
রহস্য-রোমাঞ্চ ঠিক কীরকম? আভিধানিক অর্থ ধরে এগোলে রহস্যে একরকম গোপনীয় বিষয় থাকবে, আর রোমাঞ্চ হল যা গায়ের লোম খাড়া করে দেবে। সুতরাং এমন কোনও গোপন বিষয়ের উদ্ঘাটন হয় এখানে যার পথে থাকে শিহরণ, বুক দুরুদুরু “কী হয় কী হয়” ভাব। আজ সত্যজিৎ রায়ের দুটি রহস্যনির্ভর ছবি সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথের শেষ দৃশ্য।
সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথে একটি করে বা একাধিক অজ্ঞাত বিষয়ের পশ্চাতে ছুটে চলেন রহস্যভেদী ফেলু প্রদোষচন্দ্র মিত্র। একটিতে আছে বালক মুকুল এবং তার পূর্বজন্মের সূত্র ধরে বর্তমানে ঘনিয়ে ওঠা সঙ্কটের সমাধান, সঙ্গে পূর্বজন্মকে কেন্দ্র করে জেগে থাকা রহস্যলোকটিকেও সত্যের আলোয় খুঁজে দেখা, বুঝে দেখা। তাই শেষপর্যন্ত অপরাধীকে চিনে ওঠাতেই অনুসন্ধান শেষ হয় না যেন, তা আরও দূরগামী হয়ে হয়ে ওঠে এক উন্মোচন, একান্ত একটি দর্শন। অন্য কাহিনীতে এক যথার্থ অনুসন্ধিৎসু রহস্যবেত্তার সত্যোদ্ঘাটনের পাশেই থাকে নিছক রহস্যপ্রিয় রোমাঞ্চলিপ্সুর সাজিয়ে তোলা আবডাল, যা অনায়াসেই সরে যায়। তবে অ্যান্টিক গণেশের পরিবর্তে নকল গণপতির উদ্ধারলাভেও প্রকৃত সত্যভেদীকে পরাজিত অথবা বিপথগামী করা যায় না, কারণ সত্য ধ্রুব, সত্যনিষ্ঠা-ও অভ্রান্ত। তাই এই সাজানো পুতুলখেলার মাঝেও আত্মপ্রকাশ করে ভয়াল অপরাধী, সিরিয়াস অপরাধ, অপরাধমনস্ক মানুষের অন্তর্লোক। “অপরাধী কে’র তত্ত্ব অতিক্রম করে সোনার কেল্লার মতো জয় বাবা ফেলুনাথেও তাই জেগে ওঠে গভীর মনস্তত্ত্ব, প্রবল জীবনবোধ। এই দুটি ছবির অন্তিম দৃশ্য দুটি আজ থাকুক আলোচনায়, কালানুক্রমের বিচারে সোনার কেল্লা এগিয়ে থাকলেও, প্রথমে থাকুক জয় বাবা ফেলুনাথ।
সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথে একটি করে বা একাধিক অজ্ঞাত বিষয়ের পশ্চাতে ছুটে চলেন রহস্যভেদী ফেলু প্রদোষচন্দ্র মিত্র। একটিতে আছে বালক মুকুল এবং তার পূর্বজন্মের সূত্র ধরে বর্তমানে ঘনিয়ে ওঠা সঙ্কটের সমাধান, সঙ্গে পূর্বজন্মকে কেন্দ্র করে জেগে থাকা রহস্যলোকটিকেও সত্যের আলোয় খুঁজে দেখা, বুঝে দেখা। তাই শেষপর্যন্ত অপরাধীকে চিনে ওঠাতেই অনুসন্ধান শেষ হয় না যেন, তা আরও দূরগামী হয়ে হয়ে ওঠে এক উন্মোচন, একান্ত একটি দর্শন। অন্য কাহিনীতে এক যথার্থ অনুসন্ধিৎসু রহস্যবেত্তার সত্যোদ্ঘাটনের পাশেই থাকে নিছক রহস্যপ্রিয় রোমাঞ্চলিপ্সুর সাজিয়ে তোলা আবডাল, যা অনায়াসেই সরে যায়। তবে অ্যান্টিক গণেশের পরিবর্তে নকল গণপতির উদ্ধারলাভেও প্রকৃত সত্যভেদীকে পরাজিত অথবা বিপথগামী করা যায় না, কারণ সত্য ধ্রুব, সত্যনিষ্ঠা-ও অভ্রান্ত। তাই এই সাজানো পুতুলখেলার মাঝেও আত্মপ্রকাশ করে ভয়াল অপরাধী, সিরিয়াস অপরাধ, অপরাধমনস্ক মানুষের অন্তর্লোক। “অপরাধী কে’র তত্ত্ব অতিক্রম করে সোনার কেল্লার মতো জয় বাবা ফেলুনাথেও তাই জেগে ওঠে গভীর মনস্তত্ত্ব, প্রবল জীবনবোধ। এই দুটি ছবির অন্তিম দৃশ্য দুটি আজ থাকুক আলোচনায়, কালানুক্রমের বিচারে সোনার কেল্লা এগিয়ে থাকলেও, প্রথমে থাকুক জয় বাবা ফেলুনাথ।
তবে তার-ও আগে, অন্তিম দৃশ্যের ব্যঞ্জনা, সার্থকতা ও বৈশিষ্ট্যের দিকটি স্মরণীয়। শিল্পের পথে, প্রাচ্য-পাশ্চাত্ত্য ধারায় সম্মিলিতভাবেই মিলনান্তক ও বিয়োগান্তক দু’রকমের ছবিই দর্শকের কাছে বিশিষ্ট হয়ে উঠতে পারে তার নিজের গুণে। মিলনান্তক পরিণতি দর্শককে পূর্ণতার দিকে যদি নিয়ে যায়, তবে বিয়োগান্তক পরিণতিতে শূন্যতা জেগে ওঠে, এ নিয়ে সংশয় থাকার কথা নয়। তবে সেই শূন্যতার, বিচ্ছেদের পথেও অনন্তের গোপন, অধরা মাধুরীকে ছন্দোবন্ধনে স্পর্শ করার একটা বার্তা, আকাঙ্ক্ষা, প্রয়াস থেকে যেতে পারে। সার্থকতা সেখানেই। এই মিলন ও বিয়োগের মাঝেও থেকে যায় অগণ্য স্তর, বহু অপূর্ব অনুভূতি, নানা রং। শেষ দৃশ্য সেভাবেই রঞ্জিত করে, তাড়িত করে, বিস্মিত করে, চমত্কৃত করে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : পর্ব-৫৯: আকাশ এখনও মেঘলা

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৯: মহাভারতের কথা অমৃতসমান কেন?
জয় বাবা ফেলুনাথের শেষ অংশের শেষ লগ্নে যখন সকল “রহস্য” উদ্ঘাটিত, ধরা পড়ে গেছে কুচক্রী মগনলাল, ফাঁস হয়ে গেছে তার চোরাচালানের চক্র, ভেকধারী মছলীবাবার আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে থানায়, ভালোমানুষ সেজে থাকা মন্দবুদ্ধি বিকাশ সিংহ-ও পুলিশের জালে, এমনকী যাকে ঘিরে এতকিছু সেই বহুমূল্য গণেশ-ও দাদু-নাতির রহস্য-ছলনায় আত্মগোপন করে থাকতে পারেনি, তিনি স্বয়ং ব্যাঙ্কের লকারে, তাঁর প্রতিরূপ নকলটিকে ঘিরেই যত লোভ-হত্যা-দ্বন্দ্ব, সবই উন্মোচিত উদ্ঘাটিত। সত্যসন্ধানী ফেলুকে ফেল করানো যায় না। এবার পাবে সে তার পরিশ্রমের পারিশ্রমিক। পারিশ্রমিক কি? ছোট্ট রুকু, ক্যাপ্টেন স্পার্ক রুক্মিণীকুমার জিজ্ঞাসু হয়। ফেলু তার নাতিদীর্ঘ ভাষণে রহস্যভেদের শেষ পর্দাটিও তুলে ধরেছে তখন। এবার সে চেয়ে বসে ওই প্রতিরূপ গণেশটিকেই, অবিলম্বে পেয়েও যায়, যার এতো বুদ্ধি তার সিদ্ধিলাভ ঠেকায় কে? সিদ্ধিদাতা গণপতি তাঁর হন। হোক না নকল, প্রতিরূপ। রুকু বুঝে ফেলে এটিই হল পারিশ্রমিক। ছোটদের বোঝা – না বোঝা, চাওয়া-পাওয়া নিয়ে বড়দের ভাবনা থাকে কি ততো? দাদু ততক্ষণে ভেবেই আকুল হন, সব তো হল, সত্যোদ্ঘাটন, রহস্যভেদ। কিন্তু এসব গোয়েন্দা বোঝে কী করে রহস্যপ্রিয় দাদু ভেবেই পান না। বড়রা তাদের ভাবনা-চিন্তাকে অভ্রান্ত ভাবে, ভুল বলে কোনও কিছু তাদের অভিধানে নেই। তাই এই গভীর রহস্যের জট ছাড়ানোর শর্টকাট পদ্ধতি বুঝি দাদু জানতে চান, সকলের বড় হয়েও কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না। সকলের ছোট রুকু কিন্তু বুঝে ফেলে অনায়াসে। কীসের জোরে ফেলুদা বুঝে যায় সবকিছু? কী আবার, মগজাস্ত্র। অমলিন বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা তাকে সিদ্ধ করে। তাই পেশীশক্তি, অর্থ, অস্ত্র কিছুই তার বাধা নয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৮ : শত্রুরা যখন নিজেদের মধ্যে লড়ে, আখেরে লাভ হয় তৃতীয় ব্যক্তিরই

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৪: ত্রিপুরায় রিয়াং বিদ্রোহ
সোনার কেল্লায় তখন হঠাৎ করেই মুকুলের ঘোর কেটে গেছে। নকল হাজরার ছদ্মবেশে ভবানন্দকেই সে আসল হাজরা ভেবেছিল, এই জন্ম আর গতজন্মের মধ্যে মনে মনে আসা-যাওয়া করতে করতে সত্য-মিথ্যার ভেদটুকু তার শিশুমনে ততটা স্পষ্ট হচ্ছিল না। স্পষ্ট হল, যখন নকল হাজরা রাজস্থানের দুর্গের গলি-ঘুঁজি, মোড়ে মোড়ে সন্ধানী দৃষ্টি মেলে খুঁজছিল গুপ্তধন আর মুকুল খুঁজে পাচ্ছিল আরেক গুপ্তধন তার ফেলে আসা জন্মের বাল্যকাল। বাধ সাধল একটা ময়ূর, নকল হাজরা তার দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করল। ময়ূরে তার বড় ভয়। গুলি চালানোর মুহূর্তে মুকুল তাকে ঠেলা দিল, গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। মুকুল আর ধরা দিল না, সে বুঝে ফেলল তার স্বরূপ, বলে উঠল “তুমি দুষ্টু লোক।” তারপর ফেলুদা এল সদলবলে, অপরাধী ধরা পড়ল, গল্প শেষ, কিন্তু রহস্য তো শেষ হয় না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী
তার এতদিনের আকাঙ্ক্ষিতের মুখোমুখি হয়ে একটা দোতলা বাড়ির ভগ্নস্তূপে তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে মুকুল। যে সত্যকে, স্বপ্নকে, জন্মকে সে মনে মনে এতদিন লালন করে এসেছে তা এখন নির্জন মৃত এক পাষাণপুরী ছাড়া আর কি? একদিকে সেই অতীত, আরেকদিকে অনন্ত জীবন। ফেলুদা তখন জানিয়ে দিচ্ছে, “গুপ্তধন নেই, পূর্বজন্ম থাকলেও নেই, না থাকলেও নেই।” কারণ সে জেনে ফেলেছে সত্যটি। মুকুল তার অতীত জীবনের দুর্মূল্য ধনরত্নের কথা বললেও, সেগুলো হয়তো তাদের নয়, তার বাবা ছিলেন মণিকার, তাই বাড়িতে সে দামি পাথর দেখতেই পারে। তবে এসব বিশ্বাসে মেলানোর কথা, চেনা তত্ত্বের জানা পথে তার সমাধান নেই। তবে তাতেও কিছু আসে যায় না, মুকুলের ঘুমিয়ে থাকা মন, প্রাণের ওপর দিয়ে একঝলক বসন্তবায়ুর মতো ছুঁয়ে দিয়ে গেছে সেই পাষাণপুরী। লুকোচুরি খেলার শেষে সেখানে এখন নবসন্ধ্যার বাতাসে জেগে ওঠা ফুল দুলছে। নকল হাজরাকে পাঁজাকোলা করে থানায় জমা করতে চলে যায় বিশালদেহী ট্যাক্সি-ড্রাইভার। সকলকে চমত্কৃত করে, আশ্চর্য করে দিয়ে মুকুল সেই ওপরতল থেকে হেসে ওঠে খিলখিল করে, বড় নিষ্পাপ সেই হাসি।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
ফিরতে হবে, যেতে হবে, ছেড়ে যেতে হবে, ছেড়ে চলে যেতে হবে শুনে মুকুলের মুখ খানিক বিষণ্ণ হয়। কোথায় যাব? তুমি কোথায় যেতে চাও? আমি বাড়ি যাব, কলকাতায়। বিষণ্ণতা ত্যাগ করে এই জেগে ওঠা জীবনবেদটি এই ছবির সম্পদ। আমরা সকলে হয়তো ফিরতে চাই। মুকুল ফিরে চলে তার বাড়িতে, তার শিকড়ে, যাকে সে এইমাত্র চিনলো, জানলো। আর এখানেই ছবিটি অপরাধতত্ত্ব, মনস্তত্ত্বের পথ বেয়ে বেয়ে উত্তীর্ণ হয় বৃহত্তর জীবনের কূলে। হয়ে ওঠে আত্মবিচ্ছিন্নের শিকড় সন্ধানের ভাষ্য। এখানে অতীতে না ফিরতে পারার বিয়োগ আছে, আছে হৃদয়ের বন্ধন, নিজের প্রতিবেশের দিকে ধাবমান মিলনাকাঙ্ক্ষা। তাই ছবির শেষে “ফিরতে চাইলে ফেরা যায় নাকী”জনিত বড়দের দুনিয়ার যাবতীয় সংশয়বেদনাকে দূরে সরিয়ে শৈশবের ঘরে ফেরার গান বেজে ওঠে। ফেলু সগর্বে পাশ করে, জীবন-ও বুঝি। জীবনের “জয়” সেখানেই, সেখানেই দুর্গম দুর্গ, কেল্লার যতো রহস্যের মেঘ কেটে স-ব হয়ে ওঠে হিরণ্ময়। কীভাবে? এই রহস্যের সমাধান কি মগজাস্ত্রেও মেলে?—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।।


















