রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
উত্তম সুচিত্রার যে রোম্যান্টিক যুগ তারও ঝলকানির শেষ দিক উপস্থিত হয় এই বছরের শুরু থেকে। সমান্তরালে জায়গা নিতে থাকে নবাগতা নায়িকারা, ছবির প্রেক্ষিত এবং আবেদন দুটোই বদলাতে শুরু করে এই সময়ের হাত ধরে।

‘সাথীহারা’ ছবিটি সেরকমই একটি বদলে যাওয়া সময়ের প্রতিচ্ছবি। একজন গায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন যিনি সুরসাধক। এর আগে পরেও উনি গায়কের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে সমস্ত ভূমিকাকেই উনি এক অন্য মানে প্রতিষ্ঠা করার হিম্মত দেখিয়েছেন। আমরা ‘সাথীহারা’ ছবিটির ফ্রেম টু ফ্রেম আলোচনা করলে দেখতে পাবো ক্যামেরায় উত্তমবাবুর উপস্থিতি অনেকটা চিন্তাশীল মননের পরিচয় দিয়েছিলেন।
১৯৬১ সালের বাংলা চলচ্চিত্র ‘সাথীহারা’ হল উত্তম কুমার ও মালা সিনহা অভিনীত একটি রোম্যান্টিক ড্রামা যা, কুন্দন ও রূপা নামের দুই ভবঘুরে গায়কের কাহিনি অনুসরণ করে। শুরুতে একে অপরের প্রেমের ব্যাপারে অজ্ঞাত থাকলেও পরিস্থিতি, তাদের ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি করতে বাধ্য করে। সুজন নামের একজন সংগীত পরিচালকের পাল্লায় পড়ে তাদের জীবনে নেমে আসে বিচ্ছেদ ও ভুল বোঝাবুঝি অবশেষে কাহিনীর হাত ধরে কুন্দন রূপাকে উদ্ধার করে মিলন সম্পন্ন করে।

ফণী মজুমদারের কাহিনি ও চিত্রনাট্যের উপর সংলাপ লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের গীত রচনায় সুর আরোপ করেছিলেন বম্বে নিবাসী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
উত্তম কুমারের যে সমস্ত ছবি কেরিয়ারের প্রথম থেকে গায়ক রূপী মিউজিক্যাল হিট প্রায় দু একটা বাদ দিলে সবকটিতেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরের জাদু কাজ করেছে। এই ছবির মানচিত্র বড়ই বিচিত্র কারণ উত্তম কুমার নামক বা বাণিজ্যিক ছবির কান্ডারীকে নানা রকম চরিত্রে রূপদান করতে ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল আমরা যদি উত্তমকুমার নামক ক্ষণজন্মা একজন অভিনেতার সারস্বত মূল্যায়ন করি তাহলে এবছরের গ্রাফ খুব একটা মনোরম হবে না।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৩ : ফেলুদার শেষদৃশ্য— শেষের পরে, শেষের পারে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ

এ প্রসঙ্গে আমরা সেই বছরে উত্তম কুমারের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতে পারি। মাত্র ছয়খানা ছবি সেই বছর মুক্তি পেয়েছিল। আগামী দু বছরের মধ্যেই উত্তম বাবুর ব্যক্তিগত জীবনে একটি ভয়ংকর বাঁক এসে উপস্থিত হচ্ছে যার প্রস্তুতি পর্ব সে বছরের গোড়া থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

সে সময়ে সারা বছরে বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছিল মাত্র ৩৫ টি আর উত্তমবাবুর ফিল্মোগ্রাফ ১৯৬১ থেকে ৬২ সালে অত্যন্ত সংখ্যায় কমে যায়। এর কারণগুলো কিন্তু এই ছয় খানা ছবি নয়। মাত্রিক কোন ছবির মধ্যে গতানুগতিকতা বা রিপিটেশন রিপিটেড একঘেয়েমি নেই। ছটি ছবির পরিচালকের মানও আলাদা।

অনেকগুলো ভাঙ্গা-গড়াকে সঙ্গে নিয়ে সে বছরের ছবির জগত। কারণ প্রতিটা ছবির মান উত্তম বাবুকে আগামী দিনের জন্য অন্যভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করেছিল। বিগত পাঁচ সাত বছর, বছরে ১২ খানা করে ছবির মুক্তির যে ইতিহাস উনি নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একটা বড়সড়ো রদবদল ঘটেছিল। ১৯৬১ সাল থেকে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : পর্ব-৫৯: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৪: ত্রিপুরায় রিয়াং বিদ্রোহ

ছবিটির মূল্যায়নে কতকগুলি স্তর আমরা বিবেচনা করতে পারি।
প্রথমত: উত্তম কুমারের চোখের অভিব্যক্তি। এ ছবিতে উত্তমবাবু চোখমুখ কোন অনিশ্চয়তায় ভোগা চোখমুখ ছিল না বরং নিশ্চয়তার একটা পাল্লা ভারী মৌখিক অভিব্যক্তি দু চোখের ভাষায় ফুটে উঠেছিল। ছবিটা যেহেতু মিউজিক্যাল হিট ছিল সে কারণেই বোধ হয় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দুচোখ দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল।

দ্বিতীয়ত: যে সুচিত্রা সেন ছাড়া উত্তমবাবুর এই রোম্যান্টিক জার্নি, প্রায় অসমাপ্ত বলে মানুষ মনে করতেন তাদেরও ‘যেন কিছুই হয়নি’ এরকম একটা মনোভাব নিয়ে দর্শকদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া সুচিত্রা সেন ছাড়া অন্য নায়িকাদের সাথেও উত্তম বাবু কতটা সাবলীল।

দর্শকদের দু’চোখ সংলাপের পর সংলাপের মোড়কে যখন সুকুমার দাসগুপ্তের ক্যামেরার সামনে সুচিত্রা সেনকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সে সময় কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন দর্শকদের ভাবিয়ে তুলছিল, অনেক তো হলো এবার একটু অন্য নায়িকার সাথে উত্তমবাবুকে মেনে নিতে শিখুন।

তৃতীয়ত: নায়িকা বিহনে উত্তমবাবু যখন একক বিরহ দৃশ্যের পটচিত্র নির্মাণ করছেন সেখানেই তিনি ধরা পড়েছেন। কারণ সুচিত্রাহীন অবস্থায় বিগত ছবিগুলিতে তাঁর যে মনন, যে আকুতি সেটা যেন কোথায় টোল খেয়ে যাচ্ছে নবাগতা নায়িকার বিরহে। খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে ছবিটিতে অতিরিক্ত স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছিলেন উত্তমবাবু। যেকোনও মুহূর্তে সংলাপের চাবুকে যেন বেশি করে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠছিলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৯: মহাভারতের কথা অমৃতসমান কেন?

যে উত্তমকুমার ‘নায়ক’ তৈরির অনেক আগে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ‘ক্যামেরার সামনে একটুখানি বাড়ানো মানে দশগুণ বেড়ে যাওয়া’ তিনিও এই বাড়াবাড়িটাকে মনের অচেতনে কোথাও যেন প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছেন।

পরিচালকের উদ্দেশ্যে অদৃশ্যভাবে যেন বলতে চাইছেন আমার সেই কাম্য প্রিয়া কোথায়? যাকে ছাড়া বিরহের দৃশ্য এভাবে অঙ্কন করা যায় না আপনি কি তাকে আর একবার ফিরিয়ে আনতে পারবেন! যে কারণে পুনর্মিলন দৃশ্য যখন রচিত হচ্ছে উত্তমবাবুর চেতনার জগত, কোনও এক সুদুরে যেন বাধা পেয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণ তৃপ্তির দিকে পুনর্মিলন দৃশ্যে যে ছবি আঁকা দরকার তার কোথাও যেন একটা খামতি পড়ে যাচ্ছিল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

আমাদের মনে রাখতে হবে ব্যক্তি উত্তম আর দু বছরের মধ্যেই নিজের জীবন-ছককে গতানুগতিক ধারা থেকে একটু ওলটপালট এর দিকে নিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু সেই অচেনা সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার আগে মানুষের আন্তরিক বেদন, যেমন দোটানায় ভাবুক হয়ে ওঠে উত্তমবাবুও মনে মনে সেই ভাবুকতাকে মূলধন করে ক্যামেরা সামনে দাঁড়াচ্ছিলেন।

সে কারণে শেষ দৃশ্যে যখন ‘ময়না কথা কও, কেন চুপটি করে রও’ গানটির চিত্রায়ন আমাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছে সেখানে অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এক নায়ককে আমরা দেখতে পাই। যদিও ছবির প্রয়োজনে সেটা কাম্য ছিল। কিন্তু এর আগেও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত উত্তম বাবুকে এখানে বিবর্ণ লাগেনি যতটা লেগেছে এ গানের চিত্রায়নে।
কলকাতায় বৃষ্টি
চতুর্থত: এ ছবির মূল সম্পদ ছিল ছবিটির প্লেয়ার কাস্টিং। প্রতিটা ফ্রেমে যেভাবে অভিনেতা অভিনেত্রীদের বিনিময় চিত্রনাট্য দাবী করেছিল সেভাবেই প্রত্যেকটি কুশীলবের থেকে পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্ত প্রাপ্য আদায় করে নিয়েছেন এবং দর্শকদের কাছে ঝুলি ভরে উপহার দিয়েছেন।

ছবিটির সবচেয়ে বড় সম্পদ হেমন্ত মুখার্জী ও গীতা দত্ত নামক দুই মহারথীর কন্ঠ মাধুর্য। গানের প্রতিটা ভাষার সঙ্গে সুরের যে দাম্পত্য কোথাও যেন সেই অনিন্দ্য সুন্দর মুখখানি আমাদের মানসপটে বারবার দাবি এনে দিচ্ছিল। কিন্তু মালা সিংহ নামক একজন গুণী অভিনেত্রীর ছন্দোময়তায় আমরা সার্থক ছবিই উপহার পেয়েছি। সুতরাং এ ছবির প্রতিটা অংশই মেধার দিক দিয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকার দাবিই রেখেছে।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content