শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

একসঙ্গে।

আমারে আটোমা গেলাচা। সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা আবলুশ কাঠের মতো রং। ছিপছিপে চেহারা। এসেছিল ইথিওপিয়ার জিম্মা শহর থেকে। জিম্মা ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে ৩৫৪ কিলোমিটার দূরে। ডাক্তার জন কেম্পেন ওকে আমার কাছে অবজারভারশিপের জন্য পাঠিয়েছিলেন। জন কেম্পেন এক অদ্ভুত মানুষ। হার্ভার্ড ছেড়ে থিওপিয়ায় গিয়ে চোখের ডাক্তারি করছেন। ধর্মভীরু খ্রিস্টান। দেখতেও যিশু খ্রিস্টের মতো। জন লিখেছিলেন, আমি আমারেকে ইউভিয়াইটিসের ট্রেনিং দিতে পারি কিনা। ভালোই তো, আমার শিক্ষা, আমার অভিজ্ঞতা যদি কারও কাজে লাগে। তার উপর আফ্রিকার লোকেদের। এর আগে ভারতের বাইরে থেকে কিছু চিকিৎসক আমার কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে গিয়েছে। ওভি সোফিয়া এসেছিলেন ইন্দোনেশিয়া থেকে। বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে এসেছিলেন যাহেদুর রহমান ও রঞ্জু খারেল। প্রশিক্ষণ নিয়েছেন কেনিয়াবাসী জাফরজি-ও।
আমারেকে সাদর আমন্ত্রণ জানালাম। আমার রিসার্চ ফেলো জানাকিরামন গেলেন এয়ারপোর্ট থেকে ওকে আনতে। হোয়াটসঅ্যাপ কাজ করছে না। কোনওক্রমে ই-মেলে মারফত যোগাযোগ করে গেস্ট হাউসে আনা হল। দু’দিন গেস্ট হাউসে রাখার পর হাসপাতালের কাছাকাছি একটা হোটেলে তাঁর থাকার বন্দোবস্ত করা হয়। একমাস ছিলেন আমারে। ভালো ভাবে শেখার চেষ্টা করেছিলেন। বাড়িতে একদিন ডিনারে ডেকেছিলাম। ছাত্র থেকে এক সময় বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন আমারে। যাবার আগে বলেছিলাম, তোমার জিম্মা শহরে সু্যোগ হলে যাবো। সেই সু্যোগটা এসেও গেল। এবার সিওইসিএস (COECSA) মানে কলেজ অফ অফথালমোলজি ইস্টার্ন, সেন্ট্রাল এবং সাউথ আফ্রিকার অ্যানুয়াল মিটিং হবে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা-তে। ওরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ওদের মিটিংয়ে লেকচার দেবার জন্য। ভাবলাম ইথিওপিয়ায় যাবো, সেই সঙ্গে আমারের জিম্মাতে গিয়ে দেখে আসবো, ও কি রকম কাজ করছে। মিটিং ছিল ২০ থেকে ২২ আগস্ট। চেন্নাই থেকে আদ্দিস আবাবার সরাসরি বিমান আছে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের। মিটিং শেষ করে ডোমেস্টিক ফ্লাইট নিয়ে চলে যাবো জিম্মাতে আমারের কাছে। ইথিওপিয়া যেতে ভিসা লাগবে। কনফারেন্স ভিসা পাওয়া একটু জটিল। জন বললেন, আপনি টুরিস্ট ভিসা নিয়ে নিন। ষাট ডলার। মানে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। জন ওর বাড়ির ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিলেন। দু’দিনের মধ্যে আমার ছবি-সহ টুরিস্ট ভিসা এসে গেল। জন বললেন, আদ্দিস আবাবা-তে ওর বাড়িতেই থাকতে। ওর একটা স্টুডিয়ো রুম আছে। আমার অসুবিধা না হলে ওখানে আমি থাকতে পারি। আমি কেন রাজি হব না?
আরও পড়ুন:

হোম স্টে কোদাইকানাল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাণ্ডার

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৫ : Twoকি!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪০: বেচারা বড় কষ্টে আছে, মহর্ষি সাহায্য পাঠিয়েছিলেন সাত হাজার টাকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪১: কারুর কেউ নই-কো আমি…

২১ আগস্ট সকাল ১০টা ১০-এ বিমান। জন আমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে আসতে পারবে না। ও দিনই ওঁর হাসপাতাল পরিদর্শনে আসছে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তাই ওঁর সেখানে না থাকলে চলবে না। তবে জন-এর গাড়ির চালক থাকবে। গাড়ির ও চালকের ছবি হোয়াটসঅ্যাপ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। না, তার আর দরকার হল না। আমারে জানালেন, তিনি এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করতে থাকবেন। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স খারাপ নয়। তবে ছয় ঘণ্টার জার্নিতে কোনও ‘ইনফ্লাইট প্রোগ্রাম’ নেই। ইয়ার ফোনে জয়তী চক্রবর্তীর গান শুনে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে দেওয়া গেল। নন-ভেজিটেরিয়ান খাবারটা বেশ ভালোই ছিল। ইমিগ্রেশন খুব ফ্রেন্ডলি। জিনিসপত্তর সংগ্রহ এবং কাস্টমস ক্লিয়ার করে বেরোতেই দেখি এক দঙ্গল ট্যাক্সি ড্রাইভার।প্যাসেঞ্জার চাইছে। এতো চেন্নাই কিংবা দিল্লি এয়ারপোর্টের মতো অবস্থা। ওই তো আমারে অপেক্ষা করছে আমার জন্য।
কলকাতায় বৃষ্টি

আমারে আতমা গেলাচা ও আমি জিম্মার ন্যাশনাল হোটেলের লনে।

আদ্দিস আবাবা ইথিওপিয়ার ক্যাপিটাল। ২৩৫৫ ফুট উঁচু পাহাড়ের উপর শহরটা। রাস্তা আমাদের দেশের মতো। একটু আধটু খারাপ আছে। জনের টয়োটা গাড়ি। ড্রাইভারের নাম বিজিগা। ইংরেজি জানেন। আমরা প্রথমে গেলাম জন কেম্পেনের হাসপাতালে। জন বোস্টন ছেড়ে আজ দশ বছর এই হাসপাতালে কাজ করছে, আফ্রিকার মানুষের সেবা করছে। হাসপাতালের নামটা বিদঘুটে। ম্যায়াঙ্গুয়ান হাসপাতাল। একজন কোরিয়ান এই হাসপাতালটা জনস্বার্থে তৈরি করেছিলেন। হাসপাতালে পৌঁছতে দেখি জন দাঁড়িয়ে আছেন গেটে। সত্যিই নিবেদিত প্রাণ মানুষটি। নিজে ঘুরিয়ে দেখালেন পুরো হাসপাতাল। ছিমছাম হাসপাতাল। আই ডিপার্টমেন্ট খুব বড় নয়। আমারে আমাকে বললেন, আপনি ছয় ঘণ্টা জার্নি করে এসেছেন এখন ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন। আমারে যেন আমার মনের কথাটা বলে ফেললেন। ফেরার রাস্তার বেশ খানিকটা খারাপ বলা যায়। আমাদের দেশের আধা-শহরের মতো। ড্রাইভার বিজিগা খানা-খন্দ বাঁচিয়ে সুন্দর পৌঁছে দিলেন জনের বাড়িতে। রাতে জনের বাড়িতেই খাওয়া হল। যাকে বলে টিপিক্যাল অ্যামেরিকান ডিনার। ব্রেড, স্যুপ, স্যালাড, বেকন, ইয়োগার্ট। জনের স্ত্রী স্কুল শিক্ষিকা। এক ছেলে। বয়স বারো-তেরো বছর হবে। স্কুলের পরীক্ষা দিচ্ছে। আমার স্টুডিয়ো রুমটা খারাপ ছিল না। তবে শাওয়ারের জন্য জনের বাথরুম ব্যবহার করতে হচ্ছিল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৮: সুনীতির পথ জন্মান্তরে

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, সুন্দরবনের বারোমাস্যা পর্ব-১২৬: সুন্দরবনের পাখি: গুলিন্দা বাটান

মিটিং হচ্ছে আদিস আবাবার স্কাইলাইট হোটেলে। ইথিওপিয়ায় এমন একটা আধুনিক ফাইভ স্টার হোটেল থাকবে ভাবতে পারিনি। আমার তিনটে লেকচার ছিল। আফ্রিকান চিকিৎসকরাই মূল শ্রোতা। কিছু প্রশ্নও করলেন কয়েকজন। মিটিং শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আদিস আবাবার কিছুই দেখা গেল না। এখানে নাকি একটা সুন্দর পার্ক আছে। ইউনিটি পার্ক। আছে একটা দেখার মতো মিউজিয়াম। আমার মূল লক্ষ্য, জিম্মায় আমারের কাছে যাওয়া। রাতে জনের বাড়িতে ক্যান্ডল লাইট ডিনার। তবে ভাগ্য ভালো একটু রাইস ছিল।

পরদিন সকালে উঠে জিম্মার প্লেন ধরতে হবে। ৮টা ১৫-তে বিমান। ডোমেস্টিক এয়ারপোর্ট থেকে ছাড়বে। এখানে সিকিউরিটি চেক খুব কড়াকড়ি। প্রথমে ঢুকতেই একবার, তারপরে আরেক দফা চেক ইন। সিকিউরিটি চেক করার পর যে বোর্ডিং গেটের কাছে যাব তার উপায় নেই। ছোট্ট এয়ারপোর্ট। তাই বিমান ছাড়ার ঠিক পনেরো মিনিট আগে গেটে পৌঁছতে পারলাম। এরোব্রিজ তো দুরের কথা বাস-টাসও নেই। হ্যান্ড লাগেজ সঙ্গে নিয়ে হেঁটেই যেতে হবে প্লেনে উঠতে। বিমানটি পুরনো স্টাইলের। বিরাট ফ্যান, বনবন করে ঘুরছে। উপরে স্বচ্ছ নীল আকাশ। রাইট ব্রাদার্সের মতো মনে হল নিজেকে। তিরিশ-চল্লিশ জনের মতো লোক ধরে বিমানটিতে।
কলকাতায় বৃষ্টি

জিম্মা শহরে সূর্যাস্তের আকাশ।

ঘোষণা ইথিওপিয়ান ভাষায়, সঙ্গে ইংরেজিও ছিল। ব্রেকফাস্ট ছিল অবশ্য বিমানে। তবে বিফ স্যান্ডউইচ। তাই খেতে পারলাম না। চল্লিশ মিনিটেই ল্যান্ড করে গেল জিম্মা এয়ারপোর্টে। ছোট্ট এয়ারপোর্ট। জিম্মা একটা ছোট টাউন বলা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যান এসেছে আমাদের নিয়ে যেতে। আমারে কি আমাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে? না, উনি বললেন, তাঁর ঘর ছোট। ওখানে আমি থাকতে পারবো না। আমার অসুবিধা হবে। তাই তিনি আমাকে হোটেলেই তুললেন। হোটেলের নাম ন্যাশনাল হোটেল। ভালো হোটেল। হোটেলের রিসেপশনে এক বিরাট কফি কাপের ছবি। ভিতরে ফুটন্ত কফি। আসলে কফির জন্ম এই জিম্মা শহরেই। কফি আবিষ্কারের ইতিহাসও ফ্রেম করে বাঁধানো রয়েছে রিসেপশনের দেওয়ালে। ইতিহাসে আছে, কালডি নামে এক মেষপালক দেখলেন তার ভেড়ারা একধরনের গাছের ফল খাওয়ার পর বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। কালডি তখন নিজেও এই ফল খেয়ে দেখলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে কালডি খুব চনমনে হয়ে উঠলেন। কালডির এই অদ্ভুত ব্যবহার দেখতে পেয়ে একজন সন্ন্যাসী এই ফলগুলোকে তাঁদের মনাস্ট্রিতে নিয়ে যান। সেখানে তাঁরা এই ফল খাবার পর সারারাত্রি সজাগ এবং উজ্জীবিত হয়ে থাকেন। এখান থেকেই জন্ম হয় কফির, যা আজ পৃথিবীর প্রান্তে প্রত্যন্তে ছড়িয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮২: ত্রিপুরা : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি ঊনকোটি

কালডি এই কফি আরব মার্কেটে আনেন। সেই থেকে এই কফির নাম হয় আরবিকা কফি। এই হোটেলে দেখলাম আলাদা করে এই কফি তৈরি হচ্ছে। স্টোভে জল গরম করে কেটলি করে সেই জল কফিতে যত্নে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমিও নিলাম ছোট্ট কাপে জিম্মার কালো আরবিক কফি। জিম্মার মেষ শাবকদের মতোই আমারও বেশ চনমনে লাগলো। জিম্মার মূল আকর্ষণ কফি। আমারে আমাকে কফির প্যাকেট দিতে চাইল। আমাকে কালকেই মিটিংয়ের শেষে জিম্মার কফি দু’ প্যাকেট উপহার দিয়েছে ইথিওপিয়ার একজন স্পিকার। ব্যাগে আর বেশি জায়গা নেই। তাই নিলাম না। কফি খেয়ে রওনা হলাম জিম্মা বিশ্ববিদ্যালয় আর হাসপাতাল দেখতে। বিশ্ববিদ্যালয়টি বেশ বড়। আমাদের দেশের যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাল্টিস্পেসালিটি হাসপাতাল আছে। আজ শনিবার, আউটডোর বন্ধ। সারা হাসপাতাল পরিষ্কার করা হচ্ছে। আফ্রিকা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। আই ডিপার্টমেন্টটা মেন হাসপাতাল থেকে আলাদা। ছোট্ট একটা বাগানের ভিতরে হাসপাতাল। হাসপাতালের ভিতর ওপিডি রুম। ভিশন চেক, রিফ্রাকশন। স্লিট ল্যাম্প সব আছে। তবে ইনডায়রেক্ট অফথ্যালমোস্কোপ নেই। আমরা ঠিক করেছি, শঙ্কর নেত্রালয় থেকে একটা ইনডায়রেক্ট অফথ্যালমোস্কোপ ডোনেট করবো। আমি হাসপাতালে পৌঁছতেই আমারে বললেন, আপনার জন্য সব ছাত্ররা অপেক্ষা করে আছে। লেকচার শুনবে। জনা কুড়ি ছাত্র। সবাই জিম্মার। ছোট্ট ক্লাস ঘর। সেখানে টেবিলের উপর প্রোজেক্টর লাগিয়ে সরাসরি দেওয়ালে পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইডে দেখালাম চোখের ইনফ্লামেশনের উপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক ঘণ্টার উপর ক্লাস নিলাম। ওরা মুগ্ধ হয়ে শুনল। এরকম ক্লাসের সুযোগ ওরা বেশি পায় না। ওরা সকলে গ্রুপ ফটো এবং সেলফি তুলল। এত আতিথেয়তা পেয়ে একটু অপ্রস্তুত লাগছিল।
কলকাতায় বৃষ্টি

আমারে পরিবার।

এবার ইউনিভার্সিটির ভিতরটা ঘুরলাম। ভিতরে অনেক গাছ-গাছালি। আমারে এবার আমাকে আমার হোটেলে নিয়ে এলেন লাঞ্চের জন্য। হোটেলের লনে লাঞ্চের আয়োজন করেছে আমারে। রাইস আর মাটন নিলাম। আমারে নিলেন বিফ। এখানে লোকে বিফ বেশি খায়। এর মধ্যে দেখি আমারের স্ত্রী জেনেবু, ওদের বড় মেয়ে মিল্কি আর ছোট ছেলে ওডা এসে গিয়েছে। জেনেবু একটু রোগা। আসলে আফ্রিকার বেশির ভাগ লোক রোগা, ছিপছিপে। জেনেবু একটা নেভি ব্লু জ্যাকেট আর সাদা স্কার্ট পরেছে। কন্যা ও পুত্র পরেছে উজ্জ্বল রঙের পোশাক। ওদের পরিবার খুব সুন্দর। জেনেবু দেখি আমার জন্য সুন্দর প্যাকেটে ইথিওপিয়ান শাল এনেছে। আবার একটা লাল আর সবুজ রঙে মেশানো পাগড়িও আছে। পাগড়ি পরে শালটাকে জড়িয়ে ছবি তুললাম হোটেলের লনে। এই সব মানুষের সরল ভালোবাসাকে কোনও দাঁড়িপাল্লায় মাপা সম্ভব নয়। স্বচ্ছ জলের মতো।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র,পর্ব-৭২ : গলি থেকে রাজপথ

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

লাঞ্চের পর আমারে বললেন, আপনি কি এখন রেস্ট নিতে চান, না আমাদের এই ছোট্ট শহরটাকে একটু দেখবেন? জিম্মা শহরে এসেছি, একটু দেখবো না তাই হয় নাকি? আমারে বললেন, একটু হাঁটতে পারবে তো। বললাম পারবো। তবে কত কিলোমিটার। আমারে বলেছিলেন, এক কিলোমিটার। জনান্তিকে বলে রাখি, ওটা কোনও মতেই তিন কিলোমিটারের কম হবে না। রাস্তা খুব নিরাপদ। ব্রাজিলে গিয়েছিলাম মাস তিনেক আগে একটা কনফারেন্সে। ওখানে আমার বন্ধু পার্থর চেন চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। তবে একটু ছোট্ট বিপদ হয়ে ছিল। রাস্তায় এক ইথিওপিয়ান পাগলের মুখোমুখি। কি বিপদ! একে পাগল, তারপর ভাষা বুঝি না। আমারেও কিছু একটা বললো, ওদের ভাষায়। কিছু খুচরো টাকা ধরিয়ে দিতে নিস্তার পেলাম। শহরের ভিরত একটা বিজনেস সেন্টার আছে। একটা ব্রিজ ক্রস করে যেতে হবে। ব্রিজটা বেশ সুন্দর। ওখান থেকে শহরের অনেকটা দেখা যায়। অনেকে ছবি তুলছে ব্রিজের উপর। আমরাও তুললাম কিছু। এই ছোট শহরের রাজা ছিলেন কিং আবু জিফার। শহরের মাঝখানে তাঁর একটা সুন্দর স্ট্যাচু আছে। ১৮৭৮ সাল থেকে ১৯৩২ সাল অবধি উনি রাজত্ব করেছিলেন।

না, শুধু শহরটা দেখলে হবে না, একটু শপিং করবো না তা হয় নাকি? বিজনেস সেন্টারটা একটু দূরে। আরও হাঁটতে হবে। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। ট্যাক্সি বলে কিছু নেই। টয়োটা গাড়ি শেয়ার ট্যাক্সি করে চালাচ্ছে। ওখানে একসঙ্গে বসে যাওয়া কঠিন। শেষমেশ হেঁটেই চলে গেলাম একটা শপিং সেন্টারে। সেখানে জেনেবু আমার মেয়ে সুমেধার জন্য পছন্দ করে দিল একটা ইথিওপিয়ান কারুকার্য করা পোশাক। সাদা ফ্রকের মতো। লাল-সবুজ বর্ডার। দাম কম নয়, ১৫০ ডলার। সঙ্গে একটা বড় পুঁতির হার ফাউ। বাইরে এখন ঝমঝমে বৃষ্টি। কোনওক্রমে একটা টয়োটাকে বেশি টাকা দিয়ে রাজি করিয়ে হোটেলে পৌঁছলাম। আর মাংস নয়। একটু ভাত আর মিক্সড সব্জি নিলাম।
কলকাতায় বৃষ্টি

জিম্মা ন্যাশনাল হোটেলে বিরাট কফি কাপের ছবি।

এখানে সন্ধ্যা সাতটা মানে বিকেল। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পরিষ্কার জিম্মার আকাশ তখন রঙের খেলায় মেতেছে। কি অপূর্ব দৃশ্য। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। কালকে ফেরত যাবো। জিম্মা থেকে আদ্দিস আবাবা হয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরবে। আমারে আমাকে জিম্মা এয়ারপোর্টে চেক ইন পর্যন্ত করে দিয়ে সেফ জার্নি বলে চলে গেলেন। বসে আছি ফ্লাইটের জন্য। কোনও খবর নেই। এয়ারপোর্টের একজন এসে নির্লিপ্ত মুখে বলে গেলেন ফ্লাইট ডিলেয়ড। ইনকামিং ফ্লাইট কখন আসবে ঠিক নেই। বিশাল বিপদ। সাড়ে ছ’টায় আদ্দিস আবাবা থেকে আমার কানেক্টিং ফ্লাইট।

অবশেষে চারটেয় ফ্লাইট ছাড়ল জিম্মা থেকে। নেমে ডোমেস্টিক টার্মিনাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনালে যেতে হবে। এয়ারপোর্টে ঢুকতেও সিকিউরিটি চেক। এই সব করে যখন চেক ইন কাউন্টারে পৌঁছলাম তখন বলল তোমার ফ্লাইট এয়ারলাইন্স অলরেডি রিশিডিউল করে রেখেছে। মাঝ রাতে মুম্বই নিয়ে যাবে আরেকটা ইথিওপিয়ান ফ্লাইট। সেখানে থেকে দুপুর বারোটায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স নিয়ে যাবে চেন্নাই। মানে আমি চেন্নাই পৌঁছবো আগের দিন রাত সাড়ে দশটার জায়গায় পরদিন বিকেল আড়াইটায়। পরদিন ওপিডিতে আছে। রোগীরা আসবেন। সব ভোগে যাবে। হায়, এই কি সেফ জার্নি! এই অভিজ্ঞতা যেমন মনে থাকবে, তেমনি মনে থাকবে জিম্মায় আমারের ছোট্ট হাসপাতাল, হোটেলের কেটলিতে সারভ করা ব্ল্যাক কফি, যা সেখানকার মেষপালকের আবিষ্কার আর নয়ন ভোলানো সূর্যাস্ত। হ্যাঁ, আর আবলুশ কাঠের রঙের ছিপ ছিপে তুমি আমারে আটোমা গেলাচা।

ছবি: লেখক।

*ডাঃ জ্যোতির্ময় বিশ্বাস সাহিত্যের জগতে পদচারণা করেন ডাকনামে। ‘সবুজ বিশ্বাস’ নামে তিনি একাধিক সাহিত্যকেন্দ্রিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। বাচিক শিল্পেও তাঁর প্রবল আগ্রহ। এই মুহূর্তে বাচিকশিল্পে আমাদের রাজ্যে যাঁরা স্বনামধন্য, তাঁরা অধিকাংশই ডাঃ বিশ্বাসের বন্ধুস্থানীয়। ছাত্রজীবনে, এই শহরে এমবিবিএস পাঠকালে একসঙ্গে এ-মঞ্চে, সে-মঞ্চে কবিতা আবৃত্তি করেছেন। পরে পেশাগত কারণে বিদেশযাত্রা ও গবেষণাকর্মের শেষে শংকর নেত্রালয়ে যোগদানের ফলে সেই বাচিকশিল্পের সঙ্গে সেই যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে উঠেছে। চেন্নাই শহরের বাঙালিসমাজের যে কোনো অনুষ্ঠানে অবশ্য এখনো তিনি আবৃত্তি পরিবেশন করেন। ডাঃ বিশ্বাস চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বনামধন্য। ভারতের প্রথম শ্রেণির একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। তিনি চেন্নাইয়ের শংকর নেত্রালয়ের অন্যতম ডিরেক্টর।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content