
ছবি : প্রতীকী।
একবিংশ শতাব্দীর মানুষ অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত উন্নতির যুগে বাস করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মহাকাশ অভিযান, জিন-প্রযুক্তি, ডিজিটাল যোগাযোগ—সবই মানুষের জীবনকে করেছে অনেক দ্রুততর এবং সুবিধাসম্পন্ন। কিন্তু সেই সঙ্গে মারাত্মক ভাবে বেড়েছে মানসিক উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পরিবেশ সংকট, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং আত্মপরিচয়ের সংকট। বাহ্যিক উন্নতির মধ্যেও মানুষ যেন ক্রমাগত নিজের অন্তর্নিহিত শান্তি হারিয়ে ফেলছে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে —হাজার হাজার বছর আগে রচিত উপনিষদ কি আজও আমাদের জন্য সেই ভাবে প্রাসঙ্গিক?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, উপনিষদ কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, সত্যের অনুসন্ধান এবং জীবনের চূড়ান্ত অর্থ অন্বেষণের অনন্য সাধারণ এক দলিল। বৈদিক সাহিত্যের অন্তিম পর্ব হিসেবে উপনিষদ ভারতীয় দর্শনে পরিচিত। এখানে কোনও সংকীর্ণ সম্প্রদায়গত চিন্তা নেই; বরং আছে সর্বজনীন মানবিকতার বাণী। তাই যুগ পাল্টালেও উপনিষদের আবেদন আজও অমলিন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, উপনিষদ কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, সত্যের অনুসন্ধান এবং জীবনের চূড়ান্ত অর্থ অন্বেষণের অনন্য সাধারণ এক দলিল। বৈদিক সাহিত্যের অন্তিম পর্ব হিসেবে উপনিষদ ভারতীয় দর্শনে পরিচিত। এখানে কোনও সংকীর্ণ সম্প্রদায়গত চিন্তা নেই; বরং আছে সর্বজনীন মানবিকতার বাণী। তাই যুগ পাল্টালেও উপনিষদের আবেদন আজও অমলিন।
উপনিষদের মূল প্রশ্ন—“আমি কে?” এই প্রশ্ন আজও কিন্তু সমান প্রাসঙ্গিক। আধুনিক মানুষ নিজের পরিচয়কে পেশা, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ভার্চুয়াল জগতের জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। কিন্তু উপনিষদ জানায়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় বাহ্যিক নয়; তার অন্তরে নিহিত আত্মসত্তাই তার আসল পরিচয়। তাই বলা হয়েছে—
“तत्त्वमसि”
অর্থাৎ, “তুমিই সেই পরম সত্য।”
এই উপলব্ধি মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে, অহংকারমুক্ত করে এবং জীবনের গভীর অর্থ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
উপনিষদের আর একটি মহৎ বাণী—
“अहं ब्रह्मास्मि”
অর্থাৎ, “আমিই ব্রহ্ম।”
এই উক্তির উদ্দেশ্য শুধু আত্মগরিমা বৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অসীম সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সৃজনশীলতা, জ্ঞান এবং নৈতিক শক্তির উৎস বিদ্যমান—এই বিশ্বাস আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
অর্থাৎ, “তুমিই সেই পরম সত্য।”
এই উপলব্ধি মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে, অহংকারমুক্ত করে এবং জীবনের গভীর অর্থ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
উপনিষদের আর একটি মহৎ বাণী—
অর্থাৎ, “আমিই ব্রহ্ম।”
এই উক্তির উদ্দেশ্য শুধু আত্মগরিমা বৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অসীম সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সৃজনশীলতা, জ্ঞান এবং নৈতিক শক্তির উৎস বিদ্যমান—এই বিশ্বাস আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আরও পড়ুন:

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৮০ : আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

এই দেশ এই মাটি, পর্ব-১০৬ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৫
আজকের পৃথিবীর অন্যতম বড় সংকট মানসিক অস্থিরতা। উদ্বেগ, হতাশা, প্রতিযোগিতার চাপ, একাকিত্ব এবং ভোগবাদী জীবন মানুষকে ক্লান্ত করে তুলছে। উপনিষদ এই সমস্যার সমাধান খোঁজে বাহ্যিক সম্পদে নয়, অন্তরের প্রশান্তিতে। ঈশোপনিষদের বিখ্যাত শান্তিমন্ত্র—
“ॐ पूर्णमदः पूर्णमिदं पूर्णात् पूर्णमुदच्यते।”
এই মন্ত্র শেখায়, পরিপূর্ণতা কখনও বাইরে থেকে আসে না; মানুষের অন্তরেই রয়েছে তার উৎস। যে ব্যক্তি নিজের অন্তরকে চিনতে পারে, সে কখনই বাহ্যিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার দ্বারা বিচলিত হয় না।
আধুনিক সমাজে আমরা দেখতে পাই, ধর্ম নিয়ে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সংঘাত ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ উপনিষদ আমাদেরঐক্যের শিক্ষায় শিক্ষিত করে, বিভেদের নয়, তাই বলা হয়েছে—
“सर्वं खल्विदं ब्रह्म।”
অর্থাৎ, “এই সমগ্র বিশ্বই ব্রহ্মস্বরূপ।”
অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে একই চৈতন্য বিরাজমান। তাই কেন মানুষে মানুষে এত ঘৃণা, হিংসা ও বৈরিতা? ভারতীয় এই দর্শন আজকের বিশ্বশান্তির অন্যতম ভিত্তিই হতে পারে।
এই মন্ত্র শেখায়, পরিপূর্ণতা কখনও বাইরে থেকে আসে না; মানুষের অন্তরেই রয়েছে তার উৎস। যে ব্যক্তি নিজের অন্তরকে চিনতে পারে, সে কখনই বাহ্যিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার দ্বারা বিচলিত হয় না।
আধুনিক সমাজে আমরা দেখতে পাই, ধর্ম নিয়ে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সংঘাত ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ উপনিষদ আমাদেরঐক্যের শিক্ষায় শিক্ষিত করে, বিভেদের নয়, তাই বলা হয়েছে—
অর্থাৎ, “এই সমগ্র বিশ্বই ব্রহ্মস্বরূপ।”
অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে একই চৈতন্য বিরাজমান। তাই কেন মানুষে মানুষে এত ঘৃণা, হিংসা ও বৈরিতা? ভারতীয় এই দর্শন আজকের বিশ্বশান্তির অন্যতম ভিত্তিই হতে পারে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৯: যুধিষ্ঠির-আয়োজিত রাজসূয়যজ্ঞের মহাসম্মেলন ও চেদিরাজ শিশুপালের ভূমিকা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ
পরিবেশ সংকটও আজ মানবসভ্যতার বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তন, বন কেটে ফেলা, দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার মানবজাতির ভবিষ্যৎকে ক্রমশ বিপন্ন করে তুলছে। কিন্তু উপনিষদ প্রকৃতিকে কেবল ভোগ্য বস্তু হিসেবে দেখে না; বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই বিবেচনা করে। মানুষ, প্রকৃতি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই ঐক্যের ধারণা আধুনিক পরিবেশনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার শিক্ষাক্ষেত্রেও উপনিষদের গুরুত্ব আজও অপরিসীম। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই তথ্য ও দক্ষতা অর্জনের উপর জোর দেয়, কিন্তু চরিত্রগঠন, নৈতিকতা এবং আত্মজ্ঞানকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেয়। উপনিষদ শিক্ষা দেয়—জ্ঞান কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়; জ্ঞান এমন এক শক্তি যা মানুষকে সত্যনিষ্ঠ, সংযমী, মানবিক এবং দায়িত্বশীল করে তোলে।
উপনিষদের নৈতিক শিক্ষা আজও বিস্ময়করভাবে আধুনিক। তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হয়েছে—
“सत्यं वद। धर्मं चर।”
অর্থাৎ, “সত্য বলো, ধর্মাচরণ করো।”
এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশের মধ্যেই রয়েছে সুশাসন, সামাজিক ন্যায়, ব্যক্তিগত সততা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের মূল দর্শন। দুর্নীতি, প্রতারণা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যুগে এই বাণী নতুন তাৎপর্য বহন করে আনে।
উপনিষদের নৈতিক শিক্ষা আজও বিস্ময়করভাবে আধুনিক। তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হয়েছে—
অর্থাৎ, “সত্য বলো, ধর্মাচরণ করো।”
এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশের মধ্যেই রয়েছে সুশাসন, সামাজিক ন্যায়, ব্যক্তিগত সততা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের মূল দর্শন। দুর্নীতি, প্রতারণা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যুগে এই বাণী নতুন তাৎপর্য বহন করে আনে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৭ : শাক্য সিংহের খোঁচর!

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…
বিশ্বদর্শনের ইতিহাসেও উপনিষদের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। পাশ্চাত্যের বহু দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ উপনিষদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার উপনিষদকে মানবচিন্তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে অভিহিত করেছিলেন। আধুনিক ভারতেও স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীঅরবিন্দ প্রমুখ মনীষীরা উপনিষদের চেতনাকে নতুন যুগের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁদের চিন্তায় উপনিষদ কেবল অতীতের ঐতিহ্য নয়, বরং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শকও।
তবে উপনিষদের প্রাসঙ্গিকতা মানে অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। বরং আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ এবং মানবাধিকারের মূল্যবোধকে অস্বীকার না করেই উপনিষদের আত্মজ্ঞান, সহমর্মিতা, নৈতিকতা এবং বিশ্বমানবতার চেতনাকে সমকালীন জীবনে প্রয়োগ করা। উপনিষদ কোনও অন্ধ বিশ্বাস শেখায় না; বরং প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নিজেকে উপলব্ধি করতে শেখায়। এই বৈজ্ঞানিক মনোভাবই তাকে চিরকালীন করে তুলেছে।
আজ যখন মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে, তখন একই সঙ্গে মানবিক বুদ্ধিমত্তা, নৈতিকতা এবং আত্মসচেতনতারও প্রয়োজন রয়েছে। উপনিষদ সেই অন্তর্জাগরণের পথ নির্দেশ করে। উপনিষদ আমাদের শেখায়—প্রকৃত উন্নতি কেবল প্রযুক্তির উন্নতিতে নয়; মানুষের চরিত্র, চেতনা এবং মানবিকতার বিকাশেই নিহিত।
তবে উপনিষদের প্রাসঙ্গিকতা মানে অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। বরং আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ এবং মানবাধিকারের মূল্যবোধকে অস্বীকার না করেই উপনিষদের আত্মজ্ঞান, সহমর্মিতা, নৈতিকতা এবং বিশ্বমানবতার চেতনাকে সমকালীন জীবনে প্রয়োগ করা। উপনিষদ কোনও অন্ধ বিশ্বাস শেখায় না; বরং প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নিজেকে উপলব্ধি করতে শেখায়। এই বৈজ্ঞানিক মনোভাবই তাকে চিরকালীন করে তুলেছে।
আজ যখন মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে, তখন একই সঙ্গে মানবিক বুদ্ধিমত্তা, নৈতিকতা এবং আত্মসচেতনতারও প্রয়োজন রয়েছে। উপনিষদ সেই অন্তর্জাগরণের পথ নির্দেশ করে। উপনিষদ আমাদের শেখায়—প্রকৃত উন্নতি কেবল প্রযুক্তির উন্নতিতে নয়; মানুষের চরিত্র, চেতনা এবং মানবিকতার বিকাশেই নিহিত।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা
উপনিষদ কোনও নির্দিষ্ট যুগের জন্য রচিত গ্রন্থ নয়; এটি মানবসভ্যতার চিরন্তন জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার এক অনবদ্য প্রচেষ্টা। তাই সময় যতই পরিবর্তিত হোক, মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, নৈতিক সংকট এবং সত্যের অনুসন্ধান কখনও শেষ হবে না। আর যতদিন এই অনুসন্ধান থাকবে, ততদিন উপনিষদও প্রাসঙ্গিক থাকবে।
আজকের পৃথিবীকে যদি আরও মানবিক, শান্তিপূর্ণ, নৈতিক এবং সহমর্মিতাপূর্ণ করে তুলতে হয়, তবে উপনিষদের শিক্ষা নতুন করে পাঠ করা এবং জীবনচর্চায় প্রয়োগ করা অপরিহার্য। আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীন প্রজ্ঞার এই সম্মেলনই হতে পারে আগামী দিনের সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি।
আজকের পৃথিবীকে যদি আরও মানবিক, শান্তিপূর্ণ, নৈতিক এবং সহমর্মিতাপূর্ণ করে তুলতে হয়, তবে উপনিষদের শিক্ষা নতুন করে পাঠ করা এবং জীবনচর্চায় প্রয়োগ করা অপরিহার্য। আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীন প্রজ্ঞার এই সম্মেলনই হতে পারে আগামী দিনের সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি।
* লেখক: ড. সঞ্চিতা কুণ্ডু (Sanchita Kundu) সংস্কৃতের অধ্যাপিকা, হুগলি মহসিন কলেজ।


















