
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
কাকোলূকীযম্
রাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে ট্র্যাজিক এবং অনিবার্য সত্য হল—যখন কোনও রাষ্ট্রব্যবস্থা তার নিজের পতনের দিকে ত্বরান্বিত হয়, তখন সেই দেশের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ, দূরদর্শী এবং সত্যিকারের দেশপ্রেমিক মানুষগুলোকে হয় নির্বাসনে যেতে হয়, নয়তো সমাজ ও রাষ্ট্রের দ্বারা উপেক্ষিত হয়ে অপমৃত্যু বরণ করতে হয়। ইতালীয় দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলো মিকিয়াভেলি (Niccolò Machiavelli) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’ (The Prince)-এ যেমন সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, “চাটুকাররা হল রাজদরবারের সবচেয়ে বড় ব্যাধি, আর যে শাসক তাদের স্তুতিবাক্য থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তার ধ্বংস নিশ্চিত।” উলূকরাজঅরিমর্দনের রাজসভাতেও ঠিক সেই একই ঐতিহাসিক ব্যাধির পচন ধরেছিল।
বিচক্ষণ মন্ত্রী রক্তাক্ষের সমস্ত অকাট্য যুক্তি, আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাঠ আর রক্তজল করা সতর্কবাণী সেদিন রাজসভার চাটুকার মন্ত্রীদের স্তুতিবাক্যের স্রোতে খড়কুটোরমতো ভেসে গেল। ‘সিন্ধুক’ পাখির সেই অমর শ্লোক—“সর্বংবৈমূর্খমণ্ডলম্”—উচ্চারণ করে রক্তাক্ষ যখন চোখে আঙুল দিয়েদেখিয়ে দিলেন যে, শত্রু-গুপ্তচর স্থিরজীবীকে দুর্গের প্রবেশদ্বারে স্থান দিয়ে পুরো উলূক জাতি আজ এক আত্মঘাতী‘মূর্খমণ্ডল’-এ পরিণত হয়েছে, তখন চাটুকার অমাত্যরা কেবল অন্ধেরমতো হাসল।
পেঁচাদের দল যেন এক অদ্ভুত আত্মধ্বংসী উল্লাসে মেতে উঠল। নিয়তির চরম পরিহাসে রাজা অরিমর্দন এবং তাঁর স্তাবক মন্ত্রীরা রক্তাক্ষের সেই হিতোপদেশকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সেই বৃদ্ধ কাক স্থিরজীবীকে আরও বেশি করে রাজকীয়পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করল। প্রতিদিন দুর্গের ভেতর থেকে তাঁর আহারের জন্য আসতে লাগল প্রচুর মাংস এবং নানাবিধ সুস্বাদু খাবার—
রক্তাক্ষ আর কালক্ষেপণ করলেন না। গভীর রাতে নিজের একান্ত অনুগত অনুচর ও পরিবারবর্গকে গোপনে ডেকে নিয়ে বললেন, “শোনো! আমাদের এই মহারাজার মঙ্গল এবং এই দুর্গের নিরাপত্তা আজ পর্যন্তই ছিল—
নিজের সিদ্ধান্তের সপক্ষে এবং অনুচরদের মনের দ্বিধা কাটাতে রাষ্ট্রনীতির এক ধ্রুবসত্য উচ্চারণ করলেন রক্তাক্ষ। তিনি বললেন, “রাজনীতি শাস্ত্র বলে—
স শোচ্যতে যো ন করোত্যনাগতম্।
বনেঽত্রসংস্থস্য সমাগতা জরা,
বিলস্য বাণী ন কদাঽপি মে শ্রুতা॥ (কাকোলূকীয়ম্ ২১৩)
অর্থাৎ, যে নেতা বা ব্যক্তি অদূর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপদকে আগে থেকেই অনুধাবন করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তিনিই জীবনে সফল ও সুরক্ষিত হন। আর যে ব্যক্তি বিপদ ঘাড়ে এসে পড়ার আগে পর্যন্ত উদাসীন থাকে, তাকে শেষ পর্যন্ত অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হয়। এই গহীন বনে বাস করে আমার বার্ধক্য চলে এল, কিন্তু কোনওদিন তো গুহাকে কথা বলতে শুনিনি!”
রক্তাক্ষের মুখে এই অদ্ভুত শ্লোক শুনে অনুচররা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল, “প্রভু! সে কেমন কথা? ‘কথমেতৎ?’গুহা আবার কথা বলে নাকি? এই ব্যাপারটা ঠিক কি?”
তখন কূটনীতিজ্ঞরক্তাক্ষ তাঁর অনুচরদের রাষ্ট্রীয় সতর্কতা ও উপস্থিত বুদ্ধির এক অপূর্ব নিদর্শন শোনালেন। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে এটি কেবল একটি বন্য প্রাণীর গল্প নয়, বরং এটি হলো মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare) এবং চরম সংকটে কীভাবে মাথা ঠাণ্ডা রেখে শত্রুর ফাঁদ চিনে নিতে হয়—তার এক চিরন্তন দলিল। আধুনিক সাহিত্যের ভাষায় যাকে আমরা বলি ‘Survival Strategy’বা অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত কৌশল, তা বোঝাতেই রক্তাক্ষবলতেশুরু করলেন —

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৮০ : আকাশ এখনও মেঘলা
১৫: কথা বলা গুহার গল্প
কোনও এক ঘন অরণ্যের এক প্রান্তে বাস করত ‘খরনখর’ নামে এক মহাশক্তিধর সিংহ। সংস্কৃত সাহিত্যে চরিত্রগুলোর নাম কেবল চেনার জন্য দেওয়া হয় না; প্রতিটি নামই এক একটি রূপক বা মেটাফর। ‘খর’শব্দের অর্থ অত্যন্ত ধারালো বা তীক্ষ্ণ, আর ‘নখর’হলো থাবার নখ। অর্থাৎ, যার থাবার নখ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও ধারালো, তাকেই খরনখর বলা হয়। বনের রাজা হিসেবে তার শারীরিক শক্তি ও মারণাস্ত্রের কোনও তুলনা ছিল না।
একদিন প্রচণ্ড ক্ষুধায় অস্থির হয়ে সে সারাদিন বনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তচষেবেড়ালো, কিন্তু ভাগ্যের দোষে একটি ছোট প্রাণীরও দেখা মিলল না—“ক্ষুৎক্ষামকণ্ঠো ন কিঞ্চিদ্অপিসত্ত্বম্আসসাদ”। অবশেষে সূর্যাস্তের রক্তিম আলো যখন বনের আকাশকে ঢেকে দিচ্ছে, তখন সে এক বিশাল পাহাড়ি গুহার সন্ধান পেল। খরনখরেরধূর্তমস্তিষ্ক কাজ করে উঠল। সে ভাবল, “নিশ্চয়ই রাত হলে কোনও না কোনও বন্য প্রাণী বিশ্রাম নিতে এই গুহায় আসবেই। আমি ভেতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকি, শিকার নিজে থেকেই আমার মুখে এসে পড়বে।” এই ভেবে সে সেই গুহার অন্ধকারে নিজেকে লুকিয়েরাখল।
সূর্যাস্তের শেষ রক্তিম আলো যখন অরণ্যের দীর্ঘ ছায়াগুলোকে গহীন অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে, ঠিক তখনই নিজের পরিচিত আস্তানায় এসে উপস্থিত হলো গুহার প্রকৃত মালিক—‘দধিপুচ্ছ’ নামের এক ধুরন্ধর শৃগাল। পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মার নামকরণের মুন্সিয়ানা এখানেও অনবদ্য! ‘দধিপুচ্ছ’—অর্থাৎ যার পুচ্ছ বা লেজটি জমাট দইয়েরমতো স্নিগ্ধ ও ধবধবে সাদা। কিন্তু এই শান্ত-সৌম্য রূপ কেবলই এক চমৎকার কূটনৈতিক ছদ্মবেশ! অরণ্য-সাম্রাজ্যে শিয়াল কেবল কোনো সাধারণ বন্য প্রাণী নয়, সে হলো প্রকৃতির সহজাত এক ‘গূঢ়পুরুষ’ বা নিপুণ গুপ্তচর—যার পঞ্চইন্দ্রিয় সর্বদা সতর্ক এবং চোখ ও কান চিরজাগ্রত।
ঠিক এই বিন্দুতেই তৈরি হয়রাষ্ট্রনীতির এক রোমাঞ্চকর ও চিরন্তন বৈপরীত্য! গুহার অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা সিংহ‘খরনখর’যেখানে অন্ধ বাহুবল, উগ্র হিংস্রতা আর চিন্তাহীনপেশিশক্তির এক ভয়াল প্রতীক; গুহার বাইরে দাঁড়িয়েথাকা শিয়াল ‘দধিপুচ্ছ’ সেখানে বরফের মতো শীতল মস্তিষ্ক, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং ধীরস্থির চাণক্য-প্রজ্ঞার মূর্ত প্রতীক! যুদ্ধের ময়দানে আজ যেন মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে—অন্ধ তরবারির ধার বনাম তীক্ষ্ণ মেধার ধার!
গুহার মুখে পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালদধিপুচ্ছ। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ল মাটিতে নরম বালিরওপর স্পষ্ট পায়ের ছাপ। সে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখল—সিংহের পায়ের ছাপ গুহার ভেতরে প্রবেশ করেছে ঠিকই, কিন্তু বেরিয়ে আসার কোনও চিহ্ন নেই! ‘সিংহপদপদ্ধতিংগুহায়াংপ্রবিষ্টা, ন চ নিষ্ক্রমণ গতা ইতি দৃষ্টবান্’।
দধিপুচ্ছের বুক কেঁপে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, “সর্বনাশ! আমি তো আজ শেষ! এই গুহার ভেতর নিশ্চিতভাবেই কালান্তক সিংহ বসে আছে। এখন উপায়? ভেতরে যাওয়া মানেই মৃত্যু, আর না গিয়ে ফিরে যাওয়াও আবার বোকামি। যদি আমার সন্দেহ ভুল হয়। পরিস্থিতি নিশ্চিত না করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।”

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬০: ধাড়ি ইঁদুর

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৯: যুধিষ্ঠির-আয়োজিত রাজসূয়যজ্ঞের মহাসম্মেলন ও চেদিরাজ শিশুপালের ভূমিকা
সরাসরি শক্তি দিয়ে যখন লড়াই জেতা সম্ভব নয়, তখন শুরু হয় স্নায়ুর লড়াই—চাণক্যের ভাষায় যার নাম ‘উপজাপ’। এর সহজ গল্পটা হল, শত্রুর মনের ভেতর সংশয়, ভয় আর বিভ্রান্তির বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে ভিতর থেকেই ভেঙে দেওয়া। সে তাই গুহার সামনে দাঁড়িয়ে কোনও অস্ত্র শানাল না, সে শুরু করল এক অদ্ভুত নাটক!গ্রিক পুরাণে যেমন অডিসিয়াস (Odysseus) তাঁর বুদ্ধি দিয়েট্রয় নগরীর পতন ঘটিয়েছিলেন, তেমনই দধিপুচ্ছ গুহার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়েহঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “হে গুহা! ওগো আমার গুহা! তুমি চুপ করে আছো কেন? ‘অহো বিল! অহো বিল!”
ভিতর থেকে কোনও সাড়া এলো না। শিয়াল আবার নাটকের সুর চড়িয়ে বলল,“কী ব্যাপার? তোমার কি আমাদের সেই পুরনো চুক্তির কথা মনে নেই? আমরা না শর্ত করেছিলাম, যখন আমি বাইরে থেকে ফিরে এসে তোমাকে ডাকব, তখন তুমি আমাকে স্বাগত জানিয়ে উত্তর দেবে? আজ তুমি যদি আমার ডাকে সাড়া না দাও, তবে আমি কিন্তু অন্য গুহায় চলে যাব!”
আসলে এটা কিন্তু শেয়ালের পাগলামি ছিল না; এটা ছিল গুহার অন্ধকারে বসে থাকা সিংহের মস্তিষ্কে এক প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করার মোক্ষম চাল। দধিপুচ্ছের কথাগুহার ভেতর লুকিয়ে থাকা সিংহ এই কথা শুনে মহা ফাঁপরে পড়ল। তার অপরিণত ও ভোঁতা মন ভাবল, “তাই তো! এই গুহা নিশ্চয়ই প্রতিদিন আসার সময় এই শিয়ালকে ডেকে স্বাগত জানায়। আজ আমার ভয়ে বেচারা গুহাটা কাঠ হয়ে আছে, তাই মুখ দিয়ে কথা সরছে না! শাস্ত্রে বলে—
প্রবর্তন্তে ন বাণী চ বেপথুশ্চাধিকো ভবেৎ॥ (কাকোলূকীয়ম্ ২১৪)
অর্থাৎ, ভয়ে এবং আতঙ্কে যাদের মন আড়ষ্ট হয়ে যায়, তাদের হাত-পায়ের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা লোপ পায়। তাদের কণ্ঠ থেকে বাকস্ফুর্তি হয় না এবং শরীরে কেবল প্রচণ্ড কম্পন সৃষ্টি হয়। সিংহ ভাবল, গুহাটিরও ঠিক সেই দশাই হয়েছে!
সিংহ ঠিক করল, গুহা হয়তো কথা বলবে নাতাই সে নিজেই গুহা সেজে শিয়ালকে স্বাগত জানাবে, যাতে শিয়াল আশ্বস্ত হয়ে ভিতরে ঢোকে এবং তার খিদের শিকার হয়। এই ভেবে সিংহ তার গম্ভীর কণ্ঠে ডেকে উঠল।
সিংহের সেই ভয়াবহ গর্জনে গুহার ভিতর প্রচণ্ড প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হল। সেই বিকট ও গমগমে আওয়াজে শুধু গুহা নয়, দূর-দূরান্তের বন্য প্রাণীরাও আতঙ্কে শিউরে উঠে যে যার দিকে পালাতে শুরু করল!
নিজের চতুরতারজয় দেখে শিয়াল আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। প্রাণের রক্ষে পেয়ে ঊর্ধ্বে ছুটতেছুটতে সে তখন সেই শ্লোকটি উচ্চারণ করেছিল—“অনাগতংযঃ কুরুতে স শোভতে…” (যে আসন্ন বিপদ বুঝে ব্যবস্থা নেয়, সেই বাঁচে; আমি বুড়ো হলাম, কিন্তু গুহাকে কথা বলতে শুনিনি!)

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৭ : শাক্য সিংহের খোঁচর!

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…
এই বলে দূরদর্শী মন্ত্রী রক্তাক্ষ তাঁর সমস্ত অনুগামী ও পরিবার নিয়ে পেঁচাদের দুর্গ চিরকালের মতো ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেলেন।
রক্তাক্ষের এই প্রস্থানে দুর্গের ভেতরে বসে সব চেয়েবেশিউল্লসিত হলো শত্রু-গুপ্তচর স্থিরজীবী (কাক)। তার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। সে মনে মনে বলল -“আহা! কী পরম সৌভাগ্য আমাদের! পেঁচাদের দুর্গের একমাত্র চক্ষু, সেই দূরদর্শীরক্তাক্ষ আজ চলে গেল! বাকি যারা আছে, তারা সব কটা নির্বোধ আর চাটুকার। এবার এই দুর্গ ধ্বংস করা কেবল সময়ের অপেক্ষা! রাজনীতি শাস্ত্রে বলে—
ক্রমায়াতাধ্রুবংতস্য ন চিরাৎ স্যাৎ পরিক্ষয়ঃ॥ (কাকোলূকীয়ম্ ২১৬)
অর্থাৎ, যে রাজার দরবারে দূরদর্শী, বিচক্ষণ এবং বংশানুক্রমিক বিশ্বস্ত মন্ত্রীরা থাকেন না, সেই রাজার রাজত্ব যত শক্তিশালী বা প্রাচুর্যময়ই হোক না কেন—অচিরেই তার নিশ্চিত ও সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটে।
আসলে পঞ্চতন্ত্রেরএই ‘কথা বলা গুহার কাহিনি’টি কেবল একটি নীতিগল্প নয়; আধুনিক রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামরিক মনস্তত্ত্বেরআলোয় এটি ‘অসম যুদ্ধ’ (Asymmetrical Warfare)ও ‘কৌশলগতগোয়েন্দা তথ্যের’ (Strategic Intelligence)এক কালজয়ী আখ্যান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়, মহাশক্তিধর সিংহ ‘খরনখর’ হল অন্ধ সামরিক শক্তি ও দাম্ভিক সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক—যার অস্ত্রসম্ভার (তীক্ষ্ণ নখর) বা ‘Hard Power’ অসীম হলেও সূক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব প্রকট। অন্যদিকে, শিয়াল ‘দধিপুচ্ছ’ প্রতিনিধিত্ব করে একটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল কিন্তু মেধা-ভিত্তিক কূটনীতি ও গোয়েন্দা জালের (Intelligence Network), যা টিকে থাকে ‘Soft Power’ এবং মনস্তাত্ত্বিক চাতুর্যের (Psychological Warfare) ওপর ভর করে।

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে
ইতিহাসের পাতায় এর সবচেয়ে বড় ও বাস্তব উদাহরণ হল ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্রসংকট (Cuban Missile Crisis)। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি (John F. Kennedy) শিয়াল ‘দধিপুচ্ছ’-এর মতোই এক চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন (খরনখর-এর মতোমহাশক্তিধর প্রতিপক্ষ) গোপনে কিউবার মাটিতে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের ফাঁদ পেতে রেখেছিল। কেনেডি যদি অন্ধ বাহুবল বা আবেগের বশে অবিলম্বে কিউবায় সরাসরি সামরিক আক্রমণ চালাতেন (গুহার ভিতর অন্ধভাবে প্রবেশ করা), তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পারমাণবিক ধ্বংস অনিবার্য ছিল। কিন্তু তিনি চরম শীতল মস্তিষ্কেউড়োজাহাজের গোপন ছবি (পদচিহ্ন বিশ্লেষণ)-র মাধ্যমে শত্রুর ফাঁদ ও উপস্থিতি নিশ্চিত করেন এবং সরাসরি আক্রমণ না করে ‘নৌ-অবরোধ’ (Naval Blockade)-এর মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেন। ঠিক যেমন শিয়ালের নাটকে বিভ্রান্ত হয়ে খরনখর গর্জন করে নিজের অবস্থান প্রকাশ করে ফেলেছিল, তেমনই কেনেডির শীতল মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতির কাছে সোভিয়েত নেতা নিকিতাক্রুশ্চেভ পিছু হটতে বাধ্য হন এবং গোপন ক্ষেপণাস্ত্র সরাতে রাজি হন।
অতএব, পঞ্চতন্ত্রের এই গল্প আমাদের রাষ্ট্রনীতির এই ধ্রুবসত্যইশেখায় যে—আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে অন্ধ সামরিক আস্ফালন ও অহংকারের চেয়ে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং মনস্তাত্ত্বিক চাতুর্য অনেক বেশি কার্যকর অস্ত্র।—চলবে।


















