা, সুরক্ষা বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন অর্জিতশক্তিবলে আত্মবিশ্বাসী অর্জুনের মতো কোন নিকটজন। তবেই হয়তো যুদ্ধজয় সম্ভব।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
যুধিষ্ঠিরের,পাণ্ডবসহায় কৃষ্ণের নেতৃত্বের মূল্যায়ন, বোধ হয় দলপতির সার্বিক পথপ্রদর্শকরূপে ভূমিকাসম্বন্ধে একটি স্বচ্ছ ধারণা দেয়। যে কোনও বড় দলগত লক্ষ্যে পৌঁছনোর মূলে আছে সঠিক নেতৃত্ব। যেমন বিচক্ষণ সেনানায়কের পরিচালনায় সৈন্যদল শ্রেষ্ঠ কাজ করে থাকে, তা না হলে তারা অন্ধ ও জড়ের মতো প্রতীয়মান হয়। সুপ্রণীতো বলৌঘ হি কুরুতে কার্য্যমুত্তমম্। অন্ধং জড়ং বলং প্রাহুঃ প্রণেতব্যং বিচক্ষণৈঃ।। সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার প্রসঙ্গে যুধিষ্ঠিরের ধারণাটি খুব স্পষ্ট ও প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, নীচু ও ছিদ্রযুক্ত জায়গা থেকে যেমন ধীবররা জল সংগ্রহ করে, তেমনই সুযোগ ও সুবিধার অপেক্ষায় থেকে, তার সদ্ব্যবহারের মধ্যেই সাফল্য নিহিত থাকে। কৃষ্ণের মতো আদর্শ পথপ্রদর্শকের, বুদ্ধি, কৌশল, বল, সাম দান দণ্ড ভেদ ইত্যাদি উপায়সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক।
কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের বক্তব্যে আছে যে কোন বড় পরিকল্পনা বা কার্যসিদ্ধির রূপরেখা। মহাভারতের অন্তর্লোকের পরতে পরতে আছে অনেক জীবনযুদ্ধেে প্রস্তুতির দিগ্দর্শন। মহাভারতের কথার নির্যাস সমুদ্রমন্থনের পরে অমৃতের মতোই চিরন্তন নয় কী?—চলবে।
কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের বক্তব্যে আছে যে কোন বড় পরিকল্পনা বা কার্যসিদ্ধির রূপরেখা। মহাভারতের অন্তর্লোকের পরতে পরতে আছে অনেক জীবনযুদ্ধেে প্রস্তুতির দিগ্দর্শন। মহাভারতের কথার নির্যাস সমুদ্রমন্থনের পরে অমৃতের মতোই চিরন্তন নয় কী?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















