
“টু” ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে এক খুদে অভিনেতা।
মুশকিল হল এই যে, শিশুদের জগৎটা বড়দের দুনিয়ার মতো যদি নাও হয়, শিশুরা বড়দের ক্ষুদ্র সংস্করণ তো বটেই। পৃথিবীর সকল প্রাণিদের একটা শৈশবকাল থাকে। পাড়ার কালু ভুলু থেকে সকল মনীষী, দেবতা, ঋষি কিংবা রাজা-গজা সকলেই ছোট ছিলেন এককালে। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, শিবের ছোটবেলার কথা শোনা যায় না অবশ্য। আবার, ইতিহাস-পুরাণ ও বর্তমান-প্রসিদ্ধ সকলকিছুই এই পণ্যের দুনিয়ায় বাচ্চাদের কাছে বাচ্চা হয়ে আসছেন। ছোটা ভীম, ছোটা গণেশ ছাড়াও হিম্যান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান এদের সার্থকতা ছোটদের বড় স্বপ্নগুলোকে ধন্য করেই। জয় বাবা ফেলুনাথের রুকুর ঘরে আমরা একদিন ঢুকেছিলাম। দরিদ্র অপুর কাশফুলের মাঠ থেকে মুকুলের মধ্যবিত্ত স্বপ্ন, কল্পনা আর জন্মান্তরের স্মৃতির আশেপাশে অসহায়তা দানা বাঁধে, তবে তা সাময়িক। অনন্ত আনন্দময় জীবনের উত্সার-ই সেখানে মুখ্য।
সে যাই হোক, আজকের শিশু এমন কল্পলোকে ভাসে, এমনভাবেই কি হিরোইজম গড়ে ওঠে তাদের মর্মে মর্মে নাকি তারা ছোট থেকেই বড়, আজন্ম পরিণত, শৈশব তাদের আদৌ আছে কীনা নাকি তা কেবল স্মরণযোগ্য নস্টালজিয়ামাত্র, তাও একটা স্বতন্ত্র আলোচনার ক্ষেত্র। আজকের পণ্যায়িত বিশ্বে খবর থেকে খাবার, মানুষ থেকে মনুষ্যত্ব সকলের কিছু না কিছু দাম হিসেবের কড়িতে মাপা। আজকের শিশু তার ব্যতিক্রম নয়। তার শৈশব, খেলা, আনন্দ, বিনোদন, বেড়ে ওঠার পথে অজস্র উপকরণ, শৈশবকে মধুর করার জন্য। অপু যে ট্রেন দেখতে, রেলগাড়িকে সঙ্গে করে একটা জীবনপথ পাড়ি দিল, সেই রেলগাড়ি থেকে সমরাঙ্গণের নানা অস্ত্র সম্ভার, অদ্ভুত কাল্পনিক চরিত্র কিংবা আলপিন থেকে এলিয়েন কিংবা এলিফ্যান্ট আজ শিশুর খেলনা হয়ে দেখা দেয়।

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৪ : প্রতিদ্বন্দ্বী-গণশত্রু: অন্তর্লোকের অ্যানাটমি

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬
সমস্যাটা এখানেই যে, শিশুকে শিশু ভেবে উঠতে গেলে যে ঔদার্য লাগে ততটা বড়দের থলিতে থাকে না। বরং তাদের “নেহাত্ বাচ্চা”ভাবাতেই তাদের বড় ফানুস বেশ হাওয়া পায়। ছোট থাকা, ছোট করে রাখা, বাড়তে না দেওয়া, ছোট করে দেখা, দমিয়ে রাখা, নানা সামাজিক বৈষম্য তৈরি করে যে বড়রা তারা ভুলেও যায় শিশুরাও শরীরে মনে বড় হয়ে ওঠে। বড়দের এই অদ্ভুত নিয়ম-বেনিয়ম-নিয়মহীন-হিসাবহীন অবস্থার মাঝে দোদুল্যমান ত্রিশঙ্কু সমাজ-দুনিয়ায় প্রশ্রয়, শাসন থাকলেও আশ্রয় নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়, সকল শাসন, পালন, তর্জন-প্রশ্রয়ের শেষে যে আশ্রয় বীজকে মহীরূহ করে।

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪০: কেঁচো খুঁড়তে কেউটে

উত্তম কথাচিত্র,পর্ব-৭২ : গলি থেকে রাজপথ
টু ছবিটির নানা দৃশ্য ও দৃশ্যান্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অন্য কোনও পর্বে করা যাবে। আজ সেই শিশুটিকে দেখি যে অপুর কাশবন, মুকুলের মধ্যবিত্ত জীবনের বাইরে বৈভবে বাঁচে। তো সেই ভোগবৈভব ও একাকী নিঃসঙ্গ জীবন তাকে কী শেখায়? তার বিত্তবান মা বাবা পেশার তাগিদে চলে যান, ছেলেটির জন্য সাজানো থাকে নানা বিনোদনের সম্ভার, কিংবা ভার। তার ছুটি বা মুক্তি নীল আকাশে, মাঠে, দিঘির ঘাটে, ধুলোয় ঘাসে নয়, বরং ঔপনিষদীয় প্রেয়ঃ আর শ্রেয়ের তত্ত্বে উপন্যস্ত সহজপাঠের মতোই আপাত রমণীয় প্রেয়ঃ তাকে আবিষ্ট করে এই আধুনিক জগতে। যে আধুনিক জগতে পুঁজি ঈশ্বর, যে আধুনিক বিশ্ব যুদ্ধোত্তর, এবং বারুদের সঙ্গে বাঁচে।

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮২: ত্রিপুরা : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি ঊনকোটি
বড়লোকের ছেলে বাতায়নপথে একে একে তার বৈভব দেখায়। গরিবের ছেলে দমে গিয়েও দমে না। বাঁশি, ঢোল, তীর ধনুক, মুখোশ একে একে আনে। জিততে জিততেও হেরে যায় প্রদর্শনের দুনিয়ায়। আরক্ত মুখে, আনতশিরে ফিরে যায়। ধনীর দুলাল জিতে যায় বৈভবে, প্রদর্শনে, রুচিতে, শৌর্য আর বাঁদিকের বুকপকেটে। যেমনটা বরাবর হয়েছে আর কী! কিন্তু এরপর একটা ঝটকা, বিত্তহীন ছেলেটি ঘুড়ি ওড়ায়, যে মুক্তিকে বৈভবে মাপা যায় না। উদ্ধত বৈভব এয়ারগানের নিঁখুত লক্ষ্যভেদে ঘুড়ির বাধাহীন ওড়ার দর্পচূর্ণ করে অনতিবিলম্বে, যেমনটা হয়ে এসেছে আর কী! বসুন্ধরা তো বীরভোগ্যা বলেই প্রসিদ্ধা, জোর যার মুলুক তারই হয় জলে স্থলে আকাশে, এটাই তো হবে, এতে বিচিত্র কী! আনন্দের, উদযাপনের অধিকারটুকুও সেভাবেই ছিনিয়ে নিতে হয়, একটু বুদ্ধি করলেই হয়।

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!
এই হারজিতের ছক কেউ কষে দেয়নি। কিন্তু আজকের বিশ্বের হাটে বিকিকিনির মাণদণ্ডের মায়া জীবনকে এই হারা জেতার লাভ ক্ষতির অনিবার্য শিক্ষায় দীক্ষিত করতে চায় আশৈশব। আজকের শৈশব বেলুন, বাঁশি, ঘুড়ি আর মুক্ত জীবনানন্দের সুর-ছন্দ আত্মস্থ করবে নাকি নকল গোঁফের মিথ্যা শৌর্য আর উদ্ভ্রান্ত ভয় ধরানো শব্দ, তামাসা, মেকি উদ্দাম মজায় মজবে, তা নিয়ে ছোট ছোট ভাবনার সময় বড়দের হাতে বড় একটা আছে কি? —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















